সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার চরাঞ্চলের চাঁদনীমুখার বাসিন্দা সায়রা খাতুন পাশের গ্রামের একটি পুকুর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করছেন। প্রবা ফটো
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার চরাঞ্চলের চাঁদনীমুখা গ্রাম। গ্রামের চারপাশে পানি থইথই করছে, কিন্তু কোথাও নেই খাবার পানি। এই গ্রামের বাসিন্দা সায়রা খাতুন। ৬৫ বছরের এই বিধবা খাবার পানির খোঁজে প্রতিদিন সকালে বের হয়ে ৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে পাশের পারশামারি গ্রামের একটি পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করেন। সায়রা খাতুনের মতো গ্রামের আরও নারীরা দল বেঁধে বের হন পানির সন্ধানে।
সায়রা খাতুনের স্বামী সোলেমান গাজী মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু কারও সংসারে জায়গা হয়নি সায়রা খাতুনের। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসেও তাকে খাবার পানির জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। শুধু চাঁদনীমুখী গ্রাম বা সায়রা খাতুনই নয়, খাবার পানির জন্য নিত্যদিনের লড়াই চলছে গাবুরা ইউনিয়নের প্রায় ১০ গ্রামের মানুষের।
সায়রা খাতুন বলেন, আমাদের এখানে পানির তীব্র সংকট। স্বামী মরে যাওয়ার পর আমার দেখার মতো কেউ নেই। ছেলেরাও আলাদা থাকে। এমনিতেই তিনবেলা খেতে পারি না, তার ওপর পানি কিনব কী দিয়ে। তাইতো সকাল থেকেই শুরু হয় পানি সংগ্রহ করার কাজ। তিনি বলেন, বৃষ্টির পানি ধরে পান করতে পারি, তার জন্য ড্রাম লাগে। সেই ড্রাম কেনার টাকাও নেই।
সায়রা খাতুনের মতো প্রতিদিন পানির সন্ধানে নামেন চাদঁনীমুখা গ্রামের আরেক নারী করিমন নেছা। তিনি জানান, ২০০৯ সালের ২৫ মে ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় উপকূলীয় এলাকা। ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে সুন্দরবন উপকূলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায়। শেষ হয়ে যায় হাজার হাজার গবাদিপশু আর ঘরবাড়ি। নিমেষেই গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার পরিবার। চিংড়িঘের আর ফসলের ক্ষতি ছিল অবর্ণনীয়। ধ্বংস হয়ে যায় উপকূল রক্ষা বেড়ি বাঁধ। ভেঙে চুরমার হয়ে যায় অসংখ্য ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নষ্ট হয়ে যায় এসব এলাকার অধিকাংশ টিউবওয়েল ও পুকুরের পানি। সেই থেকেই তাদের চলছে খাবার পানির সংকট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন আর পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা আশাশুনি ও শ্যামনগরের অধিকাংশ এলাকায় খাবার পানির সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আইলার পর এলাকার অধিকাংশ টিউবওয়েলের পানি লবণাক্ত ও আর্সেনিক যুক্ত হওয়ায় উপজেলার অনেক এলাকায় এখন সুপেয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়েই খোলা পুকুর ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (পিএসএফ) বসানো পুকুরের পানি পান করে জীবনধারণ করছেন হাজার হাজার মানুষ।
