সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: ভারতীয় আধিপত্যবাদী ন্যারেটিভের রাজনীতির আওতায় দেড় দশকের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের সবচেয়ে বড় সামাজিক-রাজনৈতিক ও মনোস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়েছিল এ দেশের যুব সমাজের উপর। সাধারণত যুব সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকায় সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের রূপান্তর ঘটে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী দু:শাসনের বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি গণবিধ্বংসী, ভয়ঙ্কর ও অপরিনামদর্শী। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে বহুমত ও পথের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ধারাকে সঙ্কুচিত করে তোলা হয়েছিল। গণতন্ত্রের পক্ষে যে কোনো প্রতিক্রিয়া কিংবা সম্ভাব্য আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল টার্গেট ছিল মুসলমানদের ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট এবং প্রগতিশীল যুব সমাজ। টার্গেট কিলিং, গুম-খুন, আয়নাঘর ও সিস্টেমেটিক ক্র্যাক-ডাউনের স্বীকার হওয়াদের বেশিরভাগই ছিল যুব সমাজের সদস্য। বিতর্কিত ট্রাইবুনালের ক্যাঙ্গারু কোর্টের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করে ফ্যাসিবাদ কায়েমে পথের কাঁটা দূর করতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রযোজনায় শাহবাগে তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চস্থ করে এ দেশের যুব সমাজের একটি অংশকে রাষ্ট্রীয় মদতে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। তবে গণজাগরণ মঞ্চের পাল্টায় হেফাজতে ইসলামের আহ্বানে যুব সমাজের অভাবনীয় প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শাহাবাগি গণজারণ মঞ্চের ফানুস কর্পূরের মত উবে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ বন্ধ করে ব্ল্যাক-আউটের মধ্যে শাপলা চত্বরে লাখো মানুষের শান্তিপূর্ণ অবস্থানের উপর লক্ষ লক্ষ লাইভ বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার সেল ও বুলডোজার চালিয়ে ২০১৩ সালের মে মাসে গণহত্যার পরও বাংলাদেশের যুব সমাজের প্রতিবাদী উত্থান ঠেকাতে পারেনি ফ্যাসিবাদি সরকার। সমাজের মূল ধারার মানুষের ধর্মীয়-রাজনৈতিক চেতনার তুমুল উত্থানের তোড়ে শাহবাগের কৃত্রিম গণজাগরণের ভুত রাতারাতি অনেকটা অন্ধকারের হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। আঠারো সালে ছাত্র সমাজের কোটাবিরোধী আন্দোলন কিংবা চব্বিশের জুলাইয়ে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের অনেক আগেই গণজাগরণ মঞ্চের ইমরান এইচ সরকাররা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। তাদের উপর ভর করে ভারতীয় মদতে হাসিনা তার ফ্যাসিবাদি ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে বসলেও গণজাগরণ মঞ্চের পরিচালকসহ তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গ অনুসারিদের আর কোথাও দেখা যায়নি। লাখ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা, গুম-খুন, আয়নাঘরের নির্যাতন অব্যাহত থাকলেও বিরোধী দলের অভ্যন্তরে পেইড-এজেন্ট ও দালাল সৃষ্টি করে সরকার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন ও ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে বার বার ক্ষমতার মেয়াদ নবায়নের ধারা সূচারুরূপে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
