সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : মধ্যবিত্ত বা মধ্যশ্রেণী শব্দটির সঙ্গে বাংলা ভাষার পরিচয় ঘটে আঠারো শতকে। ক্রমবর্ধমান সমাজে মধ্যবিত্ত ছিল বিশেষ গোষ্ঠী, যারা ‘অভিজাত’ নয়, আবার ‘সাধারণ মানুষ’ও বলা যাবে না। উনিশ শতকে তারা নিজেদের মধ্যবিত্ত বলে অভিহিত করত। তবে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা মধ্যবিত্তদের কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করেন না। তারা মনে করেন এরা হলো এক পদমর্যাদাসম্পন্ন গোষ্ঠী, যাদের অবস্থার নিরন্তর পরিবর্তন ঘটে। মোগল আমলের নানা পেশাজীবীকে এই বর্গে রাখা যায়। অর্থাৎ এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তির অবস্থান স্থির নয়। এর মধ্যে কেউ বেরিয়ে যেতে পারে, আবার কেউ এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে যুক্ত হওয়াটা যত সহজ ব্যাপার, বেরিয়ে যাওয়াটা ততটাই কষ্টসাধ্য।
তবে মোগল আমলে মধ্যবিত্তদের অবস্থা আলোচনার সময় ‘মধ্যবিত্ত’র সংজ্ঞা একটু ব্যাপক অর্থে ধরতে হবে। প্রচলিত অর্থে তখন শহর গড়ে ওঠেনি এবং আধুনিক ধারণা অনুযায়ী গবেষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, রাজনীতিক ও অধ্যাপকও তেমন ছিলেন না। এমনকি সেচ ব্যবস্থা, ডাক ব্যবস্থা, পূর্ত বিভাগ এমনভাবে গড়ে ওঠেনি যে ওসব ক্ষেত্রে আজকের মতো বহুসংখ্যক পেশাজীবী কর্মরত ছিলেন। সুতরাং মোগল আমলে মধ্যবিত্ত বলতে আমরা মূলত বণিক সম্প্রদায় ও মুষ্টিমেয় সরকারি চাকুরেদের বুঝি। যাদের মাঝে কোনো সহযোগিতা ছিল না, নিরন্তর শত্রুতা ছিল অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
মোগল আমলে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোকে ভিত্তি করে। এর শীর্ষে ছিলেন বাদশাহ বা সম্রাট। অর্থনৈতিক দিক থেকে সমগ্র নাগরিককে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। অভিজাত, মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণী। রাজার সুদৃষ্টিপ্রাপ্তরা থাকতেন অভিজাত শ্রেণীর অংশ হিসেবে আর শেষোক্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কৃষক, শ্রমিক ও শিল্পীরা।
মধ্যবিত্তদের বড় অংশ তখন প্রধানত ব্যবসায়ী ও বণিকদের নিয়ে গঠিত ছিল। তারা বিশেষভাবে ধনী ছিলেন না, কিন্তু তারা সফল ছিলেন এবং দারিদ্র্য ছাড়াই একটি মধ্যম জীবনযাপন করতেন। তারা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।
মোগল আমলে ভারত ভ্রমণকারীদের বর্ণনা থেকে পরিষ্কার যে মোগল ভারতের বাণিজ্যিক ও আর্থিক কাঠামোও অত্যন্ত উন্নত ছিল। ব্যবসায়ীদের মধ্যে কাজের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য শ্রেণীবিভাগ ছিল। পাইকারি ব্যবসায়ী, দোকানদার, টাকা বিনিময়কারী-ঋণদাতা (শারফ), গোমস্তা ও দালাল (এজেন্ট) ইত্যাদি প্রত্যেকের আলাদা পেশাদার গোষ্ঠী ছিল। বানজারারা ব্যাপক পণ্যের পরিবহনে বিশেষজ্ঞ ছিল। বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল: যখন কোনো পণ্যের চাহিদা থাকত বা বেশি লাভ অর্জনের সুযোগ আসত, তখন ব্যবসায়ীরা তা দ্রুত কাজে লাগাতেন। সমসাময়িক লেখকদের অনেকেই, যেমন আবুল ফজল তার বিশ্লেষণে সমাজের চার স্তরের মাঝে ব্যবসায়ীদের এবং দক্ষ শিল্পীদের একই কাতারে রেখেছিলেন। তাদের অবস্থান ছিল অভিজাতদের নিচে কিন্তু ধর্মীয় ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর ওপরে স্থান দিয়েছিলেন।
