সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জলবায়ুর প্রভাবে উপকূলীয় কোটি কোটি মানুষের জীবনে নানা ক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে যার কারণে উপকূলের মানুষ জর্জরিত হয়ে পড়েছে দে। জলবায়ু বিষয় ক দেশী ও বিদেশী বিজ্ঞানীরা যে তথ্য দিয়েছিল যে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূল লবণ পানিতে তলিয়ে যাবে, কিন্তু বিষয়টি তখন তক্কাই করেনি কোন মানুষ, এখন যত দিন যাচ্ছে আস্তে আস্তে বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে বিজ্ঞানীদের কথা। পরস্পর প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের কথার আলামত মিলে যাচ্ছে। সে কারণে আজ উপকূলের মানুষ প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে জলবায়ুর নানা প্রভাবের শিকার হয়েছে।বিশ্বজুড়ে লবণাক্ত পানির পরিমাণ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গবেষকেরা সম্প্রতি লবণাক্ত পানি দ্রুত বাড়ার কারণ জানতে গবেষণা করেছেন। সেই গবেষণায় বলা হয়েছে, বেশ দ্রুত হারে লবণাক্ত পানির পরিমাণ বাড়ছে। এর ফলে ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রতি চারটি উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় তিনটিতেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি লবণাক্ত পানি থাকবে, যা ভূগর্ভস্থ স্বাদুপানির উৎসেও প্রবেশ করবে। এর ফলে কিছু উপকূলীয় জলাশয়ের পানি পান করা সম্ভব হবে না। তখন সেচের জন্য উপকূলীয় অঞ্চলে স্বাদুপানির সংকট দেখা যাবে। লবণাক্ত পানির পরিমাণ বাড়ার কারণে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতিও বেশি হবে। বিষয়টিকে বিজ্ঞানীরা লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ বলছেন। এমন ঘটনা উপকূলরেখার নিচে দেখা যায়।
উপকূলে লবণাক্ত পানি ও ভূগর্ভস্থ স্বাদুপানি পাশাপাশি অবস্থান করে। বৃষ্টির মাধ্যমে উপকূলীয় জলাশয়ে স্বাদুপানি জমা হয়। উপকূলরেখায় সমুদ্রের চাপের কারণে সমুদ্রের পানি ভূমির অভ্যন্তরীণ দিকে প্রবেশের চেষ্টা করে। দুই শক্তির ভারসাম্য একদিকে স্বাদুপানি ও অন্যদিকে লবণাক্ত পানির মধ্যে সমন্বয় করে।
গবেষণায় বিশ্বের ৬০ হাজারের বেশি উপকূলীয় জলাশয়ের পানির তথ্যসহ ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার তথ্যমতে, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সর্বত্র বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহ পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মেক্সিকো উপসাগরের চারপাশের উপকূল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু নিচু স্থান ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
জলবায়ু পরিবর্তন স্বাদু ও লবণাক্ত পানির ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলছে। পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এতে লবণাক্ত পানি উপকূলরেখা থেকে অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে ভূমির দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে। শুধু তা–ই নয়, লবণাক্ত পানির স্থলভাগের দিকে আসার শক্তিও বাড়ছে। একই সময়ে কম বৃষ্টি ও উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে ভূগর্ভস্থ স্বাদুপানির সঞ্চালনশক্তি দুর্বল হচ্ছে। এতে উপকূল অঞ্চলের ভূপৃষ্ঠের নিচে স্বাদুপানির পরিমাণ কমছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। দিন দিন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে এসব জনপদ। বছরের পর বছর প্রকৃতির বিরূপ আচরণের সঙ্গে মানুষ খাপ খাওয়াতে না পেরে ভিটামাটি ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছে। এতে তৈরি হচ্ছে খাদ্য, বাসস্থানসহ জীবনযাত্রায় নানা সংকট। এদিকে উপকূলীয় অঞ্চলকে মাতৃস্নেহে আগলে রাখা সুন্দরবনও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রতি বছর আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে যে সুন্দরবনের প্রভাবে এসব জনপদে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হয়; সেই সুন্দরবনও আজ ভালো নেই। বিষ দিয়ে মাছ শিকার, অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারীদের নির্বিচারে গাছ নিধন এবং চোরা শিকারিদের হাতে মরছে বাঘ-হরিণসহ সুন্দরবনের নানা প্রজাতির প্রাণী। এভাবে সুন্দরবন ধ্বংস হতে হতে উপকূলীয় জনপদও একটি সময় বিলীন হয়ে যাবে—এমন আশঙ্কা বহু আগে থেকে করা হচ্ছে। এর পরও সুন্দরবন বাঁচাতে কিংবা উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষা করতে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে না। