সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : ঊন্নয়নে নারী উন্নয়ন অভিধানে একটি অতি আধুনিক সংযোজন এবং এমন একটি ধারণা যা বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বা অবদানকে স্বীকৃতি দেয়। ঊন্নয়নে নারী বলতে বুঝায় যে নারীরা উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত এবং উন্নয়নে তাদের অংশগ্রহণের পরিবেশ অনুকূল করা অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশের নারীরা বরাবরই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সনাতনী ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধ এবং লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি ও সুশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক বহু সুযোগ সুবিধা থেকে প্রায়শ তারা বঞ্চিত। নারীরা সন্তান ধারণ করে, সন্তান জন্ম দেয়, তাদের প্রতিপালন করে এবং সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম করে, কিন্তু কখনো তারা নিজেদের কাজের জন্য যথোপযুক্ত মজুরি ও স্বীকৃতি পায় না। চাকরির ক্ষেত্রে কোনো প্রকার আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নারীরা পায় না। গ্রা্রমীণ পর্যায়ে ৮৪% এবং শহরে ৫৯% নারী অবৈতনিক গৃহ পরিচালিকা হিসেবে কর্মরত থাকে। বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের তুলনায় সপ্তাহে গড়ে ২১ ঘন্টা বেশি সময় কাজ করে। যদিও ঘর গৃহস্থালীর কাজে যুক্ত নারীশ্রমকে অর্থনৈতিক মানদন্ডে কর্মকান্ড হিসেবে ধরা হয়েছে, কিন্তু এর অর্থমূল্য এখন পর্যন্ত জাতীয় আয় গণনায় হিসাব করা হয় না।
নারীর শ্রেণি পরিচিতি সবসময় নির্ধারিত হয় পরিবারের পুরুষ সদস্যের পেশা ও সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে। এমন কি পরিবারের মধ্যে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় নারীরা কম খাদ্য গ্রহণ করে, স্বাস্থ্যসেবা এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ ও সংরক্ষণের সুযোগ তাদের জন্য কম। সাংবিধানিকভাবে নারী ও পুরুষ উভয়েরই সমানাধিকার স্বীকৃত থাকলেও পারিবারিক ও ধর্মীয় আইন নারীর সার্বভৌম সত্ত্বা ও অধিকারকে খর্ব করে রেখেছে। বাংলাদেশের নারী অধিকার আন্দোলন, অসংখ্য নারী অধিকার দল বাংলাদেশের সকল মানুষের জন্য এক ও অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের দাবিতে সোচ্চার রয়েছে। প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল তাদের বিগত নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণে প্রয়োজনীয় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছে। অনেক সেমিনার ও কর্মশালা শেষে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সর্বপ্রথম ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোডের একটি ড্রাফট মডেল তৈরি করে এবং অন্যান্য নারী সংগঠনের সহায়তায় মডেলটির উৎকর্ষ সাধন করে। ১৯৯৬ সালে আইন ও সালিস কেন্দ্রের সহায়তায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোডের চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করে সরকারের নিকট জমা দেয়। কিন্তু সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কারণে এটি এখন পর্যন্ত আইনে পরিণত হয় নি। সিডও’র ওপর প্রণীত এনজিও শ্যাডো রিপোর্ট (২০০৪) পর্যালোচনা শেষে জাতিসংঘ সিডও কমিটি নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈষম্যের সংজ্ঞা নিরূপণ বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ ইত্যাদিসহ পারিবারিক আইনে বৈষম্য দূরীকরণে ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে বাংলাদেশকে পরামর্শ দেয়। বর্তমান আইনি প্রক্রিয়াতে জটিলতা থাকা সত্ত্বেও নারীর জন্য কিছু আইন প্রণীত হয়েছে। মিডিয়েশন কোর্ট প্রতিষ্ঠা, এসিড নিক্ষেপ আইন প্রণয়ন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশ সরকারের একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।