অন্য বছরের তুলনায় এবার বৃষ্টি কম হওয়ায় পনির স্তর নিচে নেমে গিয়ে সংকট আরও তীব্র করেছে। এদিকে বেসরকারি কয়েকটি সংস্থা সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে পিএসএফের মাধ্যমে কিছু এলাকায় খাবার পানির ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু চরাঞ্চলের নারীদের মাইলের পর মাইল হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জিএম মাছুদুল আলম বলেন, ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের মধ্যে পাঁচটি গ্রামে পানি সমস্যার কিছুটা সমাধান হলেও বাকি দশটি গ্রামে রয়েছে তীব্র সংকট। বিশেষ করে চাঁদনীমুখা গ্রামের মানুষকে প্রায় ৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে পারিশামারি গ্রাম থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। শুধু তাই নয়, আমার এলাকার অনেকেই ট্রলারে করে কয়রা উপজেলার ঘড়িলাল থেকে পানি সংগ্রহ করে কোনোরকমে জীবনধারণ করছেন। সরকারিভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করার জন্য অল্প কিছু ড্রামের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ সংখ্যা আরও বাড়ানো উচিত।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক ও পানি বিশেষজ্ঞ মোহন কুমার মণ্ডল জানান, ভূগর্ভের পানি লবণাক্ত হওয়া এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। নিজের পরিবারকে অরক্ষিত রেখে এই এলাকার নারীদের ৩-৪ কিলোমিটার দূরে যেতে হয় পানি আনতে।
তিনি বলেন, সুপেয় পানির সংকটের কারণে এই এলাকায় পানিবাহিত রোগ বাড়ছে। বিশেষ করে নারীদের অ্যাকলেমশিয়া এবং জরায়ু সংক্রমণ বাড়ছে তাদের। পানির সংকট নিরসন করতে না পারলে আগামী দিনে এই এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। উপকূলীয় এলাকায় পুকুর খনন করে পন্ডস স্যানিটাইজার স্থাপন করা, বড় বড় জলাধার নির্মাণ এবং বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সেগুলো পানের ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা আবহাওয়াবিদ জুলফিকার আলী রিপন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ঋতু পরিবর্তনের ফলে এ বছর বৃষ্টি কমে যাওয়ায় পানির লেয়ার নিচে নেমে গেছে। তবে এ এলাকায় পানির সংকট দীর্ঘদিনের।
সাতক্ষীরার সুন্দরবনঘেঁষা উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর। চারদিকে থইথই করছে পানি। কিন্তু খাওয়ার পানির বড়ই অভাব। খাওয়ার পানি আনতে গিয়ে প্রতিদিন দুবারে ৪-৫ ঘণ্টা ব্যয় করতে হয় এ উপকূলের অধিকাংশ বাড়ির নারীদের। তীব্র গরম পড়ার আগেই শ্যামনগরে খাওয়ার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গ্রীষ্মের দাবদাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সংকট আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
শ্যামনগরের দাতিনাখালি গ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারী কুমিলা রানী মুন্ডা (৩৩)। খাওয়ার পানি আনতে গিয়ে তিনি হারিয়েছেন শিশুসন্তানকে। কুমিলা কষ্টের কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘কাঁখে কলসি আর ঘাড়ে বাচ্চা নিয়ে যাতি হয় জল আনতি। কষ্টের কুথা বুলে বুঝানো যাবে না। ২০২১ সালের এপ্রিলে বাড়িতে সাবাল (ছেলে) রাখে গেলাম খাবার জল আনতি কলবাড়িতে। পানি নে এসে দেখি, বাড়ির ডোবায় ভাসতে আমার আদরের পলাশ। তখন পলাশের বয়স হইলো দুই বছর। সেখান থেকে জল আনতে গেলি ছোট সাবালটা ঘাড়ে করে নে যাই।’
বৃষ্টির অভাব, বন্যায় এলাকায় লবণ পানি ঢুকে যাওয়া এবং পুকুর, জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় আরডব্লিউএইচ ও পিএসএফ ঠিকভাবে কাজ করছে না।
