সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : দেশে প্রথমবারের মতো অতি নিবিড় পদ্ধতিতে উচ্চফলনশীল প্রজাতির ভেনামি চিংড়ি চাষ শুরু করেছে কক্সবাজারের একটি খামার। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি তাদের চাষ করা চিংড়ি প্রথমবারের মতো আহরণ (হারভেস্ট) করেছে। সীমার্ক (বিডি) লিমিটেড নামের এই প্রতিষ্ঠান প্রতি হেক্টরে ৮০ টনের বেশি চিংড়ি উৎপাদন করতে পেরেছে। সনাতন পদ্ধতির চাষে মাত্র পাঁচ শ কেজির মতো চিংড়ি পাওয়া যায়।
চিংড়ি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতি নিবিড় পদ্ধতিতে ভেনামি চিংড়ি চাষ অনেক ব্যয়বহুল। এই চাষে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, ফলে এর ব্যবস্থাপনাও আলাদা। তবে এ পদ্ধতির চাষ বাড়ানো গেলে চিংড়ি রপ্তানি আয় কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও কম মূল্যে চিংড়ি বিক্রি করা যাবে।
ভেনামি একটি উচ্চফলনশীল চিংড়ি। উচ্চ ফলনের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধক্ষমতার জন্যও এটি এখন সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে চাষ করা হচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে উৎপাদিত চিংড়ির ৮০ শতাংশই ভেনামি জাতের। দেশে ভেনামির পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয় ২০১৯ সালে। চার বছর ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এ চিংড়ির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর অনুমতি দেয় সরকার। এরপর দেশের বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা সনাতন ও আধা নিবিড় পদ্ধতিতে ভেনামি চাষের উদ্যোগ নেন। তবে অতি নিবিড় পদ্ধতির চাষ কার্যক্রম প্রথমবারের মতো হাতে নেয় সীমার্ক (বিডি) লিমিটেড।
উখিয়ায় মেরিন ড্রাইভের পাশে আগে থেকে সীমার্কের একটি হ্যাচারি ছিল। সেটিকেই বৈজ্ঞানিক উপায়ে ভেনামি চাষের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় খামারটির পুনর্নির্মাণকাজ। এ জন্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সীমার্ক। ১২ একরের খামারটিতে রয়েছে তিনটি কালচার পুকুর, ৩২টি নার্সারি পুকুর ও ১৬টি কোয়ারেন্টিন পুকুর।
প্রকল্পটিতে আধুনিক সব বৈজ্ঞানিক কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। এ জন্য প্রযুক্তি আনা হয়েছে থাইল্যান্ড, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুর থেকে। ভেনামি চাষ করা হয় সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে। এ জন্য বঙ্গোপসাগরের পানি সরাসরি এনে তা পরিশোধন শেষে পুকুরগুলোতে সরবরাহ করা হয়। এর মাধ্যমে সমুদ্রের পানির সঙ্গে আসা সব ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস দূষণ রোধ করা যায়। খামারে কয়েক ধরনের পুকুর রয়েছে, যেগুলোকে দূষণ ও পরিবেশগত অনিশ্চয়তা থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার সীমার্কের ভেনামি খামার সরেজমিন দেখতে যান এই প্রতিবেদক। খামারের মুখেই বেশ কড়া জৈব নিরাপত্তাব্যবস্থা। গাড়িতে স্প্রে করে ও প্রত্যেককে পরিচ্ছন্ন হয়ে খামারে ঢুকতে হয়েছে। এ ছাড়া খামারে একটি ল্যাবরেটরি বা পরীক্ষাগার রয়েছে, যেখানে পানি ও চিংড়ির ফিজিকোকেমিক্যাল ও মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষার সুবিধা রয়েছে। খামারে কোনো নিষিদ্ধ রাসায়নিক পদার্থ ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয় না। এ ছাড়া বর্জ্য পানি ট্রিটমেন্ট না করে পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হয় না। থাইল্যান্ডের চারোয়েন পোকফান্ড ফুডসের (সিপিএফ) প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদেরা এই প্রকল্পে কাজ করেছেন। ভেনামির রেণু (সদ্য জন্ম নেওয়া পোনা), খাবার ও বেশ কিছু প্রযুক্তিও আনা হয়েছে সিপিএফ থেকে।
