সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : এভাবে দরিদ্রতাকে পুঁজি করছেন জেলে মহাজনেরা। অভিযোগ উঠেছে শিশুর শ্রম কেনাবেচায় প্রশাসন থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছেনা। এমন ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দাবি তুলেছেন মানবাধিকার কর্মি রা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুশ্রমের আইন না জানা নাকি আইন না মানার প্রবনতা নাকি দারিদ্রের বেড়াজালে আটকে পড়া। নানা পক্ষের নানারকম যুক্তি থাকলেও এটা স্পষ্ট শ্রম আইনের লংঘন। কিন্তু এভাবে আর কতদিন।
সম্প্রতি দুবলার চরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১৪ বছরের সাব্বির আহম্মেদ। হাবিবুল্লাবাদ নামের এক বহাদ্দরের কাছে বিক্রি হয়েছে ৪০ হাজার টাকায়। এসময়ে বের হতে পারবেনা দুবলার চর এলাকা থেকে। এই বন্দি জীবন আর শাররিক নির্যাতনের ভয়ে সাব্বির চেষ্টা করেছিল পালানোর। পারেনি ! সাব্বিরের মতো আরেকজন ১৪ বছরের সাগর। ছয় মাসের জন্য মাত্র ৩৫ হাজার টাকায় সাগরকে কিনেছে মিজান নামে এক বহাদ্দর। সংসারের অভাব অনটন মেটাতে দূর্গম চরাঞ্চলে দিন রাত কাজ করছে তারা।
এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে পুরো দুবলার চরে তাদের বহাদ্দরকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও দেখা মেলে আরও কয়েক জন শিশুর। তাদের মধ্যে শিহাব উদ্দিনের (১৩) কাছে জানতে চাওয়া হলে সে বলে, সাতক্ষীরা জেলার আছাব উদ্দিন বহাদ্দর তাকে নিয়ে এসেছেন দুবলার চরে। পাঁচ মাস এখানে শুঁটকি প্রক্রিয়ার কাজ শেষে তাকে ৩৫ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হবে। বাবা বেঁচে নাই তাই সংসারের ঘানি টানতে সে এই চরে এসেছে।
শিশুদের দিয়ে এভাবে কাজ করানো ‘অপরাধ’ উল্লেখ করে শ্যামনগর মানবাধিকার সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি সামিউল ইসলাম মন্টি এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে এর প্রবনতা বাড়তেই থাকবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০ এ যে আইন আছে সেটার পরিবর্তন আনতে হবে।
এ বিষয়ে বনবিভাগের দুবলা জেলে পল্লীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খলিলুর রহমান দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, দুবলার চরে অবস্থানকারীদের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়া, শিশু শ্রম বন্ধসহ বনের অভ্যন্তরে যাতে কেউ অপরাধ করে পার না পায় সেকারণেই এবছর আইডি কার্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। মৌসুমের প্রথম সপ্তাহ থেকেই জেলেদের আইডি কার্ড প্রদান শুরু করা হয়েছে। এই আইডি কার্ডে দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তার যৌথ স্বাক্ষর থাকবে। আইডি কার্ড না থাকায় বিগত বছরে জেলেদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিলো না। যে যার মতো কাজ ও চলাচল করেছে। কে শিশু আর কে বয়স্ক তাও বোঝা যায়নি। অপরাধ করেও পার পেয়ে গেছে। এখন কার্ডের মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত এই বন কর্তার বক্তব্যের বাস্তবে মিল পাওয়া যায়নি দুবলার চরে।
জানা গেছে, শুঁটকি উৎপাদনকারী দুবলার চরগুলোতে এ বছর জেলেদের থাকা ও শুঁটকি সংরক্ষণের জন্য ৯৮৫টি ঘর, ৫৭টি ডিপো ও ৯৩টি দোকান ঘর স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। গত মৌসুমের চেয়ে এবার কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছে এই সংখ্যা। শুঁটকি উৎপাদনের লাইসেন্সধারী ১৭ জন বহদ্দার বা মহাজনের অধীনে দুবলার আলোরকোল, মাঝের কিল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শ্যালারা চরসহ চারটি চরে অন্তত ১০ হাজারেরও বেশি জেলে ও শ্রমিক অবস্থান করবে। তারা পাঁচ মাস ধরে সাগরে মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণে নিয়োজিত থাকবে এই চরগুলোতে। সুন্দরবনের দূবলার চরে শিশুশ্রম মানা হচ্ছেনা
রবিউল ইসলাম কালিগঞ্জ (সাতক্ষীরা) উপজেলা।
সুন্দরবনের দুবলার চরে এখনও অবাধে কেনা হচ্ছে শিশুশ্রম। এরপর স্কুল পড়ুয়া শিশুদের শুরু হয় বন্দি জীবন। এভাবে দরিদ্রতাকে পুঁজি করছেন জেলে মহাজনেরা। অভিযোগ উঠেছে শিশুর শ্রম কেনাবেচায় প্রশাসন থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছেনা। এমন ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দাবি তুলেছেন মানবাধি কার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুশ্রমের আইন না জানা নাকি আইন না মানার প্রবনতা নাকি দারিদ্রের বেড়াজালে আটকে পড়া। নানা পক্ষের নানারকম যুক্তি থাকলেও এটা স্পষ্ট শ্রম আইনের লংঘন। কিন্তু এভাবে আর কতদিন ?
সম্প্রতি দুবলার চরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১৪ বছরের সাব্বির আহম্মেদ। হাবিবুল্লাবাদ নামের এক বহাদ্দরের কাছে বিক্রি হয়েছে ৪০ হাজার টাকায়। এসময়ে বের হতে পারবেনা দুবলার চর এলাকা থেকে। এই বন্দি জীবন আর শাররিক নির্যাতনের ভয়ে সাব্বির চেষ্টা করেছিল পালানোর। পারেনি ! সাব্বিরের মতো আরেকজন ১৪ বছরের সাগর। ছয় মাসের জন্য মাত্র ৩৫ হাজার টাকায় সাগরকে কিনেছে মিজান নামে এক বহাদ্দর। সংসারের অভাব অনটন মেটাতে দূর্গম চরাঞ্চলে দিন রাত কাজ করছে তারা।
এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে পুরো দুবলার চরে তাদের বহাদ্দরকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও দেখা মেলে আরও কয়েক জন শিশুর। তাদের মধ্যে শিহাব উদ্দিনের (১৩) কাছে জানতে চাওয়া হলে সে বলে, সাতক্ষীরা জেলার আছাব উদ্দিন বহাদ্দর তাকে নিয়ে এসেছেন দুবলার চরে। পাঁচ মাস এখানে শুঁটকি প্রক্রিয়ার কাজ শেষে তাকে ৩৫ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হবে। বাবা বেঁচে নাই তাই সংসারের ঘানি টানতে সে এই চরে এসেছে।
শিশুদের দিয়ে এভাবে কাজ করানো ‘অপরাধ’ উল্লেখ করে শ্যামনগর মানবাধিকার সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি সামিউল ইসলাম মন্টি এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে এর প্রবনতা বাড়তেই থাকবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০ এ যে আইন আছে সেটার পরিবর্তন আনতে হবে।
এ বিষয়ে বনবিভাগের দুবলা জেলে পল্লীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খলিলুর রহমান দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, দুবলার চরে অবস্থানকারীদের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়া, শিশু শ্রম বন্ধসহ বনের অভ্যন্তরে যাতে কেউ অপরাধ করে পার না পায় সেকারণেই এবছর আইডি কার্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। মৌসুমের প্রথম সপ্তাহ থেকেই জেলেদের আইডি কার্ড প্রদান শুরু করা হয়েছে। এই আইডি কার্ডে দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তার যৌথ স্বাক্ষর থাকবে। আইডি কার্ড না থাকায় বিগত বছরে জেলেদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিলো না। যে যার মতো কাজ ও চলাচল করেছে। কে শিশু আর কে বয়স্ক তাও বোঝা যায়নি। অপরাধ করেও পার পেয়ে গেছে। এখন কার্ডের মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত এই বন কর্তার বক্তব্যের বাস্তবে মিল পাওয়া যায়নি দুবলার চরে।
জানা গেছে, শুঁটকি উৎপাদনকারী দুবলার চরগুলোতে এ বছর জেলেদের থাকা ও শুঁটকি সংরক্ষণের জন্য ৯৮৫টি ঘর, ৫৭টি ডিপো ও ৯৩টি দোকান ঘর স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। গত মৌসুমের চেয়ে এবার কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছে এই সংখ্যা। শুঁটকি উৎপাদনের লাইসেন্সধারী ১৭ জন বহদ্দার বা মহাজনের অধীনে দুবলার আলোরকোল, মাঝের কিল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শ্যালারা চরসহ চারটি চরে অন্তত ১০ হাজারেরও বেশি জেলে ও শ্রমিক অবস্থান করবে। তারা পাঁচ মাস ধরে সাগরে মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণে নিয়োজিত থাকবে এই চরগুলোতে।
