সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : শারদীয় দুর্গাপূজার চতুর্থ দিন আজ শুরু হবে দেবী দুর্গার মহানবমী বিহিত পূজা। এদিন দেবী দুর্গার বিদায়ের সুরে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠবে প্রতিটি মণ্ডপের পরিবেশ।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধারণা, মহানবমীর দিনে দেবী দুর্গাকে প্রাণভরে দেখে নেওয়ার সময়। দুর্গাপূজার অন্তিম দিন বলা যায় মহানবমীর দিনটিকে। পরদিন কেবল বিজয়া ও বিসর্জনের পর্ব চলে।
শনিবার (১২ অক্টৈাবর) সকালে বিহিত পূজার মাধ্যমে মহানবমী পূজা শুরু হবে। আগামীকাল রোববার দশমী বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের পর প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব।
আজ শনিবার সন্ধ্যায় দেবীদুর্গার ‘মহাআরতি’ করা হয়। মহানবমীতে বলিদান ও নবমী হোমের রীতি রয়েছে। মূলত ‘সন্ধিপূজা’ শেষ হলে শুরু হয় মহানবমী। আজ ১০৮টি নীলপদ্মে পূজা হবে দেবীদুর্গার। পূজা শেষে যথারীতি থাকবে অঞ্জলি নিবেদন ও প্রসাদ বিতরণ। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রাণের উৎসবে ভক্তদের মধ্যে বইবে বিষাদের সুর। এদিনেই সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়ে থাকে পূজামণ্ডপগুলোতে।
শ্রী শ্রী চন্ডী থেকে জানা যায়, এদিন দুর্গা রুদ্ররূপ (মা কালী) ধারণ করে মহিষাসুর এবং তার তিন যোদ্ধা চন্ড, মুন্ড এবং রক্তবিজকে হত্যা করেন। নবমী তিথি শুরুই হয় সন্ধিপূজা দিয়ে। সন্ধিপূজা হয় অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীর সূচনার প্রথম ২৪ মিনিট জুড়ে। মূলত দেবী চামুন্ডার পূজা হয় এই সময়ে। ১০৮টি মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে ১০৮টি পদ্মফুল নিবেদন করা হয় দেবীর চরণে। আর ঠিক এই কারণে পূজার মন্ত্রেও সেই বিশেষত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। বুধবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া শারদীয় এ দুর্গোৎসবের শেষ হবে আগামীকাল রোববার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে।
পঞ্জিকা অনুসারে, এবার মহানবমী ও দশমী পূজা একই দিন পড়েছে। মহানবমী পূজা শেষে দশমী তিথি আরম্ভ হয়ে যাওয়ায় আজই দশমী পূজা সম্পন্ন হবে। সকাল ৬টা ১২ মিনিটের মধ্যে দুর্গাদেবীর মহানবমী কল্পারম্ভ ও বিহিতপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সকাল ৮টা ২৬ মিনিটের মধ্যে দেবীদুর্গার দশমী বিহিতপূজা ও পূজান্তে দর্পণ বিসর্জন করার হয়েছে। পূজা শেষে যথারীতি পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও সন্ধ্যায় ভোগ আরতি থাকবে। এ উপলক্ষে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনের পূজামণ্ডপে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে আরতি প্রতিযোগিতা।
গতকাল শুক্রবার অঞ্জলি, প্রার্থনা, বন্দনায় পালিত হয়েছে মহাঅষ্টমী ও সন্ধি পূজা। এদিনের মূল আকর্ষণ ছিল কুমারী পূজা। হিন্দু শাস্ত্রমতে, মানববন্দনা, নারীর সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ঈশ্বরের আরাধনাই কুমারী পূজার শিক্ষা।