খামারের মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, ভেনামি প্রজাতি সাধারণত রোগজীবাণু–সহিষ্ণু। তা সত্ত্বেও এটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। এ জন্যই এমন নিরাপত্তাব্যবস্থা। তিনি আরও বলেন, বিদেশ থেকে রেণু আনার পরে নার্সারি পুকুরে তা ১৫ দিন লালন–পালন করা হয়। এরপর সেগুলো দেওয়া হয় কালচার পুকুরে। পরে ৬০–১২০ দিনের মধ্যে সেই চিংড়ি বিক্রির জন্য পুকুর থেকে তোলা হয়।
সনাতন, আধা নিবিড়, নিবিড় ও অতি নিবিড়—এই চার পদ্ধতিতে ভেনামি চাষ করা হয়।
সাধারণত সনাতন, আধা নিবিড়, নিবিড় ও অতি নিবিড়—এই চার পদ্ধতিতে ভেনামি চাষ করা হয়। এর মধ্যে উখিয়ায় অতি নিবিড় পদ্ধতিতে ভেনামি উৎপাদন করছে সীমার্ক। সুপার ইনটেনসিভ হিসেবে পরিচিত পদ্ধতিতে প্রতি বর্গমিটারে ৩৩০টি চিংড়ি চাষ করা সম্ভব, যেখানে সনাতন পদ্ধতিতে প্রতি বর্গমিটারে সর্বোচ্চ ৫টি চিংড়ি চাষ করা যায়। এ ছাড়া অতি নিবিড় পদ্ধতিতে চিংড়ির জীবিত থাকার হার প্রায় ৯০ শতাংশ।
চিংড়ি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সনাতন উপায়ে খামারে চাষ করলে প্রতি হেক্টরে ৫০০ কেজির মতো বাগদা চিংড়ি পাওয়া যায়। আর আধা নিবিড় পদ্ধতিতে চাষ করলে প্রতি হেক্টরে সর্বোচ্চ ৫–৬ টন পর্যন্ত বাগদা উৎপাদন করা সম্ভব। সেখানে আধা নিবিড় পদ্ধতিতে প্রতি হেক্টরে ৮–১০ টন ভেনামি চিংড়ি পাওয়া যায়। আর অতি নিবিড় পদ্ধতিতে চাষ করলে প্রতি হেক্টরে ৮০-১০০ টনের মতো ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন সম্ভব। অর্থাৎ ভেনামির উৎপাদনের হার অনেক বেশি।
খুলনায় আধা নিবিড় পদ্ধতিতে ভেনামি চাষ করেছে এমইউ সি ফুডস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাস বলেন, অনেক খামারি এখন আধা নিবিড় ভেনামি চাষের দিকে ঝুঁকছেন। অতি নিবিড় পদ্ধতিতে ফলন অনেক বেশি হলেও এ জন্য বড় বিনিয়োগ ও দক্ষতা প্রয়োজন। তবে সরকার নীতি সহায়তা দিলে নিবিড় পদ্ধতির চাষ আরও বাড়বে।
এ বিষয়ে সীমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ বলেন, ভেনামি অনেকটা ব্রয়লার মুরগি বা উচ্চফলনশীল ধানের মতো। যেহেতু আমাদের জনসংখ্যা বেশি এবং জমির সংকট রয়েছে, তাই এমন উচ্চ ফলনশীল চিংড়ি চাষের বিকল্প নেই। বাকি বিশ্বও সেদিকেই যাচ্ছে।
বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চাষের জন্য চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রথম পুকুরে ভেনামি রেণু ছাড়ে সীমার্ক। এরপর ৮০ দিন পরে তা বিক্রির জন্য তোলা হয়। এ সময় প্রতি কেজিতে ৪০টি করে চিংড়ি পাওয়া গেছে। সীমার্কের উখিয়ার খামার থেকে ভেনামির প্রথম চালান চলে যায় চট্টগ্রামের সীমার্কের প্রক্রিয়াজাতের কারখানায়। সেখান থেকে প্রক্রিয়াজাত শেষে তা রপ্তানি হবে যুক্তরাজ্যে। খুলনা অঞ্চলে উৎপাদিত ভেনামির কয়েকটি চালান অবশ্য ইতিমধ্যে রপ্তানি হয়েছে।
ইকবাল আহমেদ, চেয়ারম্যান, সীমার্ক গ্রুপ
চিংড়িশিল্পের সঙ্গে প্রায় ২৫ বছর ধরে সম্পৃক্ত রয়েছেন সীমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ। প্রক্রিয়াজাত চিংড়ি রপ্তানির জন্য ৯ বার স্বর্ণপদকও পেয়েছেন এই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের চিংড়ি রপ্তানির সূচক অনেক নিচে নেমে গেছে। এ খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ভেনামি চিংড়ি উৎপাদনের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানগুলো আবার চালু করা সম্ভব।