পেশাদার শ্রেণীর মধ্যে চিকিৎসক (বৈদ্য, হাকিম), শিক্ষক (পণ্ডিত, মোল্লা), আইনজীবী ইত্যাদি পেশার কিছু মানুষ ছিলেন। তারা ধর্মীয় প্রভাবশালী শ্রেণী যেমন ব্রাহ্মণ ও মোল্লাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতেন। যারা ধর্মীয় কার্যক্রমে শিক্ষা দিতেন বা সভাপতিত্ব করতেন তাদের মাঝে বড় অংশের মানুষ সরকারি অনুদান পেতেন। রাজ্য কর্তৃক প্রদত্ত অনুদানগুলো স্বায়ত্তশাসিত রাজা, জমিদারদের মাধ্যমে বিলি-বণ্টন করা হতো। মোগল সাম্রাজ্যের প্রায় ৫ শতাংশ রাজস্ব সম্পদ এ ধরনের অনুদানের জন্য নির্ধারিত ছিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে ছোট জমিদার ও ধনী কৃষকদেরও রাখেন অনেক গবেষক।
গ্রামীণ অভিজাত শ্রেণীর লোকদের সম্পদ জমানোর স্বভাব ছিল, যা তাদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খরচে উৎসাহিত করত। সুরদাস তার লেখায় মথুরার কাছে অবস্থিত ব্রিজ পরগনার শিকদার নন্দের বাড়িতে উৎসবের সময় বাহারি খাবার তৈরির বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। তার বাড়িতে বিলাসী আসবাবপত্র এবং নরম বিছানার চাদর ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রামের এ শ্রেণীর মহিলারা রঙচঙে শাড়ি পরতেন আর পুরুষরা শহরের লোকের মতো জামা পরতেন। স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের পোশাকের জন্য কাপড় স্থানীয় কারিগরদের কাছ থেকে বানাতে পারার কথা না। মূলত যেসব গ্রামে অবস্থাসম্পন্নরা থাকতেন তাদের সঙ্গে শহরের বাজারের যোগাযোগ থাকত। ফলে আর্থিকভাবে উন্নতরা শহরের জীবনধারা অনুসরণ করতেন।
ঐতিহাসিকদের মতে, মোগলদের একটি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল। মোগল সরকারের বিস্তারিত ও সূক্ষ্ম রেকর্ড রাখার সংস্কৃতি ছিল অবাক হওয়ার মতো; যার মধ্যে রয়েছে দাম, কর, বাড়ির সংখ্যা, রাজস্ব প্রদানকারীদের এবং বাড়ির মালিকদের নাম ও জাতির বিস্তারিত রেকর্ড। মনসব ও জায়গিরদের মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করা হতো। তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় তথ্য সংরক্ষণের এসব কাজে অনেক ক্ষুদ্র কর্মকর্তা কাজ করতেন যেমন দেওয়ান, মুহারির, আমিন, কারকুন ইত্যাদি। মনসবদার, জায়গির ও এই সরকারি কর্মকর্তারা আয়ের দিক থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাঝে পড়েন।
মনসবদারদের জন্য নির্ধারিত বেতনের মাধ্যমে তারা এমন জীবনমান বজায় রাখতেন, যা সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক ওপরে। তবে তাদের অবস্থা সতেরো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে জায়গিরের অভাব, বারবার স্থানান্তর এবং ব্যাপক দুর্নীতির কারণে অবনতি হতে দেখা যায়।
মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাঝে ক্ষুদ্র কর্মকর্তাদের জীবনযাত্রার মান সম্পর্কে অন্যদের তুলনায় বেশি তথ্য রয়েছে ঐতিহাসিকদের কাছে। শুরুর দিকের মোগল সম্রাটদের আমলে তারা সচ্ছলই ছিল বলা যায়। সুরত সিং নামের একজন, যিনি কখনো ক্লার্কের চেয়ে উচ্চতর কোনো পদে কাজ করেননি তিনি লাহোরের একটি সম্মানজনক স্থানে ৭০০ টাকায় একটি বাড়ি কিনেছিলেন। আরেকজন কর্মকর্তা খাজা উদয় চাঁদ, একটি দরগাহসংলগ্ন কুয়া নির্মাণে ৩ হাজার টাকা ব্যয় করেছিলেন। কিছু আমিন ও ফৌজদার জমি কিনে উদ্যান, হাম্মামসহ ছোট ছোট নগরী গঠন করেছিলেন। এ সম্পদশালী রাজস্ব কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, ক্ষত্রিয় ও বণিকদের নিয়ে গঠিত ছিল। রাজস্ব কর্মকর্তারা রাজ্যগুলোয়ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। বাংলার অনেক দেওয়ান এবং বখশী, স্থানীয় রাজাদের তোষামোদি করে বা কানুনগো হিসেবে কাজ করে ধনী জমিদার হয়ে উঠেছিলেন। তাদের এ সমৃদ্ধি বেতনের ফলে নয়, বরং তাদের দুর্নীতি, তোষামোদি, ঘুস গ্রহণ, রাজস্বের হিসাবে গরমিল ইত্যাদির কারণে সম্ভব হয়েছিল।