হিন্দু বাঙালির প্রিয় উৎসব দুর্গা পূজা। শাস্ত্রে যেমন এর উজ্জ্বল বিস্তার পাওয়া যায় তেমনি বাংলায় এর একটি আধ্যাত্মিক পরম্পরা রয়েছে, রয়েছে দুর্গা সাধনার উজ্জ্বল ইতিহাস। মায়ের উপাসনার মূল ভিত্তি কালিকাপুরাণ, দেবীভাগবৎ এবং বৃহৎনন্দীকেশ্বর পূরাণ। উল্লেখ্য রামকৃষ্ণ মিশনের পূজা শেষোক্ত বৃহৎনন্দীকেশ্বর পূরাণ অনুসারে হয়। দুর্গাপূজার আচারের শাস্ত্রগত উল্লেখ মূলত বাসন্তকালের শুক্লা তিথির, শরৎকালের শ্রীরাম চন্দ্রের অকাল বোধনের নয়। শরৎকালের অকালবোধনে এই পূজার উল্লেখ রয়েছে বাল্মিকীর সংস্কৃত রামায়ন রচনা থেকে অনুদিত প্রায় ৩৮ ভাষার মধ্যে কেবল বাংলায় কৃত্তিবাসকৃত রামায়ণে। চর্যাপদের সময়কাল ( ৮ম – ১২শ শতাব্দী ) পেরিয়ে এর রচনাকাল মোটামুটি ১৪০০-১৫০০ খৃষ্টাব্দ। তবে কৃত্তিবাস বিরোচিত রামায়ণের আখ্যান বাংলার সংস্কৃতি চরিত্র ও ভৌগলিক প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রামায়ণের রচনা মূলত পুঁথি নির্ভর। সারা বাংলায় ২০২২টি পুঁথির সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলায় লিখিতভাবে এই রামায়ণের প্রকাশ ঘটে ১৮০২ সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে উইলিয়াম কেরির বদান্যতায়। তবে অনুষ্টুপ ছন্দে রচিত বাল্মিকীর মূল রামায়ণের রচনাকাল যীশু খ্রীষ্টের জন্মের আগে, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ থেকে ১০০ শব্দের মধ্যে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই পূজা কে কেবল উৎসবে, আরাধনা কে উন্মাদনায় পরিবর্তিত করে দেওয়ার পেছনে আসলে এর ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়ার অভিসন্ধি বলে ভয় হতে শুরু করেছে। তাই মহালয়ার ভোরে কিংবা নব পত্রিকার স্নানে যারা ভিতরের ক্লেদ ধুয়ে যাওয়ার পবিত্রতা অনুভব করেন তারা কখনওই পিতৃপক্ষে পূজার শুভারম্ভ কিংবা দশমির পরও মন্ডপে দেবী প্রতিমার দাঁড়িয়ে থাকা মানতে পারেননা। পেরিয়ে আসা পথ ধ্বংস করে দিয়ে যেমন করে ফেলে আসা জনপদের স্মৃতি মুছে ফেলা যায় না, তেমনি হিন্দু সংস্কৃতি, পরম্পরা ও ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়া খুব সহজ নয় বলে প্রতিজ্ঞ অনেকেই।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আজকের দিনের দুর্গাপ্রতিমার বিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট ধারা এই বঙ্গদেশে লক্ষ্য করা গেলেও তার মূল পূজাপদ্ধতি প্রায় অপরিবর্তিত। মায়ের মহিষমর্দিনী রূপ মূলত কুষাণ যুগের। চালুক্য যুগে তার সিংহবাহিনী রূপ পূজিত হতো এবং মহিষাসুরমর্দিনী রূপটি পল্লব যুগে খুঁজে পাওয়া গেছে।সপরিবার দুর্গা প্রতিমার পূজার প্রচলন বাংলায় প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহীর জেলার তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়নের পূজায়। রাজা কংস নারায়ন ছিলেন মনুসংহিতার টীকাকার কুল্লুক ভট্টের পুত্র। দুর্গাপূজার রীতি-মন্ত্র ও সামগ্রিক নির্মাণ করেন কংসনারায়ণের কুল পুরোহিত রমেশ শাস্ত্রী। বাঙালি পন্ডিত রঘুনন্দন তাঁর ‘তিথিতত্ত্ব’ গ্রন্থে দুর্গাপূজার সম্পূর্ণ বিধি বর্ণনা করেছেন। মিথিলার প্রসিদ্ধ পন্ডিত বাচস্পতি তাঁর গ্রন্থে দুর্গা প্রতিমার পূজা পদ্ধতির সবিস্তার বর্ননা দিয়েছেন।এই রচনার সময়কাল ১৪২৫ খৃষ্টাব্দ – ১৪৮০ খৃষ্টাব্দ।তবে শরৎকালীন দুর্গাপূজার সর্বোচ্চ প্রসার ও প্রচার লাভ করে ১৭৫৭ সালে কৃষ্ণনগরের অধিপতি নবকৃষ্ণ দেব বাহাদুর এবং শোভাবাজার রাজবাড়ীর পূজা আয়োজনের পর থেকেই। জনপ্রিয়তা এমন জায়গায় পৌঁছায় যে পলাশীর যুদ্ধ জয়ের পরে ক্লাইভ গির্জায় না গিয়ে আনন্দ উৎসবের জন্য দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। ইংরেজদের সন্তুষ্ট করার জন্য সেই সময়েই প্রথম দুর্গা পূজায় অহিন্দু সুলভ আচরন ঢুকে পড়ে, আয়োজন করা হয় বাইজি নাচের। মাঝে ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে কোচবিহারের রাজা বিশ্ব সিংহের প্রতিষ্ঠিত ‘দুর্গাবাড়ি’ বা ‘দেবীবাড়ী’র দুর্গাপূজা অন্যতম প্রসিদ্ধ হয়ে ছিল।