কোন ধরনের কীটনাশক বা রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই সুন্দরবনের দুবলার চরে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে উচ্চমানের শুটকি মাছ। দেশের চাহিদা পূরণ করেই থেমে নেইÑরপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও। ফলে শুটকি পল্লীতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। শিগগিরই শুরু হবে বাজারজাত কার্যক্রম। মংলা থেকে নদীপথে দুবলার চরের দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। এর একদিকে বিস্তৃত সুন্দরবন, আর অন্যদিকে বিশাল বঙ্গোপসাগর। দুর্গম এই চরে প্রতি বছর অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস অবস্থান করেন উপকূলীয় এলাকার শত শত জেলে। তারা সমুদ্র থেকে মাছ ধরে, কাঁটা বাছাই করে, পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে তৈরি করেন শুটকি।
জেলেদের ভাষায়, “জোয়ারের সময় জাল নিয়ে ট্রলারে সাগরে যাই। ভাটার সময় মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরে আসি। তারপর সুন্দরভাবে মাছ পরিষ্কার করে নেটে ছেঁকে রোদে শুকিয়ে ফেলিÑএইভাবেই শুটকি তৈরি হয়।”
আরেক জেলে বলেন, “আমাদের এখানে একদম প্রাকৃতিকভাবে বাতাসে শুকানো হয়। কোনো প্রকার ওষুধ বা সংরক্ষণকারী রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না।”
দুবলার চরের জেলেরা এখন অনেক বেশি সচেতন বলে জানিয়েছেন বন বিভাগ কর্মকর্তারা। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “আমরা চাই সুন্দরবনের পরিবেশ যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তাই শুটকি তৈরির ক্ষেত্রে কীটনাশক বা রাসায়নিক ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কেউ এমন কাজ করলে বন আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রতিবছর বঙ্গোপসাগর থেকে রূপচাঁদা, ছুরি, চিংড়ি, লইট্টা, কাইট্টা সহ অন্তত ১০০ প্রজাতির মাছ ধরে জেলেরা। এসব মাছ থেকেই উৎপাদিত হয় প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টন শুটকি। প্রাকৃতিকভাবে শুকানো ও মান বজায় রাখার কারণে দিন দিন বাড়ছে দুবলার চরের শুটকির জনপ্রিয়তা, দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও।
পাখির চোখে দেখা এই দৃশ্য দুবলার চরের। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের শেষ সীমায় বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা এই চরে গড়ে উঠেছে শুটকি পল্লী।
ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবের পাশাপাশি এই চরের খ্যাতি দেশের সবচেয়ে বড় শুটকির বাজার হিসেবেও। এখান থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার শুটকি যায় সারাদেশে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলেরা প্রতি বছর অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত অর্থাৎ ছয় মাস এখানে ব্যবসার অনুমতি পান। এই চরে কাজ করেন ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ।
সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চরের মূলত আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারকেল বাড়ীয়া, শেলারচর ও মেহেরআলীর চরে হয় মাছ শুকানোর কাজ।
যেসব জেলেদের তিন থেকে পাঁচটি নিজস্ব মাছ ধরার ট্রলার আছে তাদেরকে ডাকা হয় 'মহাজন' বলে। যাদের ট্রলারের সংখ্যা আরও বেশি তাদেরকে ডাকা হয় 'বহরদার'। শুটকির কাজে নিযুক্ত জেলেরা এসব 'মহাজন' ও 'বহরদার'দের হয়ে কাজ করেন।
সাগর থেকে মাছ ধরে এনে রাখা হচ্ছে বাছাইয়ের জন্য। ছবি: হাবিবুর রহমান/স্টার
কয়েকজন 'বহরদার' ও 'মহাজন'র সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে—সাধারণত লইট্টা, তেলফ্যাসা, ছুরি, বৈরাগী, চাকা চিংড়ি, রূপচাঁদা শুঁটকি করা হয়। কাঁচা মাছ শুকাতে সময় লাগে তিন থেকে পাঁচ দিন। পাইকারদের কাছে গড়ে প্রতি কেজি শুটকি বিক্রি করা হয় ৫০০-৫৫০ টাকায়। এখান থেকেই পাইকাররা শুঁটকি কিনে নিয়ে যান।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়—কয়েক হাজার শ্রমিক শুঁটকি পল্লীতে কাজ করছেন। কেউ রোদে মাছ শুকাচ্ছেন, কেউ আবার ট্রলার নিয়ে সাগরে যাচ্ছেন মাছ ধরতে।