নারী আন্দোলনসমূহ ও নারী মুক্তি প্রচেষ্টা, উন্নয়ন ও পরিবর্তনের প্রতিনিধি হিসেবে নারীর স্বীকৃতি আদায়ের জন্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীদের ব্যাপকতর অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত করেছে। বাংলাদেশে নারী শ্রমশক্তির পরিমাণ প্রায় ২৫ মিলিয়ন। এরমধ্যে মাত্র ১০,০০০ জন নিয়োজিত প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা পেশায়। প্রায় ৭৯% নারী কাজ করে কৃষিখাতে (মৎস্য ও বনায়নসহ), ৯.৯% নারী কাজ করে ম্যানুফ্যাকচারিং ও পরিবহন খাতে, ২.২% নারী বিপণন শ্রমিক ও ০.৬% নিয়োজিত করণিক পর্যায়ের কাজে। আত্মকর্মসংস্থানের অধীনে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, বিশেষত গ্রামীণ অবকাঠামো বিন্যাসে রাস্তা নির্মাণ ও সংরক্ষণ এই বিভাজনের পর্যায়ভুক্ত নয়। নারী সমাজের এক বিশাল অংশ নিয়োজিত স্বকর্মসংস্থানে, বিশেষ করে কৃষি উৎপাদন, মৎস্যচাষ, হাঁস-মুরগী পালন, সবজি বাগান, বসতবাড়ির আশেপাশে বৃক্ষরোপণ এবং অাঁখ, বাঁশ ও বেত উৎপাদনে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের প্রায় ৩৪% হচ্ছে নারী। শহরকেন্দ্রিক শ্রমনির্ভর শিল্প, বিশেষত পোশাক শিল্পে ৮০% কাজ নারীরাই করে থাকে।
শ্রম প্রদান ছাড়াও উন্নয়ন ক্ষেত্র উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের অবদান অপরের জন্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। উদ্যোক্তা হিসেবে নারীরা হস্তশিল্প ব্যবসাকে প্রাধান্য দেন বেশি। শহর ও গ্রামাঞ্চলে তাদের উপার্জনমূলক ক্রিয়াকর্মের মধ্যে রয়েছে কাপড় সেলাই, নকশা, বাটিক, বুটিক, এমব্রয়ডারি ও খাদ্য বিক্রয়। শহরে কর্মজীবী হিসেবে নারীরা যুক্ত আছেন বিপণীকেন্দ্রসমুহে, অভ্যর্থনা ডেস্কে, বিজ্ঞাপনী সংস্থায়, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, আইনব্যবসায়, স্বাস্থ্য বিভাগে, কর্পোরেটেড সেক্টরে, শিল্পকলা, ব্যবস্থাপনা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওতে। সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্তরে জড়িত আছেন সীমিতসংখ্যক নারী।
এক পরিসংখ্যাণে দেখা গেছে যে সর্বমোট ৫১ জন সচিবের মধ্যে মাত্র ২ জন নারী সচিব, ৮০ জন অতিরিক্ত সচিবের মধ্যে ১ জন নারী, ২৫১ জন যুগ্ম সচিবের মধ্যে ৩ জন নারী এবং ৪৭৪ জন উপ-সচিবের মধ্যে মাত্র ৭ জন নারী রয়েছেন। পুলিশ প্রশাসনে বর্তমানে মোট ১ লক্ষ ২৪ হাজার পুলিশের মধ্যে ১৯৫৬ জন নারী কর্মরত আছেন। এরমধ্যে ডি.আইজি পদে ১ জন নারী, এডিশন্যাল ডি.আইজি পদে ৪ জন নারী, এডিশন্যাল এ.এস.পি পদে ১৯ জন নারী, এ.এস.পি পদে ৭৭ জন নারী, ইনস্পেক্টর পদে ৫৩ জন, এস.আই পদে ১৮৯ জন, এ.এস.আই পদে ২৫৩ এবং কনস্টেবল পদে ১৩৩১ জন নারী কাজ করছেন। আর্মি মেডিক্যাল কোরে ১ জন মাত্র নারী ব্রিগেডিয়ার কর্মরত আছেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে ১জন কর ক্যাডারভুক্ত নারী রয়েছেন। তাছাড়া, জাতীয় রাজস্ব বিভাগে কর ক্যাডারে ১৮জন নারী রয়েছেন। এদের মধ্যে কর কমিশনার হচ্ছেন ৪ জন, সহকারি কর কমিশনার ৮ জন এবং যুগ্ম কমিশনার হিসেবে ৬ জন নারী কাজ করছেন। ব্যাকিং সেক্টরে মাত্র ১ জন জেনারেল ম্যানেজার রয়েছেন। সংরক্ষিত কোটা পদ্ধতির ভিত্তিতে নারীরা পুরুষের সাথে সরকারি চাকরি করতে পারেন। সরকারি চাকরিরত ৮৫,০০০ নারীর মধ্যে (কর্মরত মোট জনশক্তির ৮.