ইকবাল আহমেদ আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো ভেনামি চাষে ইতিমধ্যে বেশ এগিয়ে গেছে। এখনো যদি আমরা শুরু করতে পারি, তাহলে বৈশ্বিক বাজার ধরতে পারব। তবে শুধু দু–চারজন চাষ করলে হবে না। এ জন্য সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের সহযোগিতা পেলে ও চাষিরা বৈজ্ঞানিক চাষে উদ্বুদ্ধ হলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এ খাতে রপ্তানি আয় ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
দেশে ভেনামি চিংড়ির পরীক্ষামূলক চাষ সফল সফল হওয়ার পর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এ চিংড়ি চাষের অনুমতি দিয়েছিল সরকার। ফলে ভেনামি চিংড়ি চাষে ইচ্ছুক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে আবেদন করে চাষ করতে পারছেন। তবে লাভজনক হলেও এ জাতের চিংড়ি চাষ তেমন একটা বাড়েনি।
দেশে ভেনামি চিংড়ির পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয় ২০১৯ সালে। চার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০২৩ সালের ২৯ মার্চ রপ্তানি আয় বাড়াতে খুলনা অঞ্চলে এই চিংড়ির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। চাষেও মিলেছে সফলতাও। কিন্তু বিদেশ থেকে খাদ্য, ওষুধ ও পোনা আমদানি এবং চাষের স্থানে জৈবনিরাপত্তা (বায়োসিকিউরিটি) নিশ্চিতের কড়াকড়ি থাকায় চাষ বাড়েনি। গত বছর খুলনায় আটজন চাষের অনুমোদন পেয়েছিলেন। এর মধ্যে চাষ করেছেন তিনজন। বাকি পাঁচজন পোনা না পাওয়ায় চাষ করতে পারেননি।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটে চিংড়ি রপ্তানি কমে যায়। সেইসঙ্গে বাগদার উৎপাদন কমে যায়। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। এমন পরিস্থিতিতে ভেনামিতে আশার আলো দেখেন চিংড়ি ব্যবসায়ীরা। কারণ এই চিংড়ির উৎপাদন যেমন বেশি, এর পেছনে খরচও তেমনি কম। তাই সরকার পরীক্ষামূলকভাবে উচ্চ উৎপাদনশীল ভেনামি জাতের বিদেশি চিংড়ি চাষের সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, যেটি এতদিন ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কায় নিষিদ্ধ ছিল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) অধীনে ২০২১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে পাইকগাছায় চাষ শুরু হয়। সে বছর দুটি প্রতিষ্ঠান চাষ করে সফলতা পায়। তার ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে আট প্রতিষ্ঠান অনুমতি পেয়ে চাষ করে সফলতা পায়
রপ্তানিকারকরা বলছেন, বাগদা চিংড়ির (ব্ল্যাক টাইগার) চেয়ে ভেনামির উৎপাদন খরচ প্রায় অর্ধেক। এ কারণে বিদেশে প্রতিযোগিতার বাজারেও টিকে থাকা যাবে। অন্যান্য দেশ ভেনামি উৎপাদন ও রপ্তানি করে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। ১০ বছর আগে ভারত ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন শুরু করেছিল। এখন তারা ওই খাতে অনেক সফল। বাংলাদেশে চাষ বাড়লে এবং রপ্তানি ঠিকমতো হলে লাভ হবে।
বিদেশ থেকে ভেনামি পোনা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এম ইউ সি ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শ্যামল দাস বলেন, “দেশে বাগদা চিংড়ির উৎপাদন কমে যাচ্ছে। যে কারণে প্রতি বছর চিংড়ি রপ্তানি কমছে। চিংড়ির অভাবে অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চ উৎপাদনশীল জাতের ভেনামি চিংড়ি চাষ করা ছাড়া আমাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। এটি অনেক লাভজনক।”
