সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে উপকূলীয় এলাকার ৫৩ শতাংশ জমি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। এতে সেখানকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, কৃষি ব্যবস্থাপনা, মিঠা পানির মাছ ও বন্যপ্রাণীর ওপর প্রভাব পড়ছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড এ দুই বিষয়কেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকেই মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লবণাক্ততা বাড়ায় দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় কৃষির ক্ষতির পাশাপাশি সেখানকার বাসিন্দারা উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির জটিলতাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউেটটের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জি এম মোস্তাফিজুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেছেন, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার মধ্যে বর্তমানে খুলনার কয়রার শিপসা এবং সাতক্ষীরার আশাশুনির মরিচ্চাপ নদীতে লবণাক্তার পরিমাণ বেশি। এ তিনটি জেলার বিভিন্ন নদ-নদীতে লবণাক্তার পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন। নদীর পানি লবণাক্ত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষিজমিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
‘উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকার সমস্যা ও উন্নয়ন সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায় দুটি প্রাকৃতিক কারণে—জোয়ারে বা জলোচ্ছ্বাসে লবণযুক্ত পানি জমিতে প্লাবিত হয়ে এবং ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানি কৈশিক রন্ধ্র দিয়ে মাটির উপরে চলে এসে। সাধারণত, শুকনো মৌসুমে (মার্চ-মে) লবণাক্ত জোয়ারের পানিতে বহু জমি তলিয়ে যায়। এ পানি সেচকাজে ব্যবহার করা হলে মাটি বা জমি লবণাক্ত হয়। অন্যদিকে, বর্ষা শেষ হলে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মাটি শুকাতে শুরু করে। মাটিতে অনেক ফাটল সৃষ্টি হয়। তখন মাটির ওপরে রোদ পড়লে উপরিস্তর থেকে পানি বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে চলে যায় এবং ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানি ওই ফাটল দিয়ে ভূমির উপরিস্তরে চলে আসে। জমির উপরিস্তর লবণাক্ত হয়। মনুষ্যসৃষ্ট কারণেও লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। উপকূলীয় অনেক এলাকায় মৎস্যচাষিরা লবণাক্ত পানির ঘের তৈরি করে চিংড়ি চাষ করেন। এতে ঘেরের মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়।
দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৯ জেলার ১৪৮টি উপজেলার মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততার ঝুঁকিতে রয়েছে ১০ উপজেলার নদীর পানি। সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জ উপজেলা; খুলনার বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা; বাগেরহাটের মংলা এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় এখন ১০ পিপিটি (প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত লবণ) মাত্রার লবণাক্ততা রয়েছে। অথচ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, লবণের সহনীয় মাত্রা দশমিক শূন্য ৫ টিটিপি। আগামীতে তা ১৫-২৫ পিপিটি মাত্রায় উন্নীত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৩২ শতাংশ ভূমিতে বসবাস করছে, প্রায় ৪ কোটি মানুষ, যা মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ। এ অঞ্চলের মাত্র ৩০ শতাংশ জমি এখন চাষযোগ্য। ১৭ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে মাছ চাষসহ অন্যান্য কাজে। ৫৩ শতাংশ জমি পতিত রয়েছে শুধু লবণাক্ততার কারণে। চাষযোগ্য ৩০ শতাংশ জমি আবার পরিপূর্ণভাবে উৎপাদনে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দক্ষিণবঙ্গের জেলা, বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার কৃষিজমি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। চিংড়ি চাষের জন্য নোনা পানি আনতে স্লুইসগেট ছিদ্র করে বাঁধ দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে এসব এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে বন্যা ও স্থায়ী জলাবদ্ধতা।
উপকূলীয় জেলায় খাবার পানির মারাত্মক সঙ্কট চলছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে পুকুরের মতো মিঠা পানির উৎস শুকিয়ে যাচ্ছে এবং টিউবওয়েলেও পানি দিন দিন কমে আসছে। লবণাক্ত ও দূষিত পানি ব্যবহার করার ফলে রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দিচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, মানুষের শরীরে নির্দিষ্ট পরিমাণ লবণের প্রয়োজন। সেটি আসে খাদ্য ও পানি থেকে। কিন্তু, উপকূলীয় এলাকার পানিতে লবণের পরিমাণ অনেক গুণ বেশি। এই পানি শরীরে প্রবেশ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। গর্ভবতী নারীদের জন্য তা বেশি বিপজ্জনক। গর্ভাবস্থায় নারীরা বেশি লবণাক্ত পানি খেলে খিঁচুনি ও উচ্চ রক্তচাপ হয়। এ কারণে নারীদের গর্ভাবস্থায় সন্তান মারা যাওয়ার হারও বেশি, যা বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, লবণাক্ততার কারণে উপকূলের নারীরা শুধু অকালগর্ভপাতের শিকার হন না, ৩ শতাংশ শিশুও মারা যায়। বেশি লবণ খাওয়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক রয়েছে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
‘উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকার সমস্যা ও উন্নয়ন সম্ভাবনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জমিতে লবণাক্ততার কারণে বর্ষাকালে শুধু আমন ধানের উৎপাদন হয়। এছাড়া, সারা বছর পতিত থাকে। শুষ্ক মৌসুমে মিষ্টি পানির অভাবে বোরো ধান আবাদ করা সম্ভব হয় না।
এ গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, লবণাক্ততার কারণে উদ্ভিদের বৃদ্ধি কমে যায়, ফুলের সংখ্যা হ্রাস পায়। অনেক ক্ষেত্রে পরাগায়নও হয় না। ফলে, ফসলের ফলন বিভিন্ন মাত্রায় কমে যায়। মাটি লবণাক্ত হওয়ার কারণে মৃত্তিকা দ্রবণের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়।
গবেষণায় লবণাক্ত এলাকার কৃষিতে বিপ্লব আনয়ন সম্ভব, উল্লেখ করে বলা হয়, লবণসহিষ্ণু ফসল ও জাতের উদ্ভাবন এবং আধুনিক চাষ প্রযুক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। ভুট্টা লবণসহিষ্ণু ফসল। তাই, কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে স্থানীয় জাতের ধানের পরিবর্তে স্বল্প মেয়াদি আধুনিক জাতের বা হাইব্রিড জাতের ভুট্টা আবাদ করা যেতে পারে। লবণাক্ত এলাকায় লবণাক্ত-সহনশীল ফসল যেমন: সূর্যমুখী, রেড বিট, সয়াবিন ইত্যাদি চাষ করতে হবে। এছাড়া, ঘেরের পাড়ে প্রায় সারা বছর সবজি ও তরমুজ চাষ করা যেতে পারে।শহিদুল গাজীর বয়স ৫০ বছর। বসবাস করতেন সুন্দরবনসংলগ্ন দাকোপ উপজেলার কালাবগি এলাকার ঝুলন্তপাড়ায়। বনের ওপর নির্ভর করেই ছিল তার জীবিকা। চার বছর আগে একদিন রাতে বন থেকে বাসায় ফিরে বিছানায় পড়ে আর উঠতে পারেননি। এখন তার শরীরের ডান পাশের অংশ (মাথা থেকে পা পর্যন্ত) অবশ হয়ে আছে। কোনো চিকিৎসাতেই তিনি সেরে উঠতে পারেননি।
