সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : মাদার সংকটের কারণে হ্যাচারি গুলো রেনু পোনা উৎপাদনে যেতে পারছে না সে কারণে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা ,খুলনা, ও বাগেরহাটের চিংড়ি চাষে আগামী ২৬ সালে একটু বিলম্ব হতে পারে বলে হ্যাচারি মালিক সমিতি ও মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। মৎস্য অধিদপ্তর জানায় উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা ,ও বাগেরহাটে ৬৭ হাজার হেক্টর জমিতে ৫৫ হাজার চিংড়িঘরে চিংড়ি চাষ হয়ে থাকে এখানে বাৎসরিক ৫০০ কোটি থেকে ৫৫০কোটি রেনুপোনার প্রয়োজন হয় ।সাতক্ষীরার সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় গড়ে উঠছে একাধিক চিংড়ি পোণা হ্যাচারি। এতে স্থানীয় পোণার চাহিদা পুরণের পাশাপাশি সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কমবে সুন্দরবনের নদী থেকে প্রাকৃতিক পোণা আহরণ। তবে এ পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ঠরা বলছেন, এ অঞ্চলে মা মাছ সংরক্ষনের ব্যবস্থা না থাকার কারনে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন তারা। এ অঞ্চলে হ্যাচারি শিল্প ধরে রাখতে সরকারি উদ্যোগে মা মাছ সংরক্ষন জরুরী বলে তারা জানান।
সরকারি হিসেবে সাতক্ষীরা জেলার ৬৭ হাজার হেক্টর জমিতে ৫৫ হাজার চিংড়ি ঘের রয়েছে। বেশিরভাগ ঘেরেই বাগদা চিংড়ির চাষ করা হয়। এসব ঘেরের চিংড়ির পোণা সংগ্রহ করা হয় সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও কক্সবাজারের বিভিন্ন হ্যাচারি থেকে। কক্সবাজার থেকে আসা পোণা পরিবহণে দীর্ঘ সময় লাগার কারনে পোণার গুনগত মান নষ্ট হয়ে যায়। চাহিদাও পুরণ হয় না। তবে সম্প্রতি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ, নওয়াবেকি এলাকায় গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি উন্নতমানের চিংড়ি পোণা হ্যাচারি। এসব হ্যাচারির পোণা ঘেরে চাষ করে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। কক্সবাজার থেকে মা মাছের নফলি এনে এখানে পোণা উৎপাদন করায় পোণার গুণগতমান অনেক ভাল।
কালিগঞ্জ উপজেলার শ্রীকলা গ্রামের চিংড়ি চাষি সাইদুজ্জামান জানান, দীর্ঘ বিশ বছর বাগদা চাষ করছি। প্রথমে নদীর পোণা ঘেরে চাষ করতাম কিন্তু নদীতে এখন তেমন পোণা পাওয়া যায় না। এজন্য আমরা কক্সবাজারের পোণা আনতে হচ্ছে। তবে গত কয়েক বছর কক্সবাজার থেকে পোণা সময় মত না পাওয়ায় এখন স্থানীয় হ্যাচারির পোণা ব্যবহার করছি এতে মাছের উৎপাদন ভাল হচ্ছে। শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চিংড়ি চাষি মাসুম মোল্যা বলেন, ঘেরে নদীর পোণা ছাড়লে উৎপাদন অনেক ভাল হয়। তবে এখন নদীতে পোণা কম পাওয়া যায় দামও অনেক বেশি। এ কারনে হ্যাচারির পোণা চাষ করি। মাঝে মাঝে নওয়াবেকির হ্যাচারী থেকে মাছ এনে ঘেরে ছাড়ি এতে ফলন ভাল হচ্ছে। একই এলাকার ঘের ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ মোল্যা বলেন, বছরে ৩ থেকে ৪ মাস কক্সবাজার থেকে কোন পোণা আসে না, এসময় আমরা ভারতীয় পোণা ব্যবহার করতাম। শ্যামনগরে হ্যাচারি হওয়ায় সেখান থেকে পোণা নিয়ে ঘেরে ছাড়ি। এতে উৎপাদন ভাল হচ্ছে।
হ্যাচারির টেকনিশিয়ানরা জানান, স্থানীয় নদী ও ঘেরের পানির লবণক্ততার পিপিটি ও তাপমাত্রা অনুযায়ী আমাদের হ্যাচারি থেকে পোণা সরবারহ করা হয় বলে ঘের গুলোতে আগের চেয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের হ্যাচারির পোণার গুনগত মান ভাল হওয়ায় চাহিদা প্রচুর।
