সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : কালাবগিতে কষ্টের জীবন থেমে থাকে না। রুক্ষ বর্তমান আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা সঙ্গে রেখেই মানুষ স্বপ্ন বোনে। মিলন হয়। জনপদে জন্ম নেয় নতুন শিশু।
এ পাড়ার মানুষগুলো 'গরীবের মধ্যে গরীব। ছোটলোকের মধ্যে আরও বেশি ছোটলোক'। এখানকার ঝুলন্ত ঘরগুলোর মতোই তাদের জীবনও সর্বক্ষণ ঝুলে থাকে জন্ম-মৃত্যুর মাঝে ঝুলে থাকা অদৃশ্য সুতোয়।
কিন্তু ঝড়ের ছোবল, তুফানের চোখরাঙানি, বাঘের ভয়, কুমিরের দাপট, তীব্র ক্ষুধা, ভয়ংকর তৃষ্ণা, নিদারুণ দারিদ্র আর রোগ-শোকের চাবুকেও সে জীবন সহসা টলতে চায় না।
এ জনপদ যেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে উঠে আসা বিংশ শতাব্দীর সেই কেতুপুর; জন্মের উৎসব যেখানে 'গম্ভীর, নিরুৎসব, বিষণ্ন'।
ভঙ্গুর বসত। ছবি: হাবিবুর রহমান/স্টার
খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নের শেষ জনপদ এই কালাবগি। এর পশ্চিমে শিবসা ও পূর্বে সুতারখালী নদী। শিবসা তীরের পশ্চিমপাড়া বলে পরিচিত লোকালয়ে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ-পূবে তাকালে চোখে পড়বে এমন শয়ে শয়ে ঝুলন্ত ঘর।
কাঠ-বাঁশের খুঁটির ওপরে মাচা পেতে বানানো হয়েছে এসব মাথা গোঁজার ঠাঁই। জোয়ারে প্রায়ই ঘরের পাটাতন বা মাচা ভিজে যায়। পাড়াটির অবস্থান আর ঘরের ধরনের জন্য এ বসতির নাম হয়েছে ঝুলন্তপাড়া। কেউ বলেন 'ঝুলনপাড়া'।
এই ঝুলনপাড়ার সব বাসিন্দাই ভূমিহীন। নদীভাঙনে সব হারানো মানুষগুলোর ঠাঁই হয়েছে এখানে। এর ওপারেই সুবিস্তৃত সুন্দরবন।
অকালপ্রয়াত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর 'গহিন গাঙের জল' শিরোনামের কবিতার এই পঙ্ক্তিগুলো কালাবগির মানুষ ও তাদের যাপিত জীবন প্রসঙ্গে বেশ প্রাসঙ্গিক—'গহিন গাঙের ঘোলা নোনাজল উথালি পাথালি নাচে/ফনা তুলে আসে তুফানের সাপ কাফনের মতো শাদা/পরানের 'পরে পড়ে আছড়ায়ে বিশাল জলের ক্রোধ—/যেন উপকূল ভিটে মাটি ঘর টেনে নিয়ে যাবে ছিঁড়ে।'
এখানে প্রতি পদে বিপদ। ছবি: হাবিবুর রহমান/স্টার
সুতারখালী ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে এই ঝুলন্তপাড়ায় ৬০০-৭০০ পরিবারের বাস। জীবিকা চলে নদী থেকে বাগদা-গলদার রেণু সংগ্রহ করে, মাছ ধরে। অনেকে সুন্দরবনে কাঠ, গোলপাতা ও মধু সংগ্রহ করেন।
নদীর ওপর পাড়ার বাসিন্দাদের ঘরগুলো সুন্দরবনের কাকড়াগাছের খুঁটি, শিরীষ কাঠের পাটাতন ও গোলপাতার বেড়া দিয়ে তৈরি। বড় আকারের জোয়ার ও ঝড় হলে নির্ঘুম রাত কাটে পাড়ার মানুষগুলোর।
বিপদে ঠাঁই নেওয়ার জন্য পাড়ার আশপাশে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নেই। চিকিৎসাসেবা নিতে নৌপথে যেতে হয় ৩০ কিলোমিটার দূরের উপজেলা সদরে। সবচেয়ে কাছের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতেও লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। খুব বেশি তৃষ্ণা না পেলে এই এলাকার মানুষ পানি খান না। রান্নার পানি আনতে হয় দুই কিলোমিটার দূর থেকে। খাওয়ার পানি আনতে হয় অন্য উপজেলা থেকে। পুরো এলাকায় সবুজের চিহ্ন নেই।
এই জনপদে নারীর জীবন আরও কঠিন। ছবি: হাবিবুর রহমান/স্টার
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ ও পাড়ার স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, ১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকেই এই এলাকায় ঝুলন্ত ঘর তৈরির এই প্রবণতা শুরু হয়। এরপর কয়েক দফা নদীভাঙনে যাদের বসতভিটা শিবসা কিংবা সুতারখালীর পেটে গেছে, তাদেরও ঠাঁই হয়েছে এখানে। সর্বশেষ সিডর ও আইলার আঘাতের পর পাড়ার পরিধি বেড়েছে। বেড়েছে বিপদের পরিধিও।