তার ছেলে জাহাঙ্গীর গাজী বলেন, ‘বাবাকে আমরা অনেক চিকিৎসক দেখিয়েছি। তারা বলেছেন, উচ্চ রক্তচাপের কারণে বাবা স্ট্রোক করেছেন।’
একই এলাকার ২৬ বছর বয়সী এক নারীর বিয়ে হয়েছে ৮ বছর আগে। এ পর্যন্ত তার কোনো সন্তান হয়নি। ওই নারী বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমার ৩ বার অকাল গর্ভপাত হয়েছে। পেটে বাচ্চার বয়স ৪ থেকে ৫ মাস হলেই সমস্যা দেখা দেয়। পরে সেই বাচ্চা আর বাঁচে না।’
ওই নারী বলেন, ‘শুধু আমারই যে এমনটি হচ্ছে তা নয়। আমার পরিচিত অনেকেরই এ ধরনের সমস্যা হচ্ছে। আগে আমি গর্ভাবস্থা শুরুর দিকে নদী থেকে নেট জাল টেনে রেণু আহরণ করেছি। নিয়মিত লবণপানি ব্যবহার করেছি। তবে এখন আমি বাড়তি সতর্কতা নিয়েছি। ভবিষ্যতে হয়তো আমার গর্ভপাত হবে না।’
সুন্দরবনসংলগ্ন ওই গ্রামটি শিবসা ও সুতারখালী নদীর মোহনায় অবস্থিত। নদী ও সুন্দরবনের লবণপানির সঙ্গেই তাদের জীবনযাপন।
এলাকাটি ঘুরে দেখা গেছে, ১৪ বছরের কমবয়সী শিশুদের শরীর থাকে জরাজীর্ণ। মাথার চুল আঠালো, চোখ চালছে ও শরীরের ত্বক রুক্ষ ও শুষ্ক।
সালাহউদ্দীন নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘ছোট ছেলে-মেয়েরা প্রায় সময় পানিতে কাটায়। নদী থেকে বাগদা ও গলদার রেণু আহরণ করার জন্য নেট জাল টানতে তারা প্রতিদিনই ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পানিতে থাকে। লবণপানিতে বেশি সময় থাকায় তাদের চেহারা পাল্টে যায়। তাদের মাথার চুল আঠালো, শুষ্ক ত্বক ও জীর্ণশীর্ণ দেহের মূল কারণ হলো লবণপানিতে বেশি সময় থাকা।’
শিরিনা নামের আরেক নারী বলেন, ‘১৩ থেকে ১৪ বছর বয়স হলেই আমরা মেয়েদের নেট জাল টানতে নদীতে নামতে দেই না। কারণ এই বয়সে লবণপানিতে বেশি সময় কাটালে তাদের যৌন সম্পৃক্ত রোগ বেড়ে যায়। অনিয়মিত মাসিক ও শরীরের চামড়া গাঢ় কালছে হতে থাকে। তাই ১৩ থেকে ১৪ বছর বয়সেই বাবা মায়েরা মেয়ে শিশুকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ওই বয়সেই উপকূলের মেয়েদের বেশি বিয়ে দেয়া হয়। অল্প বয়সেই মেয়েদের অনিয়মিত মাসিক ও যৌনাঙ্গে জ্বালাপোড়ার কারণে তাদের দ্রুত বিয়ে দিতে হয়।’
খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, খুলনাঞ্চলের উপকূলে অকাল গর্ভপাত, পেটের নানা জাতীয় রোগ, ত্বকের রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীর পরিমাণ অনেক বেশি। সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, ‘উপকূলের মানুষের রোগের ধরন ও অন্য এলাকার রোগের ধরন আলাদা। সেখানে ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটের পীড়া, চোখের উপরিভাগের রোগ, আলসার, চর্মরোগ, দাঁত, চুল, নখসহ এ জাতীয় রোগ বেশি হয়। এ ছাড়া অন্যান্য এলাকার তুলনায় অকাল গর্ভপাত ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীর পরিমাণও অনেক বেশি। এতে কারও কারও হার্ট, কিডনি ও ব্রেইনে জটিল রোগ বাসা বাঁধছে।’
তিনি বলেন, ‘উপকূলের মানুষ বেশিমাত্রায় লবণাক্ত পানি পান করেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজেই লবণপানি ব্যবহার করেন। আর সুন্দরবনের জেলেরা তো লবণপানির সঙ্গেই বসবাস করেন। খাবার পানির মাধ্যমে অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার জন্য তাদের এসব অসংক্রামক রোগ বেশি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা লবণকে বলি হোয়াইট (সাদা) কিলার। এটিতে সোডিয়াম ও ক্লোরাইডের রাসায়নিক মিশ্রণ থাকে, যা শরীরে প্রবেশ করার পর রক্তের চাপ বৃদ্ধি করে। রক্তের চাপ বেশি হলে শরীরের হার্ট, ব্রেইন ও কিডনিতে জটিলতা শুরু হয়।’