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় বা বৃষ্টি মৌসুমে যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে, সেগুলোও কোনো কাজে আসছে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দিন দিন কৃষিজমির পরিমাণ কমে আসছে। মানুষ বাধ্য হয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে পেশা পরিবর্তন করছে। বিশেষ করে খুলনার কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ, সাতক্ষীরা শ্যামনগর এবং আশাশুনি, বাগেরহাটের শরণখোলায় বর্তমানে গবাদি পশুর উৎপাদন কমে গেছে।
বৈশ্বিক উষ্ণতায় গ্রীষ্মের সময় প্রচণ্ড গরম পড়ছে। শীতের সময় অধিক পরিমাণে শীত এবং বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির ফলে দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে উপকূলীয় জনপদে। মানুষ নদীভাঙনের শিকার হয়ে এলাকা ছাড়ছে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে এমন একটি সময় আসবে, যখন দেশের মানচিত্র থেকে উপকূলীয় এসব অঞ্চল হারিয়ে যাবে—তা আর বেশি দূরে নই। তাই এসব অঞ্চল টিকিয়ে রাখতে সরকারের আরও আন্তরিকতা এবং সদিচ্ছা প্রয়োজন। আমরা দেখেছি, প্রতি বছর যখন বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন দেখা দেয়, তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের টনক নড়ে। তারা তখন বেড়িবাঁধ দেওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করে দেয়। কিন্তু সে বাঁধ বছর না যেতেই নদীর সঙ্গে মিশে যায়। এতে একদিকে যেমন প্রতি বছর সরকারের অর্থের অপচয় ঘটছে, অন্যদিকে দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে। তাই বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি এসব অঞ্চলের লবণাক্ত জমিতে লবণ সহনশীল ফসল উৎপাদনে নজর দিতে হবে। বিশেষ করে এসব জনপদে যাতে গবাদি পশুর উৎপাদন কমে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে গোখাদ্য উৎপাদনে সরকারের সহযোগিতা বাড়াতে হবে। খামারি বা স্থানীয়দের গবাদি পশুর উৎপাদন বৃদ্ধি করতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করতে হবে। গবাদি পশুর চিকিৎসায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাসহ সরকারিভাবে আরও নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যাতে সহজে কোনো পশু রোগে আক্রান্ত হলে তারা চিকিৎসা নিতে পারে। প্রয়োজনে গবাদি পশুর উৎপাদন বাড়াতে সরকারের ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে। আশা রাখি, উপকূলীয় জনপদে গবাদি পশুর উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সরকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে দেশের সমুদ্র উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ বহুমাত্রিক সংকটে পড়ছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, খাদ্য, বসতি, বিশুদ্ধ পানীয় জল, যাতায়াত এবং নিরাপত্তাহীনতায় পতিত হতে হচ্ছে তাদের। দেশের সমুদ্র উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, যশোর, ভোলা, কক্সবাজার জেলার মানুষকে চরম সংকটে ফেলছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে। এর বাস্তব প্রমাণ পাওয়া গেছে সদ্য সমাপ্ত ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’ দেশের উপকূলীয় উপকূলে আঘাতে সম্পদ ও বাড়িঘর, পশুপাখি, মাছসহ তাদের মূল্যবান সম্পদের ক্ষতি। আবার এসব অঞ্চলের নদীসমূহ অতিমাত্রায় জোয়ার-ভাটার কারণে প্রতিদিন নতুন নতুন সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এসব নদীতে সাগর থেকে জোয়ারের পানি আসে এবং ভাটায় ফিরে যায়। এ নদীগুলোর সঙ্গে পদ্মাপ্রবাহের কোনো সম্পর্ক নেই। এ কারণে সমগ্র এলাকা হচ্ছে জোয়ার-ভাটার প্লাবনভূমি।