কালিগঞ্জের পোণা ব্যবসায়ি ইশারাত আলী বলেন, কক্সবাজার থেকে কালিগঞ্জ পরযন্ত পোণা আনতে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়। সে কারনে পোণা দুর্বল হয়ে যায়। স্থানিয় ভাবে পোণা উৎপাদন করা হলে পোণার মান ভাল হবে। কক্সবাজারের সৌদিয়া হ্যাচারির সাতক্ষীরা অফিসের ম্যানেজার মুজিবুল ইসলাম বলেন, এ অঞ্চলের হ্যাচারি গুলোতে যদি কক্সবাজার থেকে নফলি এনে ঘেরে পানির লবণাক্ততা ও তাপমাত্রা সহনশীল পোণা উৎপাদন করা হয় তাহলে এ সমস্যা থাকবে না।
জেলা চিংড়ি পোণা ব্যাবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, হ্যাচরি প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারি ভাবে কোন ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায় না। এছাড়া সরকারকে মোটা অংকের রাজস্ব প্রদান করে গভীর সমুদ্র থেকে কার্গো জাহাজে করে লবণাক্ত পানি নিয়ে আসতে হয়। এর ফলে পানি পরিবহণ ব্যায় বেড়ে যায়। পোণা উৎপাদনের জন্য যে মা মাছ (ডিম দেয় যে মাছ) প্রয়োজন তা আসে মূলত কক্সবাজার থেকে। এ অঞ্চলে যদি সরকারি ভাবে মা মাছ সংরক্ষনের ব্যাবস্থা করা হয় তাহলে হ্যাচারি গুলোতে উৎপাদন বাড়বে।
এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল অদুদ বলেন, এ অঞ্চলের হ্যাচারি গুলোতে সরকারি আইন মেনে পোণা উৎপাদন করা হচ্ছে। আরো কয়েকটি হ্যাচারী গড়ে উঠলে স্থানীয় চাহিদা পুরন করা সম্ভব হবে। ব্যাবসায়ীদের সমস্যার কথা উদ্ধতন কতৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করি সরকার সমস্যা সমাধানে দ্রুত উৎদ্যোগ নেবে।
"পোনা উৎপাদনকারী হ্যাচারিতে মাদার (মা বাগদা চিংড়ি) সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করায় গভীর সংকটে পড়তে যাচ্ছে দেশের সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি শিল্প। সমুদ্র থেকে মাদার চিংড়ি আহরণকারী জাহাজ থেকে গত ১৫ দিন ধরে কক্সবাজারভিত্তিক গড়ে ওঠা হ্যাচারিগুলোতে মাদার সরবরাহ করা হচ্ছে না। ফলে প্রয়োজনীয় মাদার না পেয়ে পোনা উৎপাদনে যেতে পারছে না কক্সবাজারের অধিকাংশ হ্যাচারি।
এদিকে কক্সবাজারের অধিকাংশ হ্যাচারিতে বাগদা চিংড়ি পোনার উৎপাদন না হওয়ায় সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটসহ আশপাশের এলাকায় পোনা সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় পোনার দামও বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েক গুণ। এতে মৌসুমের শুরুতেই পোনা সংকটের কারণে চাষিরা তাদের ঘেরে পোনা ছাড়তে পারছেন না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘেরে পোনা ছাড়তে না পারলে মোটা অঙ্কের টাকা লোকসানের মুখে পড়তে হবে চাষিদের। ব্যাংক লোন নিয়ে যারা চিংড়ি চাষ করেন তারা পড়েছেন বিপাকে।
সাতক্ষীরার চিংড়ি ঘের মালিক খায়রুল মোজাফ্ফর মন্টু বলেন, বাজারে পোনা সরবরাহ কম হলে দাম বেড়ে যায়। গত বছর ১ হাজার টাকায় পোনা কিনতে হয়েছিল। এমনিতে মড়কের কারণে আমরা চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত, এরপর সেব নিজেদের স্বার্থে এভাবে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলে ঘেরে পোনা ছাড়তে না পেরে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হব।