মধ্যবিত্ত সরকারি চাকুরেদের সবসময় চেষ্টা থাকত কীভাবে সম্রাটের সুনজরে পড়ে পদোন্নতি ঘটানো যায়। কেন্দ্রে যেসব কর্মচারী কাজ করতেন তারা অনেকটা অভিজাতদের মতোই জীবনযাত্রা নির্বাহ করতেন। তবে খুব একটা জাঁকজমক দেখানো থেকে তারা বিরত থাকতেন, কারণ মোগল শাসন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন ও সঞ্চয় করা অপরাধ হিসেবে গণ্য ছিল। তাই বেশির ভাগ অভিজাত ব্যক্তির সম্পত্তির ওপর অধিকার পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা মোগল আমলে ছিল না। অবশ্য কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের মধ্যে কেউ কেউ কৃচ্ছ্রসাধন করে প্রচুর অর্থ উত্তরাধিকারীদের জন্য রেখে যেতেন।
এ তো গেল কেন্দ্রে বসবাসকারী কর্মচারীদের কথা। এছাড়া আরো বহু কর্মচারী মোগল শাসন ব্যবস্থার অসংখ্য পদে যুক্ত ছিলেন। তাদের আর্থিক অবস্থা সম্বন্ধে এখনো ইতিহাসের সাক্ষ্য কিছুটা নীরব। শুধু জানা যায় এদের অবস্থা কোনোক্রমেই সচ্ছল ছিল না।
কোনো কোনো সম্রাটের শাসনামলে জিনিসপত্রের দাম অপেক্ষাকৃত সস্তা থাকলেও বেতনের স্বল্পতার জন্য কর্মচারীদের তাতে বিশেষ উপকার হতো না। উৎকোচ গ্রহণ সরকারি কর্মচারীদের একটা সাধারণ রীতিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে শুল্ক ও রাজস্ব বিভাগের কর্মচারীরা তাদের ক্ষমতাকে অসদুপায় অবলম্বনে পূর্ণ ব্যবহার করত। শায়েস্তা খাঁর মতো শাসনকর্তাকেও বাংলার এসব কর্মচারীর ঘুস নেয়ার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করতে হয়েছিল। সৈন্যদের বেতন দেয়ার ভার ছিল যাদের ওপর তারা সৈন্যদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে ইচ্ছেমতো তাদের প্রাপ্য বেতন থেকে জরিমানা কেটে নিত। অবস্থা এমনই চরমে উঠেছিল যে সম্রাটকে লিখিতভাবে ওইসব কর্মচারীকে সতর্ক করে নিদের্শনামা জারি করতে হয়। অবশ্য কর্মচারীদের আর্থিক অবস্থা ও ব্যয় বাহুল্যের দিকটা চিন্তা করলে এ ধরনের দুর্নীতির একটা হদিস মেলে। দু-একজন ছাড়া বেশির ভাগ প্রাদেশিক শাসনকর্তাই নিজ নিজ শাসনসীমার মধ্যে অত্যাবশ্যক সামগ্রীর একচেটিয়া ব্যবসা চালাতেন। ফলে জিনিসপত্রের দাম বেশির ভাগ সময়েই ঊর্ধ্বমুখী থাকত। সম্রাট বাধা দিতেন না—এমনকি শাজাহান নিজেই একচেটিয়া নীলের ব্যবসা শুরু করেছিলেন।
শায়েস্তা খাঁ বাংলাদেশে আসার আগে আগে শাসকদের শাসনের প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন করতে গিয়ে শিয়াবুদ্দিন তালিশ তার বইতে লিখেছেন যে বাংলাদেশের সব শাসকই খাদ্য ও বস্ত্রের ওপর একচেটিয়া ব্যবসা কায়েম করেছিলেন, জিনিসের দাম হু হু করে চড়ত আর অসহায় জনসাধারণকে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে সেই দামেই কিনতে হতো। যদুনাথ সরকার তার বাংলার ইতিহাস (দ্বিতীয় খণ্ড) গ্রন্থে বিভিন্ন সমসাময়িক ব্যক্তির লিখিত বিবরণীর সাহায্যে প্রমাণ করেছেন যে শায়েস্তা খাঁও একচেটিয়া ব্যবসার নীতিকে সক্রিয়ভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন। ইংরেজ ব্যবসায়ী উইলিয়ম ক্ল্যাভেল ১৬৭৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর হুগলি বন্দর থেকে লিখছেন যে শায়েস্তা খাঁ হুগলিকে যেন ব্যক্তিগত জায়গিরে পরিণত করেছেন। তার কর্মচারীরা প্রায় সব পণ্যেরই একচেটিয়া ব্যবসা করছে, এমনকি পশুর খাদ্য ঘাসও রেহাই পায়নি।
