সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : এক শ্রেণীর অসাধু ব্যক্তিরা বিশ দিয়ে সুন্দরবনের ও বঙ্গোপসাগরের কিনারের খালে চিংড়ি মাছ আহরণ করায় হুমকির মুখে পড়েছে চিংড়ি সম্পদ। এভাবে চলতে থাকলে এক দশকের মধ্যে সুন্দরবন ও সামুদ্রিক চিংড়ি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সে কারণে সরকারকে অতি দ্রুতই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন মাছ বিজ্ঞানীরা।১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময় বাংলায় মৎস্যজীবীদের ১২০টি সমবায় ছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মৎস্যজীবীদের সমবায়ের সূচনা হয় ১৯৬০ সালে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়। সাবেক প্রাদেশিক মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি’ রাখা হয়। সমিতির লক্ষ্যসমূহ হচ্ছে: ১. মাছ ধরার সরঞ্জাম সংগ্রহ ও মৎস্যজীবীদের মধ্যে সেগুলি ন্যায্যমূল্যে সরবরাহ করা; ২. সদস্যদের অর্থযোগানের জন্য অধিভুক্ত সমিতিগুলিকে ঋণদান; ৩. মাছ ধরার আধুনিক কলাকৌশল প্রবর্তন; ৪. বরফ কারখানা স্থাপন, হিমাগার নির্মাণ, জাল তৈরির যন্ত্রপাতি বসানো ইত্যাদি; ৫. মাছ বাজারজাত করার ব্যবস্থা এবং মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানির জন্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট স্থাপন এবং ৬. মৎস্যজীবীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন সাধন।
বাংলাদেশে জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি প্রথাগত পিরামিডের মতো প্রাথমিক (নিচে), মধ্য ও শীর্ষ (উপরে) এই তিন স্তরবিশিষ্ট। জাতীয় সমিতি একটি (শীর্ষ), মাধ্যমিক সমিতির সংখ্যা প্রায় ৮০ ও প্রাথমিক সমিতির সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ। সরকার কর্তৃক ১৯৮৬ সালে নতুন উন্মুক্ত জলাশয় মৎস্য ব্যবস্থাপনা নীতি বাস্তবায়নের পর অভ্যন্তরীণ খাতে ‘বাংলাদেশ জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতি’ গঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশে সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর ১৯৫৭-৫৮ সালে প্রথম নাইলন সুতার জালসহ মাছ ধরার যন্ত্রচালিত নৌকা প্রবর্তন করে। অতঃপর ‘বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন’ ও সমবায় সমিতির মাধ্যমে যান্ত্রিকীকরণ কর্মসূচির প্রসার ঘটে।
বর্তমানে গ্রামীণ ব্যাংকের মৎস্য ফাউন্ডেশন, ব্র্যাক, কারিতাস, প্রশিকা ইত্যাদি বেসরকারি সংস্থা জেলে সম্প্রদায়ের উন্নয়নে সরাসরি জড়িত রয়েছে। মহিলারা চিরাচরিত জালবোনা, জাল মেরামত, জাল শুকানো ও মাছ শুকানো ছাড়াও বর্তমানে অধিক সংখ্যায় মৎস্য উৎপাদনে অংশগ্রহণ করছে। management) মৎস্যচাষে জলাশয়গুলিতে অধিক উৎপাদনশীলতার জন্য গৃহীত সামগ্রিক ব্যবস্থাদি। এই ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হলো