সাতক্ষীরা জেলা চিংড়ি পোনা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ আবুল কালাম বাবলা বলেন, ‘বাজারে পোনার সংকট হলে দাম বেড়ে যায়। ফলে চাষিদের ঘেরে পোনা ছাড়তে হিমশিম খেতে হয়। এতে চিংড়ির উত্পাদনও কমে যাবে। একই সঙ্গে কমে যাবে রপ্তানি।’ তিনি বাজারে মানসম্মত পোনা সরবরাহ নিশ্চিত করতে মাদার সরবরাহ যাতে স্বাভাবিক থাকে সে বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সাতক্ষীরাস্থ দিপা সি ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীন বন্ধু মিত্র বলেন, ‘দেশের বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ আসে চিংড়ি রপ্তানি থেকে। পোনা সংকটের কারণে চিংড়ির উৎপাদন কম হলে রপ্তানিও কমে যাবে। যার প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতির ওপর। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে চিংড়ি শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রিম্প হ্যাচারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (সেব)-এর একজন সদস্য জানান, গত ১৫ দিন ধরে হ্যাচারিতে মাদার সাপ্লাই বন্ধ রয়েছে। যে কারণে অধিকাংশ হ্যাচারি পোনা উৎপাদনে যেতে পারছে না।
মাদার সাপ্লাইকারী জাহাজ ব্যবসায়ী, মাদার বহনকারী কার্গো অ্যাসোসিয়েশন ও ফিড ব্যবসায়ীর সঙ্গে সেব-এর কয়েক জনের যোগসাজশে পুরো ব্যবসাটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তারা কোটা করে প্রতিটি মাদারে কমিশন নেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে হ্যাচারিতে মাদার সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। যে কারণে কক্সবাজার ভিত্তিক ৫৬টি হ্যাচারির মধ্যে বর্তমানে চালু আছে মাত্র ২৩টি। তিনি আরো বলেন, এভাবে ১৫ দিন মাদার বন্ধ থাকার কারণে চাষিরা আগামী এক মাস পোনা পাবে না। ফলে বাজারে পোনা সরবরাহ না হলে ঘের মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মৎস্য অধিদপ্তর খুলনার সহকারী পরিচালক রাজকুমার বিশ্বাস জানান, বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৯৬ হেক্টর আয়তনের জমিতে ১ লাখ ১১ হাজার ৯৪০ চিংড়ি ঘের রয়েছে। প্রতি মৌসুমে এসব ঘেরে মোট পোনার চাহিদা রয়েছে ৩৫১ কোটি। সেব যদি কোটার মাধ্যমে বাজারে পোনা সরবারহ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে তাহলে এই অঞ্চলে পোনা সংকটের সৃষ্টি হবে। ফলে ঘেরে পোনা ছাড়তে না পেরে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মাছের উৎপাদনও কমে যাবে। যার প্রভাব পড়বে পুরো চিংড়ি শিল্পের ওপর।
'শ্রিম্প হ্যাচারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (সেব)-এর মহাসচিব নজিবুল ইসলাম গত ১৫ দিন ধরে মাদার (মা বাগদা চিংড়ি) সরবরাহ বন্ধ থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘হ্যাচারিগুলোতে মাদার ফুলফিল হয়ে গেছে। এখন স্টকিং করার জায়গা নেই। যে কারণে জাহাজগুলো মাদার আহরণ না করে সাদা মাছ আহরণে চলে গেছে। এছাড়া তারা মাদারের দামও একটু বাড়ানোর কথা বলেছে। আমরা বলেছি, তারা এলে এ ব্যাপারে একটা ব্যবস্থা করা যাবে।’
হ্যাচারি শিল্পকে ভোগানো অণুজীবটি হলো ‘লুমিনাস ব্যাকটেরিয়া’। দীর্ঘ বৃষ্টিহীনতায় সাগরের পানিতে লবণের মাত্রা বেশি হলে এ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি বাড়ে।
পোনা উৎপাদনে হ্যাচারিগুলোতে প্রবেশ করানো সাগরের পানি প্রক্রিয়াকরণ প্রক্রিয়া শেষে মাদার চিংড়ি থেকে পোনা উৎপাদন শুরু হয়। সেখানে এখন ব্যাকটেরিয়ার কারণে ‘মড়ক’ দেখা দিয়েছে। ছবিটি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কলাতলী হ্যাচারি জোন থেকে তোলা; ছবি- টিবিএস/সায়ীদ আলমগীর।