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিগত কয়েক বছরে জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ। সমুদ্রের অতিমাত্রায় জোয়ার -ভাটা এবং জলোচ্ছ্বাসে একদিকে নদীভাঙন অন্যদিকে সমুদ্রের পানির অতিমাত্রায় লবণাক্তায় এসব অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দেয়। লবণাক্ত পানি পান করে নারী, শিশুসহ প্রায় সব বয়সি মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের। অন্যদিকে খুলনা বাগেরহাট, সাতক্ষীরা প্লাবনভূমির নিম্নাংশে অবস্থিত জগৎখ্যাত সুন্দরবন। সুন্দরবন থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ টন গাছের পাতা এ অঞ্চলের গভীর জোয়ারের পানি নদীতে পড়ে এবং তা ধীরে ধীরে জলজ প্রাণীর খাদ্যকণায় রূপান্তরিত হয়। তাই এ অঞ্চলের জৈবিক উৎপাদনশীলতা পৃথিবীর যেকোনো এলাকার তুলনায় অনেক বেশি।
উপকূলীয় বাঁধ হওয়ার আগে জোয়ারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জলরাশি নদীগুলোর দুকূল ছাপিয়ে প্লাবনভূমিতে উঠে আসত এবং জোয়ারবাহিত পলি প্লাবনভূমিতে পড়ে তীব্র স্রোতে ভাটায় তা ফিরে যেত। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেমন জোয়ার-ভাটার নদীগুলোর নাব্য বজায় থাকত, তেমনি ভূমির গঠন প্রক্রিয়া সমানতালে চলত। তা ছাড়া এখানকার কৃষকরা প্লাবনভূমির চারদিকে জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে সাময়িক বাঁধ দিয়ে আমন ধান রোপণ করত এবং পৌষ মাসে বাঁধ ভেঙে প্লাবনভূমিতে জোয়ারবাহিত পলির কারণে সুযোগ করে দিয়ে ভূমি গঠন ও জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করত। ফলে নদীর নাব্য থাকত। এ কারণে এখানকার নদী, প্রকৃতি, পরিবেশ ও কৃষিব্যবস্থা এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী; দেশের অন্যান্য উপকূল থেকে তা ভিন্নতর; কিন্তু এখানকার প্রকৃতি ও প্রতিবেশকে বিবেচনায় না নিয়ে ষাটের দশকে উপকূলীয় বাঁধ প্রকল্পের আওতায় এ অঞ্চলে ৩৯টি পোল্ডার নির্মাণ করা হয়, এর আওতায় ১ হাজার ৫৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ ও ২৮২টি স্লুইসগেট নির্মিত হয়। এ কারণে এই নদীগুলো স্থায়ীভাবে প্লাবনভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। যার ফলে জোয়ারবাহিত পলি প্লাবনভূমিতে পতিত হতে না পেরে নদীতে অবক্ষেপিত হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে বহু নদী মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। অবশিষ্ট জোয়ার-ভাটার নদীগুলো পলি দ্বারা ভরাট হয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর ফলে বিগত শতকের আশির দশকে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা এবং ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠেছে প্রলয়ঙ্করী ও বিধ্বংসী।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক প্রভাবে উপকূলীয় মানুষের মধ্যে মানসিক অসুস্থতা দেখা দিচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে বাস করা ২২.৪৮ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছে। এ ছাড়া ৪৩.৯৫ শতাংশ মানুষের ভালো ঘুম হয় না। সম্প্রতি রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এবং বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ, সিভিল সোসাইটি প্ল্যাটফরমের এই যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, ‘বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ুর প্রভাব শীর্ষক’ গবেষণায় গুরুতর দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা, মানসিক চাপ, মানসিক বৈকল্য এবং ঘুম না হওয়ার মতো জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা উঠে এসেছে। এ ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের ৪৩.৯৫ শতাংশ মানুষের ভালো ঘুম হয় না বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা জানান, খুলনার শ্যামনগর এলাকায় এই সমীক্ষা চালানো হয়।