জেলেরা মাছ নিয়ে এসেই শুরু করেন বাছাইয়ের কাজ। প্রজাতি অনুযায়ী মাছ আলাদা করা হয়। এরপর নানান প্রক্রিয়া শেষে শুকাতে দেন সেসব মাছ।
জেলে মিরাজ শেখ বলেন, 'সাধারণত তেলা, ফ্যাইসাসহ অন্যান্য ছোট মাছ চাতালে ও লম্বাটে লইট্টা, ছুরি মাছগুলোকে বাঁশের আড়ায় ঝুলিয়ে শুকাতে দেওয়া হয়।'
প্রায় ৩০ বছর ধরে এই চরে মহাজনের কাজ করা ইসমাইল হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এখান থেকে শুঁটকি নেওয়ার জন্য ১০-১২টি পরিবহন ব্যবস্থা আছে। তারা রংপুর, সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় শুঁটকি পাঠিয়ে দেয়। দেশের শুঁটকির বড় অংশ যায় দুবলার চর থেকে।'
আলাদাভাবে শুকানো হচ্ছে নানান প্রজাতির মাছ।
তার মতে, সরকারিভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই চরের শুঁটকি রপ্তানি করে প্রতি বছর হাজার হাজার ডলার আয় করা যেত।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুবলার চর থেকে শুঁটকি পাওয়া গিয়েছিল চার হাজার ১০৫ টন। বন বিভাগের আয় হয়েছিল দুই কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাঁচ হাজার ১০০ টন শুটকি থেকে আয় হয়েছিল ছয় কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
সাগরের যে কোনো ঝড় সবার আগে আঘাত হানে দুবলার চরে। এ কারণে দুবলার চরে কাজ করা অধিকাংশ মানুষের দাবি—সাইক্লোন আশ্রয়কেন্দ্র। এখানে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র ছিল, কিন্তু বর্তমানে সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী।
এই চরে খাবার পানির তীব্র সংকট কাটাতে কয়েকটি পাতকুয়া করা হয়েছে। বর্ষায় সেখানে পানি জমে। ওই পানি জীবাণুমুক্ত নয়। তবুও ওই পানিই ভরসা পল্লীবাসীদের।
শুকাতে দেওয়া মাছের পরিচর্যা করছেন জেলেরা।
চরটিতে আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। ছয় মাসের জন্য আসা মানুষগুলোর চিকিৎসা হয় না।
চরের নিউমার্কেট এলাকায় কয়েকটি ওষুধের দোকান আছে। দোকানদাররা অসুস্থতার ধরন শুনে জেলেদের চিকিৎসা দেন।
সেখানে চিকিৎসা সেবা দেওয়া গ্রাম্য চিকিৎসক তারিকুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এই দুর্গম চরে চিকিৎসা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ নাই। অধিকাংশ রোগী আসেন পেটের ব্যথা ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নিয়ে। আমরা তাদের চাহিদামত শুধু ওষুধ বিক্রি করি।'
চরের আলোরকোলের পূর্ব দিকে গড়ে উঠেছে বাজার। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ অন্যান্য এলাকার মানুষ দোকান দিয়েছেন ওই বাজারে। এখানে আছে সেলুন, লেদ মেশিন, খাবারের হোটেল, কসমেটিকস, মুদি ও কাপড়ের দোকান। আছে মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকানও।
জেলেরা এই বাজারের নাম দিয়েছেন 'নিউমার্কেট'। এসব দোকান থেকে ছয় মাসের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটান জেলেরা।
বাজারটি দেখে বোঝার উপায় নেই কয়েক মাসের জন্য সেখানে দোকানগুলো বসানো হয়েছে।
চরে মাছ ধরার কাজে আছে শত শত ট্রলার। এসব ট্রলার মেরামতের জন্য আছে কারখানা। নিজস্ব জেনারেটর ব্যবস্থায় কারখানাগুলো চালানো হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে জেনারেটরের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের জন্য বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে ওই চরে।:
শুকানো মাছ বাছাই করা হচ্ছে বিক্রির জন্য।