বঙ্গোপসাগরের পানিতে হঠাৎ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি বেড়েছে। ফলে পোনা উৎপাদনে সাগরের পানি ব্যবহার করা কক্সবাজার ও সাতক্ষীরার চিংড়ি হ্যাচারিগুলোতেও শুরু হয়েছে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ। এতে গত দু'মাসে ব্যাকটেরিয়ায় মড়কের কবলে পড়ে ৫৯টি হ্যাচারিতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় শত কোটি টাকা মূল্যের পোনা। হ্যাচারি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট রিসার্চ সেন্টারগুলো আগেভাগেই সতর্ক করলে হয়তো এ ধরণের ক্ষতির মুখে পড়তে হতো না।
লোকসানের কারণে এই মুর্হূতে পোনা উৎপাদনে যেতে শংকিত রয়েছেন হ্যাচারিরা মালিকরা। আবার ঘের চাষিদের কাছ থেকে পোনার চাহিদা থাকা স্বত্ত্বেও পোনা দিতে না পারায় রপ্তানিতেও প্রভাব পড়বে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।
কক্সবাজার সোনারপাড়াস্থ 'রাইসা ও মেরিগোল্ড হ্যাচারি'র ভাড়াটিয়া এবং সাতক্ষীরার 'কক্সবাজার হ্যাচারি'র মালিক ও প্রধান টেকনিশিয়ান হারুন-অর-রশীদ (৩৯) বলেন, 'কক্সবাজার উপকূলে ৩২টি এবং সাতক্ষীরায় রয়েছে ২৭টি চিংড়ি পোনা হ্যাচারি। পোনা উৎপাদনে হ্যাচারিগুলোতে প্রবেশ করানো হয় সাগরের পানি, যা প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে মা চিংড়ি থেকে উৎপাদন করা হয় লাখ লাখ চিংড়ি পোনা। একবার প্রোডাকশনে (উৎপাদন) গেলে ১ থেকে আড়াই কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয় একেকটি হ্যাচারিকে। গত দুটি চালানেই উৎপাদিত চিংড়ি পোনায় মড়কের 'খড়গ' পড়েছে। এতে কোন কোন হ্যাচারি পুরো এবং কোন হ্যাচারি অর্ধেক ক্ষতির মুখে পড়ে। সে হিসেবে হ্যাচারিগুলো গত দু'চালানে প্রায় শত কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়েছে।
তিনি আরো বলেন, 'জানুয়ারি থেকে হ্যাচারিগুলোতে চিংড়ি পোনা উৎপাদনের মৌসুম শুরু হয়েছে। প্রথম সার্কেল ভালভাবে পোনা উৎপাদনের পর সাতক্ষীরা, যশোর ও খুলনা অঞ্চলে সরবরাহ দেয়া হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ দ্বিতীয় ও তৃতীয় সার্কেলে প্রোডাকশনের জন্য সংগ্রহ করা সাগরের পানিতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি মিলে। এতে হ্যাচারিগুলোতে উৎপাদিত চিংড়ি পোনা মড়কের কবলে পড়েছে। প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে লাখ লাখ পোনা। মড়কের কারণে পোনা উৎপাদনে যেতে আতঙ্কে রয়েছে হ্যাচারিগুলো'।
টেকনিশিয়ান হারুনের মতে, হ্যাচারি শিল্পকে ভোগানো অণুজীবটি হলো 'লুমিনাস ব্যাকটেরিয়া'। একে 'এলবি' হিসেবে চেনে হ্যাচারি সংশ্লিষ্টরা। এই ব্যাকটেরিয়া খুবই মারাত্মক। এর প্রাদুর্ভাব হ্যাচারিতে হানা দিলে শতভাগ পোনা নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘ বৃষ্টিহীনতায় সাগরের পানিতে লবণের মাত্রা বেশি হলে এ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি বাড়ে। তখন শত চেষ্টা করেও পোনা টেকানো যায় না। যদি ভারী বৃষ্টিপাত হয়, আর সাগরের পানিতে লবণাক্ততা স্বাভাবিক হয়ে আসে, তবে এ ব্যাকটেরিয়া আপনাআপনি চলে যাবে।
সোনারপাড়ায় বলাকা হ্যাচারির কর্মী ইমাম হাসান বলেন, 'তৃতীয় সার্কেলে পোনা উৎপাদন করতে গিয়ে খরচ হয়েছে ২ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে সব পোনা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিনিয়োগের সম্পূর্ণ টাকা লোকসান হয়েছে। ফলে, চলতি সার্কেলে পোনা উৎপাদনে যেতে সাহস পাচ্ছি না। গত বছরও করোনার কারণে লোকসান গুনতে হয়েছে। এবার নতুন করে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ। সবকিছু মিলিয়ে দিশেহারা অবস্থা'।