৬%) মাত্র ১% মন্ত্রণালয়গুলোতে, ১৬.৫৫% স্বায়ত্বশাসিত সংস্থায় এবং ৮২.৫% সাধারণ অফিসে নিয়োগ প্রাপ্ত। এদের মধ্যে ৭% প্রথম শ্রেণির, ৩% দ্বিতীয় শ্রেণির, ৭৫% তৃতীয় শ্রেণির এবং ১৫% চতুর্থ শ্রেণির চাকরিভুক্ত। জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর ভূমিকা সীমিত। রাজনীতি ও জাতীয় সংসদে তাদের অংশগ্রহণ খুবই নগণ্য।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদে সরাসরি নির্বাচনে ৬২ টি আসনে ৫৭জন নারী প্রার্থী ছিলেন। তাদের মধ্য থেকে সর্বাধিক ২৩ জন সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সরাসরি ও সংরক্ষিত আসন মিলে ৩৪৫টি আসন বিশিষ্ট জাতীয় সংসদে মোট ৬৮ জন নারী সদস্য রয়েছেন। মন্ত্রী পরিষদে প্রধান মন্ত্রীসহ ৪ জন নারী মন্ত্রী হিসেবে (স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে) অধিষ্ঠিত আছেন।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন ছিল ৪৫টি। এই ৪৫টি আসনের বিপরীতে আওয়ামী লীগ ৩৫টি, বিএনপি ৫টি, জাতীয় পার্টি ৪টি ও অন্যান্য দল ১টি আসন লাভ করে। এসব আসনে দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দানের ফলে দ্বিতীয় কোনো প্রতিপক্ষ ছিল না। তাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৪৫ জন নারী সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হন। তাদের নির্বাচনের মাধ্যমে সর্বাধিক নারী সদস্য নিয়ে নবম জাতীয় সংসদ যাত্রা শুরু করে।। এছাড়া বিরোধী দলীয় নেত্রী তো রয়েছেন। যে ২৩টি আসনে নারী প্রার্থীরা সরাসরি প্রতিদ্বন্ধিতা করে বিজয়ী হয়েছেন সেখানে ১টি আসন ছাড়া অন্য ২২টি আসনে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন পুরুষ।
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ১৫জন প্রেসিডিয়াম ও সেক্রেটারিয়েট সদস্যের মধ্যে ৪ জন এবং জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ৭৫ জন সদস্যের মধ্যে ৮ জন হচ্ছেন নারী। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ১২-সদস্য বিশিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে মাত্র ১ জন এবং ২৬০-সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটিতে ১২জন নারী রয়েছেন। জাতীয় পাটির (এরশাদ) স্থায়ী কমিটির ৩১জন সদস্যের মধ্যে ২জন নারী ও কার্যনির্বাহী কমিটির ২০০ জন সদস্যের মধ্যে ১৫জন নারী আছেন।
জামায়েতে ইসলামীর মজলিশ-ই-শুরাতে ২৩৭ জন সদস্যের মধ্যে ৩৫ জন নারী রয়েছেন। তবে এ সংগঠনের মজলিশ-ই-আমেলাতে কোনো নারী নেই। বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির ৩৩-সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রিয় কমিটিতে মাত্র ৩ জন নারী সদস্য রয়েছেন। স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক ইউনিটে নির্বাচিত নারীদের অংশগ্রহণ কম। ইউনিয়ন পরিষদে ৪২৭৬ জন নির্বাচিত চেয়ারম্যানের মধ্যে মাত্র ২২ জন নারী ও সাধারণ আসনে নির্বাচিত ৩৮,৪৮৪ সদস্যের মধ্যে ৮৫ জন নারী রয়েছেন।