যথাযথ ব্যবস্থাপনা দক্ষতায় সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ে জলাশয়ের সীমিত পরিসরে মৎস্য খাদ্য ও যত্নের জন্য সর্বনিম্ন ব্যয়ে সর্বাধিক পরিমাণ মৎস্যখাদ্যের রূপান্তর হার (feed conversion ratio/FCR) ও মুনাফা অর্জন। ব্যবস্থাপনার অন্যান্য দিকের মধ্যে রয়েছে পানির সবচেয়ে অনুকূল ভৌত রাসায়নিক ও পরিবেশগত অবস্থা অব্যাহত রাখা, পর্যাপ্ত আলো, বায়ু চলাচল ও রোগমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং পানির তলদেশের মাটির উর্বরতা সুরক্ষা ও প্রাকৃতিক প্লাবন প্রতিরোধ।
বাংলাদেশে মৎস্যখামারের মধ্যে রয়েছে প্রধানত নার্সারি, পোনাবর্ধন ও মাছ মজুদে ব্যবহার্য নানা আকার আয়তনের পুকুর। নার্সারি পুকুরগুলি সাধারণত ০.১ একরের কম আয়তনের, আয়তাকার ও ০.৭৫-১ মিটার গভীর। পোনাবর্ধন পুকুরগুলি ০.১১-০.৬৬ একর, আয়তাকার ও ১-১.৫ মিটার গভীর। মজুদের পুকুরগুলিও আয়তাকার, ০.৬৭- ১.৫ একর ও ১.৫-২ মিটার গভীর।
পোনা মজুদ স্থানান্তরিত মাছের পোনাগুলিকে ১০-২০ মিনিট নতুন পরিবেশে অভ্যস্ত করে এক-পর্যায় ব্যবস্থাপনায় ৬-৮ গ্রাম/ডেসিমাল, আর দুই-পর্যায় ব্যবস্থাপনায় ১৫-২০ গ্রাম/ডেসিমাল হিসেবে পুকুরে ছাড়া যেতে পারে। ব্যবস্থাপনার চাহিদানুযায়ী মাছের দৈহিক বৃদ্ধির হার পরীক্ষা, ব্যায়াম, খাদ্যের মূল্যায়ন, পুকুরের তলা রেকিং ও অন্যান্য পরিবর্তনের জন্য প্রতি দুই সপ্তাহে একবার পোনা জালে ধরা যেতে পারে।
মাছের স্বাভাবিক খাদ্য হিসেবে প্লাঙ্কটনের অবিরাম বৃদ্ধির জন্য প্রতিদিন সামান্য মাত্রায় সার (১৫ গ্রাম ইউরিয়া, ২৫ গ্রাম টিএসপি/ডেসিমাল) প্রয়োগসহ পানি নাড়াচাড়া করা দরকার। সকাল ও দুপুরের খাবারের জন্য সমপরিমাণ ভিজা খৈল ও গম বা চালের ভুসি পুকুরের পাড়ের কাছাকাছি ছড়ানো প্রয়োজন। মাছ না তোলা পর্যন্ত মেঘলা ও বৃষ্টির দিন ছাড়া প্রত্যহ এভাবে খাবার দিতে হবে।
মৎস আহরণ আগাম (মার্চ-জুন) মৎস্যচাষের জন্য এক-পর্যায় চাষে ৪-৫ সপ্তাহের মধ্যে এবং দুই-পর্যায় চাষে পোনা ছাড়ার ২ সপ্তাহ পরে মাছের সংখ্যা কমাতে হয়। ব্যতিক্রম ঘটে বিলম্ব (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মৎস্যচাষের ক্ষেত্রে।
পালনের পুকুর এ ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরনের ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা হয়, তবে মাছের ঘনত্ব রাখা হয় ১০০০ পোনা/ডেসিমাল এবং হ্রাসকৃত খাদ্যহার (দেহের ওজনের ৫%) দিনে একবার।
মজুদের পুকুর মজুদের আগে ৩০০ ppm KMnO4 দ্রবণে ২-৩ মিনিট মাছের পোনার নির্বীজন আবশ্যক।
