সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : পাকিস্তান শাসন (১৯৪৭-১৯৭১) ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাসকৃত ‘ভারত স্বাধীনতা আইন’ ভারতবর্ষকে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন ডোমিনিয়নে বিভক্ত করে। ব্রিটিশ আমলের বাংলা প্রদেশটি পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা নামের দুটি ভূখন্ডে বিভক্ত হয়। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের এবং পশ্চিম বাংলা ভারতের অংশ হয়। এভাবে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের অংশ হিসেবে ‘পূর্ব বাংলা’ নামক প্রদেশের জন্ম হয়। ১৯৫৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান রাখা হয়।
বাংলা বিভক্তির সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর ৫ আগস্ট খাজা নাজিমউদ্দীন ৭৫-৩৯ ভোটে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পরাজিত করে পূর্ব বাংলা আইন সভার সংসদীয় নেতা নির্বাচিত হন এবং পূর্ব বাংলার প্রথম মন্ত্রিসভা গঠন করেন (১৪-৮-১৯৪৭)। স্যার ফ্রেডারিক বোর্ন পূর্ব বাংলায় প্রথম গভর্নর নিযুক্ত হন। নাজিমউদ্দীনের মন্ত্রিসভায় সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যকেই গ্রহণ করা হয় নি যা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে সমঝোতার অভাব নির্দেশ করে।
১৯৪৮ এর সেপ্টেম্বরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হলে নাজিমউদ্দীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল এবং নূরুল আমীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। নূরুল আমীন ১৯৫৪ সালের ২ এপ্রিল পর্যন্ত পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। পূর্ব বাংলার জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি (১৯৫০) ও ভাষা আন্দোলন তাঁর আমলের উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের সময় ভাষার প্রশ্নটি যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে স্থান এবং নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৬ সালের পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করে। ভাষা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশের) রাজনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। ভাষা আন্দোলন থেকে এ ভূখন্ডে স্বাধিকারের চিন্তা-চেতনা শুরু হয়।
পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালের ৮ থেকে ১২ মার্চ। অমুসলমানদের জন্য আসন সংরক্ষণ করে পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থায় পূর্ব বাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদের আসন সংখ্যা নির্ধারিত হয় ৩০৯টি। এর মধ্যে ২৩৭টি (৯টি মহিলা আসনসহ) মুসলমান আসন, ৬৯টি হিন্দু আসন (৩টি মহিলা আসনসহ), ২টি বৌদ্ধ আসন এবং ১টি খ্রিস্টান আসন। ১৯৫৩ সালের ১ জানুয়ারি যাদের বয়স ২১ বছর পূর্ণ হয়েছিল তাদেরকে ভোটার করা হয়েছিল। মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১,৯৭,৩৯,০৮৬ জন। আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক-শ্রমিক পার্টি এবং নেজামে ইসলাম ২১ দফার ভিত্তিতে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করে। ২১ দফায় উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতিগুলি ছিল বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা, প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসন, শিক্ষা সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইন পরিষদকে কার্যকর করা ইত্যাদি।
নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলমান আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট লাভ করে ২১৫টি আসন, ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন। খেলাফতে রাববানী পার্টি ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা লাভ করে ১২টি আসন। পরে ৭ জন স্বতন্ত্র সদস্য যুক্তফ্রন্টে এবং ১জন মুসলিম লীগে যোগ দেন। মুসলিম লীগের পরাজয়ের পেছনে বহুবিধ কারণ ছিল। ১৯৪৭ এর পর থেকে দলটি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দলের অনেক ত্যাগী নেতা কর্মী দল থেকে বের হয়ে নতুন দল গঠন করেন। ১৯৪৭ থেকে ক্রমান্বয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে বহুমুখী বৈষম্যের সৃষ্টি হয় তার দায় দায়িত্বও কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারে অধিষ্ঠিত মুসলিম লীগকেই বহন করতে হয়। ১৯৪৭ থেকে ৫৪ পর্যন্ত সময়ে পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটে, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পায়। সর্বোপরি, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবির বিরোধিতা করে এবং ১৯৫২ সালের হত্যাকান্ড ঘটিয়ে মুসলিম লীগ বাংলার আপামর জনসাধারণকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব বাংলার জনগণ যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিয়ে প্রকারান্তরে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে জোরালো সমর্থন জানিয়েছিল। পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদে মুসলিম লীগের আসন হাতছাড়া হওয়ায় পাকিস্তান গণপরিষদে ওই দলের সদস্য সংখ্যা হ্রাস পায়। এর ফলে কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকার গঠন অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে যুক্তফ্রন্ট প্রাদেশিক সরকার গঠনের সুযোগ পায়। যুক্তফ্রন্ট প্রাপ্ত ২২২টি আসনের মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগের আসন সংখ্যা ছিল ১৪২, কৃষক-শ্রমিক পার্টির ৪৮, নেজামে ইসলামের ১৯ এবং গণতন্ত্রী দলের ১৩। যুক্তফ্রন্ট দলের প্রধান নেতা ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (আওয়ামী মুসলিম লীগ) এবং এ.কে ফজলুল হক (কৃষক-শ্রমিক পার্টি)। নির্বাচনে সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী অংশ গ্রহণ করেন নি এবং ফজলুল হককে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানান হয়। শুরুতেই মন্ত্রিপরিষদ গঠন নিয়ে মনোমালিন্য শুরু হয় এবং যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলির মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট হয়। অবশেষে ১৫ মে আওয়ামী মুসলিম লীগের সংগে ফজলুল হকের আপোস হয় এবং তিনি এ দলের ৫ জন সদস্যসহ ১৪ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। কিন্তু এ মন্ত্রিসভার আয়ু ছিল মাত্র ১৪ দিন। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী সাফল্য মুসলিম লীগ সরকার সুনজরে দেখে নি। তারা যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করার চক্রান্ত করতে থাকে। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন শিল্পকল-কারখানায় বাঙালি-অবাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়। এতে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় ব্যর্থ বলে দোষারোপ করা হয়। নিউইয়র্ক টাইমস-এর সংবাদদাতা জন পি. কালাহান ফজলুল হকের এক সাক্ষাৎকার বিকৃত করে প্রকাশ করেন যে, তিনি পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা চান। এতে শাসকগোষ্ঠী তাঁকে দেশোদ্রোহী ঘোষণা করে। অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকার ২৯ মে (১৯৫৪) যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙ্গে দিয়ে পূর্ব বাংলায় গভর্নরের শাসন জারি করে যা ১৯৫৫ সালের ২ জুন পর্যন্ত বহাল থাকে।
ফজলুল হককে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে পদচ্যুত করার ২ মাসের মধ্যে তাঁকে কেন্দ্রীয় সরকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে ফজলুল হক পূর্ব বাংলায় তাঁর দলকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। স্বভাবতই যুক্তফ্রন্ট ভেঙ্গে যায়। যুক্তফ্রন্টভুক্ত মুসলমান সদস্যবৃন্দ দুধারায় বিভক্ত হন। আওয়ামী মুসলিম লীগের ধারাটি ধর্ম নিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ গ্রহণ করে। এ সময় (১৯৫৫) আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। অপর পক্ষে ফজলুল হকের জোট রক্ষণশীল ধারার রাজনীতি গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকারের নিকট তাঁদেরকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। ফজলুল হকের প্রচেষ্টায় ১৯৫৫ সালের ৩ জুন কৃষক-শ্রমিক পার্টির আবু হোসেন সরকার পূর্ব বাংলায় মন্ত্রিসভা গঠনের আমন্ত্রণ পান। নবনিযুক্ত এ মন্ত্রিসভার প্রতি প্রাদেশিক পরিষদের অধিকাংশ সদস্যের আস্থা আছে কিনা, তা প্রমাণ করার জন্য প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন আহবান সংক্রান্ত আওয়ামী লীগ এর দাবি অগ্রাহ্য করা হয়। এমনকি পরবর্তী আট মাসেও আইন পরিষদের কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয় নি।