বৃটিশ উপনিবেশোত্তর রাজনৈতিক ঘটনাক্রমের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই এ জাতির উত্তরণ ও বির্বতনের সূতিকাগার। ভারতীয় আধিপত্যবাদ প্রভাবিত সরকার ও দলীয় রাজনীতি প্রথমেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লেখাপড়া ও গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশকে কলুষিত করে তোলে। বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের খেতাব ধরে রাখতে সক্ষম হলেও একাত্তরের স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ প্রভাবিত অপরাজনীতির প্রথম টার্গেট হয়ে দাঁড়ায় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু দেশি-বিদেশি লেখক ও স্কলারদের বই ও গবেষণা কর্মেরই চর্চা হয়না; সেখানে গণতান্ত্রিক রাজনীতি, দর্শন, বহুমত ও পথের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সমকালীন সমস্যা-সংকট নিয়ে ডিবেটসহ জনমত গড়ে তোলা হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্ভাবনী প্রতিভা নতুন নতুন প্রযুক্তি ও এন্ট্রেপ্রেনারশিপের বিকাশ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু গত ৫৪ বছরে আমাদের আলোর প্রদীপ গর্বের একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘ডাকাতদের গ্রাম’ ও রক্তাক্ত সন্ত্রাসের ক্যাম্পাসে পরিনত করা হয়। তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে পরিবার ও সমাজের স্বপ্ন পুরণের প্রত্যয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপর শুরু হতো অমানবিক নির্যাতন ও ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। ছাত্রলীগ নামের জম্বি ছাত্র সংগঠনের ভয়ঙ্কর ছাত্রনেতারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আবাসিক হলগুলোকে নিজেদের জমিদারির খাস তালুকে পরিনত করেছিল। সেখানে মাদকের হাট-বাজার, গাঁজার চাষাবাদ, ধর্ষনের সেঞ্চুরি উদযাপন, গেস্টরুমে টর্চার সেল, টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজির সন্ত্রাসের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাফিয়া গ্যাংয়ে পরিনত করার সিস্টেমেটিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা হতো। একচেটিয়া অথবা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সন্ত্রাসকবলিত অপরাজনীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখ লাখ শিক্ষার্থী কয়েক বছরের সেশন জটের সম্মুখীন হয়ে জীবনের মূল্যবান কয়েক বছরের অপচয় শেষে পাস করে বের হয়ে হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হয় দেশের অধিকাংশ উচ্চশিক্ষিত যুবক। এরপর শুরু হয় চরম গ্লানিকর এক নতুন যুদ্ধ। দেশের তৈরী পোশাক খাত, ওষুধ শিল্প, আইটি সেক্টরের মত শ্রমঘন ও কর্মসংস্থান বান্ধব সেক্টরগুলোকে ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান ও চীনাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে দেশের শিক্ষিত যুবকদের চাকরির সুযোগ সঙ্কুচিত করে তোলা হয়েছে। দেশে উপযুক্ত চাকরি বা কর্মসংস্থান না পেয়ে যুবকরা বিদেশে গিয়ে পরিবারের স্বপ্ন পুরণের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির বিশ্বে লাখ লাখ শিক্ষিত যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ কোথাও নেই। আমাদের তরুণরা মধ্যপ্রাচ্যে ঘাম ঝরানো শ্রম দিয়ে, ইউরোপ-আমেরিকায় অডজব করে দেশের জন্য যে রেমিটেন্স পাঠায়, তার একটা বড় অংশই রেজিস্ট্রেশন, টেক্সেশন, হিসাব-নিকাশ ও জবাবদিহিতার বাইরে থাকা ভারতীয় অবৈধ কর্মীরা নিয়ে যায়। পতিত ফ্যাসিস্ট রিজিম উন্নয়নের নামাবলির জিগির তুললেও দেশের লাখ লাখ তরুন যে কোনো উপায়ে দেশ ছাড়তে মরিয়া হয়ে পড়েছিল। সিরিয়া, লিবিয়া, আফগানিস্তানের মত যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের নাগরিকরা যখন প্রাণ বাঁচাতে অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগরে নৌকা ভাসিয়ে ইউরোপে আশ্রয়ের জন্য ছুটছে, তখন মাঝে মধ্যেই নৌকা ডুবে শত শত পরিযায়ী অভিবাসির করুণ মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। সে সব মর্মান্তিক খবরের শিরোনামে প্রায়শ উঠে আসে বাংলাদেশিদের ছবি।
