সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে উৎপাদন করা হচ্ছে মিঠাপানির শুঁটকি।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিকের পাশাপাশি উৎপাদন করা হচ্ছে মিঠাপানির শুঁটকি। এসব শুঁটকি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে ভারতে। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রামে রপ্তানি হচ্ছে এ অঞ্চলের শুঁটকি।
জানা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলে তিন থেকে চার বছর ধরে এ শুঁটকি উৎপাদন করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, মিঠাপানির শুঁটকি উৎপাদনে সম্ভাবনাময় সাতক্ষীরা জেলা। বছরে লক্ষাধিক টন শুঁটকি উৎপাদন হয় উপকূলীয় এ জেলায়। যা স্থানীয় আমিষের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি ভারতেও রপ্তানি হয়। গত তিন থেকে চার বছর বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ব্যবসায়ী মিঠাপানির মাছ দিয়ে শুঁটকি তৈরি করছেন। তবে এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো তথ্য বা পরিসংখ্যান দপ্তরে নেই। শুঁটকি উৎপাদনে কৃষক বা ব্যবসায়ীরা এগিয়ে এলে এ জেলায় বছরে বিপুল পরিমাণ শুঁটকি উৎপাদন সম্ভব, যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করা যাবে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বিনেরপোতা এলাকার শুঁটকি উৎপাদনকারী সাধন চন্দ্র জানান, গত তিন-চার বছর শুঁটকি উৎপাদন করেন তিনি। এসব শুঁটকির মধ্যে সিলভার কার্প, বাটা, তেলাপিয়া, পুঁটি ও মৃগেল রয়েছে। প্রতি মাসে ৭ থেকে ৮ হাজার কেজি শুঁটকি উৎপাদন করেন তিনি। তার উৎপাদিত শুঁটকি নীলফামারীর সৈয়দপুর ও চট্টগ্রামে সরবরাহ করেন তিনি। সাতক্ষীরার মিঠাপানির শুঁটকির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রামে। বর্তমানে প্রতি মণ শুঁটকি পাইকারি বিক্রি করছেন ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। শুঁটকি উৎপাদনে সম্ভাবনাময় সাতক্ষীরা। এ অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির মিঠাপানির মাছ উৎপাদন হয়।
বিনেরপোতার শুঁটকি ব্যবসায়ী প্রশান্ত কুমার জানান, স্থানীয়ভাবে কম দামের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করে শুঁটকি তৈরি করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে এসব শুঁটকি দেশের বিভিন্ন এলাকার পোলট্রি ও মাছের খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া সিলভার কার্প, মৃগেলসহ অন্যান্য কার্পজাতীয় মাছ শুঁটকি করে সৈয়দপুর ও চট্টগ্রামে সরবরাহ করেন।
সৈয়দপুরের শুঁটকি ব্যবসায়ী মো. আলাউদ্দিন জানান, প্রতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শুঁটকি সংগ্রহ করেন তিনি। এসব শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি ভারতে রপ্তানি করেন। এর মধ্যে সিলভার কার্পের শুঁটকি দেশের বাজারে সরবরাহ করা হয় এবং পুঁটি ভারতে রপ্তানি করেন। সাতক্ষীরায় যে পরিমাণ মিঠাপানির মাছ উৎপাদন হয়, তার একটি অংশ থেকে উৎপাদন হয় শুঁটকি।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরায় প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ মিঠাপানির মাছ উৎপাদন করেন এখানকার মৎস্য চাষিরা। যা থেকে শুঁটকি উৎপাদন করছেন তারা। চলতি বছর জেলার বিভিন্ন খাল, ঘের, পুকুরসহ ৬৩ হাজার জলাশয়ে ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে মিঠাপানির মাছ চাষ করা হচ্ছে। আর এসব চাষ করা মাছের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার টন। যার বাজারমূল্য ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকারও বেশি। তবে প্রতিবছর সাতক্ষীরা থেকে কী পরিমাণ শুঁটকি উৎপাদন করা হয় সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি দপ্তরটি।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিবছর সাতক্ষীরাতে প্রায় এক হাজার টন শুঁটকি উৎপাদন করা হয়। এর ভেতরে সিলভারকার্প, বাটা, তেলাপিয়া, পুঁটিসহ রুই জাতীয় মাছের শুঁটকি তৈরি হয় বেশি।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বিনেরপোতা এলাকার শুঁটকি উৎপাদনকারী সাধন চন্দ্র জানান, বিগত কয়েক বছর ধরে জেলার বিভিন্ন মাছের আড়ত থেকে সিলভার কার্প, মৃগেল, বাটা, তেলাপিয়া ও পুঁটিমাছ কিনছেন। মাছ কেনার পর বিনেরপোতার বেতনা নদীর ধারে তার খামারে শুঁটকি তৈরি করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, তার খামারে প্রতি মাসে প্রায় ৮ টন শুঁটকি মাছ উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত এসব শুঁটকি চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। যার বাজার মূল্য দেড়কোটি টাকারও বেশি।
একই এলাকার অপর শুঁটকি ব্যবসায়ী নৃপেণ দাস জানান, স্থানীয়ভাবে কম দামের মাছ কিনে শুঁটকি তৈরি করে থাকেন তিনি। পরে এসব শুঁটকি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পোলট্রি ও মাছের ফিড উৎপানকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করেন। আর এ থেকে প্রতিবছর ৫-১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়।
দেশের উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুরের বৃহৎ শুঁটকি আড়তের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘প্রতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শুঁটকিমাছ সংগ্রহ করি। পরে সেগুলো দেশের বিভিন্ন বাজারে বাজারজাতের পাশাপাশি ভারতে রপ্তানি করি। দেশব্যাপী সাতক্ষীরার শুঁটকির চাহিদা রয়েছে। তা ছাড়া দেশীয় প্রজাতির ছোট ও বড় মাছের শুঁটকি পাওয়া যায় বলে এখানে বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা শুঁটকি কিনতে আসেন। শুঁটকির মান অন্য যেকোনো জেলার চেয়ে ভালো।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, ‘মিঠাপানির শুঁটকিমাছ উৎপাদনে সম্ভাবনাময় একটি জেলা সাতক্ষীরা। বছরে প্রায় দেড় লাখ টন মাছ উৎপাদন হয় এখানে। যা স্থানীয় আমিষের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিলভারকার্প মাছের শুঁটকির চাহিদা উত্তরাঞ্চলে বেশি। আবার তেলাপিয়া মাছের শুঁটকি কাঁকড়ার খাবার হিসেবে চাহিদা বেশি। আর পশ্চিমবঙ্গে পুঁটি মাছের শুঁটকির চাহিদা রয়েছে। এতে করে গত বছরের চেয়ে এবছর জেলার কার্পজাতীয় মাছের দাম ভালো রয়েছে।