১৯৫৬ সালের ৫ মার্চ ফজলুল হক পূর্ব বাংলার গভর্নর নিযুক্ত হলে প্রদেশে তাঁর দলের অবস্থান দৃঢ় হয়। গভর্নর নিযুক্ত হওয়ার আড়াই মাস পর ফজলুল হক আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশন ডাকেন। কিন্তু বাজেট পাস করাতে ব্যর্থ হলে তাঁর দলীয় মন্ত্রিসভার পতন হবে এ আশঙ্কায় তিনি ২৪ মে আইনসভার অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করেন। সাত দিন পরেই এ আদেশ প্রত্যাহার করে আবু হোসেন সরকারের পূর্ববর্তী মন্ত্রিসভা বহাল করা হয়। এবারও মন্ত্রিসভাকে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের নির্দেশ দেওয়া হয় নি। এভাবে পূর্ব বাংলার কৃষক-শ্রমিক পার্টির কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা অসাংবিধানিক পন্থায় ৩০ আগস্ট ১৯৫৬ পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে। ফজলুল হকের গভর্নর পদ লাভ এবং পূর্ব বাংলায় তাঁর দলের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাখার বিনিময়ে তিনি কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকারকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দেন এবং তা রক্ষা করেন। প্রতিশ্রুতি দুটি ছিল প্রথমত গণপরিষদে উত্থাপিত খসড়া সংবিধান তাঁর দল সমর্থন করবে, দ্বিতীয়ত আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও যৌথ নির্বাচনী ব্যবস্থা সমর্থন করবে না।
কৃষক-শ্রমিক পার্টি যৌথ নির্বাচনী ব্যবস্থার বিরোধিতা করায় পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের সংখ্যালঘু সদস্যবৃন্দ কৃষক-শ্রমিক পার্টির সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন এবং আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন। ১৯৫৬ সালের আগস্ট মাসে প্রাদেশিক আইন পরিষদের অধিবেশন আহবান করা হয়। কিন্তু অধিবেশন শুরুর কয়েক ঘন্টা পূর্বে মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শে গভর্নর অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। ৩০ আগস্ট (১৯৫৬) আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রিসভার পতন ঘটে এবং তদস্থলে ৬ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু ও বামদলগুলির কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। এ মন্ত্রীসভার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান খান। ১২ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও রিপাবলিকান পার্টির কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে তেরো মাস (১২-৯-৫৬ থেকে ১৮-১০-৫৭) এবং পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় আঠারো মাস (৬-৯-৫৬ থেকে ৩১-৩-৫৮)।
একই সঙ্গে কেন্দ্রে ও প্রদেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার সুবাদে পূর্ব পাকিস্তানে অনেক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ সরকারের উল্লেখযোগ্য কাজগুলি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে পাওয়ার স্টেশন নির্মাণ, জুট ট্রেডিং কর্পোরেশন গঠন, ফেঞ্চুগঞ্জে সার কারখানা স্থাপন, সাভারে ডেয়ারি ফার্ম প্রতিষ্ঠা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ সুবিধার জন্য ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (ওয়াপদা) গঠন, ঢাকা শহরের উন্নয়নের জন্য ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডি.আই.টি) প্রতিষ্ঠা এবং ‘গ্রেটার ঢাকা সিটি মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন, ঢাকার প্রথম চলচ্চিত্র স্টুডিও ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (এফ.ডি.সি) প্রতিষ্ঠা, ঢাকার রমনা পার্ক গড়ে তোলা, ময়মনসিংহে পশু চিকিৎসা কলেজ স্থাপন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ঢাকা-আরিচা, নগরবাড়ি-রাজশাহী এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগ সড়ক নির্মাণ, প্রদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্ল্যানিং বোর্ড গঠন এবং তিন বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা (১৯৫৭-৬০) প্রণয়ন। আওয়ামী লীগ সরকার ২১ ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে।