উন্নয়নে নারী কার্যক্রম এনজিও সেক্টরে বহুল বিস্তৃত। এনজিওদের শীর্ষ সংস্থা এডাবের ১৫ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাহী কমিটিতে ৫জন নারী ছিলেন। ৮৮৬টি সদস্য সংস্থার মধ্যে ৩৮ টি ছিল নারী সংগঠন। ২০০১ সালে অভ্যন্তরিণ কোন্দলে এডাবের কার্যনির্বাহী কমিটি অচল হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ সদস্য এডাব থেকে বের হয়ে The Federation of NGO in Bangladesh নামে পৃথক একটি শীর্ষ সংগঠন গঠন করেন। এই নতুন সংগঠনের ২১ সদস্য বিশিষ্ট কার্যনির্বাহী কমিটিতে ১টি নির্বাচিত ও ৩টি সংরক্ষিত পদে মোট ৪টি নারী সংগঠনকে রাখা হয়। এই সংগঠনের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৪৭৯। এর মধ্যে ৮৫টি নারী সংগঠন রয়েছে। এরা নারীদের মধ্যে কাজ করে এবং তাদের মধ্যে সংগঠন তৈরি, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, আয়মুখী ও ঋণ কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো, মৌলিক মানবাধিকার সংরক্ষণে গতিশীলতা বৃদ্ধি, জীবিকা নির্বাহের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি ও নারীশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি ইত্যাদি ক্ষেত্রে কাজ করে।
উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রচুর প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। নারীরা কৃষি বা অন্য অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিম্ন মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হয়। মজুরি বৈষম্য ছাড়াও নারীদের সাধারণত শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার সমস্যা রয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে প্রবেশের সুযোগ থাকলেও নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের বিবেচনা করা হয় না। সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা গৌণ। সরকারের স্বকর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং অধিকাংশ বেসরকারি সংস্থার অভিষ্ট লক্ষ্যগোষ্ঠীর মধ্যে দরিদ্র ও ভূমিহীন নারীরাও রয়েছেন। কিন্তু এসব কর্মসূচি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো, বিশেষ করে দরিদ্রদের মধ্যে যারা হতদরিদ্র তাদের জন্য কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এখনো সমস্যা হিসেবেই রয়ে গেছে। বিষয়টি বেসরকারি সংস্থার কর্মকান্ডের আওতাভুক্ত হলেও প্রান্তিক পরিবারের নারীরা এসব কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের তেমন সুযোগ পায় না। উন্নয়নে নারীর পূর্বশর্ত হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন ও দক্ষতাবৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। অবিভক্ত বাংলায় নারী উন্নয়ন শুরু হয়েছিল বাল্যবিবাহ, অবরোধ প্রথা ও ধর্মের নামে নারীদের উপর অন্যায় অবিচার প্রতিরোধ আন্দোলনের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে নারী অধিকার ইস্যু হিসেবে শিক্ষা, ভোটাধিকার ও নির্বাচন, কৃষক আন্দোলন, রাজনীতি, অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং প্রশাসনে গুরুত্ব পায়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমে বর্তমানে দারিদ্র্য দূরীকরণ, জনমিতিক পরিবর্তন ও মৌলিক চাহিদা নিরূপক সেবামূলক কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধান ধর্ম, বর্ণ, স্থান ও জন্মের কারণে নারীদের প্রতি বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছে। সরকার নারী উন্নয়নে নারী পুনর্বাসন বোর্ড, পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন, জাতীয় নারী সংস্থা, নারী বিষয়ক অধিদপ্তর, স্বতন্ত্র নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। মহিলা অধিদপ্তর বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় এবং ১৩৬ টি উপজেলায় শাখা খুলেছে। জাতীয় নারী সংস্থা ২৩৬টি উপজেলায় শাখা কার্যক্রম বাস্তবায়িত করছে।