লেখক-গবেষক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা তার এক লেখায় জানাচ্ছেন, সুন্দরবনের ভেতরের নদী আর খাঁড়িগুলোতে কুমিরের স্বাভাবিক খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় কুমির লোকালয়ের কাছে চলে আসছে। সুন্দরবনের কুমিরদের প্রধান খাবার মাছ আর কাঁকড়া। বাণিজ্যিকভাবে কাঁকড়া আহরণ, নিধন ও রপ্তানি কুমিরের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
ফলে আগে যেখানে কুমির কালেভদ্রে ভদ্রা নদী বেয়ে সুতারখালী নদীতে আসত; এখন সেই কুমির প্রায়ই জোয়ার কিংবা ভাটায় ঘরের নিচে ঘুরঘুর করছে।
ঝুলনপাড়ার মাঝে নদী, ওপারে সুন্দরবন। ছবি: হাবিবুর রহমান/স্টার
এতকিছুর পরও কালাবগিতে কষ্টের জীবন থেমে থাকে না। সেখানেও উঁকি নিয়ে যায় হাসির সূর্য। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা সঙ্গে রেখেই মানুষ স্বপ্ন বোনে। মিলন হয়। জনপদে জন্ম নেয় নতুন শিশু।
প্রতি পদে বিপদ আর অনিশ্চয়তায় মোড়ানো কালাবগির মানুষদের এ জীবন ধরার সাধ্য কোনো গল্প-কবিতার নেই। তারপরও কবি রুদ্রের মতো বলতে ইচ্ছে হয়—'রোদ্দুরে পোড়া জোস্নায় ভেজা প্লাবনে ভাসানো মাটি,/চারিপাশে তার রুক্ষ হা-মুখো হাভাতে হাঙর-জল।/উজানি মাঝির পাঞ্জায় তবু বিদ্যুৎ জ্ব'লে ওঠে/জ্ব'লে ওঠে তাজা বারুদ-বহ্নি দরিয়ার সম্ভোগ—/উপদ্রুত এ-উপকূলে তবু জীবনের বাঁশি বাজে।'
বঙ্গোপসাগরের সুদীর্ঘ উপকূল, চর ও দ্বীপাঞ্চলের দুই বেষ্টনী অপরিহার্য। এক. সমুদ্র উপকূলীয় বেড়িবাঁধ। দুই. ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলসহ সবুজ বেষ্টনী। বিস্তীর্ণ উপক‚লকে রক্ষাকারী উভয় বেষ্টনীর অবস্থা বর্তমানে নড়বড়ে। এরমধ্যে বেড়িবাঁধ নাজুক দশায় গিয়ে ঠেকেছে। অনেক জায়গায় ভাঙাচোরা বিধ্বস্ত। আবার অনেক এলাকায় বেড়িবাঁধের চিহ্নই মুছে গেছে। এ অবস্থায় অরক্ষিত বঙ্গোপসাগর উপক‚লে বেড়িবাঁধের বেষ্টনী।
ভাঙা-জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধের ভেতরে জনপদ ভাসিয়ে দিচ্ছে প্রতিদিনের সামুদ্রিক জোয়ারের পানি। সেই সাথে লোনাপানির আগ্রাসনে হাজার হাজার একর ফসলি জমি ক্ষেত-খামার বলতে গেলে অনাবাদী এবং উৎপাদনহীন হয়ে পড়েছে। সমুদ্র গর্ভে বিলীন হচ্ছে একে একে আবাদী জমি। সর্বস্বান্ত হয়ে দিশেহারা হাজারো কৃষক।
অনুুসন্ধানে জানা যায়, দেশের চর, দ্বীপাঞ্চল ও উপক‚লের ৩০ শতাংশ বেড়িবাঁধের চিহ্ন প্রায় মুছে গেছে। উপক‚লের প্রায় ৫০ ভাগ জায়গায় বেড়িবাঁধ কমবেশি ভাঙাচোরা বিধ্বস্ত নড়বড়ে। দীর্ঘদিনের দাবি সত্তে¡ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে উদ্যোগ নেই। মাঝে-মধ্যে যা হয় তা শুধুই জোড়াতালি মেরামত। এর আড়ালে বছর বছর চলছে সীমাহীন দুর্নীতি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কতিপয় অসৎ প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদার মিলে গড়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ‘নয়-ছয়ে’ আরো তৎপর আগ্রাসী বিভিন্ন এনজিও। ভাঙা বেড়িবাঁধ উপক‚লবাসীর জন্য মরণফাঁদ। অনেক তোড়জোড় হলেও উপক‚লে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মিত হচ্ছে না।
দুর্বল ঘূর্ণিঝড় ‘ফণি’ আঘাত হানার সময়ে প্রবল জোয়ারের তোড়ে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ভোলা, পটুয়াখালী, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা সমুদ্র উপক‚ল, প্রত্যন্ত চর ও দ্বীপাঞ্চলের অনেক স্থানে গ্রাম-জনপদ ফসলি জমি, মাছের খামার-ঘের, বসতঘর ভেসে গেছে। গত শুক্রবার মধ্যরাত থেকে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ‘ফণি’ এবং অমাবস্যা এই দ্বিমুখী প্রভাবে স্বাভাবিক সামুদ্রিক জোয়ারের চেয়ে ৪ থেকে ৫ ফুট উঁচু প্রবল জোয়ার বয়ে গেছে।
