বিশেষ প্রতিনিধি : গরমকাল আমাদের শরীরের জন্য এক ধরনের বাড়তি চাপের সময়। তীব্র গরমে শুধু অস্বস্তিই হয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি হৃদ্রোগীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি বয়ে আনে। গবেষণায় দেখা গেছে, গরমের সময়ে হার্ট অ্যাটাক বা হৃদ্রোগজনিত জটিলতা বেড়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়? আসলে এর পেছনে একাধিক শারীরবৃত্তীয় কারণ কাজ করে।
শরীর যখন প্রচণ্ড গরমের মুখোমুখি হয়, তখন নিজেকে ঠান্ডা রাখার জন্য ঘাম বের করতে শুরু করে। ঘামের মাধ্যমে শরীরের পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। এর ফলে শরীরে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন তৈরি হয়। পানিশূন্যতা রক্তকে ঘন করে তোলে। ঘন রক্ত হৃদ্যন্ত্রে বাড়তি চাপ ফেলে, কারণ তখন হৃদ্যন্ত্রকে রক্ত পাম্প করতে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। যদি কারও আগে থেকেই হৃদ্যন্ত্র দুর্বল থাকে বা ধমনিতে ব্লক থাকে, তবে এই চাপ সহজেই হার্ট অ্যাটাক ডেকে আনতে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো, গরমের কারণে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে রক্তনালী প্রসারিত হয়ে যায়। রক্তনালী প্রসারিত হলে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যেতে পারে। তখন শরীর রক্তচাপ স্বাভাবিক করার জন্য হৃদ্যন্ত্রকে দ্রুত স্পন্দিত হতে বাধ্য করে। এই অস্বাভাবিক স্পন্দন হৃদ্রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এভাবেই গরমে হৃদ্যন্ত্রের ছন্দ বিঘ্নিত হতে পারে এবং হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বাড়ে।
গরমে অনেক সময় মানুষ অস্বাভাবিক ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা অবসাদে ভোগে। এগুলোকে অনেকেই গুরুত্ব দেন না। কিন্তু এসব উপসর্গ আসলে হৃদ্যন্ত্রে চাপ পড়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। বিশেষ করে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা স্থূলতা আছে, তারা গরমে দ্বিগুণ ঝুঁকিতে থাকে। কারণ এসব অসুখ শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। ফলে অতিরিক্ত গরম সামলানো তাদের শরীরের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।
গরমের আরেকটি প্রভাব হলো, মানুষের শরীরে লবণ ও খনিজের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মাত্রা কমে গেলে হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দেয়। হৃদ্যন্ত্রের এই বৈদ্যুতিক সংকেতই আসলে ধুকপুক করার গতি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু ভারসাম্য নষ্ট হলে হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে পড়ে। অনেক সময় এর ফলেই আকস্মিক হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
এছাড়া গরমে মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসও দ্রুত হয়। দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাসের ফলে শরীরের অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু যাদের ধমনিতে ব্লক বা রক্তপ্রবাহে বাধা আছে, তাদের হৃদ্যন্ত্র এই অতিরিক্ত অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তখন হৃদ্পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে।
অন্যদিকে গরমের সময়ে বাইরে কাজ করা মানুষ, যেমন শ্রমিক, রিকশাচালক বা কৃষকেরা, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তারা তীব্র রোদে দীর্ঘ সময় কাজ করেন, প্রচুর ঘামেন এবং পানি কম পান করেন। এতে শরীর দ্রুত ডিহাইড্রেশনের শিকার হয় এবং হৃদ্যন্ত্র অতিরিক্ত চাপ নিতে গিয়ে ব্যর্থ হতে পারে। তাই এই শ্রেণির মানুষদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা দরকার।