লেখাপড়ার চর্চা নিয়ে যারা থাকতেন, অর্থাৎ শিক্ষক ও গ্রন্থকারেরা, তাদের আর্থিক সচ্ছলতা অন্যদের চেয়ে তেমন কিছু ছিল না। কিছু হিন্দু ও মুসলমান শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে বৃত্তিলাভ করলেও সরকারি ঔদাসীন্যের ফলে অধিকাংশ পাঠশালা ও মক্তবের শিক্ষকদের জীবনযাপন ছিল কষ্টের। অনেকে মনে করেন এ সময়ে ইসলামী শিক্ষার যথেষ্ট প্রসার ঘটেছিল। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা এ ধারণাকে ঠিক সমর্থন করে না। সমগ্র গুজরাট প্রদেশে বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র তিন, শিক্ষকের সংখ্যাও ছিল তিন, আর বৃত্তিভোগী ছাত্রের সংখ্যা ছিল পঁয়তাল্লিশ। অধিক অর্থের জন্য মসী ছেড়ে তাই অসি ধরার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। গ্রন্থকারদের অবস্থাও ছিল শোচনীয়। সাধারণত সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের লেখাপড়ার চেষ্টা চলত। মধ্যবিত্ত চাকুরেদের সমৃদ্ধি এসব বুদ্ধিজীবীর কাছে পৌঁছেনি, তারা সাধারণভাবে গরিব ছিলেন এবং পৃষ্ঠপোষকদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিছু ব্যতিক্রম ছিল, যেমন আবুল ফজল বা বীরবল। তারা মূলত আকবরের সুনজরে থেকে উন্নতি লাভ করেছিলেন। সত্য হলেও সম্রাটের অপ্রিয় এমন কোনো কথা লেখা সম্ভব ছিল না, আবুল ফজলের মতো প্রশংসা করাই ছিল রীতি।
বিহার প্রদেশের সাপুরমান পরগনার জনৈক পুঁথিকার গোলাম সরফুদ্দীনের ভাই মসিউদ্দীন আর্থিক অভাব মোচনের জন্য বাংলা বিহারের দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁর কাছে বারবার আবেদনপত্র পাঠিয়েছেন। আবেদনপত্রে তিনি দেওয়ানকে বারবার জানাচ্ছেন তার আর্থিক দুরবস্থা এমন চরমে পৌঁছেছে যে নিছক অর্থের অভাবে তিনি জীবিকার সন্ধানে বাইরে বেরুতে পারছেন না, যদি দেওয়ান দয়াপরবশ হয়ে কিছু সাহায্য না করেন তবে পরিবার নিয়ে তাকে পথে বসতে হবে। (পাটনা কলেজ সংরক্ষিত অপ্রকাশিত ফারসী পুঁথি ‘আসরাফুল মুসাওয়াদাৎ’ থেকে সংগৃহীত)। মধ্যবিত্তরাও ঠিক মধ্যবিত্ত হয়ে চিরদিন পার করতে পারেনি, নিম্নবিত্তে ওঠানামা করেছে শাসনকালভেদে।
তুর্ক-আফগান যুগে (এমনকি শাহজাহানের আমল পর্যন্ত) হিন্দু কেরানিদের অবস্থা মোটামুটি ভালোই ছিল। বিশেষ করে রাজস্বসংক্রান্ত ব্যাপারে আর জমিদারি পরিচালনায় হিন্দুদের ওপর মুসলমান শাসকরা যথেষ্ট আস্থা রাখতেন। বাংলা অঞ্চলের রাজস্ব বিভাগে যেসব কর্মচারী নিযুক্ত হতেন, তাদের মধ্যে নবীন ও প্রাচীন দুই রকমের পদবি ছিল যেমন নিয়োগী, চৌধুরী ইত্যাদির পাশাপাশি নতুন পদবি প্রচলিত হলো ‘ডিহিদার’ ‘শিকদার’ প্রভৃতি। নিয়োগী, চৌধুরীদের মধ্যে অনেকেই বেশ দুপয়সা গুছিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু আওরঙ্গজেবের সময় থেকে হিন্দুদের প্রভাব-প্রতিপত্তি রাজস্ব বিভাগ থেকে কমে যেতে থাকল। ফৌজদার ও সুবাদারের ন্যায় উচ্চ পদ থেকে আরম্ভ করে রাজস্ব বিভাগের নিম্নতম পদগুলোয় অনেক হিন্দুকে চাকরি হারাতে হয়।
তবে মোগল আমল নিয়ে আগের ইতিহাসবিদরা গবেষণার সময় বিদ্রোহ-বিপ্লব বা অভ্যুত্থানে মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছুটা অবহেলা দেখিয়েছেন। উইলফ্রেড ক্যান্টওয়েল স্মিথ ভারতবর্ষে নিম্নবিত্তদের অভ্যুত্থানের কথা বলেছিলেন, কিন্তু যে উদাহরণগুলো তিনি উল্লেখ করেছিলেন তা গবেষকদের বিচারে মধ্যবিত্ত শ্রেণীকেই তুলে ধরে। খসরু, কুতুব, সুবহান কুলি, কিশতওয়ারের জমিদার, মথুরার জাট (বর্তমান উত্তর প্রদেশের একটি স্থান), নার্নাউলের সত্যনাম, রওশন আন্দোলনের পাঠান, মারাঠা ও শিখ বিদ্রোহ প্রধানত স্থানীয় জমিদার বা গ্রামীণ ক্ষমতাসীনদের বিদ্রোহ ছিল। সমাজবিজ্ঞানের আধুনিক সংজ্ঞায়নের সঙ্গে না মিললেও এ সময়ের গবেষকদের বিশ্লেষণ থেকে এটুকু অনুমান করা যায় যে গ্রাম ও শহরাঞ্চলে অভিজাত ও নিম্নবিত্তদের মাঝেই অবস্থান করত ‘মধ্যবিত্ত’ গোষ্ঠীর জনগণ।