পুকুরের আয়তন, ভূসংস্থান, পুকুর পাড়ের গাছগাছড়া, তলার মাটির ধরন ও পুকুরের সর্বমোট উৎপাদনশীলতার সঙ্গে মজুদের পরিমাণ লাগসই হওয়া উচিত। স্বাভাবিক খাদ্য বা সম্পূরক খাদ্য সাপেক্ষে বাংলাদেশের পুকুরে প্রতিপালনের জন্য মৎস্যবিজ্ঞানীরা মৎস্য মজুদের নিম্নোক্ত সংমিশ্রণ অনুমোদন করেন। and diseases) মাছের পরজীবী মাছের শরীরের উপরে বা ভিতরে বসবাসকারী এবং পোষক মাছ থেকে খাদ্যগ্রহণকারী জলজ জীব। এগুলি বাহ্যিক, অভ্যন্তরীণ এবং রোগ সৃষ্টিকারী (pathogenic) বা রোগ সৃষ্টি করে না এমন (non-pathogenic) হতে পারে। পুকুর, জলা ও অ্যাকুয়ারিয়ামের মতো কৃত্রিম জলাশয়ে মাছচাষ করলে মাছের পরজীবিজনিত রোগের অধিক প্রকোপ ঘটে। কোন কৃত্রিম পরিবেশে এক বা একাধিক প্রজাতির মাছের অত্যধিক ঘনত্বের চাপই পরজীবীদের অধিক সংখ্যাবৃদ্ধির কারণ, যা প্রাকৃতিক পরিস্থিতিতে ততটা দেখা যায় না। সেজন্য পরজীবিঘটিত রোগের প্রকোপ প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা মাছের তুলনায় কৃত্রিমভাবে চাষকৃত মাছে অধিক।
পরজীবী সংক্রমণ থেকে পোনামাছের মৃত্যু ও বাড়ন্ত মাছের পুষ্টিঘাটতির ফলে মাছ উৎপাদন যথেষ্ট হ্রাস পায়। পরজীবীরা বিশেষ বিশেষ অঙ্গপ্রতঙ্গসহ মাছের প্রায় সবগুলি অঙ্গপ্রত্যঙ্গই আক্রমণ করতে পারে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মাছের ১৩০ প্রজাতির পরজীবী শনাক্ত করা হয়েছে। সেগুলির মধ্যে সচরাচর দেখা যায় ও গুরুত্বপূর্ণ দলগুলি নিম্নরূপ:
প্রটোজোয়া পরজীবী কালো দাগ। শামুক (Limnea) ও বক যথাক্রমে মাধ্যমিক ও শেষ বাহক। Clinostomiasis/হলুদ কীড়ারোগ- Clinostomum complanatum- জীবাণুর লার্ভাঘটিত; ত্বক, পাখনা ও ফুলকা থেকে হূৎপিন্ড ও মাংসপেশীতে ছড়ায় এবং হলুদ বা ঘি রঙের সিস্ট তৈরি করে। Ligulosis– Ligula inestinalis নামের ফিতাকৃমি (১০-১০০ সেমি লম্বা ও ০.৬-১.২ সেমি চওড়া) অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও উদরের প্রদাহ ঘটায়। Caryophyllidiasis– ক্যাটফিসের অন্ত্রে অবস্থানকারী Lytocestus indicus, L. parvulus, Bovienia serialis, Djombangia penetrans ঘটিত রোগ। Piscicolasis– Piscicola geometra জোঁকের আক্রমণঘটিত রোগ; সাধারণত প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছে থাকে, কিন্তু বর্ষাকালে প্রায়ই চাষকৃত মাছেও দেখা যায়; ত্বক, পাখনা, ফুলকা, মুখ ও চোখ আক্রমণ করে। Ergasiliasis– Ergasilus species ঘটিত কার্প ও ক্যাটফিসের ফুলকার রোগ, ব্যাপকভাবে ছড়াতে পারে। এক্ষেত্রে পুকুরে Neguvon বা Dipterex (০.২৫-০.৫ ppm) প্রয়োগ করে প্রতিরোধ করা যায়। Lernaeasis/অ্যাঙ্করওয়ার্ম সংক্রমণ- Lernaea cyprinacea ঘটিত রোগ। স্ত্রী লার্ভা মাছের শরীরে গর্ত করে ঢোকে এবং বাইরে কাঁটা বা কুর্চের মতো বেরিয়ে থাকে, প্রায়শ দেহের গভীরে পৌঁছে অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিনষ্ট করে। Argulosis/মাছের উকুনরোগ- পরজীবী Argulus species শুঁড় দিয়ে চামড়া ফুটো করে মাছের রক্ত চুষে খায়; ত্বক, পাখনা ও ফুলকা আক্রমণ করে এবং বিষ ঢুকিয়ে মাছের মৃত্যু ঘটায়।