গরমে মানসিক চাপও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রচণ্ড গরমে অনেকেই বিরক্তি, অস্থিরতা বা রাগ অনুভব করেন। মানসিক চাপ শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং হৃদ্যন্ত্রের ওপর বাড়তি প্রভাব ফেলে। স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন বেড়ে গেলে হৃদ্যন্ত্র দ্রুত ও অনিয়মিতভাবে স্পন্দিত হতে শুরু করে। এতে করে যারা আগে থেকেই হৃদ্রোগে ভুগছেন, তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
গরমের প্রভাব শুধু শহরের মানুষের ওপর নয়, গ্রামাঞ্চলেও সমানভাবে পড়ে। তবে শহরের মানুষরা অতিরিক্ত ধোঁয়া, দূষণ ও যানজটের কারণে শ্বাসকষ্ট এবং হৃদ্যন্ত্রে চাপের শিকার হয় বেশি। দূষণের সঙ্গে গরম যোগ হলে এটি দ্বিগুণ ক্ষতি করে। তাই শহরের মধ্যবয়সী ও বয়স্ক মানুষের জন্য গরমকাল বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
গরমের সময় শরীরকে ঠান্ডা রাখতে গিয়ে হৃদ্যন্ত্রকে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। পানিশূন্যতা, রক্তচাপের ওঠানামা, খনিজ লবণের ঘাটতি, অক্সিজেনের বাড়তি চাহিদা এবং মানসিক চাপ— সব মিলিয়ে এই মৌসুমে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই গরমে যথেষ্ট পানি পান করা, লবণ-খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখা, রোদে অতি প্রয়োজন ছাড়া না বের হওয়া এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা খুবই জরুরি। বিশেষ করে যারা আগে থেকেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত, তাদের জন্য গরমকাল সতর্ক থাকার মৌসুম।
ঠান্ডা বাতাস বইলে এবং তাপমাত্রা কমে গেলে, আমরা প্রায়শই উষ্ণ এবং আরামদায়ক থাকার কথা ভাবি। তবে, শীতকাল কিছু গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে আসে, বিশেষ করে যখন আমাদের হৃদরোগের কথা আসে। গবেষণায় দেখা গেছে যে ঠান্ডা মাসগুলিতে হার্ট অ্যাটাক বেশি দেখা যায় এবং এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এই ব্লগে, আমরা শীতকালে হার্ট অ্যাটাক কেন বৃদ্ধি পায় এবং আপনার হৃদপিণ্ডকে সুরক্ষিত রাখার জন্য আপনি কী পদক্ষেপ নিতে পারেন তা অনুসন্ধান করব।
শীতকালে হার্ট অ্যাটাক বেশি হওয়ার প্রধান কারণ হল ঠান্ডা আবহাওয়ার প্রভাব আপনার শরীরের উপর। যখন তাপমাত্রা কমে যায়, তখন আপনার রক্তনালীগুলি সংকুচিত হয়ে যায়, যার ফলে রক্তের অবাধ প্রবাহ কঠিন হয়ে পড়ে। রক্তনালীগুলির এই সংকুচিত হওয়ার ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়, যার ফলে আপনার হৃদপিণ্ড আরও বেশি কাজ করে। যাদের আগে থেকেই হৃদরোগ আছে, তাদের জন্য এই অতিরিক্ত চাপ হার্ট অ্যাটাকের দিকে পরিচালিত করতে পারে।
অতিরিক্তভাবে, ঠান্ডা আবহাওয়া অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণকে ট্রিগার করে। এই হরমোনগুলি আপনার হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি করে এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি করে, যা হৃদপিণ্ডের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। অন্তর্নিহিত হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে, এই অতিরিক্ত চাপ একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে যেখানে হৃদপিণ্ড কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করতে অক্ষম হয়, যার ফলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
ঠান্ডার মাসগুলিতে, মানুষ প্রায়শই রের ভত কে। শারীরিক কার্যকলাপ হ্রাস হৃদরোগের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে, রক্তচাপ কমায় এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে আপনার হৃদয়কে ভালো অবস্থায় রাখতে সাহায্য করে। শীতকালে যখন মানুষ কম সক্রিয় হয়ে যায়, তখন এই সুবিধাগুলি হারিয়ে যায়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