মওলানা ভাসানী ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করলে আওয়ামী লীগ থেকে ২৮ জন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য পদত্যাগ করে ন্যাপে যোগদান করেন এবং আওয়ামী লীগ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে কৃষক-শ্রমিক পার্টিকে সমর্থন দেন। কিছু সংখ্যালঘু সদস্যও আওয়ামী লীগ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেন। এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রাদেশিক আইন পরিষদের আসন্ন বাজেট অধিবেশনে বাজেট পাস করা অসম্ভব হয়ে পড়লে সরকার গভর্নরকে বাজেট অধিবেশন কিছুদিন স্থগিত রাখতে অনুরোধ করে। কিন্তু ফজলুল হক মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেন (৩১-৩-৫৮) এবং আবু হোসেন সরকারকে মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। এসময় কেন্দ্রে ফিরোজ খান নুনের রিপাবলিকান পার্টির মন্ত্রিসভা আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে টিকে ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় সরকার গভর্নর পদ থেকে ফজলুল হককে বরখাস্ত করে (১-৪-৫৮) এবং পূর্ব বাংলার চিফ সেক্রেটারিকে অস্থায়ী গভর্নরের দায়িত্ব দেয়। নতুন গভর্নর আওয়ামী লীগ সরকারকে পুনর্বহাল করেন (১-৪-৫৮)। আস্থাভোটে সরকার ১৮২-১১৭ ভোটে জয়লাভ করে। কিন্তু এর দেড় মাস পর (১৮-৬-৫৮) সরকার খাদ্য পরিস্থিতির ওপর এক ভোটাভুটিতে হেরে যায়, ফলে ১৯ জুন ১৯৫৮ তারিখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং ২০ জুন আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বাধীন কৃষক-শ্রমিক পার্টি সরকার গঠন করে। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ ন্যাপের সমর্থন নিয়ে আইন পরিষদে আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রিসভাকে অনাস্থা ভোটে (১৫৬-১৪২) পরাজিত করে (২৩-৬-৫৮)। কিন্তু তখন আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ না জানিয়ে কেন্দ্রের শাসন জারি করা হয় (২৫-৬-৫৮)। এর দুমাস পর (২৫-৮-৫৮) আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠিত হয়।
এভাবে ১৯৫৪ সালের মার্চ মাস থেকে ১৯৫৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে সাতটি মন্ত্রিসভা গঠিত হয় ও তিনবার গভর্নরের শাসন চালু হয়। অবশেষে সেপ্টেম্বর মাসের ২৩ তারিখে আইন পরিষদে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির উদ্ভব হয় এবং ডেপুটি স্পিকার জনাব শাহেদ আলী একদল বিক্ষুব্ধ পরিষদ সদস্য কর্তৃক আঘাত প্রাপ্ত হয়ে ২৫ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করা হয়।
পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি হলে ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারগুলি বরখাস্ত, জাতীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদসমূহ অবলুপ্ত, সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত এবং মৌলিক অধিকারসমূহ স্থগিত করা হয়। ২৭ অক্টোবর আইয়ুব খান ইসকান্দার মির্জাকে অপসারিত করে সর্বময় ক্ষমতা নিজ হাতে গ্রহণ করেন। এভাবে পাকিস্তানে সংসদীয় গণতন্ত্রের অপমৃত্যু ঘটে। সামরিক আইন জারির পর পরই আইয়ুব খান রাজনীতিবিদ, উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, ধনী ব্যবসায়ী, সাবেক কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রী, জাতীয় ও আইন পরিষদের সদস্য প্রমুখের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আনেন। তিনি ১৯৫৯ সালের ৭ অক্টোবর Election Bodies Disqualification Order, 1959 (EBDO) এবং Public Offices Disqualification Order (PODO) নামে দুটি আদেশ জারি করেন। EBDO-এর আওতায় পূর্ব পাকিস্তানের ৩,৯৭৮ জন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ৩,০০০ জন রাজনীতিবিদ রাজনীতি করার অধিকার হারিয়ে ছিলেন। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের ১৩ জন, ফরেন সার্ভিসের ৩ জন, পুলিশ সার্ভিসের ১৫ জন ও প্রাদেশিক সার্ভিসের ১৬৬২ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত কিংবা বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। PODO-র আওতায় যেসকল সংবাদপত্রে প্রদেশের স্বায়ত্তশাসন ও অধিকারের কথা লেখা হতো (যেমন ইত্তেফাক, সংবাদ ও পাকিস্তান অবজারভার) সেগুলিকে কালো তালিকাভুক্ত করে সরকারি-আধাসরকারি বিজ্ঞাপন থেকে বঞ্চিত করা হয়।
আইয়ুব খানের স্বৈরতান্ত্রিক সামরিক শাসনামলের অভিনব সৃষ্টি হচেছ মৌলিক গণতন্ত্র। ১৯৫৯ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রণীত মৌলিক গণতন্ত্র্র ছিল চার স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ছাড়াও মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবন্থায় আইয়ুব খান গ্রাম পর্যন্ত সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৪০,০০০ করে মোট ৮০,০০০ মৌলিক গণতন্ত্রীকে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়, যারা Electoral College হিসেবে প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচনের এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটারে পরিণত হন। এভাবে জনগণ প্রেসিডেন্ট ও আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচনে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, জাতীয় রাজনীতিতে রাজনৈতিক দল ও জনগণের ভূমিকা গৌণ হয়ে যায় এবং সীমিতসংখ্যক মৌলিক গণতন্ত্রীর উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তার সহজ হয়। ১৯৬০ সালের ১১ জানুয়ারি সারাদেশে মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আইয়ুব খান ১৩ জানুয়ারি (১৯৬০) Presidential Election and Constitutional Order, 1960 জারি করেন এবং এ অধ্যাদেশ বলে ১৪ ফেব্রুয়ারি (১৯৬০) হ্যাঁ - না ভোটের মাধ্যমে পাঁচ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং সংবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা লাভ করেন। ১৯৬২ সালের ১ মার্চ সংবিধান ঘোষণা করা হয় এবং তা ৮ জুন থেকে কার্যকর হয়। মৌলিক গণতন্ত্রীগণ ১ মার্চ থেকে ৮ জুনের মধ্যে দেশের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যও নির্বাচিত করেন। ৮ জুন সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়।
১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করা হলে প্রতিবাদে ছাত্ররা ১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট ডাকে ও রাস্তায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে। ধর্মঘট একনাগাড়ে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে। এভাবে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। ১৯৬২ সালের ১ মার্চ আইয়ুব খান সংবিধান ঘোষণা করা মাত্র পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজ বিক্ষোভ-সমাবেশ ও ক্লাস বর্জন করে। ১৯৬২-এর সেপ্টেম্বরে আরেকটি আন্দোলন হয়, যা ‘বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন’ নামে অভিহিত। শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। ১৫ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর হরতাল পালনকালে পুলিশের গুলিতে বাবুল, গোলাম মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ প্রমুখ নিহত হন এবং আহত হয় প্রায় আড়াইশ জন। এ আন্দোলনের ফলে সরকার শরীফ কমিশনের সুপারিশ স্থগিত রাখে। এ আন্দোলনের গুরুত্ব এ যে, এ সময় থেকে ছাত্ররাই আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত ছাত্র সম্প্রদায় প্রতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর ‘শিক্ষা দিবস’ রূপে পালন করে আসছে।