জুলাই বিপ্লবের আগ পর্যন্ত এই হচ্ছে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও মধ্যবিত্ত যুব সমাজের চরম বাস্তবতা। যুব সমাজের উদ্ভাবনী প্রতিভা, শ্রমসাধনা, ত্যাগী ও সংগ্রামি ভূমিকাই একটি রাষ্ট্র ও সমাজের এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে মোক্ষম ও কার্যকর শক্তি। বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার বিমর্ষ, আশাহত ও পলায়নপুর যুব সমাজ নিয়ে রাষ্ট্র তার অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনা। আওয়ামী দু:শাসনে ও দুবৃর্ত্তায়নে আমাদের যুব সমাজ রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তারা রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে প্রবল রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়েছিল। ষাট, সত্তুর ও আশির দশক পর্যন্ত যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্র সংসদের নির্বাচন ও নেতৃত্ব গ্রহণের সুযোগ পেয়েছিল, তারাই পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভারতীয় আধিপত্যবাদী নীল নকশার রাজনীতি ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদী দু:শাসন গত তিন দশক ধরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার পরিবেশই শুধু নষ্ট করেনি, সেই সাথে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারার ছাত্র রাজনীতি চর্চার পথও রুদ্ধ করে দিয়েছিল। আমাদের জনগোষ্ঠির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশই হচ্ছে যুব-তরুন সমাজ। এ সমাজ যখন রাজনীতি বিমুখ হয়ে রাজনীতিকে ঘৃণা করতে শুরু করার পাশাপাশি হতাশ হয়ে দেশের সবকিছুকেই অবজ্ঞা ও অগ্রাহ্য করে বিদেশে পাড়ি জমানোর ধান্দায় ছুটতে থাকে, তখন জাতির সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা জাগানিয়া আশাপ্রদ আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। একটি জাতিকে ভেতর থেকে দুর্বল ও নি:শেষ করে দেয়ার এটাই মোক্ষম অস্ত্র। বাংলাদেশের পরজীবী, দুর্বৃত্তায়িত ফ্যাসিস্ট রেজিম দেড় দশক ধরে একাজটিই করেছে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে বিদেশি প্রভুদের ক্রীড়নক দুর্বল রাজনৈতিক পরজীবীরা কখনোই রাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা ও সক্ষমতাকে দাবিয়ে রাখার শক্তি রাখেনা। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান যেন সেই ধ্বংসস্তুপ ও হতাশার অন্ধকার থেকে জেগে ওঠা আবাবিল কিংবা ফিনিক্স পাখির পুনরুত্থানের নতুন ইতিহাস। জন্মের পর থেকেই পাঠ্য বইয়ে, গণমাধ্যমে, রাজনীতির মাঠে, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক ব্যক্তি ও একটি পরিবারকে ঘিরে গড়ে তোলার পলিটিক্যাল মিথ ও মিথ্যা ন্যারেটিভ শুনতে শুনতে এই প্রজন্ম সেই রাজনীতি ও গল্পের অনুবর্তী হয়ে পরার কথা। যেখানে মূল ধারার রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা দেড় দশকে কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম সফল করতে ব্যর্থ হয়ে কোনঠাসা হয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা পরিত্যাগ করতে শুরু করেছিল; ঠিক তখনই অরাজনৈতিক মোড়কে ছাত্র সমাজের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সৈনিকরা নিজেদের জীবন ও রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদি রেজিমের বিরুদ্ধে এক দু:সাহসী ও দুর্ভেদ্য প্রতিরোধের মুখে রক্তপিপাসু স্বৈরাচারকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। প্রবল নিপীড়নের মুখেও বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে এমন একটি প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ৫ আগস্টে দেশ নতুন স্বাধীনতা লাভের পর বিএনপি-জামায়াতের নেতারা নিজেদের মুক্তি ও নতুন স্বাধীনতার জন্য জুলাই অভ্যুত্থানের তরুনদের অবদানের কথা আবেগি কণ্ঠে স্বীকার করেছিলেন।