একই গ্রামের রেবেকা খাতুনও (৩৬) পানি আনতে গিয়ে তাঁর শিশুসন্তানকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক বিকেলে তাঁর মেয়ে সালমাসহ (৬) কয়েক শিশুকে খেলতে দেখে তিনি পানি আনতে যান। বাড়িতে ফিরে দেখেন, বাড়ির পুকুরে তাঁর মেয়ে ডুবে মারা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও লবণাক্ততার সমস্যা দূর করতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো তদারকি না করায় খাওয়ার পানির সংকট বাড়ছে দিন দিন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল শ্যামনগর উপজেলার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় এ এলাকায় ৪০ শতাংশ মানুষ খাওয়ার পানির সংকটে রয়েছে। শ্যামনগর আতরজান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের পান করাসহ দৈনন্দিন কাজের জন্য নির্ভর করতে হয় পুকুর ও বৃষ্টির পানির ওপর। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনিয়ন্ত্রিত চিংড়ি চাষ, চিংড়িঘেরে উঁচু বাঁধ না দেওয়া, নদীপ্রবাহ আটকে দেওয়া, পুকুর ভরাট, খাল বেদখলের কারণে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষগুলো নিরাপদ পানির তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে দিনানিপাত করছে। সাধারণত শীতের মৌসুম থেকে বর্ষা আসার আগপর্যন্ত একটা লম্বা সময় এই দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এ উপকূলবাসীর
শ্যামনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ১ হাজার ৯৪৯টি গভীর (২৫০ ফুটের ওপরে), ৪৯১টি অগভীর (২৫০ ফুটের নিচে), ৫০০টি এসএসটি (৫০ থেকে ১৫০ ফুট) ও ৪৪১টি ভিএসএসটি (৩০ থেকে ৫০ ফুট) নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে ৮টি গভীর, ১২৯টি অগভীর, ১৬টি এসএসটি ও ৪৪টি ভিএসএসটি নলকূপ কয়েক বছর ধরে অকেজো পড়ে আছে। উপজেলার রমজাননগর এলাকার বাসিন্দা আমান উল্লাহ বলেন, খাওয়ার পানির জন্য তাঁকে প্রতি মাসে হাজার টাকার কাছাকাছি ব্যয় করতে হয়। রান্নাবান্নার পানি আনতে হয় অনেক দূর থেকে। বাড়িতে নলকূপ বসিয়েছেন; কিন্তু পানি ওঠে না।
গত বুধবার সকালে জয়াখালী মোড়সংলগ্ন আকিজ কোম্পানির তৈরি পানির ফিল্টার থেকে পানি নিতে এসেছিল অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুর্শিদা। সে জানায়, তাদের বাড়ি সাপখালী। জয়াখালী থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। সকাল ৭টার দিকে এলাকার চাচিদের সঙ্গে এখানে পানি নিতে এসেছে সে। তার স্কুল ১০টা থেকে। এখান থেকে গিয়ে স্কুল ধরতে প্রতিদিন তার কষ্ট হয়। তার বাবা দিনমজুর। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। প্রতিদিন পানির জন্য এই পথ পাড়ি দিয়ে তাকেই পানি আনতে হয়।
রমজাননগর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আল মামুন জানান, এ অবস্থা শুধু কৈখালী ইউনিয়নে নয়, পার্শ্ববর্তী রমজাননগর, ঈশ্বরীপুর, বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুর, আঠুলিয়াসহ গোটা উপকূলে একই অবস্থা।
