বিশেষ প্রতিনিধি : জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে তীব্র ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে স্বাদু পানির এলাকাগুলো লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ফলে উপকূলীয় বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠীর পানীয় জলের সহজলভ্যতা, স্বাদু পানি নির্ভর কৃষি কাজ ও জীবিকার ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ প্রভাব এই অঞ্চলের নারী ও শিশুদের ওপর আরো মারাত্মক।
স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জীবনেও জলবায়ু পরিবর্তন মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বহু কিশোরীর বিয়ে হয়ে যায় অল্প বয়সে। তারা স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। পরিবারের সংকটের কারণে বহু কিশোর কাজে যোগ দিতে বাধ্য হয়। সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর, খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি, দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নে এমন অনেক ঘটনা পাওয়া যায়। প্রতাপনগর ইউনিয়নের তালতলার বাসিন্দা ফারুক হোসেন ঘন ঘন প্রাকৃতিক বিপদের মুখে পড়ে তার ৭ম শ্রেণি পড়ুয়া কিশোরী কন্যাকে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তার ৮ম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে স্কুল ছেড়ে কাজে যোগ দিয়েছে। বড় ছেলে অনেক কষ্টে অনার্স পাস করেছিল। কিন্তু চাকরির অভাবে সে এখন রাজমিস্ত্রির কাজ করে। ফারুক হোসেন বলেন, ‘প্রাকৃতিক বিপদে পড়ে আমি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছি। বড় ছেলে অনার্স পাস করলেও চাকরি পায়নি। চাকরি পেতে টাকা লাগে। ঘূর্ণিঝড় আম্পান আমার সব কিছু কেড়ে নিয়েছে।’
আশাশুনির প্রতাপনগরের সাংবাদিক মাছুম বিল্লাহ, যিনি ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সর্বনাশা ঘটনাগুলো খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর প্রায় দুই বছর এই এলাকার মানুষ জোয়ার-ভাটার সঙ্গে বসবাস করেছে। এই এলাকায় নতুন নতুন অনেক সংকট তৈরি হয়েছে। বড়দের সঙ্গে ছোটরাও পরিবারের সংকটগুলো মোকাবিলা করে। জরুরি সময়ে সংকট উত্তরণে যুবকদের স্থানীয় উদ্যোগ দেখেছি। কিন্তু তাদের রয়েছে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার অভাব। দক্ষতা বাড়াতে পারলে তরুণ-যুবকরা সংকট উত্তরণে আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।’
জলবায়ু সংকটাপন্ন এলাকায় অ্যাডাপটিভ লার্নিংয়ের আওতায় শিক্ষার্থীরা নানামুখী কার্যক্রমের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর বিভিন্ন প্রভাব সম্পর্কে নতুন করে অনেক কিছু শিখছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা দায়িত্বশীল হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রভাবের শিকার হওয়ার পরিবর্তে তারা পরিবর্তনের রূপকার হয়ে উঠবে। নিজেদের পরিবর্তনের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীরা তাদের মতো কিশোর-কিশোরীদের সম্পৃক্ত করবে। সে কথাই বলছিলেন সাতক্ষীরার আশাশুনির বড়দল এলাকার অ্যাডাপটিভ লার্নিংয়ের শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরার বাবা ফারুক হোসেন গাজী।
তিনি বলেন, ‘দুর্যোগপ্রবণ এলাকার পরিবারগুলো বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করে। শিশুরাও সে সংকটের বাইরে নয়। ওরা শিশুকাল থেকে বিভিন্ন ধরনের সংকট মোকাবিলা করে। সেক্ষেত্রে অ্যাডাপটিভ লার্নিং এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য খুব দরকারি। আমি আশাকরি শেষ অবধি এই কার্যক্রম জলবায়ু সংকটাপন্ন এলাকায় অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।’