বাংলায় পারিবারিক দুর্গাপূজার প্রচলন মোটামুটি ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে বড়িশার সাবর্ন রায়চৌধুরী বাড়ীর পূজা আয়োজনের মাধ্যমে। সেই জমিদার বাড়ীর লক্ষীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের পুজো তাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল। যদিও অন্যমতে পারিবারিক দুর্গা পুজার সূচনা হয় ১৬০৯ সালে কাশীশ্বর দত্ত চৌধুরীর হাত ধরে। তখনও দুর্গাপূজা ছিল পুরোপুরি জমিদারের ঠাকুরদালান অথবা নাটমন্দিরে সীমাবদ্ধ।
১৭৯০ সালে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ার বারো জন ব্রাহ্মণ যুবকে যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল দুর্গাপূজার। বারো ইয়ার বা বন্ধু মিলে ওই পুজো ‘বারোইয়ারি’ বা ‘বারোয়ারি’ পূজা নামে খ্যাত হয়ে আছে। সেই থেকেই আজকের বারোয়ারি পুজোর বিবর্তন। আর কলকাতায় ‘বারোয়ারি’ দুর্গাপূজার প্রচলন রাজা হরিনাথ রায়ের হাত ধরে কাশিমবাজার রাজবাড়ীতে।সেদিনের সেই ‘বারোয়ারি’ কথাটি ধীরে ধীরে আজকের ‘সর্বজনীন’ কিংবা ‘সার্বজনীন’ এ রূপান্তরিত।
ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাস চর্চায় জাগ্রত প্রতীক হিসেবে দেবী মা দুর্গা প্রজ্জ্বলিত। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে জাগ্রত করতে এর সর্বজনীন পূজা ব্যাপক প্রসার লাভ করেছিল সেই পরাধীন দেশেই। দেবী দুর্গা কে আরাধ্য করেই ভারতমাতার জাগ্রত চেতনা মূর্তিরূপ লাভ করে। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ কিংবা অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতমাতা’ প্রতিরূপ দেবী দুর্গার বন্দনা গীতের আরেকটি প্রতিচ্ছবি। স্বাধীনতাকামী অসংখ্য যুবকের অফুরন্ত প্রাণশক্তির সম্মিলিত উপাদান আর শক্তি ও সুন্দরের অসীম ভান্ডার যে দেবী দুর্গার মধ্যে নিহিত তা স্পষ্ট করে প্রকাশিত হয়েছিল ঋষি অরবিন্দের সেই বিখ্যাত ‘দুর্গাস্তোত্র’ তে। ১৯০৯ সালে নিজের সম্পাদিত ‘ধর্ম’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় সেটি প্রকাশ পায়। ১৯০৫ সালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সহিংস ধারার গুপ্ত সংগঠনের, ‘অনুশীলন’ ও ‘যুগান্তরের’ এর হাজার হাজার যুবকের ‘জীবন মৃত্যু কে পায়ের ভৃত্য’ করা প্রেরণার উৎস ছিলেন অসুরনাশিনী মা দুর্গা। মৃত্যুকে তুচ্ছ করা এইসকল অজেয় বীর বিপ্লবীরা মা দুর্গা অথবা কালী মূর্তির সামনে আত্ম বলিদান শপথ গ্রহণ করতেন। কাজী নজরুল ইসলামকে দুর্গা মাতার শক্তি বন্দনার মাধ্যমে সহিংস বিপ্লবীদের উদ্বুদ্ধ করার কারনে ইংরেজ সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছিল। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সর্বজনীন দূর্গা পূজার সঙ্গে যুক্ত থাকার ইতিহাস পাওয়া যায়।