উপক‚লের অনেক জায়গায় বেড়িবাঁধ না থাকায় কিংবা নড়বড়ে হওয়ায় জোয়ারের পানিতে দ্রুত প্লাবিত হয় গ্রাম-পাড়া এবং ফল-ফসলের জমি। এখন মাঠে রয়েছে আধা-পাকা আমন ফসল। সর্বনাশা জোয়ারে আমন ফসল বিনষ্ট হয়েছে। ক্ষেত-খামারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অপূরণীয়। এহেন দুর্যোগের সময়ে অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকা ছাড়া সমুদ্র উপক‚লের কৃষকদের আর করার কিছুই ছিল না। প্রতিবারের দুর্যোগে একইভাবে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলছেন কৃষক। উপক‚লীয় গ্রামীণ অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ছে। দীর্ঘদিন যাবৎ দেশের সমগ্র উপক‚ল, চর দ্বীপাঞ্চলের মানুষের এক আওয়াজ- ‘আমরা রিলিফ চাই না, বেড়িবাঁধ চাই’।
দেশের ১৯টি উপক‚লীয় জেলার সাড়ে ৪ কোটি বাসিন্দার মাঝে অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মূল কারণ তাদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য অপরিহার্য বেড়িবাঁধে অবহেলা। অধিকাংশ স্থানে ক্ষতবিক্ষত, নড়বড়ে ও বিধ্বস্ত বাঁধ কোনোমতে টিকে আছে। উপক‚লীয় জনপদে বেড়িবাঁধ স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যম। ভাঙা ও বিচ্ছিন্ন বাঁধের কারণে অনেক জায়গায় যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন প্রায়। টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপ, কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া হয়ে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উপক‚লের বাঁশখালী, আনোয়ারা, স›দ্বীপ, সীতাকুণ্ড, মীরসরাই, মহানগরীর পতেঙ্গা-হালিশহর-কাট্টলী পর্যন্ত বেড়িবাঁধের দুর্দশার কারণে লাখ লাখ মানুষের জীবনধারণ কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব উপক‚লীয় ৭১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তটরেখায় বেড়িবাঁধের সেই একই দৃশ্য। ভাঙাচোরা বাঁধ দিয়ে উত্তাল সাগরের লোনাপানি এপাশ-ওপাশ ঢেউ খেলছে।
ঝড়-জলোচ্ছাস ও জোয়ারের আতঙ্ক নিয়েই দিনাতিপাত করছেন উপক‚লবাসী। স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে উপক‚লবাসীর জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত। অনেক এলাকায় তারা হুমকির মুখে। কৃষি-খামার, ফসলি জমি, লবণের মাঠ, চিংড়িসহ মাছের ঘের, পুকুর, সবজি ক্ষেতসহ গ্রামীণ অর্থনীতির পাশাপাশি নিজেদের বসতভিটা সবকিছুই উত্তাল সাগরের করাল গ্রাসের মুখোমুখি রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ অধিকাংশ স্থানে বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সংস্কার বা মেরামত কাজের মান নিয়ে উপযুক্ত তদারকি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার যেন কোনো বালাই নেই। এতে করে জোড়াতালির বেড়িবাঁধ কিছুদিন পরেই সমুদ্রে বিলীন হয়। কিংবা ধসে পড়ে।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল সংঘটিত শতাব্দীর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছাসের পর দুর্যোগপ্রবণ সমুদ্র উপক‚ল, চর ও দ্বীপাঞ্চলে জানমাল সুরক্ষায় অগ্রাধিকার পরিকল্পনার ভিত্তিতে উপযুক্ত অবকাঠামো সুবিধাসমূহ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৭ দফা সুপারিশ সরকারের কাছে পেশ করে তৎকালীন সচিব এম মোকাম্মেল হকের নেতৃত্বে গঠিত সরকারি উচ্চপর্যায়ের কমিটি। বহুল আলোচিত সেই ‘মোকাম্মেল কমিটি’র সুপারিশে সমুদ্রবন্দর, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ, মৎস্য, কৃষি-খামার সমৃদ্ধ দেশের বিস্তীর্ণ উপক‚লীয় অঞ্চল সুরক্ষায় টেকসই এবং স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। অথচ সেই টেকসই মজবুত বা স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ আজো দৃশ্যমান নয়।
ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, জোয়ার-ভাটা এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপক‚লীয় এলাকার স্বাভাবিক ঘটনা। আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবের ফলে এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েই চলছে। এসব দুর্যোগের কবল থেকে উপকূলবাসীকে রক্ষা করতে বেড়িবাঁধ এবং বনায়নের মাধ্যমে সবুজ বেস্টনি গড়ে তোলা হয়। তবে ৩০ বছর আগের বেড়িবাঁধ নানান দুর্যোগে আজ ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। অসাধু ব্যক্তিরা বনায়নের গাছ কেটে চিংড়ি ঘের তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে উপকূল এখনও অরক্ষিত। আকাশে কাল মেঘ ও সাগরের নিম্নচাপ দেখলেই উপক‚লবাসীর বুক ভয়ে কেঁপে উঠে। দেশের সাগর তীরবর্তী অর্থাৎ উপক‚লীয় ২১টি জেলায় লাখ লাখ মানুষের বসবাস। কিন্তু এই বিস্তীর্ণ উপকূলের যথাযথ সুরক্ষা নেই। উপকূলের রক্ষাকবচ বেড়িবাঁধ সর্বত্রই ভাঙাচোরা ক্ষতবিক্ষত। অনেক জায়গায় বাঁধের চিহ্নও নেই। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে তছনছ উপক‚লীয় এলাকার বেড়িবাঁধ। এতে করে প্রতি বছর এসব এলাকার বসতভিটা, ফল-ফসলি জমি, ফাউন্দি ক্ষেত, খামার, লবণের মাঠ, চিংড়িসহ মাছের ঘের, মিঠাপানির উৎস পুকুর-কুয়া-নলকূপ, হাট-বাজার, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে একাকার। হাজার হাজার একর জমি লবণাক্ত হয়ে চাষের অনুপোযোগী হয়ে পড়ছে। এসব এলাকায় উঁচু বাঁধ নির্মাণে পরিকল্পনা থাকলেও বাঁধ নির্মাণে নজর নেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ভাঙা বাঁধ মেরামতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও তাতে রক্ষা হয় না উপক‚ল। অথচ টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলে সমুদ্রবন্দর, পোতাশ্রয়, বিমানবন্দর, শিল্প-কারখানা, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদসহ অপার সম্ভাবনা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাগর পাড়ের বাঁধগুলো উঁচুকরণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্লিষ্টদের খুব একটা গুরুত্ব ও নজর না থাকার কারণে জোয়ারে পানিতে প্রতি বছরই উপক‚লীয় এলাকা ডুবে-ভাসে। গতবছর দীর্ঘস্থায়ী জোয়ারে সাগর পাড়ের লাখ লাখ মানুষ ছিল পানিবন্দি। বর্তমানে অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে উপক‚লের অনেক এলাকা। দেশের দক্ষিণ-পূর্বে টেকনাফ-কুতুবদিয়া, বাঁশখালী-স›দ্বীপ, ল²ীপুর থেকে দক্ষিণের দ্বীপজেলা ভোলা, বরিশাল, খুলনা হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাগেরহাট-সাতক্ষীরা পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে বিস্তীর্ণ উপকূল-চর-দ্বীপাঞ্চলে শুধুই ভাঙন। এসব এলাকার কয়েক লাখ বাসিন্দা এবং সেখানকার জনবসতি, অবকাঠামো অরক্ষিত। অনিশ্চিত জীবন-জীবিকা। তাইতো উপকূলবাসী কাফনের কাপড় পরে ভাঙা বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে দাবি জানায় ‘ত্রাণ চাই না, টেকসই বেড়ি বাঁধ চাই’।