শ্যামনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভূগর্ভে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ নলকূপে পানি কম উঠছে। শুধু দুর্যোগকালে সরকারিভাবে দুর্গতদের মধ্যে খাওয়ার পানি বিতরণ করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, পানির সমস্যা দূরীকরণে শ্যামনগরে জনস্বাস্থ্য বিভাগের পিএসএফ, আরডব্লিউএইচ (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং), গভীর ও অগভীর নলকূপ, আরও (রিভার্স অসমোসিস), পুকুর, দিঘি, মার (ম্যানেজড একুইফার রিচার্জ) মিলিয়ে প্রায় আট হাজার পানির উৎস রয়েছে। তবে বৃষ্টির অভাব, বন্যায় এলাকায় লবণ পানি ঢুকে যাওয়া এবং পুকুর, জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় আরডব্লিউএইচ ও পিএসএফ ঠিকভাবে কাজ করছে না।
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, কিছু এনজিও পানি সরবরাহের কাজ করলেও জনস্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় না করায় পানি সরবরাহের বিষয়ে কোনো তথ্য তাঁদের কাছে নেই।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাতক্ষীরা জেলার উপকূলীয় অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির সংকট ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে এই অঞ্চলের পুকুর এবং নলকূপের মতো মিঠা পানির উৎস দিন দিন কমে আসছে। অপরদিকে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি তারা অবলম্বন করে তা স্বল্প পরিসরে, দীর্ঘ মেয়াদী নয়। দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে বেড়েছে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, জন্ডিস, গ্যাস্ট্রিক, ইউরিন্যাল ইনফেকশান, চর্মরোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য, যৌনাঙ্গে চুলকানি, ঘা এবং জালাপোড়ার মতো রোগ। নারীদের মধ্যে এই সকল রোগের প্রাদূর্ভাব বেশি দেখা দিচ্ছে যা পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদী রোগ যেমন টিউমার এবং জরায়ু ক্যান্সারে রুপান্তরিত হচ্ছে।সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার দুইটি ইউনিয়ন-ভাড়াশিমলা এবং মথুরেশপুরে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার। বৃষ্টি কম হওয়ার কারণে কালিগঞ্জ ওয়াপদা পুকুরে পানির স্তর একেবারে নিচে নেমে আসার কারণে বিভিন্ন পুকুরের সাথে যে পিএসএ ফিল্টার রয়েছে তা এখন একেবার বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের মানুষ সরাসরি অথবা ফিটকিরি দিয়ে পানি পান করছে। সরেজমিনে দেখা যায় এসকল পুকুরের পানিতে ব্যাঙাচি জন্ম নিয়েছে। কালিগঞ্জ উপজেলার দশটির বেশি গ্রামের ছয় হাজারের অধিক পরিবারের মানুষ এই পানির উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে। দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য কালিগঞ্জ ওয়াপদার বিভিন্ন পুকুর থেকে ব্যাঙাচিযুক্ত পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন নারীরা।এই ব্যাপারে নারায়ণপুর গ্রামের রহিমা খাতুন বলেন, পানির আর কোন উৎস না থাকায় আমরা এই পানি সংগ্রহ করে ব্যবহার করছি। এছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। বাজারে যে পানি কিনতে পাওয়া যায় তার দাম পূর্বের তুলনায় দিগুণ। করোনা পরিস্থিতির কারণে আমাদের আয়ের উৎস কমে গেছে, তাই পানি কিনে খাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব না। রহিমা খাতুন আরোও জানান, নোংরা পানিতে গোসল করার কারণে নারীদের সাদা স্রাব বেশি হচ্ছে (লিউকোরিয়া)। ডাক্তাররা পরিষ্কার পানিতে গোসল করার পরামর্শ দেন, কিন্তু যেখানে খাবার পানিই পাওয়া যায় না সেখানে গোসলের জন্য পরিষ্কার পানি পাওয়া দুষ্কর।