দুবলার চরটি দক্ষিণবঙ্গসহ দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবের কারণে। প্রায় দেড় শ বছর ধরে দুবলার চরের আলোরকোলে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে রাস পূজা ও পুণ্যস্নান। পূজা উপলক্ষে এখানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ আসেন বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
দুবলার চর ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সমুদ্রসম্পদ ব্যবহার করে দুবলার চর থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব পায় সরকার। দেশের মাছের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে চরটি। ওই কাজে যারা সহযোগিতা করেন তাদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নেই। জেলেদের উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় সরকারি ব্যবস্থা থাকা দরকার।'
পরিবেশবাদীরা বলছেন, সংরক্ষিত বনে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের আনাগোনায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসহ পরিবেশের নানা ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। মাছ ধরার অজুহাতে অনেকে হরিণ শিকারসহ নানা অপকর্ম জড়িয়ে পড়েন। সরকারের উচিত পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে পল্লীর সার্বিক উন্নয়ন করা।সুন্দরবনের দক্ষিণে অবস্থিত দুবলার চরে চলে ‘সাহেবদের’ শাসন। সাগর, বন সবখানেই তাদের আধিপত্য। তাদের নিয়ন্ত্রণে চলছে চরের অন্তত ২০ হাজার জেলের জীবন ও জীবিকা। ফলে চরে হাড়ভাঙা খাটুনির পরও ভাগ্যের বদল হয় না বলে অভিযোগ সেখানকার জেলেদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুন্দরবন এলাকার জেলেদের কাছ থেকে মাছ কেনেনÑ এমন ব্যবসায়ীদের একটি সমিতি রয়েছে। দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপ নামের সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সমিতির সঙ্গে যুক্ত অন্যরা সাধারণ জেলেদের কাছে ‘সাহেব’ নামে পরিচিত। এই সাহেবরাই সেখানকার জেলে ও মাছ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। একসময় দুবলার চরে শুঁটকির ব্যবসা পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করতেন প্রয়াত মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন। তার মৃত্যুর পর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যায় তার ভাই কামাল উদ্দিন আহম্মেদের হাতে। কয়েক যুগ ধরে সমিতির সাধারণ সম্পাদকের পদ আঁকড়ে ধরে আছেন তিনি।
জেলেদের অভিযোগ, সুন্দরবন লদস্ মুক্ত হয়েছে। নেই মুক্তিপণের আতঙ্ক। তার পরও দুবলার চরে হাসি নেই তাদের মুখে। এর কারণ, দুবলার চরে কারা মাছ ধরবেন, কোন ব্যবসা কাছে বিক্রি করবেন, কোন মাছের দাম কত হবেÑ সবই ঠিক করেন প্রভাবশালী ‘সাহেবরা’। তারাই জিম্মি করে রেখেছেন ৯৮৫ জেলে-মহাজনসহ প্রায় ২০ হাজার মৎস্যজীবীকে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দুবলা চর গিয়ে দেখা যায়, চরটিতে সচল রয়েছে একটি মাত্র মোবাইল ফোন কোম্পানির নেটওয়ার্ক। তবে যেদিন বেশি মাছ ধরা পড়ে, সেদিনই ডাঙ্গার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ থাকে জেলেদের। এই সুযোগে পানির মাছ পানির দামে কিনে নেয় মহাজনদের লোকজন। জেলেরা বিশাল জেলে পল্লীতে একসময় ছিল দস্যুদের লক্ষ্য। তবে র্যাবের তৎপরতায় সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হলেও সংকট পিছু ছাড়েনি তাদের।
এদিন তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, বছরে সাত মাস দুবলার চর ফাঁকা থাকে। থাকে না মানুষের তেমন পদচারণা। বাকি পাঁচ মাস থাকে লোকে লোকারণ্য। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রান্তিক জেলেরা গড়ে তোলেন বসতি। সাগর ও নদী থেকে ধরে আনা মাছ এখানে শুকানো হয় রোদে। সরকার প্রতি বছর এই শঁটকি পল্লী থেকে ছয়-সাত কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করে। একদিকে সিন্ডিকেট, অন্যদিকে মহাজনরা খায় লাভের অংশ। কিন্তু জেলেদের নিয়ে ভাবে না কেউ।