অ-পরজীবী মৎস্যরোগ মাছ দেহের তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না বিধায় সহজেই, বিশেষত জটিল কৃত্রিম পরিবেশগত পরিস্থিতিতে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। মাছ ও রোগজীবাণুর মধ্যেকার ভারসাম্যগত অবস্থা ভেঙে গিয়ে রোগের অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি হলে, প্রধানত পরিবেশের অবক্ষয়জনিত কারণে রোগ দেখা দেয়।
মৎস্যরোগের বাহ্যিক ও আচরণগত লক্ষণ হলো: দেহবর্ণের ঔজ্জ্বল্য হ্রাস ও রঞ্জককণার পরিবর্তন, নিশ্চল বা অস্থির সাঁতার, ভারসাম্যহীনতা, দলবদ্ধতা ও পানির উপর ভেসে ওঠা, অস্বাভাবিক ঢোক গেলা; দেহের অস্বাভাবিক স্ফীতি বা কৃশতা, রক্তশূন্যতা, অক্ষিস্ফীতি, হূৎপিন্ডস্ফীতি, ত্বকে ক্ষত, পাখনা ও ত্বক ক্ষয়, স্ফীত অাঁশ, অত্যধিক মিউকাস নিঃসরণ, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি। অভ্যন্তরীণ লক্ষণের মধ্যে আছে দেহগহবরে ঈষৎস্বচ্ছ তরল জমা হওয়া, দেহগহবরের স্ফীতি বা সঙ্কোচন, গভীর ক্ষত, অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্তক্ষরণের চিহ্ন বা সিস্ট।
মৎস্যরোগের মূলে রয়েছে পানির গুণমানের অবনতি, অধিক মাছ মজুদ ও অতিরিক্ত খাদ্য সরবরাহের জন্য পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়া ইত্যাদি। পানিদূষণ, পুকুর ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ইত্যাদিও মাছে রোগ উৎপাদনের সহায়ক।
পরজীবী ছাড়াও মৎস্যরোগের অন্যান্য কারণ রোগজীবাণু, পরিবেশের অবক্ষয়, পুষ্টির অভাব ও বংশানুসৃত ত্রুটি। বাংলাদেশে সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ অ-পরজীবী মৎস্যরোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ১. ভাইরাসঘটিত রোগ- বাংলাদেশে এই ধরনের কোন রোগ এখনও নেই। ২. ব্যাক্টেরিয়াঘটিত রোগ- Columnaris রোগ- রোগের জীবাণু Flexibacter columnaris; স্বাদুপানির প্রায় সকল প্রজাতির মাছের ত্বক, পাখনা ও ফুলকাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ আক্রমণ করে, ফলে ক্ষত ও রক্তক্ষরণ ঘটে। অক্সিজেনের ঘাটতি ও জমাকৃত বিপাকীয় বর্জ্যই এ রোগের প্রধান কারণ। রক্তক্ষরাজনিত সেপ্টিসেমিয়া (শোথ)- Aeromonas hydrophila ও Pseudomonas florsescence আক্রমণে শরীরে ক্ষত, রক্তক্ষরণ এবং অন্ত্র, লিভার, প্লীহা ও বৃক্কে অস্বচ্ছ তরল সঞ্চয়সহ উদরস্ফীতি দেখা দেয়। অাঁশ ফেঁপে ওঠা (scale protrusion) রোগের মূলে রয়েছে Pseudomonas ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ। এই রোগে অাঁশগুলি ফুলে উঠে ফাঁক ফাঁক হয়ে যায় এবং অাঁশের মাঝখানে নির্গত তরল জমা হয়। ব্যাক্টেরিয়াঘটিত ফুলকাপচা রোগ Myxobacteria জীবাণুর দ্বারা ঘটে এবং সাধারণত অল্পবয়সী কার্প মাছের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। ফুলকার পচন এবং শ্বাসকষ্ট থেকে মাছ মারা যায়। পুকুরে চুন প্রয়োগে এ রোগের প্রকোপ কমে। ৩. ছত্রাকরোগ- Saprolegniasis রোগ দেখা