বিশুদ্ধ পানির সংকট নিয়ে একই গ্রামের সফুরা জানান, খাবার পানির যেমন সমস্যা রয়েছে তেমনই তাদের রান্না এবং গোসলের জন্য নোনা পানি ব্যবহার করতে হয়, ফলে তাদের অধিকাংশের ডায়রিয়া আর আমাশয় এর মতো রোগ লেগেই আছে।মথুরেশপুর ইউনিয়নের হাড়দাহেও দেখা গেছে একই চিত্র। কালাবোনিয়ায় পুকুরের পানিও তলানিতে ঠেকেছে, অগত্যা মানুষ ঐ পানি সংগ্রহ করে খাচ্ছেন। এই পুকুরের পানি সাত গ্রামের তিন হাজার পরিবার সংগ্রহ করে খাচ্ছেন।ভুক্তভোগী হাড়দাহের হালিমা বেগম বলেন, পানি মেপে মেপে খাই। এই গরমে পানি মেপে খেলে কি শরীর থাকে? আমাদের বাড়ির সবার ইউরিন্যাল ইনফেকশান। আমাদের এলাকায় শতকরা নিরানব্বই জনের এই সমস্যা আছে বলে আমি মনে করি।পানি বিক্রি করে সংসার চালনো রূপবান বলেন, আগে পিএসএ ফিল্টারের পানি নিয়ে বিক্রি করতাম, কিন্তু এখন পানি নেই। এখন সরাসরি নলকূপের পানি তুলে বিক্রি করছি। এই পানিও অতোটা ভালো না, কিন্তু উপায় নেই। এছাড়া আর পানি কই? এখন বাধ্য হয়ে এই পানি মানুষকে দিতে হচ্ছে।এই ব্যাপারে মথুরেশপুরের এক গ্রাম্য চিকিৎসক বলেন, ইউরিন্যাল ইনফেকশান এবং লিকোরিয়া রোগী এখন বেশি পাচ্ছি। পানি কম খাওয়ার কারণে ইউরিন্যাল ইনফেকশান এবং নোংরা পানিতে গোসলের জন্য লিকোরিয়ার মতো রোগের প্রকোপ বেড়েছে। পরবর্তীতে এই সকল অসুখ থেকে জরায়ুতে ইনফেকশান এবং ক্যান্সারও হতে পারে।অপরদিকে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত ডাক্তার মাহাতাব হোসেন বলেন, করোনার মধ্যে সাধারণত জ্বর ছাড়া রোগী কম ভর্তি হচ্ছে বা ডাক্তার দেখাতে আসছে। তবে ইউরিন্যাল ইনফেকশান, যৌনাঙ্গে চুলকানি এবং সাদা স্রাব (লিউকোরিয়া) এর মতো অসুখ নিয়েও অনেকে আসছেন।এই বিষয়ে কালিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদী বলেন, পানির সমস্যার বিষয়টি আমাদের অজানা নয়। ইতোপূর্বে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাথে আমরা বসেছি। বিষয়টি আমরা খুব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছি, কিন্তু করোনার জন্য এই সমস্যা সমধানে তেমন অগ্রগতি হয়নি। আগে জেলা পরিষদের অধীন বিভিন্ন পুকুরে মাছ চাষ করা হতো, স্থানীয় জনগণের পানির চাহিদা পূরণের জন্য এবছর সব পুকুর ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও জনানা তিনি।একশনএইড এর কমিউনিকেশন অফিসার প্রেরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন ঘেষা বৈশখালী গ্রামে মাদার গাং নদীর চরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন রোমেছা বেগম (৩৫)। গেল ২৫ বছরে অন্তত ১৫ বার ঘরে পানি উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘর-উঠান ঠিক করে বছর না ঘুরতে আবার একই অবস্থা হয়ে যায়। তারপরও বাধ্য হয়ে মানিয়ে নিতে হচ্ছে এ ‘নিত্য অনাচারের’ সঙ্গে, নানা রোগ-শোক আর প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কাটছে জীবন।
সর্বনাশা বন্যায় ধসে যাওয়া বারান্দা ঠিক করতে করতে রোমেছা বেগম এই প্রতিবেদককে বলছিলেন, ‘লোনা পানি আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। উঠোনে গাছ তো দূরে থাক, বছরের পর বছর ধরে দুটো ঘাসও জন্মায় না; এমন তেজ এই লোনা পানির।’