রাজনীতি বিমুখ, হতাশ, ডিজিটাল গেজেটে আসক্ত জেন-জি প্রজন্ম মৃত্যুর ভয় উপেক্ষা করে জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিল। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকেই সেই প্রজন্মকে ডিমোরাল করার নানাবিধ উপায়-উপকরণ সক্রিয় রয়েছে। একদিকে পতিত রেখে যাওয়া মুখোশধারি ও ছদ্মবেশি দালাল ও দোসররা। অন্যদিকে ক্ষমতার মোহে অন্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর চাঁদাবাজ-দুর্বৃত্তায়িত অংশের টার্গেটে পরিনত হয়েছে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশিত রাজনৈতিক বন্দোবস্তের রূপরেখা। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। তার মানে হচ্ছে অস্ত্র দিয়ে কিংবা রক্ত দিয়ে যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন করা গেলেও স্বাধীনতার লক্ষ বাস্তবায়নে আরো সুদৃঢ় ও সুদীর্ঘ কর্মপন্থা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের প্রয়োজন হয়। জেন-জি প্রজন্ম দেশকে আধিপত্যবাদী শক্তির ক্রীড়নক রেজিমের কবল থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হলেও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া ও বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল দায়িত্ব বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো পরিবর্তনের প্রত্যাশা অনুসারে রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রে জুলাই অভ্যুত্থানের অংশীদার যুব সমাজের প্রত্যাশা পুরনের পাশাপাশি রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণের পথকে সহজ ও উন্মুক্ত করে দেয়াই ছিল প্রত্যাশিত। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর টানপোড়েন, রশিটানাটানি, ব্লেইমগেম, অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারের অস্তিত্ব ও সংস্কারের প্রশ্নে গণভোটের ম্যান্ডেট নানা টালবাহানা ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীতা মনোনয়নে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ বহন করছে না। বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিমের রাবারস্ট্যাম্প সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ছিল রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত, মুনাফাবাজ ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ সামরিক-বেসামরিক সাবেক আমলা ও চিহ্নিত লুটেরা অলিগার্ক। জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ অনুসারে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষত বিএনপি যে সব প্রার্থীদের নাম ইতিমধ্যে প্রকাশ করেছে, তাতে নতুনত্বের কিছু নেই। বিএনপির মত জনপ্রিয় ও জনবান্ধব রাজনৈতিক দলে প্রতিটি আসনে একাধিক (৫-১০জন) সুশিক্ষিত ও সুযোগ্য প্রার্থী বাছাই করে মনোনয়ন দেয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু তারা এবারো আগের মতই গতানুগতিক ও পুরনো রাজনৈতিক বৃত্তের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেনি। অন্যদলগুলোর মধ্যেও ব্যতিক্রমী কিছু দেখা যায়নি। এনসিপি কিছুটা ব্যতিক্রমী অবস্থান গ্রহণ করলেও বড় দলগুলোর প্রচলিত রাজনৈতিক অবস্থানের কাছে তাদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হালে পানি পাবে বলে মনে হয়না।