দেয় Saprolegnia প্রজাতির ছত্রাকের আক্রমণে। এতে স্বাদুপানির মাছ, ডিম ও পোনা ব্যাপক হারে আক্রান্ত হয়। এ রোগে ত্বকের প্রদাহ থেকে মাংসপেশীর পচন ঘটে; Branchiomycosis রোগ দেখা দেয় Branchiomyces-এর কয়েক প্রজাতির আক্রমণে। এতে ছত্রাকের অণুসূত্রে রক্তনালীগুলি আবদ্ধ হয়ে ফুলকায় ক্ষত দেখা দিলে রক্তপ্রবাহে বিঘ্ন ঘটে, ফলে মাছের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
অপুষ্টিজনিত রোগ মাছের অপুষ্টিজনিত রোগের মধ্যে ভিটামিন ‘সি’-র অভাবজনিত রোগ পুকুরের কার্প ও ক্যাটফিশের মধ্যে সাধারণত দেখা যায়। মাছ প্রধানত মূল খাদ্যের সঙ্গে জলজ আগাছা ও শৈবাল থেকে ভিটামিন সি পেয়ে থাকে, কিন্তু নিবিড় চাষে তাদের মধ্যে মেরুদন্ডবক্রতা (Lordosis/Scoliosis) দেখা দেয়। এ রোগে কার্প ও ক্যাটফিশ বেশি আক্রান্ত হয় এবং তাদের বৃদ্ধি হ্রাস পায়, দেহবিকৃতি ঘটে। অধিকন্তু করোটির অস্থিগঠন ব্যাহত হওয়ার দরুন ‘মাথাভাঙ্গা’ রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। রোগের সংক্রমণে মাছের থুতনির নিচ থেকে রক্তক্ষরণ হয়, যা আফ্রিকান মাগুরে বেশি দেখা যায়।
পরিবেশগত রোগ পরিবেশগত অবক্ষয়ের দরুন ব্যাপক হারে মাছ মারা যেতে পারে এবং মাছের বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। তন্মধ্যে অত্যধিক অক্সিজেন বা নাইট্রোজেন সম্পৃক্ততার কারণে সৃষ্ট গ্যাস-বুদ্বুদ রোগ অনেক মাছে লক্ষ্য করা যায়। এ রোগে পোনার কুসুমথলি, চোখের অধঃত্বক, ফুলকা ও পটকায় এবং পূর্ণবয়স্ক মাছের দেহগহবরে গ্যাস-বুদ্বুদ দেখা যায়। আক্রান্ত মাছে রং গাঢ়, চলাচলে ভারসাম্যহীনতা এবং শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা যায়।
ত্বকের ক্ষতজনিত সিনড্রোম (Epizootic Ulcerative Syndrome/EUS) প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম জলাশয়ের বিভিন্ন ধরনের মাছের একটি সংক্রামক রোগ। এতে শরীরে গভীর ক্ষত দেখা দেয় ও মাছ মারা যায়। এ রোগ স্বাদুপানি ও মোহনার মাছের মৌসুমি পরজীবী Aphanomyces-এর সংক্রমণ থেকে দেখা দেয়। প্রবল বৃষ্টিপাত ও বন্যায় পানির ক্ষারত্ব, ক্লোরাইড ও লবণাক্ততা হঠাৎ হ্রাস পেলে এবং পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা কমে গেলে এ রোগ দেখা দেয়। বাংলাদেশে রোগটি ১৯৮৮ সালে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে প্রথম দেখা দেয়। এটি এখনও মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়নি। তবে মাছের ব্যাপক মৃত্যুজনিত কারণে মৎস্য সম্পদের অবনতি ঘটে। রোগাক্রান্ত মাছ বিক্রির অযোগ্য হয়ে পড়ে।