সরকার কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল নির্মাণ, বস্তিবাসী নারীদের সহযোগিতা, কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের জন্য ডে- কেয়ার স্থাপন, স্বতন্ত্র মহিলা বাস সার্ভিস চালু, সরকারি চাকরিতে নারীদের কোটা সংরক্ষণ, নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রকল্প, শহরে ও গ্রামে নারীদের জন্য আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষণ ও নারী সমাজের স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করে, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে আজো এ নীতি কার্যকর করা সম্ভব হয় নি।
বাংলাদেশের সংবিধান, সিডও সনদ, সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র ও নারী উন্নয়ন নীতিতে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন গুরুত্ব পেয়েছে; গুরুত্ব পেয়েছে নারীর কর্মসংস্থান ও তার নিরাপত্তার বিষয়টি। সিডও সনদের ২নং ধারা (যা বাংলাদেশের সংবিধানের ২৬,২৭,২৮,২৯ ধারার সাথে সংগতিপূর্ণ) ও ১৬নং ধারা নারীর স্বার্থ সংরক্ষণের কথা বলছে। অথচ এ দুটি ধারা বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন পায় নি। বাংলাদেশ সকল প্রকার নারী বৈষম্য সংক্রান্ত জাতিসংঘ কনভেনশনে এ দুটি ধারা বাদ দিয়ে স্বাক্ষর করেছে। তবে বেইজিং প্লাটফর্ম ফর অ্যাকশনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। বেইজিং ফোরাম কর্তৃক চিহ্নিত নারী উন্নয়নের ১২টি প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সরকার ও এনজিওদের সাথে যৌথ কর্মকৌশল গ্রহণ করেছে।
বেইজিং ফোরাম এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের সুপারিশমালার আলোকে বাংলাদেশ সরকার ও এনজিওসমূহ অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করেছে এবং তা বাস্তবায়নে কৃষি, বন ও পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, সমাজকল্যাণ, তথ্য, পরিকল্পনা, যুব ও ক্রীড়া, সংস্কৃতি, পররাষ্ট্র, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করেছে। মন্ত্রণালয়ের বাইরে যেসব সংস্থা এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছে এদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, নারী সংগঠন, গণসংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, নেটওয়ার্ক ফোরাম এবং এনজিও। বাংলাদেশে শ্রমশক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সাধারণভাবে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ খুব সীমিত। বাংলাদেশ সরকার ও এনজিওসমূহ দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য নানারকম কর্মসূচি নিয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনের একটি উপায় হচ্ছে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, বিশেষ করে এমন সব প্রকল্পের মাধ্যমে যেগুলি নারীদের শিল্পোদ্যোগের মাধ্যমে আয় সৃষ্টির কাজে নিয়োজিত রাখে।
ঐতিহাসিকভাবে, উন্নত ও উন্নয়শীল সব দেশেই শিল্প ও ব্যবসায়িক উদ্যোগে নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা অনেক বেশি। বাংলাদেশেও নারীরা এখনও শিল্প ও ব্যবসায়িক উদ্যোগের মূল ধারায় আসে নি। শুধু ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসায়িক উদ্যোগে নারীর কিছু উপস্থিতি রয়েছে, অন্যত্র তাদের উপস্থিতি একেবারেই নগণ্য। অধিকাংশ নারী উদ্যোক্তাই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তারা প্রধানত গ্রামাঞ্চলের বাজারে কেন্দ্রীভূত অনানুষ্ঠানিক শিল্প খাতে কাজ করেন। তবে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো পরিকল্পিত ও সংগঠিত শিল্প খাতেও স্বল্প কিছুসংখ্যক নারী উদ্যোক্তার উপস্থিতি নজরে পড়ে।