বিশ্বের দেশে দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বে নতুন ধারা ও সম্ভাবনার জানান দিচ্ছে। লন্ডন ও নিউইয়র্কের মত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী মেট্রোপলিটান মেগাসিটির নেতৃত্বে পুরনো বড় রাজনৈতিক দলের বাঘা বাঘা নেতাদের পরাস্ত করে উপমহাদেশের বংশোদ্ভুত নতুন প্রজন্মের মুসলমান তরুণরা মেয়র নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। প্রায় এক দশক আগে ২০১৬ সালে লন্ডনের মেয়র নির্বাচনে পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত সাদিক খান কনজারভেটিভ পার্টির জ্যাক গোল্ডস্মিথকে হারিয়ে প্রথম নির্বাচিত হওয়ার পর এখন তিনি তৃতীয় মেয়াদে লন্ডনের মেয়র হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিই লন্ডনের প্রথম মেয়র জিনি রাজকীয় নাইটহুড সম্মান লাভ করেছেন। অন্যদিকে উগান্ডা থেকে অভিবাসি আমেরিকান নাগরিক ভারতীয় বংশোদ্ভুত মাহমুদ মামদানি ও মিরা নায়ারের পুত্র জোহরান মামদানি এবার নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে নিউ ইয়র্কের সাবেক গবর্নর এন্ড্রু কুমোকে বেশ বড় ব্যবধানে হারিয়ে নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। শত বছরের মধ্যে মামদানি নিউ ইয়র্কের সর্ব কনিষ্ট মেয়র এবং প্রথম মুসলমান ও আফ্রো-এশীয় বংশোদ্ভুত নাগরিক। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি বিরোধিতা ও হুমকি মোকাবেলা করে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে ট্রাম্প মামদানিকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানান। গত ২২ নভেম্বর হোয়াইট হাউজে দুজনের মুখোমুখি সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়। এটিই হচ্ছে মার্কিন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও সহাবস্থানের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন নির্বাচনগুলোতে অন্তত ৫ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত মার্কিন নাগরিক মূল ধারার রাজনৈতিক নেতৃত্বে কংগ্রেস, সিনেট, হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ও কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। আমাদের নতুন প্রজন্ম বিদেশে ইতিহাস সৃষ্টি করবে আর স্বদেশে গতানুগতিক দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির কাছে অবহেলিত থাকবে, এটা আর চলতে পারেনা। রাজিনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে নতুন চিন্তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা না হলে রাষ্ট্রে ও সমাজে প্রত্যাশিত পরিবর্তন ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর নিশ্চিত করা অসম্ভব।
জনগণ ও রাষ্ট্র অবিচ্ছেদ্য। সরকার একটি স্বল্পস্থায়ী প্রতিষ্ঠান মাত্র। জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কই রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সরকারের বৈধতা দেয়। তাই জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং এই সম্পর্ক সুদৃঢ় ও স্বচ্ছ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ঐ দৃঢ়তা ও স্বচ্ছতা বিধানের মাধ্যম। সরকারের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড জনগণকে সম্পৃক্ত করে, জনগণকেন্দ্রিক এবং সব জনগণের জন্য সমভিত্তিক হতে হয়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পদ্ধতিই জনগণ, রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক ও জবাবদিহি অধিকতর নিশ্চিত করে বলে বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। যদিও গণতন্ত্র বর্তমানে দলতন্ত্রে পরিণত হয়েছে, বিভিন্ন দূষণে দুষ্ট এবং বিশ্বব্যাপী এখন অনেকটা