সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বুধবার পালিত হল বিশ্বকর্মা পূজা। দিনটি শ্রমজীবী মানুষের ক্যালেন্ডারে লাল দাগে চিহ্নিত। কারণ আজই পালিত হচ্ছে বিশ্বকর্মা পূজাÑকারিগর, নির্মাতা, প্রকৌশলী ও শ্রমজীবী মানুষের দেবতার আরাধনা। ভাদ্র মাসের শেষ প্রান্তে এসে বাংলার আকাশে ছড়িয়ে পড়ে দুর্গোৎসবের গন্ধ, আর তার আগমনী সুর বয়ে আনে বিশ্বকর্মা পূজা। অনেকেই প্রশ্ন করেনÑকে এই বিশ্বকর্মা? কেন তাঁকে শ্রমজীবীদের আরাধ্য বলা হয়? কেনই বা কারখানা, ওয়ার্কশপ, মিস্ত্রিখানা কিংবা স্থাপত্যের মাঠে এ পূজা এত গুরুত্ব পায়? এর উত্তর পেতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে পৌরাণিক কাহিনি, ধর্মগ্রন্থ ও শ্রমসংস্কৃতির শিকড়ে। বিশ্বকর্মার নাম প্রথম উচ্চারিত হয় ঋগবেদে।
দশম ম-লের ৮১ ও ৮২ নম্বর সূক্তে তাঁকে বলা হয়েছেÑসৃষ্টিকর্তা, মহাশিল্পী ও ধাতা। বলা হয়েছে, প্রথমে ছিল কেবল জল, তার ভেতর থেকেই বিশ্বকর্মার চিন্তাশক্তি সৃষ্টিকে জন্ম দেয়। তিনি শুধু সৃষ্টিকর্তাই নন, তিনি শ্রমের প্রতীক, কর্মের দেবতা। পুরাণে বিশ্বকর্মার জন্ম নিয়ে নানা আখ্যান আছে। কারও মতে তিনি অষ্টবসুর অন্যতম প্রভাস ও বৃহস্পতির ভগিনী বরবর্ণিনীর সন্তান। আবার ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ বলছেÑপ্রজাপতি ব্রহ্মার নাভি থেকে তাঁর উৎপত্তি। এ কারণে তাঁকে অজাত পুরুষ বা সনাতন পুরুষ বলা হয়।
বিশ্বকর্মাকে সাধারণত চার বাহু, রাজার মুকুট ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি হাতে চিত্রিত করা হয়। হাতে থাকে দাঁড়িপাল্লা (জ্ঞান ও কর্মের ভারসাম্য), হাতুরি (শিল্পের প্রতীক), কলস (সমৃদ্ধির প্রতীক) এবং বই (বিদ্যার প্রতীক)। তাঁর বাহন হাতিÑযা শক্তি ও শ্রমের প্রতীক। সত্যযুগে তিনি নির্মাণ করেন স্বর্গলোক, দেবরাজ ইন্দ্রের প্রাসাদ। ত্রেতা যুগে তাঁর সৃষ্ট সোনার লঙ্কা হয়ে ওঠে রাবণের রাজধানী। দ্বাপর যুগে তিনি নির্মাণ করেন শ্রীকৃষ্ণের নগরী দ্বারকা। কলিযুগে তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে হস্তিনাপুর ও ইন্দ্রপ্রস্থ।
ভগবান শিবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, ইন্দ্রের বজ্র, কার্তিকের শক্তি, কুবেরের অস্ত্রÑসবই বিশ্বকর্মার সৃষ্টি। এমনকি জগন্নাথদেবের বিগ্রহও তাঁর হাতে নির্মিত বলে বিশ্বাস। বিশ্বকর্মার রচিত স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থের নাম বাস্তুশাস্ত্রম। এখানে গৃহ, নগর, মন্দির, উদ্যান, পুকুর, এমনকি শৌচাগার পর্যন্ত কোথায় হবেÑসব নির্দিষ্ট করে লেখা আছে। তিনি বলেছিলেনÑ“কাষ্ঠং নো ভক্ষ্যতে কীটের্যদি পক্ষং ধৃতং জলে।” অর্থাৎ কাঠ কেটে ১৫ দিন জলে ডুবিয়ে রাখলে তাতে পোকা ধরবে না।
এমন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আজও বিস্মিত করে। ভাদ্র সংক্রান্তির দিন বিশ্বকর্মা পূজা হয়। এদিন কারখানা, ওয়ার্কশপ, গ্যারেজ, তাঁতঘর, কুমোরপাড়া, কাঠমিস্ত্রির আঙিনাÑসব জায়গায় এক উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। যন্ত্রপাতি ধুয়ে-মুছে সাজানো হয়।মেশিনে গামছা বা ফুল বেঁধে পূজা দেওয়া হয়। ঘরে বিশেষ ভোজের আয়োজন হয়। কোথাও কোথাও ঘুড়ি ওড়ানো হয়। শ্রমজীবীদের বিশ্বাস তাঁরা মনে করেনÑবিশ্বকর্মার আশীর্বাদে হাতের কাজ সফল হয়, জীবিকা টিকে থাকে, দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