তথ্য কৃতজ্ঞতা: দ্য কেমব্রিজ ইকোনমিক হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া
মোগল আমলে গ্রামীণ জীবনকে মোটাদাগে তিন ভাগে ভাগ করা যেত—জমিদার, ভাসমান কৃষক ও ভাড়াটে কৃষক। এছাড়া চর্মকার, মৃৎশিল্পী ও ভূমিহীন কৃষকদের উপস্থিতি দেখা গেছে।
মোগল আমলে গ্রামীণ জীবনকে মোটাদাগে তিন ভাগে ভাগ করা যেত—জমিদার, ভাসমান কৃষক ও ভাড়াটে কৃষক। এছাড়া চর্মকার, মৃৎশিল্পী ও ভূমিহীন কৃষকদের উপস্থিতি দেখা গেছে। তারা কায়িক শ্রমের বিনিময়ে ফসলের একটা নির্দিষ্ট অংশ পেতেন। জমির উর্বরতা, অবস্থান ও ফসল উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে তখনকার রাজস্ব আহরণের কাজ পরিচালনা হতো। অর্থ সমাগমের ভিন্নতার দরুন মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণেও স্বতন্ত্র পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তৎকালীন দক্ষিণ ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনমান যে উঁচু স্তরে ছিল না সেটা তাদের পোশাকের স্বল্পতা থেকে প্রমাণিত। ঐতিহাসিক রালফ ফিচ বিষয়টি নিয়ে দাবি করেন, সাধারণত পুরুষদের কোমরের চারপাশে সামান্য একটু কাপড় দেয়া থাকত। অবস্থাসম্পন্নদের অবস্থা ছিল আপেক্ষিক। তারা নানা ধরনের পোশাক-পরিচ্ছদের পাশাপাশি গহনা ব্যবহার করত।
বসতবাড়ি নির্মাণেও মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ছাপ সুস্পষ্ট ছিল। দক্ষিণ ভারতের মানুষের খেজুর পাতায় নির্মিত ঘর এতটাই ছোট আর অমার্জিত ছিল মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ফুরসতও পেত না। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ গ্রামগুলো ব্যতিরেকে কেউই একাধিকবার খাবারের সুযোগ পায়নি। রান্না করার উপকরণ সহজলভ্য ছিল না। লবণসহ যাবতীয় রান্নার উপকরণ ব্যবহার বিলাসী জীবনকে প্রতিনিধিত্ব করত। তবে অনেক ঐতিহাসিক জমির গড় আকার বড় ও বাড়তি উৎপাদনকে বিবেচনা করে সে সময়কার খাদ্যাভাব স্বীকার করেন না। সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতা নানা ধরনের অনুঘটকের ওপর নির্ভর করত। তার মধ্যে খরা, বন্যা ও মহামারী সবচেয়ে ভয়ানক আর আতঙ্কের। এ আপৎকালে রাষ্ট্র ভূমি রাজস্ব মওকুফ ও ঋণ প্রদানের মাধ্যমে মানুষের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করত।
মোগল আমলে নগরায়ণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে বিবেচিত। বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিক ছাড়াও এখানে সৈন্য, চাকর ও সেবক নিয়োগ মানুষের সচ্ছলতার পরিচয় দেয়। দক্ষিণ ভারতীয় অঞ্চলে পরিসংখ্যান পরিচালনা, রাজস্ব রেকর্ড সংরক্ষণসহ মোটামুটি সব ধরনের প্রশাসনিক কাঠামো তৎকালীন মোগল শাসনে ছিল। দিওয়ান, আমিল ও কারকুনসহ নানা প্রশাসনিক পদ-পদবি মোগল শাসনের কাঠামোর পরিচয় দেয়। সে সময়কার শহুরে পেশায় নানা বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রভাবশালী হিসেবে চিকিৎসক, শিক্ষক ও আইনজীবী অন্যতম ছিলেন। এছাড়া মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপস্থিত দক্ষিণ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। অভিজাতদের শৈল্পিক কাজে পৃষ্ঠপোষকতা করতে দেখা গিয়েছিল, বিশেষ করে সংগীতপ্রীতি অনেক ছিল। সে সময় চিত্রশিল্পও দারুণ পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। মোগল অভিজাতরা সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছিল। এটি কতটা গ্রামীণ ‘ধনী’দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা একটি অনুমানের বিষয়।