সর্বাধিক রোগপ্রবণ হলো নিম্নস্তরে বসবাসকারী মাংসাশী বিভিন্ন মাছ। এর পরে রোগপ্রবণ হচ্ছে মধ্যস্তরের প্রজাতিগুলি। বাতাস থেকে শ্বাসগ্রহণকারী অনেক জাতের মাছ যেমন, টাকি (Channa punctatus), শোল (C. striatus), কই (Anabas testudineus), মাগুর (Clarias batrachus) এবং শিঙ্গি (Heteropneustes fossilis) কমবেশি সমভাবে এ রোগে আক্রান্ত হয়। সর্বাধিক আক্রমণ ঘটতে দেখা গেছে শোল-টাকি প্রজাতিতে (৩০%), তারপর যথাক্রমে পুঁটি প্রজাতিগুলি (Puntius species), মেনি (Nandus nandus), ও কুচিয়া (Monopterus cuchia)- যারা নিচুস্তরের কদমাক্ত পরিবেশে বাস করে। টাকি-শোল মারাত্মক ক্ষত নিয়েও দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। তবে অন্য প্রজাতিগুলি দ্রুত মারা যায়।
মৎস্য অথবা মৎস্যজাত দ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকান্ড। উৎপাদক, মধ্যম, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা এবং ভোক্তার সমন্বয়ে মৎস্য উৎপাদন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ, পরিবহণ ও বিপণন তিনটি বিপণন প্রায় পুরোটাই সম্পন্ন হয় ব্যক্তিগত খাতে। গ্রামীণ বাজার (হাট), শহরের মার্কেট (বাজার), জনসমাগমস্থল, শহুরে পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলির এক জটিল পদ্ধতির মাধ্যমে এ বিপণন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এ নেটওয়ার্কের মধ্যে রয়েছে মাছ নামানোর ঘাটগুলিতে ক্রেতাদের প্রতিযোগিতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার যোগান দেওয়া। অনেক সময় মৎস্যজীবীরা ব্যবসায়ী/দালালদের (আড়তদার/পাইকার) নির্ধারিত দামেই তাদের কাছে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হয়। মধ্যগ কেবল মাছ ব্যবসায়ী নয়, সে নিজেও মৎস্যজীবী হতে পারে এবং হতে পারে নৌকা, জাল ইত্যাদির মতো পুঁজির মালিক, যা সে মৎস্যজীবীদের ইজারা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সে এগুলি চালাতে নির্দিষ্ট মজুরির বিনিময়ে জেলেদের মাছ ধরার শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগায় এবং ন্যায্য পাওনা থেকে তাদের বঞ্চিত করে।
বিভিন্ন সমস্যা সত্ত্বেও বাংলাদেশে মাছ বিপণন ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর এবং গুণগত মানের খুব বেশি অবনতি না ঘটিয়েই প্রয়োজনমতো বাজারকেন্দ্রগুলিতে যথাসময়ে মাছের চালান পৌঁছায়। মৎস্যজীবীদের নিকট থেকে মাছ সংগ্রহে নৌকা ব্যবহূত হয়। বরফসহ মোড়কবদ্ধ মাছ ট্রাক ও বাসে করে বড় বড় শহরে পৌঁছায়।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন চট্টগ্রামে আধুনিক মৎস্য পোতাশ্রয় এবং কক্সবাজার, বরিশাল, খেপুপাড়া, পাথরঘাটা ও খুলনায় সামুদ্রিক মাছের, আর রাঙ্গামাটি, কাপ্তাই, রাজশাহী ও ডাবরে স্বাদুপানির মাছের অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। পোতাশ্রয় ও সকল অবতরণ কেন্দ্রে নোঙর বাঁধা, নিলাম ডাকা, বরফকল, হিমাগার, ফ্রিজার ও মৎস্যবাহী ভ্যান ইত্যাদির ব্যবস্থাসহ আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত সুযোগ-সুবিধার সংস্থান রয়েছে। তবে অনেক সময় মাছ ব্যবসায়ীরা অজ্ঞতা ও