সামাজিক কাঠামো ও আন্তসম্পর্ক থেকে উদ্ভূত সুযোগ-সুবিধাদি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় বঞ্চিত এমন দৃষ্টান্ত যথেষ্ট রয়েছে। প্রথমত, শিক্ষার অভাবে ও চলাফেরায় সামাজিক বাধানিষেধের কারণে অধিকাংশ নারীই নিজেদের ক্ষমতা ও ব্যবসায়িক সুযোগের সদ্ব্যবহার করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সচেতন নন। দ্বিতীয়ত, অন্যান্য সকল যোগ্যতা থাকলেও নারীরা প্রায়শই ব্যবসায়িক উদ্যোগে ঝুঁকি নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ পায় না, বা পুঁজির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। তৃতীয়ত, এমন কিছু আইনগত বাধা ও সামাজিক রীতিনীতি রয়েছে যেগুলি শিল্প ও ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, নারীরা যদি সামান্য কিছু ঋণের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলির কাছে আবেদন করে তাহলে তাদের অন্তত একজন পুরুষ অংশীদার থাকতে হবে। এ কারণে নারী উদ্যোক্তারা যদি অপেক্ষাকৃত বড় কোনো ব্যবসায়িক কর্মকান্ড শুরু করতে চায় তাহলে তাদের পুরুষের সঙ্গে যৌথভাবে তা করতে হয়। একইভাবে, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ লাভের ক্ষেত্রে শর্তাদি সম্পর্কে দরকষাকষিতে নারীদের সামর্থ্যের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে সমাজে প্রচলিত লিঙ্গ সম্পর্কিত ধ্যানধারণা ও মানসিকতা। নারী উদ্যোক্তাদের সামনে আরও কিছু বিশেষ ধরনের সমস্যাও রয়েছে। পুরুষেরা নারী উদ্যোক্তাদের গুরুত্বের সঙ্গে নিতে চায় না। নারীদের ওপর এর একটা নিরাশাব্যঞ্জক প্রভাব রয়েছে। পুরুষ উদ্যোক্তাদের প্রাধান্যে পরিচালিত বাজারে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকা নারী উদ্যোক্তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। চলাফেরার ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগত সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক বিধিনিষেধের কারণেও নারী উদ্যোক্তারা অপরিচিত পুরুষদের সঙ্গে ব্যবসায়িক আলোচনা বা দরকষাকষিতে যেতে আগ্রহী হয় না।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা প্রণীত বাংলাদেশ বিষয়ক একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বাড়তি অসুবিধা সৃষ্টি করে এমন কিছু বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ঋণভিত্তিক কর্মকান্ডের বাইরে প্রধানত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসায়িক উদ্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সমীক্ষা জরিপের ওপর ভিত্তি করে এই বিষয়গুলি চিহ্নিত করা হয়েছে। ঐ প্রতিবেদনে দেখা যায়, একই ধরনের ব্যবসায়িক উদ্যোগ শুরু করার আগে পুরুষ উদ্যোক্তাদের কাজের অভিজ্ঞতা নারী উদ্যোক্তাদের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। পুরুষদের অভিজ্ঞতা গড়ে ৪.৯ বছর, আর নারীদের অভিজ্ঞতা গড়ে মাত্র ০.৮ বছর। অধিকাংশ পুরুষ উদ্যোক্তা (জরিপকৃতদের ৭৩.৮ শতাংশ) নিজেদের সঞ্চয় থেকে একটা মোটামুটি অঙ্কের নিট নিজস্ব মূলধন সৃষ্টি করতে পারে, অন্যদিকে নারীদের মধ্যে মাত্র ৪০.১ শতাংশ সামান্য কিছু সঞ্চয় করতে পারে। ফলে নারীরা ব্যাংকের ঋণ সমমূলধনের অনুপাতের শর্ত পূরণে সমস্যার সম্মুখীন হয়, যার ফলে নারীরা ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য বিবেচিত হয়। নারী উদ্যোক্তাদের চলাফেরায় সীমাবদ্ধতার কারণে নারীর মালিকানাধীন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের অবস্থান লক্ষ্য করা যায় বাসস্থানের সীমানার মধ্যে। এর ফলে নারীরা প্রায়শই বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি লক্ষ্য করা গেছে তা হলো কোনো ব্যবসায়ে উদ্যোগ নিতে একজন নারী উদ্যোক্তার প্রাথমিক পুঁজি একই ধরনের ব্যবসার শুরুতে একজন পুরুষ উদ্যোক্তার প্রাথমিক পুঁজির মাত্র এক ষষ্ঠাংশ।