বিশ্বকর্মা পূজার অন্যতম আনন্দ হলো ঘুড়ি ওড়ানো। বাংলার বহু শহর, বিশেষ করে নদীবেষ্টিত এলাকা বা পুরনো মহল্লায় ভাদ্র সংক্রান্তির দিনে আকাশ রঙিন ঘুড়িতে ভরে ওঠে। শ্রমজীবী মানুষ যেমন এদিন যন্ত্রপাতি সাজিয়ে পূজা করেন, তেমনি শিশু-কিশোর থেকে যুবকরা ঘুড়ির টানে ছুটে যায় ছাদে। অনেক জায়গায় এটি একপ্রকার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। ঘুড়ি যেন শ্রমের বাঁধন ছিন্ন করে আকাশে উড়ার প্রতীক। শ্রমজীবী মানুষের অন্তরে জমে থাকা আনন্দের বিস্ফোরণ প্রকাশ পায় আকাশ ভরা রঙিন কাগজের নাচনে।
আগেকার দিনে বিশ্বকর্মা পূজা ছিল মূলত কারিগর ও পুরুষ শ্রমজীবীদের বিষয়। কিন্তু সময় পাল্টেছে। এখন সেলাই, তাঁত, পোশাকশিল্প, এমনকি কাঠ ও ধাতুশিল্পেও নারীর অবদান চোখে পড়ার মতো। ফলে বিশ্বকর্মা পূজায় নারীদের উপস্থিতিও বেড়েছে। অনেক কারখানায় নারী শ্রমিকরাই নিজের হাতে পূজার আয়োজন করেন, ম-প সাজান, প্রসাদ বিতরণ করেন। এতে পূজা শুধু শ্রমের নয়, লিঙ্গসমতার উৎসবেও রূপ নিচ্ছে। গ্রামে: মাটির ঘট, ধূপ-ধুনো, কলার থোড় আর যন্ত্রপাতির পূজা।
ছোট আঙিনায় সবাই একসঙ্গে বসে ভোগ খায়। শহরে: কারখানায় বিশাল ম-প, সাউন্ড সিস্টেম, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শ্রমিকদের সাথে মালিকপক্ষও যুক্ত থাকে। এই বৈপরীত্যই দেখায়, পূজা কেবল ধর্মীয় নয়Ñএটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। বিশ্বকর্মা পূজা স্থানীয় অর্থনীতিকেও সচল করে। ফুল বিক্রেতা, ফল বিক্রেতা, ঘুড়ি ব্যবসায়ী, প্রসাদ প্রস্তুতকারকÑসবাই লাভবান হয়। স্থানীয় শিল্পীরা প্রতিমা তৈরি করে আয়ের সুযোগ পান। কারখানার মালিকেরা এদিন শ্রমিকদের খুশি করতে বিশেষ বোনাস দেন।
ফলে এ পূজা হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক গতিশীলতার অংশ। বিশ্বকর্মা পূজা মূলত শ্রমজীবী মানুষের উৎসব। এদিন শ্রমিক-মালিক ভেদ থাকে না। সবাই একই আসনে বসে পূজা করে, খায়-দায়, আনন্দ করে। এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং শ্রমিক সমাজের সংহতির উৎসব। সারা বছরের কঠোর পরিশ্রমের ফাঁকে এই একদিন তারা আনন্দ খুঁজে নেয়। বিশ্বকর্মার ধারণা থেকে জন্ম নিয়েছে বহু শিল্পকলা ও নির্মাণধারা।মন্দির স্থাপত্যে সূক্ষ্ম নকশা। অলংকারশিল্পে স্বর্ণকারদের কৌশল।
কুমোরদের মৃৎশিল্প। জাহাজ নির্মাণে ঐতিহ্য। সব ক্ষেত্রেই শ্রম ও শিল্পকে পবিত্র ধরা হয়েছে। আজকের দিনে কারখানা, সেতু, বিমানবন্দর, আকাশচুম্বী ভবনÑসবই বিশ্বকর্মার ঐতিহ্যের ধারক। প্রকৌশলী ও স্থপতিরা মনে করেন, তাঁদের কাজ একধরনের পূজা। শ্রমিকেরা মনে করেন, প্রতিটি হাতুড়ির শব্দ আসলে বিশ্বকর্মার স্মরণ। প্রযুক্তির যুগেও এই পূজা শ্রমের মর্যাদা ও শিল্পীর সৃজনশীলতাকে স্বীকৃতি দেয়। বিশ^কর্মা পূজা আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñশিল্প ছাড়া সভ্যতা নেই। শ্রম ছাড়া উন্নতি নেই।
আর শ্রমজীবী মানুষ ছাড়া কোনো সমাজ টিকে থাকতে পারে না। ভাদ্র মাসের এই দিনে তাই শ্রমজীবী সমাজ দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার চরণে প্রার্থনা জানায়Ñ “ওঁ দেবশিল্পি মহাভাগ, দেবানাং কার্যসাধক;বিশ্বকর্মন্নমস্তুভ্যং, সর্বাভীষ্টপ্রদায়ক।” এ প্রার্থনা কেবল এক দেবতার উদ্দেশে নয়, এটি শ্রম ও শিল্পের প্রতি এক চিরন্তন শ্রদ্ধা। বিশ্বকর্মার পূজা তাই কেবল পূজা নয়Ñএটি শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উৎসব, শিল্প-সংস্কৃতির মহোৎসব।