স্বার্থপরতার কারণে এসব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে কম আগ্রহী। বাংলাদেশে মৎস্য ব্যবস্থাপনা বলতে সরকারের রাজস্ব (কর) অর্জনের উদ্দেশ্যে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন নদ-নদী বা তাদের অংশবিশেষ, বিল, বাওড় ও অন্যান্য জলাশয় ইজারা প্রদান বোঝায়। ১৭৯৩ সালে ভারতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন-১ কার্যকর হওয়ার পর থেকেই এ ধরনের ব্যবস্থাপনার সূত্রপাত হয়। এই আইনের অধীনে বিশাল এলাকা ভূস্বামীদের (জমিদার) স্থায়িভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া হতো। শুধু জমিই নয়, বড় বড় নদ-নদীর অংশ, তাদের শাখা-প্রশাখা এবং প্লাবনভূমিও এই ধরনের জমিদারি বা ভূসম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্লাবনভূমির মধ্যে ছিল গভীর খাদ, যেগুলি ‘বিল’, ‘বাওড়’ ইত্যাদি নামে পরিচিত। পৃথিবীর সর্বত্র মৎস্য ব্যবস্থাপনা বলতে জলভাগের জীবন্ত সম্পদের এমন ব্যবস্থাপনা বোঝায়, যাতে বছরের পর বছর একটি পূর্বনির্ধারিত মাত্রায় আহরণের পরও তা স্থায়িভাবে টিকে থাকে।
কোন জমিদারির সীমানাভুক্ত পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা ইত্যাদি বড় নদ-নদীর অংশ বা অংশসমূহ অথবা তাদের শাখা-প্রশাখার অংশ এবং বিল বা হাওর সংশ্লিষ্ট ভূস্বামীর ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। এধরনের নদ-নদীর অংশবিশেষ, বিল বা হাওরকে জলমহাল বা জলকর (জল তালুক) বলা হতো। ভূস্বামীরা সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের জন্য এসব জলমহাল ইজারা দিত। নদীর জলমহাল এক বছর এবং বিল ও হাওর তিন বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হতো। বর্তমানে জলমহালের সংখ্যা প্রায় ১০,০০০, যার মধ্যে রয়েছে সাবেক জমিদারদের বাড়ির দিঘি ও পুকুর।বিপণন প্রায় পুরোটাই সম্পন্ন হয় ব্যক্তিগত খাতে। গ্রামীণ বাজার (হাট), শহরের মার্কেট (বাজার), জনসমাগমস্থল, শহুরে পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলির এক জটিল পদ্ধতির মাধ্যমে এ বিপণন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এ নেটওয়ার্কের মধ্যে রয়েছে মাছ নামানোর ঘাটগুলিতে ক্রেতাদের প্রতিযোগিতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার যোগান দেওয়া। অনেক সময় মৎস্যজীবীরা ব্যবসায়ী/দালালদের (আড়তদার/পাইকার) নির্ধারিত দামেই তাদের কাছে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হয়। মধ্যগ কেবল মাছ ব্যবসায়ী নয়, সে নিজেও মৎস্যজীবী হতে পারে এবং হতে পারে নৌকা, জাল ইত্যাদির মতো পুঁজির মালিক, যা সে মৎস্যজীবীদের ইজারা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সে এগুলি চালাতে নির্দিষ্ট মজুরির বিনিময়ে জেলেদের মাছ ধরার শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগায় এবং ন্যায্য পাওনা থেকে তাদের বঞ্চিত করে।