শ্রিম্প হ্যাচারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (সেব) এর মহাসচিব মোহাম্মদ নজিবুল ইসলাম বলেন, 'লুমিনাস ব্যাকটেরিয়া থেকে বাঁচতে অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়ে থাকে হ্যাচারিগুলো। কিন্তু ব্যাপক হারে ছড়িয়ে গেলে তখন পদক্ষেপগুলো আর কাজে আসে না। এফ.আর.আই ও মেরিন রিসার্চ ইনস্টিটিউট নামে সরকারের দুটি রিসার্চ সেন্টার আছে। উপকূলে কী ধরনের ব্যাকটেরিয়া আছে, কখন কী ধরনের ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে, তা হ্যাচারিগুলোকে আগেভাগেই জানিয়ে দিলে তখন হ্যাচারিগুলোর পদক্ষেপ নিতে সহজ হয়। কোনো ধরনের তথ্য না পাওয়ায় ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে চিংড়ি পোনা মড়কে পড়েছে। এতে হ্যাচারি শিল্প ধুঁকছে'।
নজিবুল ইসলাম আরো বলেন, 'সাগরের পানিতে ব্যাকটেরিয়ার দূষণ প্রাকৃতিকভাবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত চিংড়ি পোনা উৎপাদন সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে উপকূলের ৫৯টি হ্যাচারিতে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে অর্ধশতাধিক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারী বৃষ্টির পর অতিরিক্ত তাপমাত্রা কমে গেলে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ চলে যাবে। তারপর আবার আগের মতো ভালভাবে চিংড়ি পোনা উৎপাদন করতে পারব বলে আশা করছি'।
সেব মহাসচিব নজিবের মতে, এই সময়টাতে চাষিদের চিংড়ি পোনার চাহিদাটা বেশি। এখন যেহেতু চিংড়ি পোনা উৎপাদন করা যাচ্ছে না, সেহেতু চাষিরাও ঘেরে পোনা ফেলতে পারছে না। এ কারণে চিংড়ি উৎপাদনে জাতীয়ভাবে ঘাটতি ও রপ্তানিতেও প্রভাব পড়তে পারে।
সেব-এর তথ্য মতে, বড় ২০টি , মাঝারি ১৫টি এবং ছোট ২৪টি মিলিয়ে মোট ৫৯টি হ্যাচারি প্রতি মৌসুমে ৬ সার্কেলে প্রায় ২ হাজার ১৬০ কোটি পোনা উৎপাদন করে। আর চলমান তিন সার্কেলে উৎপাদন হওয়ার কথা প্রায় ৮০০ কোটি চিংড়ি পোনা। কিন্তু গত ৩ সার্কেলে সাতক্ষীরা, যশোর ও খুলনা অঞ্চলে সরবরাহ দেয়া সম্ভব হয়েছে মাত্র ২০০ কোটি পোনা।
এদিকে সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিএম সেলিম এই প্রতিবেদককে বলেন মাদার সংকটের কারণে ২০২৬ সালে চিংড়ি চাষে বিলম্ব হতে পারে কারণ সাগরে মাদার বাগদা সংগ্রহ করতে না পারায় এই বিলম্বর কারণ। তিনি আরো বলেন প্রতিবছর সাতক্ষীরা, খুলনা , ও বাগেরহাট এই তিন জেলায় ৫০০ কোটি থেকে ৫৫০ কোটি বাগদা রেনুপোনা প্রয়োজন হয়। এর মধ্য ৮৫ শতাংশ রেনু পোনা কক্সবাজার থেকে সরবরাহ হয় বাকি ১৫ শতাংশ রেনঙ পোনার মধ্য ১৩শতাংশ পোনা স্থানীয় হ্যাচারি থেকে উৎপাদিত হয় বাকি ২শতাংশ পোনা স্থানীয় নদী থেকে সংগ্রহ হয়। তিনি আরো বলেন কক্সবাজার থেকে বাগদা রেনুপোনা না আসলে সাতক্ষীরা ,খুলনা, ও বাগেরহাটের স্থানীয় হ্যাচারীগুলোর পোনাতে চাহিদা পূরণ করা আদৌ সম্ভব না। সে কারণে কক্সবাজারের পোনা অতি প্রয়োজন কিন্তু সাগরে মাদার সংকটের কারণে কক্সবাজারের হ্যাচারি গুলো পোনা উৎপাদনে যেতে পারছে না যার কারণে আগামী ২৬ সালে সাতক্ষীরা খুলনা বাগেরহাট চিংড়িঘেরে রেনু পোনা ছাড়তে বিলম্ব হতে পারে বলে হ্যাচারি মালিক সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে মৎস্য অধিদপ্তরে।