সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে, বঙ্গোপসাগরের লোনা বাতাস আর নদীভাঙনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সাতক্ষীরা। এই জেলা শুধু মানচিত্রের একটি নাম নয়; এটি টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, দারিদ্র্য আর অবহেলাÑএই চার দেয়ালের মধ্যে বাস করে এখানকার মানুষ। এখানেই প্রতিবন্ধী শিশু ও যুবদের জীবন আরও কঠিন, আরও নিঃসঙ্গ।
যে পরিবার প্রতিদিন নদীর পানি ঠেলে ঘরে ফেরে, সেই পরিবারের পক্ষে প্রতিবন্ধী সন্তানের নিয়মিত চিকিৎসা বা থেরাপি করানো প্রায় অসম্ভব। ফলস্বরূপ অনেক শিশু জন্মের পর থেকেই জীবনের সুযোগ হারায়, শুধু চিকিৎসা নয়Ñসামাজিক স্বীকৃতিও পায় না। তবু এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও এখন এক নতুন হাওয়া বইছে সাতক্ষীরায়Ñমানবিক সহমর্মিতার হাওয়া। সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় শুরু হওয়া “প্রতিবন্ধী শিশু ও যুবদের পুনর্বাসন স্ক্রিনিং ক্যাম্প” যেন পুরো জেলার জন্য এক অনুপ্রেরণা।
লিলেয়ানা ফন্ডস, নেদারল্যান্ডসের অর্থায়নে, সিডিডি (Center for Disability in Development)-এর সহযোগিতায় এবং স্থানীয় এনজিও আইডিয়াল-এর আয়োজনেই এই ক্যাম্পের সূচনা হয়। প্রথম ক্যাম্পে ৫০ জন প্রতিবন্ধী শিশু ও যুব অংশ নেন। তাঁদের শারীরিক ও মানসিক মূল্যায়ন করেন সাতক্ষীরা জাতীয় প্রতিবন্ধী ও সাহায্য কেন্দ্রের ফিজিওথেরাপি কনসালট্যান্ট ডা. এস এম হাবিবুর রহমান।
ক্যাম্পের মাধ্যমে শুধু চিকিৎসাই নয়, শুরু হয় তাঁদের পুনর্বাসনের পথচলা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আশাশুনি সদর, শোভনালী ও বুধহাটা ইউনিয়নে মোট ১২টি ক্যাম্পে ৬০০ জন প্রতিবন্ধী মানুষকে সেবা দেওয়া হবে। এটি কেবল চিকিৎসা নয়, বরং এক সামাজিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া।
সাতক্ষীরা জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত। লবণাক্ত পানি জমিতে ফসল ফলায় না, বিশুদ্ধ পানির সংকটে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। এই অবস্থায় প্রতিবন্ধী মানুষদের জীবন আরও কঠিন। তাঁদের জন্য নেই পর্যাপ্ত থেরাপি সেন্টার, নেই প্রশিক্ষণকেন্দ্র, নেই চলাচলের সুবিধাসম্পন্ন অবকাঠামো। বহু গ্রামে এখনো দেখা যায়, প্রতিবন্ধী শিশুদের লুকিয়ে রাখা হয় ঘরের ভেতর।
অনেক সময় তাদের জন্মই যেন পরিবারের গোপন লজ্জা। অথচ রাষ্ট্রীয় সংবিধান বলছেÑপ্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। এই বৈষম্যের দেয়াল ভাঙতে হলে শুধু সরকারি সহায়তা নয়, মানসিক পরিবর্তনই সবচেয়ে জরুরি। আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধীদের প্রতি আচরণ প্রায়ই করুণার, সহানুভূতির বা দানবোধের। কিন্তু প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি আসে যখন আমরা তাঁদের সমান নাগরিক হিসেবে দেখিÑযখন তাঁরা “তারা পারবে না” নয়, বরং “তাদের সুযোগ দিতে হবে”Ñএই মানসিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
সাতক্ষীরার এই উদ্যোগ সেই মানসিক বিপ্লবের সূচনা করেছে। এখানে চিকিৎসা শুধু শারীরিক নয়; এটি সমাজের চেতনায় এক থেরাপিÑমানবিকতার থেরাপি। একজন প্রতিবন্ধী শিশুর পুনর্বাসনের যাত্রা শুরু হয় পরিবার থেকে। কিন্তু দারিদ্র্য ও কুসংস্কারের কারণে অনেক পরিবার সন্তানকে সমাজে আনার পরিবর্তে আড়াল করে রাখে। অভিভাবকরা অনেক সময় মনে করেনÑএই সন্তান পরিবারে বোঝা, সমাজে উপহাসের কারণ। কিন্তু আশাশুনির ক্যাম্পে দেখা গেছে, সেই ধারণা বদলাচ্ছে।
একজন মা বলেন, “আমার ছেলেটা কথা বলতে পারে না, আগে ওকে নিয়ে বাইরে যেতে লজ্জা লাগত। এখন বুঝি, এটা তার অপরাধ নয়Ñওরও অধিকার আছে সমাজে বাঁচার।” এটাই পরিবর্তনের শুরু। যখন একজন মা বুঝতে পারেন সন্তান প্রতিবন্ধী নয়, বরং বিশেষ সক্ষম, তখন সমাজও বদলাতে শুরু করে। বাংলাদেশ সরকার প্রতিবন্ধী উন্নয়ন নীতি, প্রতিবন্ধী ভাতা, বিশেষ শিক্ষা, কর্মসংস্থান কোটাÑসবই চালু করেছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন।