গ্রামীণ ও শহুরে উভয় এলাকার বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে জীবনযাত্রার মানে একটি বড় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মধ্যযুগীয় দক্ষিণ ভারতের মানুষের নিয়মিত জীবনমান সাধারণত একটি স্থিতিশীলতা মাত্রায় পৌঁছেছিল। কিন্তু এ স্থিতিশীলতা প্রায়ই দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ ও অন্যান্য বিপর্যয়ের কারণে ব্যাহত হয়ে নানাভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা তৈরি করত। মধ্যযুগীয় দক্ষিণাত্যে প্রথম বড় খরা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় মোটামুটি ১৬৩০-৩১ সালের দিকে। এছাড়া ১৬৫৫, ১৬৮২ ও ১৬৮৪ সালেও আঞ্চলভেদে আরো কিছু ছোট খরার পুনরাবৃত্তি ঘটে। খরাগুলো সাধারণত প্লেগের উপদ্রব বাড়াত। লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং ক্ষুধার্ত মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রির মতো ঘটনাও ঘটেছিল। যখন বড় খরা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটত তখন সাধারণত সরকারকে রাজস্ব মওকুফ করতে হতো। খাদ্যশস্যের উদ্বৃত্ত এলাকা থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করে সরকারি দোকানে রেশন ব্যবস্থাপূর্বক ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য বিনামূল্যে খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করা হতো।
সবকিছু ছাপিয়ে গেছে মোগল ও মারাঠাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ। এ যুদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির পতন ঘটায়। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগগুলো ঘন ঘন ঘটলেও সেগুলো মধ্যযুগের ওই অঞ্চলে অর্থনৈতিক ইতিহাসের জন্য কেবল অস্থায়ী বলে মনে হয়। এগুলো অর্থনীতির মৌলিক স্বরকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটায়নি। যত তাড়াতাড়ি বিপর্যয় কেটে যেত তারা তাদের পুরনো স্থানে ফিরে যেত এবং নতুন স্থানে বসবাস করত, অথবা শুধু উভয় স্থানেই যাযাবর হয়ে উঠত। তাদের জীবনমান প্রায় আগের মতো করে পুনরায় শুরু
মুঘল সাম্রাজ্য ছিল ভারত উপমহাদেশের একটি ঐতিহাসিক সাম্রাজ্য । উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলজুড়ে মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল । মুঘল সাম্রাজ্য পারস্যের ভাষা শিল্প ও সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত ছিল । সমসাময়িকরা বাবরের প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যকে তিমুরি সাম্রাজ্য বলে উল্লেখ করেছেন যা মুঘলরা নিজেরাও ব্যবহার করত । আইন ই আকবরিতে হিন্দুস্তান নামটি উল্লেখ রয়েছে । পাশ্চাত্যে মুঘল শব্দটি সম্রাট ও বৃহৎ অর্থে সাম্রাজ্য বোঝাতে ব্যবহৃত হত । আরবি এবং ফারসি থেকে মুঘল শব্দটি এসেছে । তবে বাবরের পূর্বপুরুষরা সাবেক মঙ্গোলদের চেয়ে ফারসি সংস্কৃতি দ্বারা বেশি প্রভাবিত ছিলেন । জ্বলপথে প্রথম যুদ্ধে ইবরাহিম লোদির বিরুদ্ধে বাবরের জয়ের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা ঘটে । মুঘল সম্রাটরা ছিলেন মূলত মধ্য এশিয়ার তুর্কি মঙ্গোল বংশোদ্ভূত । এরা চাগতাই খান এবং তৈমুরের মাধ্যমে নিজেদের চেঙ্গিস খানের বংশধর বলে দাবি করতেন । ১৫৫৬ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের ধ্রুপদি যুগ শুরু হয় । আকবর এবং তার ছেলে জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ভারতে অর্থনৈতিক প্রগতি বহুদূর অগ্রসর হয় । আকবর অনেক হিন্দু রাজপুত রাজ্যের সাথে মিত্রতা করেন । কিছু রাজপুত রাজ্যের উত্তর পশ্চিম ভারতে মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জারি রাখে কিন্তু আকবর তাদের বশীভূত করেন । মুঘল সম্রাটরা মুসলিম থাকলেও জীবনের শেষের দিকে শুধুমাত্র সম্রাট আকবর এবং তার পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর নতুন ধর্ম দীন ই-ইলাহির অনুসরণ করতেন ।