খাদিজাতুল কুবরা একা নন, তার গ্রামে মো. আল আমীনের মেয়ে শামীমা খাতুন, শহীদুল ইসলামের মেয়ে সুমি খাতুন, দাউদ মোড়লের ছেলে ফাহিম হোসেন, মহসিন গাজীর ছেলে মো. নাঈমসহ আরো অনেক শিক্ষার্থী অ্যাডাপটিভ লার্নিংয়ে সবুজ দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগে সম্পৃক্ত হয়েছে। শুধু সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলা এই বড়দল এলাকায় নয়, এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে খুলনা জেলার দাকোপ, পাইকগাছা, কয়রা এবং সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার প্রায় তিন হাজার কিশোর-কিশোরী, যারা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কলেজ পড়ুয়া।
জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই দুইটি জেলার বিপদাপন্ন। জনগোষ্ঠীর জীবিকা, আবাসন এবং পানীয় জলের সমস্যা প্রকট। সংকট মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তোলার লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে অ্যাডাপটিভ লার্নিং সেন্টার। বিপদাপন্ন এলাকার বাস্তবের অবস্থাগুলোর সঙ্গে আগামী প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীদের আরো নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করতে শিক্ষার্থীদের দুইটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একদল ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সি এবং আরেক দল ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি। এরা ‘চলো পৃথিবী সাজাই’ শিরোনামে জলবায়ু শিখন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এই শিক্ষার্থীরা জলবায়ু পরিবর্তন শিখছে বিশ্ব, বাংলাদেশ এবং উপকূলের প্রেক্ষাপটে। এর আওতায় থাকছে গ্রিন হাউস, ইতিহাসের ভয়াবহতম প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো বিষয়ে আলোকপাত।
জলবায়ু শিখনে শিক্ষার্থীরা শিখছে মানুষের জীবন এবং জীবিকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। যে ঘটনাগুলোর সঙ্গে এই শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই পরিচিত। কিন্তু এসব বিষয়ে ওদের আগে কিছুই জানা ছিল না। এখন ওরা জানতে পারছে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নিরাপদ পানির অভাব, নদীভাঙন, প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাস, স্বাস্থ্যঝুঁকি, জীবিকার উৎস ধ্বংস, কৃষি উৎপাদন হ্রাস ইত্যাদি বিষয়ে। শিক্ষার্থীরা শিখছে নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের বাড়তি প্রভাব সম্পর্কে। এতে তাদের শেখানো হচ্ছে নারী পরিবর্তনের রূপকার। ওরা শিখছে জলবায়ু পরিবর্তনে জেন্ডার সমতার প্রয়োজনীয়তা, কিশোর-কিশোরীর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইত্যাদি। শিক্ষার্থীরা শিখছে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন, সক্রিয় নাগরিকত্ব, অধিকার, দায়িত্বসহ নানা বিষয়। জলবায়ু আন্দোলন এবং জলবায়ু স্বেচ্ছাসেবায় কিশোর-কিশোরীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো এই পাঠ থেকে শিখছে শিক্ষার্থীরা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সবুজ দক্ষতা গড়ে উঠছে, যা জলবায়ু সংকটাপন্ন এলাকায় সবুজবাতি জ্বলবে বলে উদ্যোক্তাদের আশাবাদ।
জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা উপকূলীয় এলাকার প্রার্থীরা। তারা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিতে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূল। এ ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের যেই নির্বাচিত হন না কেন, তাঁরা এই অঞ্চলের পানি সংকট, লবণাক্ততা, বেড়িবাঁধ, নদী ভাঙ্গন ও জলাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করবেন। খুলনা উপকূলের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন সংসদীয় এলাকা ঘুরে প্রার্থী, ভোটার, পরিবেশ সংগঠক ও নাগরিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য উঠে এসেছে।