এ বিষয়ে দুবলার চরে মাছ ধরতে আসা জেলে নজরুল ফকির বলেন, ‘ক্ষমতা সব সাহেবদের। কামাল সাহেব, টোকেন সাহেব, কামরুল সাহেবসহ অনেক সাহেব আছে এখানে। এই সাহেবদের কাছ থেকে দাদন (অগ্রিম টাকা নেওয়া) নিতে হবে। এক লাখ টাকা নিলে পাঁচ লাখ টাকার মাছ বুঝে নেবেন তারা। মহাজন বা সাহেবদের কারবার হওয়ায় কোনো মাছ বাইরে বিক্রি করা যায় না। জলদস্যু না থাকলেও এই সাহেবদের অত্যাচারে জেলেরা বন্দি। এখান থেকে আমরা মুক্তি চাই।
আরেক জেলে সেলিম মাঝি বলেন, ‘এই চরের রাঘববোয়ালদের হাত থেকে সরকার আমাদের উদ্ধার করুক। যাদের লাইসেন্সে এখানে মাছ ধরা হয়, সেই সাহেবদের অর্ধেকের বেশি মাছ বুঝিয়ে দিতে হবে। কথা বলার কোনো অধিকার নেই। এভাবে দিতে দিতে জেলেদের ছেঁড়া জাল আর ভাঙা ট্রলার নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয়।
৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দুবলার চরে মাছ ধরতে আসা জাহাঙ্গীর হোসেন নামে এক জেলে বলেন, ‘রাত জেগে রোদে পুড়ে সাগরে মাছ ধরতে হয়; অনেক কষ্ট। এরপর সাহেবদের কাছে সেই মাছ বিক্রি না করলে গালাগাল করে, নির্যাতন করে।’
এদিকে, শীত মৌসুমে দুবলার চরে জেলে ও অন্যান্য কর্মী মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার লোক বাস করেন। কিন্তু সেখানে নেই কোনো মেডিকেল ক্যাম্প, নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা।
নাহিদুল ইসলাম মৃধা নামে এক জেলে বলেন, এখানে সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। চরের কুয়া থেকে পানি তুলে খেতে হয়। এতে পেটে অনেক সমস্যা হয়। এ ছাড়া এখানে হাসপাতালের কোনো ব্যবস্থা নেই। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে পর্যাপ্ত চিকিৎসারও কোনো ব্যবস্থা নেই।
ইয়াছিন শেখ নামে আরেক জেলে বলেন, সাগরে মাছ ধরতে গেলে অনেক সময় পানি সাপ নামে একধরনের বিষাক্ত সাপের কামড় খেতে হয়। এ জন্য এখানে ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা রাখা হলে তাদের জীবনের ঝুঁকি কমে যেত। এ ছাড়া অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে দুবলার চর থেকে তাদের নদীপথে বাগেরহাট বা খুলনায় হাসপাতালে নিতে ১০-১২ ঘণ্টা সময় লাগে। এ জন্য জরুরিভাবে একটি সরকারি হাসপাতালের দাবি করেন তারা।
এ ব্যাপারে দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘জেলেদের এই অভিযোগ কতটুকু সত্য তা আমার জানা নেই। এখানে দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের একটি সমিতি আছে। জেলেরা চাইলে সমিতিতে অভিযোগ দিতে পারেন। এরপর এর সুষ্ঠু সমাধান করা যেতে পারে।
কিন্তু দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপ সমিতির খোদ কামাল উদ্দিন আহম্মেদই কয়েক যুগ ধরে সাধারণ সম্পাদকের পদ আঁকড়ে রাখায় সেখানে কোনো জেলে অভিযোগ দিতে সাহস পান না বলে জানা গেছে।
মাছ শিকার আর শুঁটকির মৌসুমে কথিত সাহেবদের অত্যাচার-নির্যাতনের বিষয়ে জেলেরা লিখিত অভিযোগ দিলে দুবলার চরকে সাহেবমুক্ত করা হবে জানিয়ে পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজী মো. নুরুল করিম বলেন, দুবলার চরে সুপেয় পানির সমস্যা দীর্ঘদিনের। কিন্তু এবার জেলেদের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর স্বাস্থ্যসেবার জন্য গত সোমবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় দুবলার চরে অন্তত একজন চিকিৎসক এবং পর্যাপ্ত ওষুধের ব্যবস্থা করতে সিভিল সার্জনকে অনুরোধ করা হয়েছে। সিভিল সার্জন তাকে আশ্বস্ত করেছেন।