বিভিন্ন সমস্যা সত্ত্বেও বাংলাদেশে মাছ বিপণন ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর এবং গুণগত মানের খুব বেশি অবনতি না ঘটিয়েই প্রয়োজনমতো বাজারকেন্দ্রগুলিতে যথাসময়ে মাছের চালান পৌঁছায়। মৎস্যজীবীদের নিকট থেকে মাছ সংগ্রহে নৌকা ব্যবহূত হয়। বরফসহ মোড়কবদ্ধ মাছ ট্রাক ও বাসে করে বড় বড় শহরে পৌঁছায়।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন চট্টগ্রামে আধুনিক মৎস্য পোতাশ্রয় এবং কক্সবাজার, বরিশাল, খেপুপাড়া, পাথরঘাটা ও খুলনায় সামুদ্রিক মাছের, আর রাঙ্গামাটি, কাপ্তাই, রাজশাহী ও ডাবরে স্বাদুপানির মাছের অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। পোতাশ্রয় ও সকল অবতরণ কেন্দ্রে নোঙর বাঁধা, নিলাম ডাকা, বরফকল, হিমাগার, ফ্রিজার ও মৎস্যবাহী ভ্যান ইত্যাদির ব্যবস্থাসহ আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত সুযোগ-সুবিধার সংস্থান রয়েছে। তবে অনেক সময় মাছ ব্যবসায়ীরা অজ্ঞতা ও স্বার্থপরতার কারণে এসব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে কম আগ্রহী। বাংলাদেশে মৎস্য ব্যবস্থাপনা বলতে সরকারের রাজস্ব (কর) অর্জনের উদ্দেশ্যে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন নদ-নদী বা তাদের অংশবিশেষ, বিল, বাওড় ও অন্যান্য জলাশয় ইজারা প্রদান বোঝায়। ১৭৯৩ সালে ভারতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন-১ কার্যকর হওয়ার পর থেকেই এ ধরনের ব্যবস্থাপনার সূত্রপাত হয়। এই আইনের অধীনে বিশাল এলাকা ভূস্বামীদের (জমিদার) স্থায়িভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া হতো। শুধু জমিই নয়, বড় বড় নদ-নদীর অংশ, তাদের শাখা-প্রশাখা এবং প্লাবনভূমিও এই ধরনের জমিদারি বা ভূসম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্লাবনভূমির মধ্যে ছিল গভীর খাদ, যেগুলি ‘বিল’, ‘বাওড়’ ইত্যাদি নামে পরিচিত। পৃথিবীর সর্বত্র মৎস্য ব্যবস্থাপনা বলতে জলভাগের জীবন্ত সম্পদের এমন ব্যবস্থাপনা বোঝায়, যাতে বছরের পর বছর একটি পূর্বনির্ধারিত মাত্রায় আহরণের পরও তা স্থায়িভাবে টিকে থাকে।
কোন জমিদারির সীমানাভুক্ত পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা ইত্যাদি বড় নদ-নদীর অংশ বা অংশসমূহ অথবা তাদের শাখা-প্রশাখার অংশ এবং বিল বা হাওর সংশ্লিষ্ট ভূস্বামীর ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। এধরনের নদ-নদীর অংশবিশেষ, বিল বা হাওরকে জলমহাল বা জলকর (জল তালুক) বলা হতো। ভূস্বামীরা সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের জন্য এসব জলমহাল ইজারা দিত। নদীর জলমহাল এক বছর এবং বিল ও হাওর তিন বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হতো। বর্তমানে জলমহালের সংখ্যা প্রায় ১০,০০০, যার মধ্যে রয়েছে সাবেক জমিদারদের বাড়ির দিঘি ও পুকুর।