‘মাটির রাস্তা বলে বর্ষাকালে চলাচলে খুব কষ্ট। কিন্তু তারপরও আমরা বর্ষাকালের অপেক্ষোয় থাকি। কারণ, এ সময়ে বৃষ্টির পানিটা আমরা খেতে পারি। পুকুরের পানির লোনাও একটু কম থাকে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা বেড়েছে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে। মাত্রাতিরিক্ত লোনা জমি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত তেমনি ভুগছেন এসব এলাকার জনগোষ্ঠীও। বিশেষ করে পানি গোসল থেকে শুরু করে দিনের যাবতীয় কাজে লোনা পানির ব্যবহারে নানা রোগে ভুগছেন উপকূলের নারী, কন্যা ও শিশুরা। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ব্যবহারের সুবিধা থাকলেও শুষ্কমৌসুমে পানির জন্য হাহাকার চলে এসব এলাকা।
কয়েকবছর আগে অপারেশন করে জরায়ু ফেলে দেওয়া রোমেছা বেগম বললেন, ‘লোনা পানিতে নামলেই শরীর চুলকাতো। কিন্তু মিঠে পানি পাব কোথায়? এভাবে চলতে চলতে একসময় নিয়মিত রক্ত পড়তে থাকলো। পরে ডাক্তার জরায়ু অপারেশনের পরামর্শ দিলো। না খেয়ে টাকা জোগাড় করে অপারেশন করেছি।’
‘আমার মতো অবস্থা এই গ্রামের প্রায় সব মহিলাদের। এমন কোনো বাড়ি নেই, যে বাড়িতে জরায়ু কাটা রোগী নেই’।
রোমেছার কথার সত্যতাও মেলে। তারই পাশের বাড়ির ফিরোজা বেগম মাত্র ২৬ বছর বয়সে জরায়ু হারান। এ ছাড়াও লিউকোরিয়া, চুলকানিসহ নানা রোগে ভুগছেন এসব এলাকার নারী ও শিশুরা।
স্ত্রী ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ও শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন রীতা রানী পাল ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘অতিরিক্ত লোনাপানি থেকে যৌনপথে ছত্রাকের আক্রমণ হয়। এরপর চুলকানি, জ্বালাপোড়া, সাদাস্রাব বা লিউকোরিয়া, অনিয়মিত বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে থাকে।’
শ্যামনগর উপজেলার ক্লিনিকগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, কয়েকবছর ধরে জরায়ু অপারেশন বেড়েছে। অবশ্য এর পেছনে কত চিকিৎসা, কতটা দুর্নীতি তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তবে জরায়ু আক্রান্তের সংখ্যা যে বাড়ছে তা নিয়ে সন্দেহ নেই বলে জানান তাদের।
২০১৮ সালে ‘সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবে লবণাক্ততার প্রভাব’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার নারী ও কিশোরীরা মাসিকের সময় ব্যবহৃত কাপড় লবণ পানিতে ধুয়ে আবারও সেটি ব্যবহার করে। এর ফলে নানা ধরনের অসুখে আক্রান্ত হয় তারা।
লোনা পানির কারণে নারীদের গর্ভপাত হয় বলেও আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর,বি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে।
এদিকে ক্ষতিকর হলেও নারীদের জীবিকার জন্য নির্ভর করতে হয় লোনা পানির উপরেই। ভারত-বাংলাদেশকে বিভক্তকারী কালিন্দী নদীর পাড়েই কৈখালী ইউনিয়ন। সেখানকার বাসিন্দা হাসিনা বেগম দিনে ছয় ঘণ্টা ধরে কোমর পর্যন্ত ডুবিয়ে নদীতে মাছের পোনা ধরেন।
তিনি জানান, লোনা পানিতে দীর্ঘসময় ধরে থাকার পরিণামে প্রতি মাসে অপরিমিত রক্তক্ষরণ হয়। কিন্তু কিছু করার নেই। সংসার টেকাতে এই লোনা পানিই ভরসা।
‘আগে জমিতে ধান হতো। গরু, হাঁস, মুরগি পুষতাম। এখন সে উপায় নেই। কারণ, জমিতে ধান হয় না। নিজেরাই খেতে পারিনা। খড় কিনে গরুকে খাওয়ানোর উপায় কই!’ -বলেন হাসিনা।
‘ঘূর্ণিঝড় আইলার থেকে শুরু করে যতগুলো ঘূর্ণিঝড় এসেছে সবগুলোতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। বারবার লোনা পানিতে ডুবে গেছে ফসলের ক্ষেত থেকে ঘরবাড়ি। আগে খেতে দিনমজুরি করলেও এখন সেসব কাজও নেই গ্রামে। তাই ইট ভাটায় কাজ করতে গ্রাম ছেড়েছে স্বামী’ -বলেন এই জলবায়ু যোদ্ধা নারী।