সাতক্ষীরায় এখনো অনেক পরিবার জানে না কিভাবে প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়া যায়, কিংবা কোথায় আবেদন করতে হবে। অনেকে অভিযোগ করেন, তালিকা হালনাগাদ হয় না, প্রক্রিয়া জটিল, ফর্ম পূরণে হয়রানি। ফলে “নীতি” থাকে কাগজে, বাস্তব পরিবর্তন আসে না। আশাশুনির এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, যদি স্থানীয় প্রশাসন, এনজিও ও সমাজ একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে প্রশাসনিক জটিলতা অনেকটাই কমে। এটি কেন্দ্রীয় নয়, মানুষকেন্দ্রিক প্রশাসনের উদাহরণ। প্রতিবন্ধী শিশুদের স্কুলে ভর্তি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
সাতক্ষীরার অনেক স্কুলে র্যাম্প নেই, টয়লেট সুবিধা নেই, শিক্ষক প্রশিক্ষিত নন। ফলে অভিভাবকরা সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে ভয় পান। অন্যদিকে কর্মসংস্থানে প্রতিবন্ধীদের অংশগ্রহণও কম। তাঁদের জন্য সরকারি কোটা থাকলেও তা প্রায়ই বাস্তবায়িত হয় না। কিন্তু যাঁরা সুযোগ পান, তাঁরা দক্ষতা দিয়ে প্রমাণ করছেনÑশারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনোই মেধার সীমাবদ্ধতা নয়। প্রয়োজন শুধু দরজা খোলা রাখাÑতাঁদের প্রবেশের পথ সহজ করা।
সাতক্ষীরার সামাজিক বাস্তবতায় প্রতিবন্ধী নারীরা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। তাঁদের অনেকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, কেউ কেউ যৌন নিপীড়নের শিকার, আবার অনেকে চিকিৎসা না পেয়ে ঘরে বন্দি।প্রতিবন্ধিতা এখানে শুধু শারীরিক নয়, সামাজিক কাঠামোর প্রতিটি স্তরে বাধা। এই প্রেক্ষাপটে পুনর্বাসন ক্যাম্পে নারীদের অংশগ্রহণ একটি বড় বার্তা দিয়েছেÑতাঁরাও সমাজের অংশ। তাঁদের থেরাপি, প্রশিক্ষণ, আত্মনির্ভরতার সুযোগ দিতে হবে; তাহলেই প্রকৃত অর্থে নারী উন্নয়ন সম্ভব।
প্রতিবন্ধী মানুষের পুনর্বাসন কেবল এনজিওর দায়িত্ব নয়। স্থানীয় সরকারই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্ল্যাটফর্ম।ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা সমাজসেবা অফিস, স্কুল ও মসজিদ, মন্দিরÑসবখানে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
সাতক্ষীরায় অনেক ইউনিয়নে সমাজকর্মীরা এখন মাঠে কাজ করছেনÑএটি আশার বার্তা। কিন্তু এই প্রচেষ্টা টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার ধারাবাহিক অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও মনোযোগ। জাতিসংঘের ভাষায়Ñ“Leave No One Behind” অর্থাৎ কাউকে পেছনে ফেলে উন্নয়ন নয়।
সাতক্ষীরার প্রান্তিক জনপদে যে উদ্যোগ শুরু হয়েছে, সেটিই এই দর্শনের বাস্তব অনুবাদ। উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির জীবনে পৌঁছায়। প্রতিবন্ধীদের জীবনে পরিবর্তন মানেই সমাজে পরিবর্তন। কারণ মানবিক উন্নয়ন মানে শুধু অর্থনীতি নয়Ñঅন্তর্ভুক্তির সম্প্রসারণ। যদি প্রতিটি উপজেলায় এমন স্ক্রিনিং ক্যাম্প হয়, প্রতিবন্ধী তালিকা হালনাগাদ করা হয়, নিয়মিত থেরাপি ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়Ñতাহলে সাতক্ষীরা হতে পারে বাংলাদেশের প্রথম “প্রতিবন্ধীবান্ধব জেলা।” এখানে স্থানীয় সরকার, সমাজসেবা অধিদপ্তর, এনজিও, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ একত্রে কাজ করছেÑএই সমন্বয়ই অন্য জেলার জন্য হতে পারে ‘সাতক্ষীরা মডেল’।
এই মডেল অনুসরণে দেশের অন্য প্রান্তেও প্রতিবন্ধীদের জীবনমান বদলানো সম্ভব। আশাশুনি থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন আমাদের শেখায়Ñসহানুভূতি নয়, দরকার অংশগ্রহণ। প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়ানো দান নয়, বরং দায়িত্ব। তাঁদের জীবনে আলো ফিরিয়ে আনা মানে সমাজে মানবতার পুনর্জাগরণ ঘটানো। একজন প্রতিবন্ধী শিশুর হাসিমুখে যখন নতুন আশার আলো জ্বলে ওঠে, তখন বুঝিÑআমাদের উন্নয়ন শুধু বাজেট নয়, এটি হৃদয়ের পরিমাপেও সফল হচ্ছে। সাতক্ষীরা এখন শুধু দুর্যোগের জেলা নয়; এটি মানবতার জেলার নামও হতে পারে।
এখানকার মানুষ প্রমাণ করেছেনÑপ্রতিবন্ধকতা কোনো সীমা নয়, বরং সমাজকে বদলে দেওয়ার এক সম্ভাবনা। আশাশুনির মতো উদ্যোগগুলো যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে বাংলাদেশ সত্যিই একদিন “অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র” হয়ে উঠবে। প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়, তারা সমাজের সাহস। তাদের পাশে দাঁড়ানো মানে, আমাদের মানবিক চেতনার পাশে দাঁড়ানো।