১৯৬২ সালের ৮ জুন সামরিক আইন তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিবিদগণ দলীয় রাজনীতি করার অধিকার ফিরে পান। সোহরাওয়ার্দী সকল দলের সমন্বয়ে আইয়ুব বিরোধী একটি ফ্রন্ট গঠনের আহবান জানান। তার উদ্যোগে এবং নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, কাউন্সিল মুসলিম লীগ ও নূরুল আমিনের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের অংশ মিলে ৪ অক্টোবর (১৯৬২) ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট বা এন.ডি.এফ নামে একটি ফ্রন্ট গঠিত হয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও সংবিধানের গণতন্ত্রীকরণের আন্দোলন গড়ে তোলা ছিল এ ফ্রন্ট গঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ফ্রন্ট গঠনের পিছনে সোহরাওয়ার্দীর আরেকটি কৌশল কাজ করেছিল। এবডো আইনে সাজাপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদের জন্য রাজনীতি করা নিষিদ্ধ থাকলেও ফ্রন্টের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ায় কোনো বাধা ছিল না। তাই তিনি ফ্রন্ট গঠনকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। খুব শীঘ্র ফ্রন্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
১৯৬৩ এর ডিসেম্বরে সোহরাওয়ার্দী ইন্তেকাল করার পরবর্তী মাসেই (২৫ জানুয়ারি ১৯৬৪) আওয়ামী লীগ পৃথকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। ইতঃপূর্বে ন্যাপ, জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি দল আত্মপ্রকাশ করে। ফলে এন.ডি.এফ দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ১৯৬৫ সালের ২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুবের বিরুদ্ধে একক প্রার্থী দেওয়ার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কাউন্সিল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি দল মিলে Combined Opposition Party (COP) নামক একটি জোট গঠন করে। COP মিস ফাতিমা জিন্নাহকে (মুহম্মদ আলী জিন্নাহর ভগ্নী) প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটার ছিলেন ৮০,০০০ মৌলিক গণতন্ত্রী। আইয়ুব খান ওই সব গণতন্ত্রীদের বশীভূত করেন। নির্বাচনে জনগণের মধ্যে মিস জিন্নাহর পক্ষে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষ করা গেলেও নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায় যে, আইয়ুব খান যেখানে ৪৯,৯৫১ ভোট পান, সেখানে মিস ফাতিমা পান মাত্র ২৮,৯৬১। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন। এ সব নির্বাচনে কনভেনশন মুসলিম লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করে যে, মৌলিক গণতন্ত্র যতদিন থাকবে ততদিন আইয়ুব খানকে অপসারণ করা সম্ভব হবে না।
আইয়ুব খানের পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলিক গণতন্ত্রীগণ একটি বিশেষ স্বার্থ ও সুবিধাভোগী শ্রেণীতে পরিণত হয়ে পড়ে। সুতরাং মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থা বাতিল করার দাবি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ইস্যু হয়। পূর্ব পাকিস্তানে প্রত্যক্ষ ভোটের দাবি উচ্চারিত হয়। নির্বাচনী ফলাফল থেকে সৃষ্ট পূর্ব পাকিস্তানীদের ক্ষোভ কমতে না কমতেই শুরু হয় ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরের পাক-ভারত যুদ্ধ। এ যুদ্ধের সময় এটা স্পষ্ট হয় যে, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় ছিল না। এমনকি উক্ত যুদ্ধের সতেরো দিন প্রশাসনিক দিক দিয়েও এ প্রদেশ কেন্দ্র থেকে সম্পূর্ণ বিচিছন্ন হয়ে পড়েছিল। অতএব ১৬শ কিমি ব্যবধানে অবস্থিত দুটি প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তান যে একটা অস্বাভাবিক রাষ্ট্র ছিল তা আরেক বার প্রমাণিত হলো। ইতোমধ্যে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানের সচেতন মহলকে বিক্ষুদ্ধ করে তোলে।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর আমলাগণ ছিলেন প্রশাসনের সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। আমলাদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব ছিল নগণ্য। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ৪২,০০০ কর্মকর্তার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানিদের সংখ্যা ছিল ২,৯০০। করাচিতে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করা হলে সেখানকার সকল অফিস-আদালতে পশ্চিম পাকিস্তানিরাই একচেটিয়া চাকরি লাভ করে। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বাঙালিদের পক্ষে সেখানে গিয়ে ইন্টারভিউ দিয়ে চাকুরি লাভ করা সম্ভব ছিল না। উপরন্তু ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি না দেওয়ায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বাঙালি ছাত্রদের সাফল্যলাভ সহজ ছিল না। এমতাবস্থায় প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য দিন দিন বাড়তেই থাকে। ১৯৬৬ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানি গেজেটেড কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১,৩৩৮ ও ৩,৭০৮ জন এবং নন-গেজেটেড কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২৬,৩১০ ও ৮২,৯৪৪ জন। ১৯৬২ সালে ফরেন সার্ভিসে পূর্ব পাকিস্তানিদের অবস্থান ছিল ২০.৮%; ১৯৬৮ সালে প্রতিরক্ষা সার্ভিসের অফিসারের ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে অনুপাত ছিল ১০ : ৯০। শিক্ষাক্ষেত্রে লক্ষ করা যায় যে, ১৯৪৮-৫৫ সময়কালে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষেত্রে যেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৫৩০ কোটি টাকা, সেখানে পূর্ব পাকিস্তানকে দেওয়া হয় মাত্র ২৪০ কোটি টাকা (১৩.৫%)। ১৯৪৭-৫৫ সময়কালে কেন্দ্রীয় সরকারের মোট ব্যয়ের মাত্র ১০% ব্যয় হয় পূর্ব পাকিস্তানে। একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে যেখানে উন্নয়ন খাতে খরচ হয় ১৪৯৬.২ মিলিয়ন টাকা, সেক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নে খরচ করা হয় মাত্র ৫১৪.৭ মিলিয়ন টাকা। পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানে পর্যায়ক্রমে তিনটি রাজধানী শহর (করাচি, রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদ) নির্মাণ করা হয়। কেবল করাচিকে রাজধানী শহর হিসেবে গড়ে তুলতে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ব্যয় হয় ৫,৭০০ মিলিয়ন টাকা, যা উক্ত সময়কালে পাকিস্তান সরকারের মোট ব্যয়ের ৫৬.৪%, যে সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে মোট সরকারি ব্যয়ের হার ছিল মাত্র ৫.১০%। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ইসলামাবাদের উন্নয়নের জন্য ৩,০০০ মিলিয়ন টাকা ব্যয় করা হলেও ঢাকার উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হয় মাত্র ২৫০ মিলিয়ন টাকা। পশ্চিম পাকিস্তানে রাজধানী ও সামরিক-বেসামরিক বিভাগসমূহের প্রধান কার্যালয় অবস্থিত হওয়ায় চাকুরির সুবিধা ছাড়াও বিভিন্ন ভবন নির্মাণ, আসবাবপত্র ক্রয়, স্টাফদের বাসাবাড়ি নির্মাণ প্রভৃতিতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয় এবং নির্মাণ ও সরবরাহ ক্ষেত্রে যে কর্মসুযোগ সৃষ্টি হয় তার একচেটিয়া সুবিধা পায় পশ্চিম পাকিস্তানিরা।
এভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৃষ্ট বৈষম্য, নির্বাচনে প্রাপ্য ফলাফল লাভে ব্যর্থতা, পূর্ব পাকিস্তানের অরক্ষিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইত্যাদি কারণে পূর্ব পাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরদার হয়। পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলসমূহের নেতৃবৃন্দের এক কনভেনশনে ছয়দফা কর্মসূচিউপস্থাপন করলে উপস্থিত ৭৪০ জন সদস্যের মধ্যে ৭৩৫ জনই তাৎক্ষণিকভাবে তা নাকচ করে দেন। এর প্রতিবাদে শেখ মুজিব সম্মেলন স্থান ত্যাগ করে ঢাকায় ফিরে আসেন। লাহোরে শেখ মুজিব যে ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করবেন সে বিষয়ে দলের কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। ১৩ মার্চ আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয় দফা কর্মসূচি অনুমোদন করা হয়।
শেখ মুজিবসহ দলের অন্য নেতৃবৃন্দ সারাদেশ জুড়ে ছয় দফার প্রচার শুরু করেন। ছয় দফার পক্ষে অভাবনীয় জনমত সৃষ্টি হয় এবং এতে আতঙ্কিত শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের ধর পাকড় শুরু করে। ৮ মে (১৯৬৬) শেখ মুজিব দেশরক্ষা আইনে গ্রেফতার হন। প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ৭ জুন (১৯৬৬) গোটা প্রদেশে হরতাল পালন করে।