সিভিল সার্জন বলেন, ‘উপকূলে অধিক লবণাক্ততার কারণে সেখানে ফসল ফলে না, ফলমূলের কোনো গাছ নেই। যে কারণে সেখানের মানুষ পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হন। বলা যায়, অধিক লবণাক্ততার কারণে উপকূলে পুষ্টিহীনতা বেড়েছে। এটিও রোগ বৃদ্ধির একটি অন্যতম কারণ।’
অকাল গর্ভপাতের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গর্ভবতী মায়েদের লবণপানি খেতে হয় ও ব্যবহার করতে হয়। লবণ বেশি খাওয়ার জন্য উচ্চ রক্তচাপে তাদের গর্ভপাত হয়। এ ছাড়া যৌনাঙ্গে লবণপানি ব্যবহারের ক্ষতি তো আছেই।’
তিনি বলেন, ‘উপকূলে অধিক লবণাক্ততার কারণে অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
২০২১ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক জরিপে খুলনাঞ্চলের উপকূলীয় মানুষের নিরাপদ খাবার পানির দুর্দশার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, খুলনার কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায় বসবাসকারী ৭৩ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ লবণাক্ত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ওই জরিপের তথ্য মতে, উপকূলীয় এসব উপজেলার মানুষের প্রতি লিটার খাবার পানিতে ১ হাজার ৪২৭ মিলিগ্রাম থেকে হাজার ২৪০৬ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা রয়েছে। তবে পানির প্রতি লিটারে ১ হাজার মিলিগ্রামের বেশি লবণাক্ততা থাকলে তা খাওয়ার অনুপযোগী।
সেখানকার মানুষ পান করেন এমন ৫২ শতাংশ পুকুর ও ৭৭ শতাংশ টিউবওয়েলের পানিতে অনুমোদিত মাত্রার থেকে বেশি মাত্রায় লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। দাকোপ উপজেলার পুকুরগুলোতে ৬৫০ মিলিগ্রাম, কয়রায় ১ হাজার ২৪ মিলিগ্রাম, পাইকগাছায় ১ হাজার ৫৮১ মিলিগ্রাম, আশাশুনিতে ১ হাজার ২০৩ মিলিগ্রাম, ও শ্যামনগরে ১ হাজার ১৮৪ মিলিগ্রাম লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া টিউবওয়েলগুলোর পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা রয়েছে দাকোপে ২ হাজার ৪০৬ মিলিগ্রাম, কয়রায় ১ হাজার ৪৫৩ মিলিগ্রাম, পাইকগাছায় ১ হাজার ৫১০ মিলিগ্রাম, আশাশুনিতে ৯৯৮ মিলিগ্রাম ও শ্যামনগরে ১ হাজার ৬৮৩ মিলিগ্রাম।
এ ছাড়া শুষ্ক মৌসুমে বা শীতকালে শ্যামনগর উপজেলার টিউবওয়েলে প্রতি লিটার পানিতে ৬ হাজার ৬০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণাক্ততা পওয়া গেছে, যা অনুমোদিত সীমার চেয়ে ৬ গুণেরও বেশি।
গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ওই জরিপ প্রকল্পের সমন্বয়কারী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘প্রায় তিন দশক ধরে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে। ওই এলাকার মানুষ খাবার পানির জন্য মূলত পুকুর ও টিউবওয়েলের ওপর নির্ভরশীল হয়েছে। কিছু এলাকায় লবণপানির চিংড়ি চাষের কারণে সুপেয় পানির পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার কারণেও অনেক পুকুর লোনাপানিতে ভরে গেছে। পরে তা সংস্কার করা হয়নি।’শুরু হচ্ছে ইরি বোরো মৌসুম। আর দুশ্চিন্তা বাড়ছে কৃষকের। উপকূলজুড়ে কৃষকের ফসলের মাঠ গ্রাস করছে লবণাক্ততা নামক ভয়ঙ্কর বিষ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, ভাঙা ও দুর্বল বেড়িবাঁধ আর বারবার নোনা পানির আগ্রাসনে উপকূলের পলি মাটি নিঃশ্বেষ প্রায়। ইরি আবাদে শত চেষ্টা আর বাড়তি খরচ করেও নাজেহাল প্রান্তিক চাষিরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সরকারি সংস্থা, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় কৃষকরা একসঙ্গে উদ্যোগী না হন, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে উপকূলীয় এলাকার বড় অংশই লবণাক্ত হয়ে যেতে পারে। এটা শুধু কৃষি উৎপাদনেই নয়, বরং গ্রামীণ জীবনের নিরাপত্তা ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
প্রকৃতির নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টিকে আছে দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলের সংগ্রাম মুখর মানুষগুলো। এদের জীবন-জীবিকা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। লবণাক্ততার কারণে জমিতে ফসল ফলাতে পারছেন না, উর্বরতা হারাচ্ছে কৃষিজমি। গৃহপালিত পশুর খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। ইরি বোরো আবাদে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গিয়ে দেড়গুণ অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে চাষীদের। প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ পিছু ছাড়ে না উপকূলবাসীর। বিশেষ করে আইলা, আম্পান, বুলবুল, ইয়াসের মতো সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলীয় জমিতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা লবণাক্ততা এখন কৃষকের গলার ফাঁস।
মৃত্তিকা সম্পদ ইন্সটিটিউট খুলনার আঞ্চলিক কার্যায়ের সংগ্রহ করা পানি ও মাটির নমুনার তথ্য অনুয়ায়ী বটিয়াঘাটার কৃষ্ণনগর এলাকায় মাটিতে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে ৬.৫ ইসি:ডিএস/মি (ইলেকট্রিককনডাকটিভিটি ডেসিমেল/ মি; মাটির গুণাগুণ পরীক্ষার একক। এবছর ৭.২ ইসি:ডিএস/মি। পাইকগাছা ও বাগেরহাটের দ্বিগরাজে পাওয়া গেছে ১০.৫ ইসি:ডিএস/মি।
সূত্রটি আরো জানায়, উপকূলের খুলনা সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট বেষ্টিত নদ-নদীতে লবণাক্ততা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। গেল বছর এপ্রিল মাসে নমুনা পরীক্ষা করে বটিয়াঘাটার গাগড়ামারি নদীতে ২৬ ডিএস/মি (ডেসিসিমেল পার মিটার; পানি পরিমাপের একক), মংলা পশুর নদ-নদীতে ২৬.৮ মাত্রা লবণাক্ততার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সাতক্ষীরার আশাশুনিতে পাওয়া গেছে ২৮.৩ ডিএস/মিটার। যা যে কোনো কাজে ব্যবহারের অনুপযোগী।
খুলনার মৃত্তিকা গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক জরিপ সূত্রে প্রকাশ, গেল বছর উপকূলীয় এলাকার প্রায় ১২ লক্ষাধিক হেক্টর জমি লবণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে, কৃষিবিদ আব্দুল গফুর বলছেন, আগামী একযুগে এ অবস্থা রীতিমত ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। তখন রেড এলার্ট জারি ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা থাকবে না।
দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে আমন আবাদের বাম্পার ফলন হলেও উপকূলের মোট জমির এক তৃতীয়াংশ লবণাক্ততার শিকার। এসব অঞ্চলে আমনের উৎপাদনের হার ছিল গড় উৎপাদনের অর্ধেক। চলতি মৌসুমে গত কয়েক বছর বীজ বোনা হয়, কিন্তু চারা ওঠে না। আর যদি ওঠেও, লবণের ঝাঁজে পুড়ে মরে যায়। কৃষক একাধিক দফায় অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও ওষুধের মাধ্যমে অঙ্কুরোদগমের ব্যবস্থা করে। উপকূলীয় জনপদ বাগেরহাটের মংলা, রামপাল, মোড়লগঞ্জ, ফকিরহাট, সাতক্ষীরা শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জে আর খুলনার পাইগাছা, কয়রা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়ার নিত্যদিনের বাস্তবতা। এক সময় যেখানে তিন মৌসুমে ধান, তিল, সরিষা, পাট, ডাল আর সবজির সমাহার থাকত, সেই জমিগুলো আজ লবণাক্ততার কারণে অনাবাদি হয়ে পড়ে থাকে মাসের পর মাস। খুলনাঞ্চলের মাটি ও পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা গত বছরের তুলনায় এবছর দ্বিগুণ ছাড়িয়েছে। পানি ও মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় চলতি বোরো মৌসুমে বোরো চাষীরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে জানায় কৃষিবিদরা।
সূত্রমতে, উপকূলের কৃষি জমির প্রায় ৮৮ ভাগই লবণাক্ততায় আক্রান্ত। শুধু নদীর পানি এবং মাটি নয়; খাল, বিল, পুকুরের পানিতেও লবণাক্ততা বাড়ছে। বাড়ছে ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা। এখানকার গাছপালা, পশুপাখি সবই নোনায় বিপর্যস্ত। এ অঞ্চলের উদ্ভিদগুলো অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বিবর্ণ, ধূসর। শাক-সবজি ও মাঠের ফসল কমে গেছে। লবণাক্ততা বাড়ছে পানিতে। লবণ পানি টেনে আনা হচ্ছে ভূমিতে। ফলে ভূমিতেও লবণাক্ততা বাড়ছে। দিন দিন এই অঞ্চলের মাটি ফসল উৎপাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে এই অঞ্চলে উৎপাদিত হয় এমন ফসল লবণাক্ততা সহ্য ক্ষমতার চেয়ে মাটির লবণাক্ততা বেশি হয়ে গেছে।
মৃত্তিকা বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জি এম মোস্তাফিজুর রহমান ইনকিলাবকে বলেন, কৃষিজমির লবণাক্ততা বাড়ছে খুলনাঞ্চলের নদ-নদীতে। তার প্রভাব পড়ছে সংশ্লিষ্ট এলাকার ফসলি জমিতে। তাই ফসল উৎপাদন ক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। লবণাক্ততা বাড়তে থাকলে কৃষি আয় বছরে ২১ শতাংশ কমে যাবে। উপকূলীয় অঞ্চলের ৪০ শতাংশ কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়বে। এতে এ অঞ্চলের দুই লাখ ৪০ হাজার কৃষকের বাস্তুচ্যূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া এই অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানিও লবণাক্ত। এ পানি খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করাও খুব ক্ষতিকর। মানুষ বাধ্য হয়ে এই পানি পান করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে কৃষি ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে। শুধু সাতক্ষীরা অঞ্চলেই কৃষি উৎপাদন প্রতিবছর গড়ে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ হারে কমে যাচ্ছে যা এ এলাকায় খাদ্য সঙ্কট বাড়িয়ে তুলছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লিডার্সের গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯১ থেকে ২০২০-এর মধ্যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ১৯৭টি বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে যা এ দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা, সম্পদ, খাদ্য, পানি ও বাসস্থানসহ অন্যান্য সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। এ সঙ্কট দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে আরও প্রকট। ক্রমবর্ধমান দুর্যোগের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষের খাদ্য সঙ্কট, স্বাস্থ্যঝুঁকি, জীবিকার উৎস হ্রাস, অপুষ্টি ও সুপেয় পানির অভাবে রোগব্যাধি বৃদ্ধিসহ প্রতিবছর প্রচুর আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মাইনর ইরিগেশন ইনফরমেশন সার্ভিস ইউনিট পরিচালিত ‘দক্ষিণাঞ্চলের ভূগর্ভে লবণ পানির অনুপ্রবেশ পূর্বাভাস প্রদান’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ পানিতে বঙ্গোপসাগর থেকে লবণ পানি এসে মিশছে। এই লবণ পানি ক্রমেই বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে বর্তমানে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৬-১৫.৯ পিপিটি; অথচ মাটির সহনীয় মাত্রা ০.৪-১.৮ পিপিটি।
উপকূলীয় এলাকায় জীবন-জীবিকার উন্নয়নে কাজ করছে নাগরিক সংগঠন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন। সংগঠনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র সময়ের আলোকে জানান, লবণাক্ততা ও পরিবেশগত সঙ্কটের কারণে পেশাগত নিরাপত্তা নেই। সুন্দরবন উপকূলে একসময় ধান চাষ হতো। জমিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। ফলে মাছ চাষ শুরু হয়। এরপর সেই লবণাক্ততার পরিমাণ আরও বেড়ে যাওয়ায় এখন মাছ চাষ বাদ দিয়ে কাঁকড়া চাষ করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে গাছপালার পুনর্জন্ম হতে পারছে না। একই কারণে সুন্দরী গাছ আগের তুলনায় ছোট হয়ে যাচ্ছে।
তিনি জানান, উপকূল এলাকার মানুষ ফসলি জমি হারাচ্ছেন, বাঁধ ভেঙে ভেসে যাচ্ছে বাড়িঘর। আর এই লবণাক্ততা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ। চিংড়ি চাষের জন্য বাঁধ ছিদ্র করে ফসলি জমিতে লবণ পানি তোলা হয়। ছিদ্র করা বাঁধই বেশি ভাঙে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার সময়ের আলোকে বলেন, বাঁধ কেটে বা নষ্ট করে লবণ পানি তোলা বন্ধে উচ্চ আদালত ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালীরা সেই নির্দেশ মানছেন না। উপকূলবাসীকে রক্ষায় চিংড়ি ঘেরে লবণ পানি তোলা বন্ধ করতে হবে।
লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল সময়ের আলোকে বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল আজ অরক্ষিত। লবণ ফসলের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকা লোনা পানিতে ডুবে থাকে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সঙ্কট ও বারবার বাড়িঘর হারিয়ে মানুষ আজ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ৬০-এর দশকের বাঁধের পরিকল্পনা আজ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারছে না। ঘূর্ণিঝড় ও উচ্চ জোয়ারের চাপে বেড়িবাঁধ ভেঙে বারবার মানুষ তার সহায়-সম্বল হারাচ্ছেন এবং মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এজন্য প্রয়োজন নতুন পরিকল্পনায় বেড়িবাঁধ তৈরি, সুপেয় পানি নিশ্চিত করা এবং সুন্দরবনকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।শ্যামনগরের তিনটি বেসরকারি ক্লিনিকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বছরে মোট অপারেশনের প্রায় ১০ শতাংশ রোগীর জরায়ু অপারেশন হয়ে থাকে।
দীর্ঘদিন ধরে জরায়ু জটিলতায় ভুগলে তা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় বলে জানান চিকিৎসকেরা।
শ্যামনগরে অবস্থিত ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে জরায়ুর অসুখের মাত্রার পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় চারশো নারীর ভ্যাজাইনাল ইনফেকশন অ্যাসেসমেন্ট (ভিআইএ) করা হয়। এদের মধ্যে ৬৭ জনের ক্যান্সারের মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। পরবর্তী চিকিৎসার জন্য তাদের খুলনা বা ঢাকায় রেফার করা হয়।
শিশুবয়স থেকে দীর্ঘদিন ধরে লিউকোরিয়ার কারণে মূত্রনালির সংক্রমণ, পেলভিস প্রদাহ, বন্ধ্যত্ব এমনকি সার্ভিকাল ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে বলে জানান ডা. তাসনুভা আফরিন। বর্তমানে সুইডেন প্রবাসী এই চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে শ্যামনগর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের কাজ করেন।
উপকূলীয় এই এলাকায় কাজ করা অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, “সহনীয় পর্যায়ের পরিষ্কার লোনা পানি ক্ষতিকারক নয়। তবে শুকনো মৌসুমে লবণের তীব্রতা বাড়লে তা নারীদের সারভিক্স থেকে জরায়ু পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।”
