সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ছোট-বড় অবকাঠামো, বাঁধ ও তীব্র দূষণ। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে উপকূলীয় এলাকার নদ-নদীর মাছ ও জলজ প্রাণীর জীবন।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ছোট-বড় অবকাঠামো, বাঁধ ও তীব্র দূষণ। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে উপকূলীয় এলাকার নদ-নদীর মাছ ও জলজ প্রাণীর জীবন। গবেষণায় দেখা গেছে, বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত উপকূলে লবণাক্ততার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার ফলে মিঠাপানির মাছ আবাস বদলাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাছের আবাস পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে স্থানীয়দের জীবন, স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাসও। উপকূলবাসীর আর্থসামাজিক পরিমণ্ডলে অস্থিরতা বৃদ্ধির সঙ্গেও জলজ প্রাণীর আবাস বদলের সম্পর্ক রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ‘ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ গ্রুপ’ গত জানুয়ারিতে উপকূলীয় এলাকার মাছের জীবনমানের ওপর লবণাক্ততার প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশ করে। গবেষণাটির শিরোনাম ‘ফিশিং ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন কোস্টাল বাংলাদেশ: দি ইকোনমিক অ্যান্ড হেলথ ইমপ্যাক্টস অব ইনক্রিজিং স্যালিনিটি’। এতে ২৯ প্রজাতির মাছ নিয়ে গবেষণা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, বসন্তের শুরু থেকে বর্ষার আগ পর্যন্ত পুরো সময় উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যায়। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে নদ-নদীর মাছ ও জলজ প্রাণীর ওপর। এ সময় লবণাক্ততা সহ্য করতে না পেরে মিঠাপানির মাছ আবাস পরিবর্তন করে। ফলে ওই সময় স্থানীয় জেলেদের আর্থসামাজিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। বেড়ে যায় মাছের দাম। কমে যায় জেলেদের আমিষ গ্রহণের পরিমাণ।
গবেষকরা উপকূলীয় এলাকার পাঁচটি স্টেশন থেকে নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণের তথ্য নিয়েছেন। ২০২০-২২ সাল পর্যন্ত খুলনা, বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা, বরগুনার আমতলী ও পটুয়াখালীর গলাচিপায় বসানো স্টেশনগুলো থেকে লবণাক্ততার তথ্য নিয়েছেন। পাঁচটি স্টেশন থেকে পাঁচটি নদ-নদীর লবণাক্ততার তথ্য নেয়া হয়েছে। নদ-নদীগুলো হলো রূপসা, পশুর, বলেশ্বর, পায়রা ও রামনাবাদ। এসব নদীতে বছরের সবচেয়ে কম এবং সবচেয়ে বেশি লবণাক্ততার তথ্য নিয়ে কাজ করেছেন তারা। দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নদ-নদীগুলোয় লবণাক্ততার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে।
গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পাঁচটি স্টেশনেই বছরের সবেচেয়ে বেশি পরিমাণ লবণাক্ততা পাওয়া গেছে ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত। বর্ষায় এর পরিমাণ কমতে থাকে। পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ নির্ণয়ের একক হলো পার্টস পার থাউজ্যান্ড বা পিপিটি। খুলনায় সর্বোচ্চ লবণাক্ততার পরিমাণ পাওয়া গেছে ৮ দশমিক ৮৯ পিপিটি, মোংলায় ১২ দশমিক ৭৫, শরণখোলায় ১ দশমিক ১৮, আমতলীতে শূন্য দশমিক ২৩ ও গলাচিপায় শূন্য দশমিক ৫৮ পিপিটি।
ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকার নদ-নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ার ব্যাপারটি খুবই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন গবেষকরা। প্রাকৃতিক বা আবহাওয়াগত বৈচিত্র্যের কারণেই এ সময় বাংলাদেশে বৃষ্টির পরিমাণ কম থাকে বা হয় না বললেই চলে। ফলে উজানের পানি সমুদ্রে যাওয়ার সময় যথেষ্ট পানি পায় না। লবণাক্ততা বৃদ্ধির এটা একটা কারণ। তবে প্রধান কারণ হলো ভারতে নির্মিত ফারাক্কাসহ দেশে তৈরি বিভিন্ন বাঁধের কারণে সমান গতিতে পানি উজান থেকে সমুদ্রে যেতে পারে না। মেঘনার মোহনা দিয়ে পানির একটা স্রোত যাচ্ছে, কিন্তু পুরো সুন্দরবন অঞ্চলের পানি পদ্মা অববাহিকার গড়াই ও কপোতাক্ষ নদ দিয়ে দিয়ে যাওয়ার কথা—সেটা পুরোপুরি বন্ধ। একদিকে বৃষ্টি না থাকায় পর্যাপ্ত পানির অনুপস্থিতি, অন্যদিকে দেশী-বিদেশী বাঁধের বাধা—দুই মিলে উপকূলীয় এলাকার পানিতে এ সময় লবণাক্ততার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে।
তবে শুধু লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধির কারণেই মাছ বা জলজ প্রাণী আবাস বদলায় বলে মনে করেন না জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি মাছেরই লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা থাকে। বর্ষার আগে যে পরিমাণ লবণ থাকে সেটাও হয়তো মাছের জন্য বড় হুমকি হতো না যদি উজানের পানি একই স্রোতে ভাটিতে যেতে পারত। এর ওপর যোগ হয় নদী ও সমুদ্রদূষণ। আমাদের মাছ ও জলজ প্রাণী যে আবাস পাল্টাচ্ছে, এটার বড় একটা কারণ মনে করি দূষণ। নির্দিষ্ট পরিমাণ লবণাক্ততা হয়তো মাছ বা জলজ প্রাণী সহ্য করতে পারবে, কিন্তু এত তীব্র দূষণ তো তাদের সহ্যক্ষমতার বাইরে। তাছাড়া মাছের খাবার হিসেবে যে জলজ উদ্ভিদ রয়েছে সেগুলো দূষণের কারণে মারা যায় কিংবা বিষাক্ত হয়ে পড়ে। তাই মাছ হয় খাবারের অভাবে, না হয় বিষাক্ত খাবার থেকে বাঁচতে আবাস বদলায়। আর যেসব আবাস বদলাতে পারে না কিংবা লবণাক্ততা ও দূষণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না সেগুলো মারা যায়।’
অতিরিক্ত লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে সরাসরি দায়ী করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বিশেজ্ঞরা। তারা বলছেন, উপকূলীয় এলাকায় মাটি ও পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ার জন্য মূলত উজানের বাঁধ ও সরকারিভাবে নির্মিত বেড়িবাঁধ দায়ী। জোয়ারের সময় পানির সঙ্গে পলি এসে নদী ও খালের তলদেশ ভরাট হয়ে যায়। কিন্তু নদী ও খাল নিয়মিত খনন না করার ফলে এবং উজান থেকে মিঠাপানির স্রোত না আসার কারণে জোয়ারের পানি লোকালয়ের অনেক ভেতরে চলে আসে। ভাটার সময় পানি চলে গেলেও মাটিতে লবণ থেকে যায়। এর প্রভাবে ধীরে ধীরে ভূমিক্ষয়, নদীভাঙন ও ফসল নষ্ট হতে থাকে। এভাবে মাটি দূষিত এবং নদ-নদী ও খালের তলদেশ ভরাট হয়ে গেলে মাছ ও জলজ প্রাণী স্বাভাবিকভাবেই আবাস পাল্টাবে। শুধু আবাস নয়, এর ফলে এখন আর আগের মতো খুলনা-সাতক্ষীরা এলাকায় মাছের রেণু পাওয়া যাচ্ছে না। এর পেছনেও রয়েছে লবণাক্ততার প্রভাব। মাছের প্রজনন পদ্ধতি ও প্রজনন স্বাস্থ্য দুটোই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে লবণাক্ততার কারণে।
অতিরিক্ত লবণাক্ততার প্রভাবে শুধু মাছ নয়; সঙ্গে মানুষের আর্থসামাজিক জীবনও বদলে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী। এই প্রতিবেদক কে তিনি বলেন, ‘এসব এলাকায় এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। জেলেরা পেশা পাল্টাচ্ছে। নারী ও শিশুরা অনিরাপদ জীবনযাপন করছে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিশুশ্রম বাড়ছে। অপরাধ বাড়ছে। একসময় যারা মাছ ধরত, তারা অন্য কাজের খোঁজে চলে গেছে। অর্থাৎ মাছ যেভাবে আবাস পরিবর্তন করছে, উপকূল এলাকার মানুষও একইভাবে আবাস পরিবর্তন করছে।’