গত সপ্তাহেও খুলনা-সাতক্ষীরা ও সংলগ্ন দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিম্নচাপ অবস্থান করে। এর ফলে অতিবৃষ্টি ও প্রবল জোয়ারে গোটা উপক‚লভাগ, নদ-নদী, খাল-বিলসহ ফুলে-ফুঁসে উঠেছে। সতর্ক সঙ্কেত না থাকলেও গতকাল রোববার পর্যন্ত সমুদ্র ছিল উত্তাল। অস্বাভাবিক জোয়ারে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের অনেক এলাকা প্লাবিত হয়। লোকালয় পানিতে সয়লাব। আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাসে জানা গেছে, চলতি আগস্ট (শ্রাবণ-ভাদ্র) মাসে বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দু’টি নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এরফলে উপক‚লজুড়ে ভারি বর্ষণ ও অস্বাভাবিক জোয়ারে একই ধরনের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের উপকূলীয় এলাকার ৮ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালে আইলার পর উপকূল এলাকার বাঁধের অনেক জায়গা ভেঙে যায়, অনেক জায়গা বানের তোড়ে ভেসে যায়। কিন্তু তার বড় অংশ এখনো যথাযথভাবে মেরামত করা হয়নি। এতে করে গোটা উপক‚লীয় এলাকা এখন অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। গত বছর আম্পানে উপক‚লীয় জেলার ১৫২টি স্থানে ৫০ দশমিক ৪৭৮ কিলোমিটার বাঁধ সম্পূর্ণ ভেঙে বিলীন হয়েছে। ৫৮৩টি স্থানে ২০৯ দশমিক ৬৭৮ কিলোমিটার আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪৮টি নদীর তীর ভাঙনে ১৩ দশমিক ২০৮ কিলোমিটার বিলীন হয়েছে এবং ৩৭টি নদীর তীর সংরক্ষণ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের ক্ষতি হয়েছে ১২ দশমিক ৮০০ কিলোটার। এই বিধস্ত উপক‚লকে এখনো মেরামত করা হয়নি। ফলে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে ও টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে ভাসছে উপকূলের জেলাগুলো।
বিশিষ্ট জলবায়ু ও পানি বিশেষজ্ঞ ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আইনুন নিশাত ইনকিলাবকে বলেন, আইলা-সিডর-আম্ফান ও দীর্ঘ বন্যায় দেশের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এবার সমুদ্রে সৃষ্ট লঘুচাপের ফলে জোয়ারে পানিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এসব প্রাকতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে হলে বর্তমানে বাঁধের উচ্চতা সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে ১৫ ফুট, ভেতরের দিকে ১৪ কিংবা ১২ ফুট। এগুলো যদি সবল থাকে তাহলে ১৪-১৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস ঠেকিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবে এসব বাঁধও ভাঙা-বিধস্ত। এ ছাড়া বর্তমানে ১৭-১৮ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত জোয়ারের পানি উঠছে। তাই এসব বিবেচনা করে উপক‚লের বেড়িবাঁধগুলো টেকসইভাবে নির্মাণ করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর বাঁধ ভাঙবে আর এসব ভাঙা মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হবে। উপকূলবাসীর দুর্ভোগ তাতে দূর হবে না।
উপক‚লীয় এলাকার বর্তামন অবস্থা আমাদের সংবাদদাতারা তাদের রিপোর্টে তুলে ধরেছেন। সে আলোকে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম থেকে শফিউল আলম জানান, ঘূর্ণিঝড়ের মুখে প্রাণ হাতে নিয়ে উপক‚লবাসীর বসবাস। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি। যখন ঘূর্ণিঝড় হয় না তখনও প্রবল জোয়ার ভাটায় লোনা পানি এপাশ-ওপাশ খেলছে। এতে করে বসতভিটা, ফল-ফসলি জমি, ফাউন্দি ক্ষেত, খামার, লবণের মাঠ, চিংড়িসহ মাছের ঘের, মিঠাপানির উৎস পুকুর-কুয়া-নলক‚প, হাট-বাজার, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে একাকার। অথচ বেড়িবাঁধ অবহেলিতই রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ এবং বঙ্গোপসাগরের কোলে ফানেল বা চোঙ্গা আকৃতির অবস্থানে বাংলাদেশ। ভ‚প্রাকৃতিক কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে দুর্যোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সুদূর অতীত থেকে এ যাবত বছরে একাধিক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে। তাছাড়া জলবায়ুর বৈরি আচরণে ফুলে-ফুঁসে উঠা সমুদ্রের অস্বাভাবিক জোয়ারে প্লাবিত হচ্ছে অনেক এলাকা। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ‘নাভি’ আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, হালিশহর এবং দেশের প্রধান ‘সওদাগরী বাণিজ্য পাড়া’ চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ সামুদ্রিক জোয়ারে ডুব-ভাসি করছে। ঢলের পানিতে থৈ থৈ সড়কে সাম্প্রতিক সময়ে নৌকাযোগে অফিসে গেছেন সরকারি কর্মকর্তারা। সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক-বীমা, ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্র, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গুদাম-আড়ত, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, সরকারি কমার্স কলেজসহ অধিকাংশ স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদরাসা, হাসপাতাল, সড়ক অলিগলিতে জোয়ারে পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে করে ক্ষয়ক্ষতি কোটি কোটি টাকার। ইতোমধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন অনেকেই। অথচ চট্টগ্রাম শহর রক্ষা বাঁধ আজও অধরা।
আবহাওয়া-জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। যা উপক‚লজুড়ে ‘সাইলেন্ট দুর্যোগে’ রূপ নিয়েছে। অথচ যুগের প্রয়োজনে লাগসই প্রযুক্তিতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেই। মীরসরাই-সীতাকুন্ড-সোনাগাজীতে নির্মাণাধীন দেশের সর্ববৃহৎ শিল্পজোন ‘বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর’ থেকে চট্টগ্রাম মহানগরী, আনোয়ারা, বাঁশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া হয়ে কক্সবাজার উপকূলভাগ পর্যন্ত ‘সুপার ডাইক’ অর্থাৎ সুউচ্চ বেড়িবাঁধ-কাম-সড়ক নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। তবে এখনও তার বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়নি। নেদারল্যান্ডস ও বিশ্বের সমুদ্রবেষ্টিত বিভিন্ন দেশ আধুনিক হাইড্রোলজি প্রযুক্তির বেড়িবাঁধ, রিং-বাঁধ ও আঁড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণ করে সমুদ্র ও উপক‚লভাগে বিশাল আয়তনের ভূমি জাগিয়ে তুলছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সমুদ্রের করাল গ্রাসে অসহায়ভাবে প্রতিনিয়ত হারাচ্ছে ব্যাপক হারে মূল্যবান ভূমি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের দ্বীপাঞ্চল, চর ও উপকূলে ৩৫ শতাংশ স্থানে বেড়িবাঁধের চিহ্ন প্রায় মুছে গেছে। প্রায় ৫০ ভাগ বেড়িবাঁধ ক্ষত-বিক্ষত, কম-বেশি বিধ্বস্ত, জরাজীর্ণ, নড়বড়ে। বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও জোড়াতালির মেরামতের নামে নয়-ছয় করেই সারাবছর চলে যথেচ্ছ অনিয়ম-দুর্নীতি। এর পেছনে পাউবোর একশ্রেণির অসৎ প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী-ঠিকাদার মিলে সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে উঠেছে। ভাঙাচোরা বেড়িবাঁধ উপকূলবাসীর মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বেড়িবাঁধ সংস্কার, জোড়াতালি মেরামত কাজের মান নিয়ে উপযুক্ত তদারকি, যাচাই, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার বালাই নেই। মানসম্মত কাজ না হওয়ায় বেড়িবাঁধ টিকছে না। বালির বাঁধের মতোই বিলীন হয়ে যাচ্ছে সাগরের পেটে। বেড়িবাঁধ ধসে যায়, আসে নতুন কাজ। নামে মাত্র কাজ করেই বিলের মোটা অঙ্কের টাকা তুলে নিয়ে সটকে পড়ে ঠিকাদাররা।