ব্যর্থতায় পর্যবসিত। জনগণ এখনো শোষণের শিকার। এই শোষণে রাষ্ট্র ও সরকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। অসম বণ্টন ও সুযোগ-সুবিধার বিষম ব্যবহার বর্তমান বিশ্বের বড় একটি সমস্যা। এটি একটি দুষ্টচক্রে পরিণত হয়েছে। জনগণ ও দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য এই রাহুগ্রাস থেকে নিষ্কৃতি নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনীতি জনগণের জন্য, জনসেবার জন্য। আর অর্থনীতি জনজীবনকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে। তাই রাজনৈতিক বলয়ে অর্থনীতির স্বরূপ অনুধাবন প্রয়োজন। অন্য কথায় একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অর্থনীতি সম্পর্কে আমাদের কমবেশি সচেতনতা আবশ্যক। এটি ছাড়া নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা কঠিন বৈকি।
রাজনীতি এবং অর্থনীতি পরস্পর প্রযুক্ত বা একে অন্যের পরিপূরকও বলা যেতে পারে। যেমন রাজনীতি করতে গেলে অর্থনীতির একটা ভূমিকা এসেই যায়, আবার অর্থনীতি পরিচালনার জন্য ক্ষমতা বা নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়, যা কিনা রাজনীতির একটা বাই প্রডাক্ট। অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ, এর প্রবৃদ্ধি ঘটানো, ব্যবহার ও উপযোগিতা বৃদ্ধি রাজনৈতিক ইচ্ছা বা ক্ষমতার ব্যবহার ব্যতিরেকে ঘটে না। নাগরিকের কাছ থেকে কর-রাজস্ব আহরণ এবং সেই নাগরিকের কল্যাণে তা ব্যয় করার জন্য আইন-কানুন তৈরি ও প্রয়োগের মাধ্যমে জবাবিদিহির পরিবেশ যাতে সৃষ্টি হয়। এখানে রাজনীতি অর্থনীতির মেলবন্ধনের প্রাসঙ্গিকতা চলে আসে। আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, অর্থনৈতিক পরিবর্তন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রেরই পরিবর্তনের চাবিকাঠি। আর্থিক ক্ষমতা একটি পরিবারকে নিশ্চিত ভবিষ্যতই দেয় না, একটি শিক্ষিত এবং স্বাস্থ্যবান পরিবার নির্মাণে সব ধরনের যোগান দিয়ে থাকে। দেশের প্রতিটি পরিবারে যখন অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে তখন দেশটার চেহারাই পাল্টে যাবে। অর্থনৈতিক পরিবর্তন না ঘটাতে পারলে অন্য কোনো ক্ষেত্রেরই পরিবর্তন ঘটবে না। আর এ পরিবর্তন ঘটানোর দায়িত্ব সর্বাগ্রে বর্তায় আমাদের রাজনীতিবিদদের তথা জনপ্রতিনিধিদের ওপর। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিশ্ব জুড়েই এখন চলছে উন্নয়নের রাজনীতি। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনীতি করছেন রাজনীতিবিদরা। রাজনীতির সব পক্ষই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথার অঙ্গীকার করে যাচ্ছে। কিন্তু মনে হয় উন্নয়নের রাজনীতি না হয়ে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের রাজনীতি হলে ভালো হয়।
ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার পথে থাকা দেশ অর্থনীতি ও সমাজে প্রায়শ কয়েকটি পরস্পর প্রযুক্ত প্রশ্নের সম্মুখীন। প্রথমত, মাত্রাহীন দুর্নীতি কি শুধু নৈতিক ব্যর্থতা নাকি তা রাজনৈতিক অর্থনীতির অবশ্যম্ভাবী অনুষঙ্গ? দ্বিতীয়ত, সংস্কারে অনীহা কি অদক্ষতার প্রশ্ন না দুর্নীতিগ্রস্ত স্বার্থকে আড়ালে রাখার প্রয়োজনে? তৃতীয়ত, বাস্তবায়নগত দুর্বলতা কি সক্ষমতার অভাব না ক্ষেত্র বিশেষে মেধার নিরন্তর অবমূল্যায়নের ফল? এসব দেশ বা অঞ্চলে অর্থনীতি সুষ্ঠু পরিচালনার ক্ষেত্রে ঘাটতিতে ঘরের স্বার্থসন্ধ্য দায় দায়িত্বহীনতা ও সুশাসনের অভাব এবং এ ব্যাপারে চির প্রতিদ্বন্দ্বী নিকট প্রতিবেশীদের কলকাঠি নাড়ার ভূমিকা সব সময় ছিল বা আছে। তবে তিন, চার কিংবা পাঁচ বার একটানা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সুবাদে স্বৈরাচারী সরকারসমূহে রাজনৈতিক অর্থনীতির নীতি প্রণয়নে