তাছাড়া, যদি আপনি এমন কেউ হন যিনি নিয়মিত ব্যায়ামে অভ্যস্ত না হন, তাহলে হঠাৎ তীব্র শারীরিক কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়া - যেমন তুষার সরানো বা ভারী জিনিস বহন করা - হৃদপিণ্ডের অপ্রত্যাশিত চাপ সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে ঠান্ডা তাপমাত্রায়। ঠান্ডা অবস্থায় এই আকস্মিক পরিশ্রম দুর্বল ব্যক্তিদের হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে।
ঠান্ডা আবহাওয়া আপনার রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে। যখন আপনি ঠান্ডা থাকেন, তখন আপনার শরীর স্বাভাবিকভাবেই ছোটখাটো কাটা বা আঘাতের কারণে অতিরিক্ত রক্তপাত রোধ করার জন্য আরও জমাট বাঁধার উপাদান তৈরি করে। তবে, এই জমাট বাঁধার উপাদানগুলি আপনার ধমনীতে প্লাক তৈরি করতে পারে, যা ব্লকেজের কারণ হতে পারে। যদি করোনারি ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধে, তাহলে এটি হৃদপিণ্ডে রক্ত প্রবাহকে বাধা দিতে পারে, যার ফলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
যাদের ধমনীতে প্লাক জমে থাকে (যাকে এথেরোস্ক্লেরোসিস বলা হয়), তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। শীতকালে, ঠান্ডার প্রতি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া প্লেক ফেটে যাওয়ার এবং হৃদপিণ্ডের ধমনীতে বাধা সৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
ঠান্ডা আবহাওয়া শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যেমন ফ্লু বা নিউমোনিয়া। এই সংক্রমণগুলি আপনার হৃদয়ের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, বিশেষ করে যদি আপনার ইতিমধ্যেই হৃদরোগ থাকে। যখন আপনার শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ হয়, তখন আপনার শরীরের অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যায়, যার ফলে আপনার হৃদয় আরও বেশি কাজ করে। এছাড়াও, এই সংক্রমণের কারণে প্রদাহ হৃদয়ের উপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে।
শীতের মাসগুলিতে সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য, যেমন ফ্লু টিকা নেওয়া, ঘন ঘন হাত ধোয়া এবং অসুস্থ হওয়া এড়াতে উষ্ণ থাকা। এই সহজ পদক্ষেপগুলি শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে পারে এবং আপনার হৃদয়কে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করতে পারে।
ছুটির মরশুম, যা প্রায়শই ঠান্ডা মাসগুলির সাথে মিলে যায়, তার নিজস্ব চাপ নিয়ে আসে। কেনাকাটা, রান্না বা পারিবারিক সমাবেশে যোগদানের চাপ যাই হোক না কেন, মানসিক এবং মানসিক চাপ আপনার হৃদরোগের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মানসিক চাপ কর্টিসলের মাত্রা বৃদ্ধি করে, যা একটি হরমোন যা রক্তচাপ এবং হৃদস্পন্দন বাড়াতে পারে। সময়ের সাথে সাথে, দীর্ঘস্থায়ী চাপ হৃদরোগের কারণ হতে পারে।
সারা বছর ধরে চাপ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে শীতের মাসগুলিতে যখন আবহাওয়ার সম্মিলিত প্রভাব, কর্মব্যস্ততা হ্রাস এবং ছুটির চাপ আপনার হৃদয়ের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। ধ্যান, যোগব্যায়াম বা গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের মতো শিথিলকরণ কৌশল অনুশীলন করা চাপ কমাতে এবং আপনার হৃদয়কে সুস্থ রাখতে সাহায্য করতে পারে।
শীতকাল আপনার হৃদরোগের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে কারণ এর মধ্যে রয়েছে ঠান্ডা তাপমাত্রা, কম কার্যকলাপ এবং বর্ধিত চাপ। শীতকালে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ানোর কারণগুলি বোঝার মাধ্যমে, আপনি নিজেকে রক্ষা করার জন্য সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে পারেন। সক্রিয় থাকা, রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করা, অথবা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা যাই হোক না কেন, ছোট ছোট পরিবর্তনগুলি আপনার হৃদরোগের স্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।