মুঘল সাম্রাজ্য স্থানীয় সমাজে হস্তক্ষেপ করতেন না তবে তারা প্রশাসনিকভাবে এসববের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতেন । তারা অনেক বেশি কাঠামোগত ভাবে কেন্দ্রীভূত শাসন প্রতিষ্ঠা করেন । মুঘল শাসনামলে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন সমাজ গোষ্ঠী যেমন মারাঠা, রাজপুত ও শিখরা সামরিক শক্তি অর্জন করেন ।
শাহজাহানের যুগে মুঘল স্থাপত্য এর স্বর্ণযুগে প্রবেশ করে । তিনি অনেক স্মৃতিসৌধ, মসজিদ, দুর্গ নির্মাণ করেন যার মধ্যে রয়েছে আগ্রার তাজমহল, মোতি মসজিদ, লালকেল্লা, দিল্লি জামে মসজিদ । আওরঙ্গজেবের শাসনামলে মুঘল সাম্রাজ্যের সীমানা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায় । শিবাজী ভোসলের অধীনে মারাঠাদের আক্রমণের ফলে সাম্রাজ্যের অবনতি শুরু । আওরঙ্গজেবের সময় দক্ষিণ ভারত জয়ের মাধ্যমে ৩.২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটারের বেশি অঞ্চল মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয় । ততকালিন সাম্রাজ্যের জনসংখ্যা ছিল ১৫০ মিলিয়নের বেশি যা ততকালীন পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ এবং জিডিপি ছিল ৯০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ছিল । ১৮শ শতাব্দীর মধ্যভাগ নাগাদ মারাঠারা মুঘল সেনাবাহিনীর বিপক্ষে সফলতা লাভ করেন এবং দক্ষিণাত্য থেকে বাংলা পর্যন্ত বেশ কিছু মুঘল প্রদেশে বিজয়ী হন । সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার দুর্বলতার কারণে আভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সৃষ্টি করে যার ফলে বিভিন্ন প্রদেশ কার্যত স্বাধীন হয়ে যায় । ১৭৩৯ সালে কারনালের যুদ্ধে নাদির শাহের বাহিনীর কাছে মুঘলদের পরাজয় ঘটে । ততকালিন সময় দিল্লি লুন্ঠিত হয় । পরের শতাব্দীতে মুঘল শক্তি ক্রমান্বয়ে সীমিত হয়ে পড়েন ও শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের কর্তৃত্ব শুধু শাহজাহানাবাদ শহরে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় । সিপাহী বিদ্রোহের সমর্থনে তিনি একটি ফরমান জারি করেন । সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহীতার অভিযোগ এনে কারাবন্দী করেন । শেষে তিনি রেঙ্গুনে নির্বাসিত হন এবং সেখানেই মারা যান ।
বাবর মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি ছিলেন মধ্য এশিয়ার তুর্কি মঙ্গোল বংশোদ্ভূত শাসক । বাবার দিক থেকে তিনি তৈমুর লং এবং মায়ের দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন । মধ্য এশিয়া থেকে বিতাড়িত হয়ে বাবর ভারতে ভাগ্য নির্মাণে নিয়োজিত হন । তিনি নিজেকে কাবুলের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং আফগানিস্তান থেকে খাইবার পাস হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন । জ্বলপথের যুদ্ধে বিজয়ের পর বাবরের সেনাবাহিনী উত্তর ভারতের অধিকাংশ এলাকা জয় করে নেয় । তবে তার শাসন কাজে পাকাকোক্ত হতে অনেক সময় লেগে যায় । অস্থিতিশীলতা তার ছেলে হুমায়ুনের সময়ও ছড়িয়ে পড়েছিল । হুমায়ুন ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারত থেকে পারস্য