একটি মৌলিক রূপান্তর ঘটে চলেছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রবণতা বা চ্যালেঞ্জের পরিণতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, একমাত্রিক উন্নয়ন ধারণায় অবকাঠামোই সব সামাজিক উন্নয়ন দর্শনকে পাশে ঠেলে দিয়েছে। যেমন শিক্ষার মানের চেয়ে শিক্ষালয়ের ভবন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। স্বাস্থ্যসেবার মানের চেয়ে হাসপাতাল ভবন এখন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। নগর অবকাঠামো ইন্টিগ্রেটেড ও বাসযোগ্যতাকে প্রাধান্য না দিয়ে বিচ্ছিন্ন অবকাঠামোর সমাহারে রূপান্তরিত হয়েছে। একমাত্রিক উন্নয়ন দর্শনে কঠিন শর্তের ধার-কর্জে আত্মসাৎ, অপচয়, দুর্নীতি দ্বারা নির্মিত অবকাঠামোর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান হয়ে ওঠছে। যেমন সড়ক নিরাপত্তার শঙ্কাজনক ঘাটতি এবং নিরাপদ ভ্রমণের অনিশ্চয়তা, শিক্ষার মানের নিম্নগতি, কাক্সিক্ষত ফলাফল ছাড়াই স্বাস্থ্যসেবা অত্যধিক ব্যয়বহুল হয়ে যাওয়া, অতিমাত্রায় সড়ক ও সেতু অবকাঠামো নির্মাণে জলাধার, নদী ও নিসর্গ নির্জীব হয়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ ঘটাচ্ছে।
আইন এবং তা বাস্তবায়নের মাঝে চোখে পড়ে বিপুল দূরত্ব। আইনের ভালোটুকু পালিত হয় না, পালিত হয় মন্দটুকু। আইনে যা বলা আছে তা পালনে বিস্তর অনীহা, যা বলা নেই সেটি পালনের মহোৎসবই যেন সর্বত্র দৃশ্যমান। জাল যার জলা তার নয়, যিনি কৃষক তিনি ভূমিহীন। ভূমির সঠিক ব্যবহার আজো নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায়। বেঠিক ব্যবহারই যেন প্রশ্রয় পাচ্ছে। অনিয়ম নিয়ম হয়ে যাচ্ছে। শোষণ বঞ্চনা বৈষম্যের বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রামে জয়ী তৃতীয় বিশ্বের বহু মানুষ আর্থ-সামাজিক রাজনীতির ক্ষেত্রে অব্যাহতভাবে অধিকার বঞ্চিত। বিশেষ করে, যারা অর্থনৈতিক বিচারে দরিদ্র, পেশার নিরিখে সংখ্যালঘু তাদের বঞ্চনা ও অধিকারহীনতার অভিযোগ বাড়ছে। সুসংহত আইনি ব্যবস্থা ব্যাতিরেকে মানুষের অধিকার সমুন্নত রাখা পুরোপুরি সম্ভব নয়। অনেক দেশেই এখনো এমন একটি মানবিক আইনি কাঠামো স্থিতিশীল হয়নি, যা মানুষের সার্বিক ও মানবিক বিকাশকে সহজ করবে। পুরো আইনি ব্যবস্থার পরতে পরতে এখনো রয়ে গেছে তাদের পূর্বেকার ঔপনিবেশিক মানসিকতার হীন অভিপ্রায়; ফলে অগুনতি আইনি অসংগতি থেকে ‘মুক্তির সংগ্রাম’ শেষ হয়নি। এসব দেশে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় রাজনৈতিক, অর্ধরাজনৈতিক, ছদ্ম রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক অবস্থা-ব্যবস্থা নানান রঙে, নানান মোড়কে আচ্ছাদিত। প্রশাসনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে সরকারি কিংবা দলীয়করণ করে সরকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন-দূরদৃষ্টিহীন-জনসংযোগহীন আইনি পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। তেমনি, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং সদিচ্ছার অভাবে একটি ভালো আইনের মন্দ প্রয়োগও যেন অতি সাধারণ বিষয়। প্রতীয়মান হয়, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামোটাই এমন যে তা জনমানুষের দুর্ভোগে বিচলিত তো নয়ই, বরং ভোগান্তি উৎপাদন এবং পুনরুৎপাদনকারী আইনি এবং প্রশাসনিক কাঠামোই চিরকাল হাত ধরে পাশাপাশি হেঁটেছে, হাঁটছে। মানুষকে অজ্ঞতায় রেখে কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না।
অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের ওপর গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেট স্বার্থের আধিপত্য। অতিমারী কিংবা পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সমর এর অভিঘাতের অজুহাতে উঠতি অর্থনীতির নিম্নগামী হওয়ার ক্ষেত্রে অলিগার বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, যা উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতাকে নিরুৎসাহিত করছে এবং মেধা, উদ্যোক্তা ও সম্পদ পাচারকে উৎসাহিত করছে। সংকীর্ণ ও সংকুচিত বেসরকারি স্বার্থ রক্ষার নামে যে ধরনের অনৈতিক নিয়ম সাজানো হয় তা উদ্বেগজনকভাবে আর্থিক সংস্থান, ব্যাংক খাত, বিদ্যুৎ, পরিবহন ব্যবস্থা, আইসিটি এবং অবকাঠামো খাতের ধ্বস ও ধ্বংস স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কোনো কোনো দেশে উন্নয়নের নানা মাত্রায় সে দেশের ভূমিকা এবং অর্জন দেশ এবং সারা বিশ্বে যথাযথভাবে পরিচিতি পেয়েছে। তবে এসব দেশে পরিবর্তনের পাশাপাশি আকাক্সক্ষা ও চ্যালেঞ্জের জগৎ পাল্টেছে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনীতিতে কিছু উদ্বেগের জায়গা ঘনীভূত হয়েছে। দরিদ্রের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক হতাশা বর্তমানে সংকটের শীর্ষবিন্দুতে অবস্থান করছে। এসব হতাশা তৈরি হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থনীতি পরিচালনার রাজনৈতিক অর্থনীতি থেকে। এটাও ঠিক কোনো কোনো দেশ উন্নয়ন যাত্রার বাঁকবদলের পর্যায়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে সফলতার মুখ দেখা অন্য দেশগুলো মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়েছে, কারণ তারা সতর্ক সংকেতগুলো মানেনি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলোকে মূল্যায়ন করেনি। সাব-সাহারা ও মধ্যপ্রাচ্যের আন্তঃকলহে লিপ্ত দেশসমূহের মতো এমন কি শ্রীলঙ্কার মতো এসব দেশে পারস্পরিকভাবে এমন নীতির প্রবণতাকে শক্তিশালী করে তুলছে, যা দেশসমূহের অর্থনীতিতে ব্যাপক স্থিতিশীল উন্নয়ন আকাক্সক্ষার ক্ষেত্রে কাঠামোগত বাধায় রূপান্তরিত হতে চলেছে। বাস্তবে পরিকল্পিত অকার্যকারিতা এবং দুর্নীতি বিস্তারের যোগসাজশের বিষয়টি স্পষ্টতর হয়ে উঠতেও বাধা প্রাপ্ত হচ্ছে। এর কারণ হছে, সার্বিক বিষয়টি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি ও সুশাসনের পথে না গেলে, বরং গোষ্ঠীস্বার্থ রাজনৈতিক অর্থনীতির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক এজেন্ডায় অর্থনৈতিক মুক্তির কথা, দেশের উন্নয়নের কথা বা জনগণের কল্যাণের কথা হরহামেশা রাজনৈতিক প্রতিটি দলই নানাভাবে বলে যাচ্ছে। এসব শুধু এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত থাকলে চলবে না। খোদ রাজনীতিকেই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের স্রোতধারায় নিয়ে এসে নতুন রাজনৈতিক প্রবাহ সৃষ্টি করতে হবে এবং সেটি হবে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের রাজনীতি। আমাদের দেশে এখন গণতান্ত্রিক পদ্ধতির চর্চা কতটা বিদ্যমান? গণতন্ত্রে বিশ্বাসী প্রতিটি রাজনৈতিক দলের পুরনো দৃষ্টিভঙ্গি ও ধ্যান-ধারণার রাজনীতিতে বিবর্তন ঘটিয়ে বর্তমানের বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়ে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের রাজনীতি প্রবর্তন করতে হবে। রাজনীতির স্বার্থে অর্থনীতি নয়, বরং অর্থনীতির স্বার্থেই রাজনীতিকে সাজাতে হবে। আর এ উদ্যোগটা নিতে হবে স্বয়ং রাজনীতিবিদদেরকেই। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে এ ধারার রাজনীতিতে প্রথমেই করণীয়গুলো নির্ধারণ করতে হবে। এক কথায় বলতে গেলে, দেশের প্রতিটি পরিবারকে উপার্জনক্ষম পরিবারে রূপান্তর করাই হবে এ রাজনীতির মূল লক্ষ্য। অর্থাৎ প্রতিটি কর্মক্ষম মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আর সে জন্য বাড়াতে হবে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ।