টুঙ্গিপাড়া (গোপালগঞ্জ) প্রতিনিধি : বাজান, আমারে এই ঘরটা আপনারা কিনে দেন। আমি ভিক্ষা কইরা চাইয়া আইনা কহানে বসে খামু, কহানে বসে একটু নামাজ পড়মু। এই ঘরটা আমারে কিনে দেন বাবা
সাংবাদিকদের সামনে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে এভাবেই নিজের শেষ আশ্রয়ের জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন ৭৫ বছর বয়সী ভিক্ষুক রোকেয়া বেগম। কান্না জড়ানো কণ্ঠে তিনি বলেন, দুঃখের আর সীমা নাই রে বাজান। আমি একটু থাকার জায়গা চাই। একটা মাইয়াও যদি থাকতো, আমারে এভাবে থাকতে হতো না। আমার একটা ছেলে সেও আবার হাসপাতালে ভর্তি। লিভারে পানি জমছে, অপারেশন লাগবে। টাহা নাই, কী দিয়া চিকিৎসা করমু কথা বলতে বলতে থেমে যান তিনি। চোখের পানি মুছতে মুছতে আরও বলেন, একটু আগে ফোন দিছে মা, আমি বড় বিপদে। আমার লইগা দোয়া কইরেন।
রোকেয়া বেগমের দাবি, মাত্র ২০ হাজার টাকা দিতে না পারায় তাকে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ফজরের নামাজের পর এশরাক নামাজ পড়তেছিলাম। সেই সময় এই ঘরের লোকজন আমারে ঘর থিকা নামাই দিছে, বলতে বলতে কেঁদে ওঠেন তিনি।
এক মুহূর্তেই মাথার ওপরের শেষ আশ্রয়টুকু হারান এই বৃদ্ধা। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের পার ঝনঝনিয়া গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম। প্রায় ১৬–১৮ বছর আগে তার স্বামী সুলতান শেখ মারা যাওয়ার পর থেকেই একাকী সংগ্রাম শুরু। স্বামীর রেখে যাওয়া এক কাঠা জমিই ছিল শেষ সম্বল। অভাবের তাড়নায় সেটিও বিক্রি করতে হয়। ওই টাকায় নৌকা কিনে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি নৌকাটি নদীতে ডুবে যায়। এরপর থেকেই মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষাই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে থাকার সুযোগ পেলেও ওই ঘরের বিনিময়ে তার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারায় নামাজরত অবস্থাতেই তাকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। রোকেয়ার অসহায়ত্ব দেখে এগিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ শেখ ও তার স্ত্রী খালেদা বেগম। আপাতত তারা তাকে নিজেদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন।
খালেদা বেগম বলেন, ওনাকে ঘর থেকে নামাই দিছে শুনে আইছি দেখি কান্নাকাটি করছে। তখন বলছি আমার ছেলে ও বউ বাড়িতে নাই, আপাতত তুমি আমার ঘরেই থাকো। তিন-চার মাস ধরে আছেন। কিন্তু আমরা নিজেরাও গরিব মানুষ, স্থায়ীভাবে রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।
এদিকে বাঁশবাড়িয়া চৌরঙ্গী মোড় এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের নামে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে নেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ নিশ্চিত করা।
ডুমুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজাম শেখ বলেন, আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখব। উনি যদি প্রকৃতপক্ষে গরিব মানুষ হন, তাহলে ইউএনও স্যারের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেব।
এ বিষয়ে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহিরুল আলম বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর কোনোভাবেই বিক্রি বা অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তরের সুযোগ নেই। ভিক্ষুক রোকেয়া বেগমের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শীতের এই দিনে বৃদ্ধা রোকেয়া বেগম এরপর কোথায় যাবেন এই প্রশ্নই এখন এলাকাবাসীর বিবেককে নাড়িয়ে দিচ্ছে। মাত্র ২০ হাজার টাকার অভাবে কি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নাকি আশ্রয়ণ প্রকল্প তার মতো অসহায়দের জন্য নয় আজও রোকেয়া বেগম তাকিয়ে আছেন এক টুকরো ছাদের আশায় একটু শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার আশায়।