ক্ষুদ্র ঋণভিত্তিক ব্যবসায়িক কর্মকান্ডের বাইরে একটা নতুন প্রবণতা ইদানীং লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যিক ও সেবা খাতে নারীদের গৃহীত উদ্যোগের সংখ্যা বাড়ছে। এসব নারী মূলত ধনী পরিবার থেকে আগত এবং তারা কিছু কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বাধাবিপত্তি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম। বড় বড় শহরে এখন নারীদের মালিকানায় পরিচালিত অনেক বাটিক, বিউটি পারলার, রেস্তোরাঁ ইত্যাদি দেখা যায়। নারী স্থপতি ও প্রকৌশলীদের অনেকেই এখন পুরুষ পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করার পরিবর্তে নিজেরাই কনসাল্টিং ব্যবসা শুরু করছেন। তা ছাড়া মনোহারি দোকান, স্বাস্থ্য ক্লিনিক, কোল্ড স্টোরেজ, ভ্রমণ ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার মতো নানা ধরনের ব্যবসা নারীরা চালাচ্ছেন এমন দৃশ্যও এখন আর বিরল নয়। অনেক নারী উদ্যোক্তা বিদ্যালয়, বিশেষত ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়, টিউটোরিয়াল স্থাপনেও আকৃষ্ট হচ্ছেন। একজন নারী উদ্যোক্তা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছেন। সংখ্যায় কম হলেও নারীদের প্রতিষ্ঠিত তৈরি পোশাকের কারখানাও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৮০ সালে একজন নারী উদ্যোক্তা বৈশাখী গার্মেন্টস নামে একটি তৈরি পোশাক কারখানা স্থাপন করেছেন যা এ দেশে প্রাচীন গার্মেন্টস কারখানাগুলির অন্যতম।
নারী উদ্যোক্তারা সামাজিক পুঁজি সংগঠনের প্রয়াস অব্যাহত রেখেছেন। শহরাঞ্চলের নারীরা নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কার্যকারিতা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। ঢাকার নারী উদ্যোক্তারা একটি সমিতি গঠন করেছেন যার মাধ্যমে শিল্পে ও ব্যবসায়ে নারীদের পৃষ্ঠপোষকতা দানের প্রয়াস চলছে। নারীদের শিল্প ও ব্যবসায়িক উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষকতার উদ্দেশ্যে মাইডাস (Micro Industries Develpoment Assistance Society) দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় নারী উদ্যোক্তার নেতৃত্বে একটি নারী উদ্যোগ উন্নয়ন কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি জামানত ছাড়া ঋণ দানের মাধ্যমে নারীদের ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। এই কমিটির মাসিক বৈঠকে ব্যবসায়িক কর্মকান্ডের নানা দিক সম্পর্কে নারী উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দেয়া হয়।
ঐতিহাসিকভাবে, বাংলাদেশের নারীরা অনেক ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে থাকেন, বিশেষত গৃহস্থালী ও খামারভিত্তিক অর্থনেতিক কর্মকান্ডে ঐতিহ্যগতভাবেই তাদের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। তারা নিজেদের পুঁজি বা ধার করা পুঁজি খামার গড়া বা শাকসবজির বাগান করার কাজে লাগিয়ে কিছু অর্থ উপার্জন করে থাকেন। এই অর্থে তাদের উদ্যোক্তাই বলা যায়। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থা প্রচলনের পর থেকে এই শ্রেণীর নারী উদ্যোক্তারা অত্যন্ত দৃশমান হয়ে উঠেছেন। পৃথক পৃথকভাবে এসব উদ্যোগের আকার বেশ ছোট বটে, কিন্তু গোষ্ঠী হিসেবে সাকুল্যে তারাই বাংলাদেশের বৃহত্তম নারী উদ্যোক্তা শ্রেণী।