স্বাধীনতা উত্তর ভারতে এই পূজার প্রচার ও বিস্তার আরও ব্যাপকতা লাভ করেছে। একসময়ে জমিদার বনেদি বাড়ী কিংবা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবশালীদের পূজা ক্রমে সর্বসাধারণের হয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে প্যান্ডেল-আলো- থিম- বিনোদন সর্বস্ব আজকের আয়োজনে তার আধ্যাত্মিক ও অন্তরের প্রাণশক্তি ক্রমশ ফিকে হচ্ছে।মনে রাখা প্রয়োজন হিন্দু ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ কোনটাই শাস্ত্র বহির্ভূত নয়। আজকের দিনে চারদিকের আয়োজন দেখে মনে হয় সকল বিষয়টিকে শাস্ত্রের নিরিখে না বুঝে ব্যাবসায়িক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝে নিতে চাইছেন কেউ কেউ; সংযমের ধর্মীয় দুর্গাপূজা বিনোদন আর উশৃংখলের রঙ্গমঞ্চ হয়ে উঠছে দিন দিন। ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ আদর্শে কয়েক হাজার বছর ধরে টিকে যাওয়া হিন্দু ধর্মকে ভাতৃত্ববোধের পাঠ শেখানো প্রয়োজনহীন। যে বৈদিক সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণে দেবীর আরাধনা হয় সেই সংস্কৃত শব্দকোষে ‘বাতিল’ বা ‘exclusion’ বলে কোন শব্দই নেই। স্মরণ রাখা উচিত সেই সনাতন ধর্মের পূজা কিংবা মাঙ্গলিক কর্মে নিজ গোষ্ঠীর মঙ্গল প্রার্থনার কোন মন্ত্রই নেই। আছে সারা জগতের মঙ্গল কামনার পবিত্র আকাঙ্ক্ষা। সেই সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণে কেবল সকল মনুষ্য জাতির নয়, জগতের সকল পশুপাখি এবং গাছপালা সহ সকলের মঙ্গল কামনার উদাত্ত প্রকাশ। তাই আজকের দিনে তথাকথিত ‘সমন্বয়’ কিংবা ‘ভাতৃত্বের’ নাম করে দুর্গাপূজার আধ্যাত্মিক বিষয় দূরে সরিয়ে চাপিয়ে দেওয়া অশাস্ত্র সুলভ ও অভিসন্ধিমূলক এই সকল কর্মকান্ড, নিশ্চিতভাবে রাজনীতি ছাড়া আর কিছুই নয়।
দেবী দুর্গাকে কেন্দ্র করে উৎযাপিত দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হল বাঙালি হিন্দু সমাজের প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। আশ্বিন বা চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গাপূজা করা হয়। আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজা শারদীয়া দুর্গাপূজা এবং চৈত্র মাসের দুর্গাপূজা বাসন্তী দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। শারদীয়া দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা বেশি। বাসন্তী দুর্গাপূজা মূলত কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
দুর্গাপূজা ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল সহ ভারতীয় উপমহাদেশ ও বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রে পালিত হয়ে থাকে। তবে বাঙালি হিন্দু সমাজের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হওয়ার দরুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যে দুর্গাপূজা বিশেষ জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু হিন্দু সমাজেও দুর্গাপূজা বিশেষ উৎসাহের সঙ্গে পালিত হয়। এমনকি চারতের অসম ও ওড়িশা রাজ্যেও দুর্গাপূজা মহাসমারোহে পালিত হয়ে থাকে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে প্রবাসী বাঙালি ও স্থানীয় জনসাধারণ নিজ নিজ প্রথামাফিক শারদীয়া দুর্গাপূজা ও নবরাত্রি উৎসব পালন করে। এমনকি পাশ্চাত্য দেশগুলিতে কর্মসূত্রে বসবাসরত বাঙালিরাও দুর্গাপূজা পালন করে থাকেন।
২০০৬ সালে গ্রেট ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্রেট হলে “ভয়েসেস অফ বেঙ্গল” মরসুম নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর অঙ্গ হিসেবে স্থানীয় বাঙালি অভিবাসীরা ও জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এক বিরাট দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন।
দূর্গা পূজা কবে, কখন, কোথায় প্রথম শুরু হয়েছিল তার জানা যায় না। ভারতের দ্রাবিড় সভ্যতায় মাতৃতান্ত্রিক দ্রাবিড় জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। সিন্ধু সভ্যতায় ( হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতা) দেবীমাতা, ত্রিমস্তক দেবতা, পশুপতি শিবের পূজার প্রচলন ছিল। দূর্গা শিবের অর্ধাঙ্গিনী সে হিসাবে অথবা দেবী মাতা হিসাবে পূজা হতে পারে। তবে কৃত্তিবাসের রামায়নে আছে, শ্রী রাম চন্দ্র কালিদহ সাগর থেকে ১০১ টি নীল পদ্ম সংগ্রহ করে সাগর কূলে বসে বসন্তকালে সীতা উদ্ধারের জন্য সর্বপ্রথম শক্তি তথা দুর্গোৎসবের (বাসন্তি পূজা বা অকাল বোধন) আয়োজন করেছিলেন। মারকেন্দীয়া পুরান (Markandeya Purana) মতে, চেদী রাজবংশের রাজা সুরাথা (Suratha) খ্রীষ্ঠের জন্মের ৩০০ বছর আগে কলিঙ্গে (বর্তমানে ওড়িষ্যা) Duseehera নামে দূর্গা পুজা প্রচলন করেছিল।
আজও নেপালে Duseehera বা Dashain নামেই পুজা হয়। যদিও প্রাচীন ওরিষ্যার সাথে নেপালের পূজার কোন যোগসূত্র আছে কিনা জানা নাই।
মধ্য যুগে বাংলা সাহিত্যে দূর্গা পূজার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ১১শ শতকে অভিনির্ণয়-এ, মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির দূর্গাভক্তিতরঙ্গিনীতে দূর্গা বন্দনা পাওয়া যায়। বঙ্গে ১৪শ শতকে দুর্গা পূজার প্রচলন ছিল কিনা ভালভাবে জানা যায় না। ১৫১০ সালে কুচ বংশের রাজা বিশ্ব সিংহ কুচবিহারে দূর্গা পূজার আয়োজন করেছিলেন। ১৬১০ সালে কলকাতার বারিশার রায় চৌধুরী পরিবার প্রথম দূর্গা পূজার আয়োজন করেছিল বলে ধারণা করা হয়। আধুনিক দূর্গা পূজার প্রাথমিক ধাপ ১৮ম শতকে নানা বাদ্য যন্ত্র প্রয়োগে ব্যক্তিগত, বিশেষ করে জমিদার, বড় ব্যবসাযী, রাজদরবারের রাজ কর্মচারী পর্যায়ে প্রচলন ছিল। পাটনাতে ১৮০৯ সালের দূর্গা পূজার ওয়াটার কালার ছবির ডকুমেন্ট পাওয়া গেছে। ওরিষ্যার রামেশ্বরপুরে একই স্থানে ৪০০ শত বছর ধরে সম্রাট আকবরের আমল থেকে দূর্গা পূজা হয়ে আসছে। বার ইয়ার বা বারোয়ারী পূজা প্রথম হুগলীর গুপ্তিপাড়ার ১২ জন বন্ধু মিলে ১৭৬১ সালে আয়োজন করেছিল। সম্ভবত সেই থেকে বারোয়ারী পূজা শুরু। ১৯১০ সালে সনাতন ধর্মউৎসাহিনী সভা ভবানীপুরে বলরাম বসু ঘাট লেনে এবং একই জেলায় অন্যান্যরা রামধন মিত্র লেন, সিকদার বাগানে একই বছরে ঘটা করে প্রথম বারোয়ারী পুজার আয়োজন করে।
১৭১১ সালে অহম রাজ্যের রাজধানী রংপুরে শারদীয় পূজার নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের দূত রামেশ্বর নয়ালঙ্কার। নবাব সিরাজ-উদ-দ্দৌল্লার আক্রমনে কলকাতার একমাত্র চার্চ ধ্বংশ হবার পর সেখানে কোন উৎসব করা অবস্থা ছিল না। পলাশীর যুদ্ধে বিজয় লাভের জন্য ১৭৫৭ সালে কলকাতার শোভা বাজার রাজবাড়িতে রাজা নব কৃঞ্চদেব লর্ড ক্লাইভের সন্মানে দূর্গা পূজার মাধ্যমে বিজয় উৎসবের আযোজন করেছিলেন।
১৯২৬ সালে অতীন্দ্রনাথ বোস জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে পূজা উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে দূর্গা পূজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল (যেমন, কবি নজরুলের আনন্দময়ীর আগমনে কবিতা, বঙ্কিচন্দ্রের বন্দে মা তরম কবিতা, পরবর্তীতে ভারতের জাতীয় সংগীত…)। বৃটিশ বাংলায় এই পূজা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দূর্গা স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে জাগ্রত হয়। বিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধে এই পূজা ঐতিহ্যবাহী বারোয়ারী বা কমিউনিটি পূজা হিসাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। আর স্বাধীনতার পর এই পূজা পৃথিবীর অন্যতম প্রধান উৎসবের মর্যাদা পায়।