তাছাড়া বেড়িবাঁধ যথেষ্ট উঁচু করে নির্মিত হয় না। সামুদ্রিক জোয়ারের সমান উঁচু করে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার না করায় জোয়ারের পানি বেড়িবাঁধ টপকে ফসলি জমি, লবণ মাঠ ও লোকালয় ভাসিয়ে দিচ্ছে। অনেক জায়গায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে বেড়িবাঁধ। নড়বড়ে বিধ্বস্ত অবস্থায় কোনোমতে টিকে আছে বেড়িবাঁধ। উপকূলীয় অনেক জনপদে বেড়িবাঁধ ব্যবহৃত হয় স্থানীয় যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে। কিন্তু বাঁধ ক্ষত-বিক্ষত থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় জিওব্যাগ তছনছ হয়ে গেছে সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে আনোয়ারা, বাঁশখালী, সীতাকুন্ড, স›দ্বীপ, পতেঙ্গা, কাট্টলী, হালিশহরে উপক‚লীয় বেড়িবাঁধের বর্তমানে নাজুকদশা। নিয়মিত জোয়ারে প্লাবিত হচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল শতাব্দীর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর, ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলা, ২০১৩ সালের ১৬ মে মহাসেন, ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই কোমেন, ২০১৬ সালের ২১ মে রোয়ানু, ২০১৭ সালের ৩০ মে মোরা, ২০১৯ সালের ৩ মে ফণি, ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর বুলবুল, ২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ও সর্বশেষ এ বছর ২৬ মে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। প্রতিবছর এক বা একাধিক ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় বেড়িবাঁধের ভাঙাচোরা অববাঠামো আরও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে করে উপক‚লবাসী জীবন-জীবিকা এবং মূল্যবান অবকাঠামো হুমকির মুখে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ সূত্র জানায়, ‘সুপার ডাইক’ অথবা অন্যান্য উন্নত হাইড্রোলজি প্রযুক্তির স্থায়ী বেড়িবাঁধ কাম সড়ক নির্মাণ এখন জরুরি। সেকেলে বেড়িবাঁধ টিকছে না। সমুদ্রবন্দর, পোতাশ্রয়, বিমানবন্দর, শিল্প-কারখানা, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদসহ অপার সম্ভাবনার ধারক উপকূল অরক্ষিত রয়ে গেছে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ভোলা, বরিশাল, খুলনা, বরগুনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরায় সাগরের সাথে লাগোয়া দ্বীপ ও চরাঞ্চল ক্রমেই লোনা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। লোনার আগ্রাসন বিস্তারের সাথে সাথে সর্বনাশ হচ্ছে ফল-ফসলি জমির। কৃষি-খামার, পর্যটন, বিনিয়োগ, শিল্পায়নসহ চর-উপকূল-দ্বীপাঞ্চল সুরক্ষা, উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান প্রসারের জন্য মজবুত টেকসই বাঁধের বিকল্প নেই। এরফলে উপক‚লীয় অঞ্চলের বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে উন্নত সমৃদ্ধ হবে দেশ।
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সভাপতি প্রবীণ অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক এলাকা আগ্রাবাদ, চাক্তাই খাতুনগঞ্জে জোয়ারের সমস্যার স্থায়ী সমাধান জরুরি। এর জন্য দীর্ঘদিনের নাগরিক দাবি চট্টগ্রাম শহর রক্ষা বাঁধ মজবুত এবং জোয়ারের তুলনায় যথেষ্ট উঁচু করে নির্মাণ করা প্রয়োজন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এ জে এম গোলাম রাব্বানী বলেন, উপক‚লে বাঁধের ভাঙনস্থলে বালুর বস্তা ও কংক্রিটের ব্লক ফেলে সমাধান হবে না। উপক‚ল সুরক্ষায় স্থায়ী সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। উন্নত ও নতুন প্রযুক্তির বেড়িবাঁধের কলাকৌশল কাজে লাগাতে হবে। এর জন্য পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ প্রয়োজন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল এবং সমুদ্রের জোয়ারের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চতার সুপার ডাইক, সড়কসহ বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। তবে বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকা চাই।