লোনা পানির তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কঠিন হয়ে পড়েছে খাবার পানি সংগ্রহ করা। অন্তত তিন থেকে চার মাস ধরে বৃষ্টির পানি খাওয়া সম্ভব হয় বর্ষাকালটা তাদরে জন্য আশীর্বাদ। অবস্থাসম্পন্ন গৃহে আধুনিক ট্যাংকিতে সংগ্রহ করে রাখা হয় পানি, যা দিয়ে বছরজুড়ে খাবার পানির সংকট মেটানো যায়। তবে বিপাকে পড়ে গরীব মানুষজন।
শুষ্ক মৌসুমে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সরবরাহ করা পানির ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয় তাদের। কোনো আয় না থাকলেও প্রতি লিটারে ন্যূনতম ৫০ পয়সা দরে পানি কিনে খেতে হয় বলে জানান এসব এলাকার মানুষ। কোথাও কোথাও এক লিটার পানির দাম ৭০ পয়সা পর্যন্তও হয়।
এই পানি সংগ্রহের কাজ বেশিরভাগই করেন নারীরা। কয়রা উপজেলার কয়রা ইউনিয়নের বাসিন্দা সুমতি মন্ডল ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার পরিবারে ছয়জন মানুষ। গরমকালে পানির চাহিদা অনেক। আমাকেই প্রতিদিন অন্তত চার কলস পানি নিয়ে আসতে হয় দুই কিলোমটিার দূর থেকে। এ্ পানি পেতে আবার টাকাও দিতে হয়।
‘সুজলা সুফলা গ্রাম বলতে যা বুঝি তেমনই ছিল আমাদের গ্রাম। কিন্তু আইলার পর থেকে তা কার্যত মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। লোনা পানি ঢুকে জমিতে ফসল হয় না। বাধ্য হয়ে জমিগুলো ঘেরে পরিণত হয়েছে। অল্প জমি যাদের তারা কম পয়সায় বর্গা দিতে বাধ্য। ফলে কারো ঘরে আর ফসল ওঠে না’ -বলছিলেন গাবুরার ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুল বারী।
‘চাল, ডাল, পানি থেকে শুরু করে সব কিছু কিনে খেতে হয়। এমনকি জ্বালানিটা পর্যন্ত’ -বলেন তিনি।
এসব বিষয়ে কৈখালী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণসহ লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে।’
‘প্রত্যেক ইউনিয়নে জলববায়ু তহবিল গঠনে বরাদ্দ দেওয়াসহ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সংকট নিরসনে আরও পানির প্লান্ট তৈরি করতে হবে। আমরা এসব বিষয়ে বারবার সরকারের দৃষ্টি আহবান করছি’ -বলেন তিনি।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক ড. আনোয়ার জাহিদ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পরীক্ষা করে দেখা যায়, উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর-কালিগঞ্জে ২০০-২৫০ ফুট গভীর পানির স্তর থাকলেও তা অনেক লোনা। এরপর আবার ১১০০ ফুট পর্যন্ত কোনো পানির স্তর নেই।’
কোথাও কোথাও ৬০০-৭০০ ফুট গভীরে সুপেয় পানি পাওয়া গেলেও সাধারণ পরিবারের জন্য এত গভীর নলকূপ বসানো কষ্টসাধ্য। শুধু বাংলাদেশের উপকূলেই নয় লোনা পানির সীমানার মতো ভারতের উপকূলেও ছুঁয়ে গেছে এর ভয়াবহতার মাত্রা।
ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের সন্দেশখালি, মিনাখাঁ, হিঙ্গলগঞ্জে গ্রামগুলোতে নিয়মিত মেডিক্যাল ক্যাম্প করেন আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ শ্যামল চক্রবর্তী।
তিনি জানান, এসব গ্রামে অনেক জরায়ু সংক্রমণের রোগী মেলে। এরজন্য শুধু পরিচ্ছন্নতার অভাবই নয়, লোনা পানিও অন্যতম কারণ। এখানকার পানিতে লিটারে প্রায় ২০ গ্রাম লবণ রয়েছে। এই হাইপারটনিক স্যালাইন যোনিপথের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়, সংক্রমণ সহজে ছড়ায়।’