শিল্প ও ব্যবসায়িক উদ্যোগে সাফল্যের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্যজ্ঞান, শিক্ষাগত মান এবং শিল্প ও ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে উন্নয়ন সাধনের সর্বাপেক্ষা কার্যকর উপায় হচ্ছে নারী উন্নয়নে সরকারের বিনিয়োগ। নারী উদ্যোগ বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাসমূহের মধ্যকার সহযোগিতামূলক সম্পর্কে উৎসাহিত করে থাকে। নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে বেশ কিছু কর্মসূচি ও প্রকল্পের বাস্তবায়ন চলছে। নারীদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নানা বাধাবিপত্তি ছাড়াও একটা প্রধান বাধা হচ্ছে নারীদের ঋণ লাভের সুযোগের অভাব। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচির সাফল্যের পর তাদের অনুসরণে ব্যাপক সংখ্যক এনজিও ও জাতীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ক্ষুদ্র অর্থায়নের ফলে নারীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলির মাধ্যমে নারীরা নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তা পাচ্ছেন। এখন অনেক নারীই অন্যের প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করার পরিবর্তে আত্ম-কর্মসংস্থান বেশি পছন্দ করেন। চাকুরির কঠোর শর্তাবলি, শিশুদের দেখাশোনা করার সুযোগের অভাব, অগ্রহণযোগ্য কাজের পরিবেশ, কাজের নির্দিষ্ট সময়ের অনমনীয়তা, চাকুরিক্ষেত্রে হতাশা, লিঙ্গ বৈষম্য ইত্যাদি কারণে অনেক নারীই এখন অন্যের প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করতে আগ্রহী নন।
পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৯৭-২০০২) নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রচলিত কিছু আইন সংশোধনের শর্তারোপ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ঋণের ব্যাপারে সামর্থ্য সৃষ্টিতে সহায়তা যোগানোর উদ্দেশ্যে সরকার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা তৈরি করেছে। নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে গ্রামীণ ব্যাংকের সৃজনশীল ভূমিকা অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে। গ্রামীণ ব্যাংকের অনুসরণে অনেক এনজিও এখন নারী উদ্যোক্তাদের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে অবদান রাখছে, যদিও তাদের সহযোগিতা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নানা উদ্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। খামার-বহির্ভূত কর্মকান্ড যেমন আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদন, উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ, হাতে তৈরি কাগজ উৎপাদন এবং তৈরি পোশাক শিল্পের বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ইত্যাদি কর্মকান্ডে ব্র্যাকের রুর্যাল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্ট নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করছে। ব্র্যাকের কর্মসূচি সহায়ক উদ্যোগগুলি তাদের গ্রুপ-সদস্য নারীদের ব্যবসায়িক ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে থাকে। কিন্তু নারী উদ্যোক্তারা তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। তাদের কর্মকান্ড মূলত স্থানীয় বাজারগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অবশ্য দুধ, ডিম, হাঁস-মুরগি, হস্তশিল্পজাত পণ্য, তৈরি খাদ্য, গরু মোটাতাজাকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিছু কিছু বাজার নেটওয়ার্ক ক্রমশ গড়ে উঠছে।