কক্সবাজার থেকে শামসুল হক শারেক জানান, সাগরে লঘুচাপের সপ্তাহব্যাপী ভারি বর্ষণে কক্সবাজারের নিম্নাঞ্চলে পানিবন্দি হয়েছে তিন লাখেরও বেশি মানুষ। জেলার দুই প্রধান নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরি নদীতে ঢলের পানির তোড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে ডুবে গেছে চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, ঈদগাঁও, কক্সবাজার সদরের বিস্তীর্ণ জনপদ। পানিবন্দি এসব মানুষের সুপেয় পানিও খাবারের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এদিকে বৃষ্টির পানিতে নতুন করে ডুবে গেছে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। বেড়িবাঁধ ভেঙে নাফ নদীর জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত একর চিংড়ি ঘের, ঘরবাড়ি ও রাস্তা ঘাট। মহেশখালীর ধলঘাটা, মাতারবাড়ি ও কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল এলাকায় ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে চলছে সাগরের লোনা পানির জোয়ার ভাটা। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের মতে বন্যায় প্রায় ৪৫টি ইউনিয়নের সাড়ে ৫ শত গ্রামের আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়েছে।
জানা গেছে, কক্সবাজার উপক‚লে টেকনাফ থেকে কুতুবদিয়া ও পেকুয়া পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপক‚লীয় বেড়িবাঁধ আছে ৫৯৫ কিমি.। আর পানি নিষ্কাশনের জন্য সøুইস গেট আছে ২৫৩টি। উপক‚লে প্রচুর সবুজ বন তৈরি হলেও বনদস্যুরা তা কেটে চিংড়ি ঘের করে। কয়েক শত সাইক্লোন শেল্টার পড়ে আছে অরক্ষিত। আর টেকসই বেড়িবাঁধ যেন অধরা স্বপ্ন। বেড়িবাঁধ নির্মাণ নিয়ে চলে আসছে লুটপাটের মহোৎসব।
কক্সবাজার কুতুবদিয়া থেকে হাছান কুতুবী জানান, দেশের সম্ভাবনাময় দ্বীপ-উপজেলা কুতুবদিয়া। এই দ্বীপরক্ষাবাঁধ নির্মাণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার অর্থ বরাদ্দ করে সরকার। কিন্তু আধুনিক ডিজাইনমতে কাজ না হওয়ায় টেকানো যাচ্ছে না কুতুবদিয়া রক্ষাবাঁধ। এতে করে প্রতি বর্ষায় অমাবস্যা-পূর্ণিমাসহ স্বাভাবিক জোয়ারেও সামুদ্রিক নোনা পানিতে সয়লাব হওয়ায় দ্বীপটির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। বঙ্গোপসাগরের অব্যাহত ভাঙনের মুখে দ্বীপটি দ্রæত ছোট হয়ে যাওয়াসহ সহায়-সম্পদের নিরাপত্তা না থাকায় প্রতি বছর কুতুবদিয়া ছাড়ছে অসংখ্য লোক। ষাটের দশকে কুতুবদিয়ার আয়তন ছিল ১২০ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে দ্বীপের আয়তন ৪০ বর্গকিলোমিটারে ঠেকেছে। দ্বীপের চতুর্দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ থাকলেও তার মধ্যে প্রায় ১৯ কিলোমিটার ভাঙা। ওই ভাঙা অংশ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে দ্বীপের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। ভাঙছে নতুন নতুন এলাকা। এতে দ্বীপের আয়তন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। কিন্তু দ্বীপটি রক্ষার স্থায়ী বেড়িবাঁধ নিয়ে কারও যেন মাথাব্যথা নেই। বর্তমানে বেড়িবাঁধ নির্মাণ-সংস্কার কাজে বরাদ্দকৃত ১২০ কোটি টাকার চলমান কাজেও ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
নোয়াখালী থেকে আনোয়ারুল হক আনোয়ার জানান, জেলার উপক‚লীয় ও দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। যে কোনো সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে আবারও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছে দ্বীপবাসী।