পালিয়ে যায় । হুমায়ুনের সাথে পারস্যের সাফাভিদের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং মুঘল সাম্রাজ্যে পারস্যের সাংস্কৃতিক প্রভাব বৃদ্ধি শুরু হয় । পারস্যের সহায়তায় হুমায়ুন মুঘলদের ক্ষমতা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে । এর অল্পসময় পরে দুর্ঘটনায় হুমায়ুনের মৃত্যু হলে তার ছেলে আকবর অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সিংহাসনে বসেন । আকবরের অভিভাবক বৈরাম খান ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি মজবুত করতে আকবরকে সহায়তা করেন । যুদ্ধ এবং কূটনীতির মাধ্যমে আকবর সাম্রাজ্যকে সবদিকে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয় । তিনি ভারতের সামাজিক গোষ্ঠীর সামরিক অভিজাতদের থেকে তার প্রতি অনুগত নতুন অভিজাত শ্রেণী গড়ে তোলেন । তিনি উন্নত সরকার ব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে বহু অবদান রেখেছেন । আকবর ইউরোপীয় বাণিজ্য কোম্পানিগুলোর সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধি করেন । বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পার্থক্য দূর করার জন্য আকবর দীন ই ইলাহি নামক নতুন ধর্ম তৈরি করেন । তবে এই ধর্ম প্রসিদ্ধ হয়নি । আকবরের ছেলে সম্রাট জাহাঙ্গীর সমৃদ্ধির সাথে শাসন করেন । তবে জাহাঙ্গীর আফিমে আসক্ত ছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় কাজে অনীহা দেখায় এবং দরবারের বিদ্রোহীদের প্রভাবে পড়ে । তার ছেলে শাহজাহানের শাসনকাল মুঘল দরবারের জাকজমকের জন্য প্রসিদ্ধ । এসময় অনেক বিলাসবহুল ইমারত নির্মিত হয় যার মধ্যে তাজমহল ছিল অন্যতম । এসময় দরবারের রাজস্ব আয়ের চেয়ে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বেশি ছিল । শাহজাহানের অসুস্থতার পর তার বড় ছেলে দারা শিকোহ অভিভাবক হন । সিংহাসন নিয়ে শাহজাহানের ছেলেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় অন্যান্যদের পরাজিত করে শেষপর্যন্ত আওরঙ্গজেব জয়ী হন । দারা শিকোহকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় । আওরঙ্গজেব শাহজাহানকে শাসনের অযোগ্য ঘোষণা করে বন্দী করেন । আওরঙ্গজেবের সময় মুঘল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অনেক বৃদ্ধি পায় । তিনি প্রায় সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া মুঘল সাম্রাজ্যের সরাসরি অধীনে নিয়ে আসেন । ১৭০৭ সালে তার মৃত্যুর পর সাম্রাজ্যের অনেক অংশ বিদ্রোহ করতে শুরু করে । আওরঙ্গজেবের ছেলে প্রথম বাহাদুর শাহ প্রশাসন সংস্কার করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন । তবে ১৭১২ সালে তার মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য বিশৃঙ্খল অবস্থায় পড়ে । ১৭১৯ সালে চারজন সম্রাট পরপর শাসন করেন । একটি সময় মুহাম্মদ শাহের শাসনামলে সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে শুরু করে । মধ্য ভারতের অধিকাংশ মারাঠা সাম্রাজ্যের হাতে চলে যায় ।
নাদির শাহ দিল্লি আক্রমণ করেন এবং এতে মুঘল শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে । সাম্রাজ্যে অনেক স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব হয় । তবে মুঘল সম্রাটকে সর্বোচ্চ শাসক হিসেবে বিবেচিত করা হত । সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম মুঘল কর্তৃত্ব পুনপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালান । কিন্তু তাকে বাইরের শক্তির উপর নির্ভর করতে হয় । এদের মধ্যে ছিলেন আফগানিস্তানের আমির আহমেদ শাহ আবদালি ।