“এ এলাকার মেয়েরা সাধারণত পুকুরে গোসল করে। অনেকে দীর্ঘসময় ধরে নদীতে জাল টেনে মাছ ধরে। এসব পানি যে শুধু মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত তা–ই নয়, একই পুকুরে অনেকে গোসল করে, এমনকি কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজও একই পুকুরে করতে হয়।”
জরায়ু অপারেশনের পর থেকে সারা শরীরে অসহনীয় জ্বালাপোড়া অনুভব করেন বলে জানান ফিরোজা বেগম।
দুই সন্তানের মা খাদিজা বেগম (৩২) বলেন, “আগে তো মাসের কিছুদিন শুধু পেটে ব্যথা করতো। অপারেশনের পর এখন সারাক্ষণ গা দিয়ে দাহ (তাপ) ওঠে। জালা-যন্ত্রণা করে। মনে হয়, পানিতে ঝাঁপ দিয়ে পড়ি, তাহলে একটু আরাম পাব।”
ময়মনসিংহ মেডিকেলের ডা. ইশরাত জাহান স্বর্ণা বেনারকে বলেন, “মেয়েদের শরীরে আলাদা হরমোন আছে, যা দিয়ে মাসিক চক্র, মেজাজ, স্মৃতি নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু জরায়ু কেটে ফেললে এসব হরমোনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। জরায়ুর সাথে আবার ওভারি কেটে ফেললে এসব হরমোনের সোর্স নষ্ট হয়ে যায়।”
“ফলে একজন অল্পবয়সী রোগী যার মেনোপেজ হওয়ার কথা ছিল না, তার জরায়ু ও ওভারি কেটে ফেললে ভয়াবহ সব সিম্পটম হবে। তার তীব্র গরম লাগবে, মনে হবে মরে যাচ্ছে; ভ্যাজাইনাল ড্রাইনেস হবে অর্থাৎ মাসিকের রাস্তা শুকনো হয়ে যাবে, ফলে স্বামীর সাথে শারীরিক সম্পর্কে যেতে পারবে না; কষ্ট হবে। তার হাড় ক্ষয়ে যেতে থাকে। সার্বিক ভালোলাগা অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়,” বলেন তিনি।
বেশ কয়েকজন চিকিৎসক বেনারকে বলেন, বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এই অঞ্চলে জরায়ুজনিত রোগে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা বেশি।
দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি বলেন বেনারকে বলেন, “সাতক্ষীরা জেলার নারীদের এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সার রয়েছে, যা জরায়ুর ক্যান্সারের একটি ধরন।”
“জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা তীব্র হওয়ার ফলে নারীদের শারীরিক অসুস্থতা বাড়ছে,” নীলোর্মি বলেন।জয়াখালী গ্রামের মোহাম্মদ আলীমউদ্দিন গাজী (৫৮) বলেন, “আমার এই ৫৮ বছর বয়সে এত পানির কষ্ট কখনো পাইনি।”
চিংড়ি চাষের ঘেরের কারণে লবণাক্ততার তীব্রতা আরো বেড়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “লোনাপানির কারণে গাছপালা সব মরে এই এলাকা মরুভূমির মতো হয়ে যায়। ঘের না থাকলে গাছপালা জন্মাবে। ফসল ফলানো যাবে। গরু ছাগল পোষা যাবে। মানুষের অভাব কমবে।”
লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, মাছের ঘের তৈরির মতো মনুষ্যসৃষ্ট কারণকেও দায়ী করেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক ড. আনোয়ার জাহিদ। উপকূলীয় এলাকায় ঘের বন্ধ করতে পারলে এই ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমে আসবে মনে করেন তিনি।
২০১৪ সালের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলে চিংড়ি চাষ স্থানীয় পরিবেশগত মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে; যার মধ্যে রয়েছে মাটি এবং পানির গুণমানের অবনতি, ভূগর্ভস্থে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, স্থানীয় পানি দূষণ এবং স্থানীয় হাইড্রোলজি পরিবর্তন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের গবেষণায় বলা হয়েছে, “গবেষণা এলাকায় লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ স্থানীয় গাছপালা এবং বিশেষ করে ধান ও শাকসবজি উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।”
দেশের জনসংখ্যার আনুমানিক ৪১ ভাগ মানুষ সমুদ্রপিঠ থেকে ১০ মিটার (প্রায় ৩২ ফুট) নিচে বসবাস করেন বলে।