বাংলাদেশ একটি নিম্নভূমি হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই অঞ্চল ঘূর্ণিঝড়, উপকূলীয় বন্যা এবং উপকূলীয় ক্ষয়ক্ষতির মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য খুব ঝুঁকিপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে বিগত নব্বইয়ের দশকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের গবেষণা সংস্থা সিইজিআইএস একটি সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষায় নদী বাঁচানোর মাধ্যমে জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য নদীতে অবাধ জোয়ার-ভাটার ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। এর পর নদী অববাহিকায় বিশেষ করে খুকশিয়া বিলে এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এই অববাহিকার পাঁচ-সাতটি উপজেলা জলাবদ্ধতামুক্ত থাকে; কিন্তু কৃষকদের অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হলে নদী রক্ষা কার্যকারণ বন্ধ হয়। ফলে হরি, শ্রী ও ভদ্রা নদীগুলো আবারও ভরাট হয়ে গেছে এবং জলাবদ্ধতার তীব্রতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
অন্যদিকে ২০১৫ সালে সাতক্ষীরা জেলার কপোতাক্ষ নদ অববাহিকার জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য পাখিমারা বিলে টিআরএম কার্যক্রম চালু হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি কপোতাক্ষ অববাহিকায় আর কোনো জলাবদ্ধতা দেখা দেয়নি। তবে বর্তমানে টিআরএম কার্যক্রম বন্ধ রাখার ফলে নদীর নাব্য দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু জনগণের দৃষ্টিতে তার কোনোটিই প্রকৃতি, নদী ও পরিবেশসম্মত নয় এবং সেই কারণে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও নদীর নাব্য রক্ষায় এসব প্রকল্প সফল ভূমিকা রাখতে পারেনি। একই নদী বারবার খননের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা দূরীকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে; কিন্তু তা এক-দুই বছরের মধ্যে ফের পলি দ্বারা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের জনবসতি ও সভ্যতা রক্ষার জন্য এ অঞ্চলের নদীকে বাঁচিয়ে রাখা বা নদীর নাব্য রক্ষার জন্য জোয়ারের পানিতে আসা পলি নদীর প্লাবনভূমিতে ফেলার ব্যবস্থা নিতে হবে।
গবেষণা প্রতিবেদনে সুপারিশ অনুযায়ী উপকূলের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার বিধান বাড়ানো, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করা, কাউন্সেলিং ইউনিট স্থাপন করা এবং ন্যাশনাল আডাপ্টেশন প্ল্যান (ন্যাপ) জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে একীভূত করা। আরও সুপারিশের মধ্যে রয়েছে দুর্বল জনগোষ্ঠীর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, নীতি এবং আইনি কাঠামোর পরিবর্তন এবং মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারীদের জন্য স্বাস্থ্য সুবিধা বিধানগুলো উন্নত করা। সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের আরও প্রভাব জানতে উপকূলের পরিবারগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা দরকার।’
সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ডা. ড্যানিয়েল নোভাক জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বিপজ্জনক। সুইডেনে মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ প্রভাব জেনে তাদের বাচ্চাদের হত্যা করার মতো উদাহরণও রয়েছে। খরায় জেগে উঠল ৩০০ বছরের পুরোনো শহর। কৃত্রিম হ্রদের নিচে তলিয়ে গিয়েছিল ফিলিপাইনের প্রাচীন শহর পান্তাবঙ্গন। ১৯৭০-এর দশকে কৃত্রিম হ্রদের জন্য জলাধার নির্মাণের পর ডুবে যায় শহরটির ধ্বংসাবশেষ। তীব্র খরার কারণে বাঁধের ভেতরের কিছু অংশ শুকিয়ে যাওয়ায় জেগে উঠেছে শহরের চিহ্ন পান্তাবঙ্গ।
বাংলাদেশে গত এক মাস ধরে রছে প্রচণ্ড দাবদাহ। ইতোমধ্যে এ কারণে মারা গেছে প্রায় ২৪ জন। তীব্র গরমের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটির লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অফিসের কার্যক্রমও বাড়ি থেকে করার সুপারিশ করা হয়েছে। আগামী দিনগুলোতেও তাপমাত্রা বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ফিলিপাইনের আবহাওয়া দপ্তরের বিশেষজ্ঞ বেনিসন এস্তারেজা বলেছেন। তিনি বলেছেন ‘ফিলিপাইনে জলবায়ু পরিবর্তনের সাধারণ প্রভাব হলো উষ্ণ তাপমাত্রা। আমরা যে তাপ অনুভব করছি, তা আগামী দিনে ক্রমাগত বাড়তে পারে।’ ফিলিপাইনে এখন উষ্ণ ও শুষ্ক ঋতুর মাঝামাঝি সময়। বিশেষ আবহাওয়া পরিস্থিতি ‘এলনিনো’র (প্রশান্ত মহাসাগরের সাগরপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতা) প্রভাবে দেশটিতে গরমের তীব্রতা আরও বেড়েছে। এমনি অবস্থায় বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় মানুষকে রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।