ভেনামি চিংড়ি উচ্চ উৎপাদনশীল মাছ। এটি পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রজাতি। উচ্চ উৎপাদনের পাশাপাশি এর রোগ প্রতিরোধক্ষমতার জন্যও এটি এখন সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে উৎপাদিত চিংড়ির ৮০% ভেনামি। ইংরেজি নাম “হোয়াইটলেগ শ্রিম্প” বা সাদা পায়ের চিংড়ি। শুধু পা দেখতে সাদা এমন নয়, পুরো চিংড়িই দেখতে সাদাটে। অনেকটা স্থানীয় জাতের “হরিণা” চিংড়ির মতো। ফলে প্রথম দেখায় “হরিণা” ভেবে ভুল করেন অনেকে। বর্তমানে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, একুয়েডর, মেক্সিকো ইত্যাদি দেশে চাষ হচ্ছে।
ভেনামি চিংড়ি রোগ সহনীয় এবং উৎপাদন সন্তোষজনক।
মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, দেশের উপকূলবর্তী এলাকায় ২ লাখ ৬ হাজার ৭৬৩ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়। এই জমিতে ২০২১-২২ অর্থবছরে বাগদা উৎপাদন হয়েছিল মাত্র ৭২,৮০৯ টন। বর্তমান বিশ্বে উৎপাদিত চিংড়ির ৮০% ভেনামি প্রজাতির হলেও বাংলাদেশে এর উৎপাদন করা যাচ্ছিল না। সরকারি সিদ্ধান্তের ফলে এখন দেশে চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানি দুটিই বাড়বে।
চাষিরা বলছেন, দেশে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ব্ল্যাক টাইগার চিংড়ি, যেটি “বাগদা” নামে পরিচিত। সনাতন উপায়ে খামারে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ কেজির মতো বাগদা উৎপাদন সম্ভব। তবে এই চিংড়ি যদি নিবিড় পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়, তাহলে হেক্টরপ্রতি দেড় টন থেকে দুই টন মাছ পাওয়া সম্ভব।
অন্যদিকে, নিবিড় পদ্ধতিতে ভেনামি চিংড়ি চাষ করা হলে হেক্টরপ্রতি ৮ থেকে ১০ টন পর্যন্ত চিংড়ি পাওয়া সম্ভব। তাতে খরচ বাদে বিনিয়োগের ৩০% পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সঠিকভাবে ভেনামি চাষ করা গেলে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এই খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
২০২৩ সালে চাষের আবেদন করেন নয়জন। অনুমোদন পান আটজন। এর মধ্যে চাষ করেন তিনজন। তারা সফলতা পেয়েছেন। বাকিরা পোনার অভাবে চাষ করতে পারেননি। ২০২৪ সালে অনুমতি পেয়েছেন ছয়জন। শেষ পর্যন্ত পোনা পাবেন কি-না, তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন। কারণ পোনা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সেইসঙ্গে খাদ্য ও ওষুধ আমদানি করতে হবে। এসব কারণে আগ্রহী হচ্ছেন না চাষিরা।
চাষিরা বলছেন, ভেনামি চিংড়ি রোগ সহনীয় এবং উৎপাদন সন্তোষজনক। চাষে খরচ কম। কিন্তু এর খাদ্য, ওষুধ ও পোনা আমদানি করতে বেশি টাকা খরচ হয়। পাশাপাশি চাষের ক্ষেত্রে জৈবনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। ফলে চাষে আগ্রহী হচ্ছি না আমরা। এজন্য চাষ বাড়ছে না।
লোকসানের ভয়ে চাষ বাড়ছে না বলে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক এম এ হাসান পান্না। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, “দেশে ভেনামির পোনা উৎপাদনে একটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিলেও লোকসানের ভয়ে উৎপাদনে আসেনি। ফলে পোনা ও খাবার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। যা ব্যয়বহুল। সেইসঙ্গে চাষে মৎস্য বিভাগের বিধিনিষেধ আছে। এসব কারণে উৎপাদন বাড়ছে না। পোনা ও খাবার এখানে উৎপাদন হলে এবং উন্মুক্ত জলাশয়ে চাষের অনুমতি দিলে চাষ বাড়বে।”
মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, জৈবনিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে সনাতন পদ্ধতির বদলে আধা নিবিড় বা নিবিড় পদ্ধতিতে ভেনামি চিংড়ি চাষ করতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ যথাযথভাবে মানসম্মত খাদ্য দিতে হবে। কোনোভাবেই অননুমোদিত অ্যান্টিবায়োটিক, রাসায়নিক বা কীটনাশক প্রয়োগ করা যাবে না। আর বাজারজাত করার ৮ থেকে ১০ দিন আগে চিংড়ির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নিতে হবে।
খুলনা বিভাগীয় পোনা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও পাইকগাছা উপজেলার পুরস্কারপ্রাপ্ত ঘের ব্যবসায়ী গোলাম কিবরিয়া রিপন বলেন, “আমদানি নির্ভরতার কারণে ভেনামি চিংড়ি চাষ বাড়ছে না। ইচ্ছে থাকলেও এই চিংড়ি চাষ বাড়াতে পারছেন না চাষিরা। কারণ নানা ধরনের বিধিনিষেধ আছে।”
নিবিড় পদ্ধতিতে ভেনামি চিংড়ি চাষ করা হলে হেক্টরপ্রতি ৮ থেকে ১০ টন পর্যন্ত চিংড়ি পাওয়া সম্ভব।
মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, ভেনামি বিদেশি প্রজাতির মাছ। তাই উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছটি ছড়িয়ে পড়লে দেশি মাছের ক্ষতি হবে। নির্দিষ্ট স্থানে চাষাবাদ করতে হবে। না হয় কোনো ধরনের ভাইরাস ছড়াতে পারে। কারণ খাদ্যাভ্যাস ও আবহাওয়া বিবেচনায় এই চিংড়ি চাষের ঝুঁকি একটু বেশি।
এসব কারণে ভেনামি চিংড়ি চাষ ব্যবস্থাপনায় জৈবনিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হয় বলে জানালেন খুলনা জেলা মৎস্য । তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, “ভেনামি চাষে সরকারি অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। কারণ পরিবেশগত দিকসহ আধুনিক চাষ পদ্ধতির প্রস্তুতির বিষয় আছে। প্রস্তুতি ঠিক থাকলে অনুমোদন পাওয়া সহজ। পোনা ও খাদ্য আমদানি করতে হয়। এ বছর আরও ছয়জন অনুমোদন পেয়েছেন। গত বছর অনুমোদন পেয়েও পাঁচজন পোনা না পাওয়ায় চাষ করতে পারেননি। গতবার যে তিনজন চাষ করেছেন তারা হেক্টরপ্রতি ১২ টন উৎপাদন করতে পেরেছেন। তাদের লাভ হয়েছে ভালোই।”
ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়বে জানিয়ে এই মৎস্য কর্মকর্তা আরও বলেন, “২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাগদা-গলদা- হরিণা চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল ১৮,২৫৫ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ২৫,৩৭৫ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। ভেনামি উৎপাদন ২০২২-২৩ অর্থবছরে শুরু হয়। তখন উৎপাদন হয়েছিল ১৩৫ মেট্রিক টন। এ বছর আরও বাড়বে।”
চলতি বছর সারাদেশে ২ লাখ ৬৩ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হচ্ছে জানিয়ে মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল বলেন, “এখান থেকে ২ লাখ ৯৫ হাজার টন চিংড়ি উৎপাদন হবে। খুলনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৪,৫৮৫ টন গলদা, ১২,৫৯১ টন বাগদা, ১,৪০৩ টন ভেনামি (পরীক্ষামূলক), ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৩,৩২৫ টন গলদা, ১২,৫৪৯ টন বাগদা, ১,৭৩৩ টন ভেনামি (পরীক্ষামূলক), ২০২০-২১ অর্থবছরে ১১,৪৪৬ টন গলদা, ১১,৩১৭ টন বাগদা, ১,৯৩৫ টন ভেনামি (পরীক্ষামূলক), ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১,৯৩৮ টন গলদা, ১১,২২৪ টন বাগদা, ১,৯৬০ টন ভেনামি (পরীক্ষামূলক), ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২,১৫৭ টন গলদা, ১১,২৬৪ টন বাগদা এবং ১,৯৫৩ টন ভেনামির বাণিজ্যিক উৎপাদন হয়েছে। এই হিসেবে ভেনামি চিংড়ি তেমন একটা বাড়েনি।”