সরকারী বা জাতীয়ভাবে এই উৎসবকে দূর্গা পূজা বা দূর্গা উৎসব হিসাবে অভিহিত করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এটাকে শরৎ কালের বার্ষিক মহা উৎসব হিসাবে ধরা হয় বলে ইহাকে শারদীয় উৎসবও বলা হয়। কার্তিক মাসের ২য়দিন থেকে ৭ম দিন পর্যন্ত এই উৎসবকে মহালয়া, ষষ্ঠি, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী ও দশমী নামে পালন করা হয়। অকালে বা অসময়ে দেবীর আগমন বা জাগরণ বলে বসন্তকালের এই উৎসবকে বাসন্তি পূজা বা অকালবোধনও বলা হয়।
দূর্গা পূজা ভারতে অসম, বিহার, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপকভাবে উৎযাপন করা হয়। সেখানে ৫ দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়। পশ্চিম বঙ্গ ও ত্রিপুরায় (যেখানে বাঙ্গালী হিন্দুরা ব্যাপক সংখ্যায় বসবাস করে) সবচেয়ে বড় সামাজিক, সাংস্কৃতিক উৎসব হিসাবে ইহা পালিত হয়। এ ছাড়াও পূর্ব ভারতের বা বঙ্গেও কলকাতা, হুগলী, শিলিগুড়ি, কুচবিহার, লতাগুড়ি, বাহারাপুর, জলপাইগুড়ি এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চল যেমন, আসাম, বিহার, দিল্লী, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গোয়া, গুজরাট, পাঞ্জাব, কাশ্মীর, অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়–, কেরালায় ঘটা করে এই উৎসব পালন করা হয়। নেপালে ও ভুটানেও স্থানীয় রীতি-নীতি অনুসারে প্রধান উৎসব হিসাবে পালন করা হয়।
বাংলাদেশের ঢাকা, চট্রগ্রাম, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী, সিলেট, রংপুর, বগুরা এবং অন্যান্য জেলায়ও ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই উৎসব পালন করা হয় এবং সরকারীভাবে এক দিনের এবং হিন্দুদের জন্য তিন দিনের ছুটি ঘোষনা করা হয়। বিদেশে যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, জামার্নী, নেদারল্যান্ড, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর, মরিশাস, ফিজি, টোবাকো, কুয়েত সহ বিশ্বের বহু দেশে অভিবাসী হিন্দুদের বা বাঙালী হিন্দুদের নানা সংগঠন এই উৎসব পালন করে থাকে। ২০০৬ সালে, মহা দূর্গা পূজা অনুষ্ঠান ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্রেট কোর্টে অনুষ্টিত হয়েছিল । বঙ্গে এই পূজাকে শারদীয় পুজা, শারদোৎসব, মহা পূজা, মাযের পূজা, ভগবতী পূজা এবং বসন্তকালে বাসন্তী পুজা বা অকালবোধন হিসাবে উৎযাপন করা হয়। বিহার, আসাম, উড়িষ্যা, দিল্লী, মধ্যপ্রদেশ এ দূর্গা পূজা, মহারাষ্ট্র, গুজরাট,উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, কেরালায়, হিমাচল প্রদেশ, মহীশুর, তামিলনাড়, অন্ধ্র প্রদেশে এ পূজাকে নবরাত্রি পূজা বলা হয়।
বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কলারোয়ার ১৮ শতকের মঠবাড়িয়ার নবরত্ন মন্দিরে (১৭৬৭) দূর্গা পূজা হত বলে লোকমুখে শোনা যায়। ঢাকেশ্বরী মন্দির চত্বরে আছে দুই ধরনের স্থাপত্যরীতি মন্দির। প্রাচীনতমটি পঞ্চরত্ন দেবী দূর্গার যা সংস্কারের ফলে মূল চেহারা হারিয়েছে। মন্দিরের প্রাচীন গঠনশৈলী বৌদ্ধ মন্দিরের মত। ধারনা করা হয়, দশম শতকে এখানে বেীদ্ধ মন্দির ছিল যা পরে সেন আমলে হিন্দু মন্দির হয়েছিল এবং ১১শ বা ১২শ শতক থেকে এখানে কালী পূজার সাথে দূর্গা পূজাও হত। ইতিহাসবিদ দানীর মতে, প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে রমনায় কালী মন্দির নির্মিত হয়েছিল এবং এখানেও কালী পূজার সাথে দূর্গা পূজাও হত।