খুলনার পাইকগাছার মাহমুদকাটি জেলেপল্লীর শংকর বিশ্বাস বলেন, উপকূল নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু কাজ হয় না। আগে ঝড়-ঝঞ্জা কম ছিল। আমাদের জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে যেতেন। বড় ঝড়-ঝঞ্জার ভয় বেশী ছিল। কিন্তু এখন হঠাৎ হঠাৎ দুর্যোগ হচ্ছে। আমরা এই দুর্যোগ মোকাবেলায় এমপি প্রতিশ্রুতি চাই। দাকোপের বানীশান্তা ইউনিয়নের আমতলা গ্রামের ঝর্ণা মন্ডল (৩৫) বলেন, দুর্যোগ এখন বলে-কয়ে আসে না। আমরা জনপ্রতিনিধিদের কাছে পর্যাপ্ত সাইক্লোন সেন্টার, পানীয় জলের সংকট ও নদী ভাঙ্গন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি চাই। একই এলাকার শিলা রায় (৩৪) জানান, নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দেন, আমরা তার বাস্তবায়ন চাই। সাতক্ষীরা শ্যামনগর আশরাফ কাগুজী (৫৮) বলেন, ‘আমরা সব সময়েই ভয়ে থাকি। কখন ঝড়, জলোচ্ছ্বাস আসে। বাঁধ ভাঙন, লবণাক্ততাসহ সমস্যার শেষ নেই। ভোটের আগে অনেকে কথা দেন, কিন্তু অবস্থা পাল্টে না। আমরা এ থেকে নিস্তার চাই। বাগেরহাটের মোংলার আমীর হোসেন বলেন, ‘নির্বাচন এলে অনেক প্রতিশ্রুতি আছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি থেকে রেহাই নেই। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, আমরা কার্যকর উদ্যোগ চাই।’ খুলনা আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, ২০১১ সালে খুলনা অঞ্চলের গড়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন ২১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১২ সালে সর্বোচ্চ ৩১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সর্বনিম্ন ২২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০২০ সালে এই তাপমাত্রা দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ৩১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সর্বনিম্ন ২২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২১ সালের এপ্রিলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি বছরে তা ৪১ দশমিক ৩ সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। অবশ্য ১০ বছর পর গড় বৃষ্টিপাত কিছুটা কমেছে। ২০১৩ সালের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ছিল ১৭৩ মিলিমিটার। চলতি বছরে সেটি এসে দাঁড়িয়েছে ১৬৫ মিলিমিটার। অপরদিকে বাংলাদেশে ২০০৭ সাল থেকে গেল ১০ বছরের সিডর আইলা, মহাসেন, রোয়ানু, মোরা, ফণি, বুলবুল, আম্ফান, ইয়াস, গুলাব, জাওয়াদ, সিত্রাং, মোখা, হামুন ও মিথিলী সহ ১৪টি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। যার বেশীর ভাগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট উপকূলের মানুষ। বর্তমান বন, পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজিওয়ানা হাসান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলে লবণাক্ততা, পানি সংকট, ভূমিক্ষয়, নদী ভাঙন রয়েছে। অন্যান্য এলাকার থেকে এখানকার সমস্যাগুলো ব্যতিক্রম। নারী ও শিশু স্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদনে বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। কিন্তু এসব বিষয়ে বরাদ্দ আশানুরূপ নয়। এসব ইস্যুতে সাধ্যমত কাজ করছি। এক সময়ে লবণপানির বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। এবার নির্বাচিত হলে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে এসব ইস্যু নিয়ে কাজ করতে চাই। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ার জলবায়ু পরিবর্তনে মোকাবেলায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, নির্বাচিত হলে ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করবো। একই আসনে বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী দেবদাস সরকার তিনি দুর্যোগ কবলিত কয়রার মানুষ পরিচয় দিয়ে বলেন, উপকূলের মানুষ দুর্যোগে বিপর্যস্ত। এতে থেকে উত্তরণে উদ্যোগ নেওয়া হবে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ বলেন, চলমান বেড়িবাঁধ কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য ইতিমধ্য কয়েকবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাইক্লোন সেন্টার স্থাপন, মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ও উপকূলীয় মানুষের কর্মসংস্থানে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হবে। একই আসনে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) প্রার্থী গোলাম রেজা বলেন, শ্যামনগরের গাবুরা-গড়াইখালীর দুরাবস্থা কারো অজানা নয়। আমি নির্বাচনে হলে তাদের জন্য কাজ করতে চাই। সাতক্ষীরার মানবাধিকার সংগঠন স্বদেশ’র নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত উপকূলের দুর্ভোগ মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দাবি করেন। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য প্রার্থীরা যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন; সেগুলো তাদের রক্ষা করা উচিত। না হলে উপকূলবাসীর টিকে থাকা অসম্ভব হবে। তৃতীয় উপকূলীয় পানি সম্মেলন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম আরফীন বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলকে রক্ষা করা যাবে না। আগামীদিনে নীতি নির্ধারকদের প্রতিশ্রুতি অবশ্যই প্রশংসনীয়। ভূ-প্রকৃতিগতভাবে ভিন্ন আবহের খুলনা উপকূলের জন্য বিশেষ উদ্যোগ জরুরি। না হলে আর্থসামাজিক সকল ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম বৃহৎ অংশটি পিছিয়ে পড়বে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টি কমে গেছে। কয়েক বছরে মাটিতে বেড়েছে লবণাক্ততা। এ কারণে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে প্রায় দেড় হাজার রেইনট্রি মারা গেছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা। রাস্তার দুই পাশে থাকা সারি সারি এ গাছগুলো এখন বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। ডাল ভেঙে আহত হচ্ছেন পথচারীরা। প্রায়ই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে সড়কে চলাচলকারী যানবাহন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টি কমে গেছে। কয়েক বছরে মাটিতে বেড়েছে লবণাক্ততা। এ কারণে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে প্রায় দেড় হাজার রেইনট্রি মারা গেছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা। রাস্তার দুই পাশে থাকা সারি সারি এ গাছগুলো এখন বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। ডাল ভেঙে আহত হচ্ছেন পথচারীরা। প্রায়ই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে সড়কে চলাচলকারী যানবাহন। সাতক্ষীরা-আশাশুনি সড়কে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে ডাল ভেঙে হতাহতের শঙ্কায় এ পথে শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছেন অভিভাবকরা।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রধান ড. নাসরিন আক্তার বণিক বার্তাকে জানান, রেইনট্রি গাছ মরে যাওয়ার অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাটির লবণাক্ততা ও ক্ষার বেড়ে যাওয়া। তাছাড়া প্রত্যেক গাছের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত কমে গেছে। মৌসুমি বৃষ্টি না হলে রেইনট্রি গাছ খাদ্য সংকটে পড়ে। এছাড়া বিভিন্ন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েও গাছ মরে যেতে পারে।
বছরখানেক আগে সাতক্ষীরার সড়ক থেকে মারা যাওয়া রেইনট্রি গাছগুলো অপসারণের উদ্যোগ নেয় বন বিভাগ। তারা এগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও এতদিনেও সেগুলো কাটতে পারেনি জেলা পরিষদ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ ও সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে সড়কটি অনিরাপদ হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা-আশাশুনি সড়কের ধুলিহর বাজারের পাশে কয়েক মাস আগে ডাল ভেঙে স্কুলছাত্র প্রণব সরকার গুরুতর আহত হয়। সে আশাশুনি সদরের শংকর সরকারের ছেলে। সম্প্রতি সড়কের মালির মোড়ের কাছে চলন্ত মোটরসাইকেলের ওপর ডাল ভেঙে পড়ায় মারাত্মক আহত হন সদর উপজেলার বালিথা গ্রামের আরশাদ আলী ওরফে ভোলা। তার কোমরের হাড় ভেঙে গেছে বলে জানায় পরিবার। গত কোরবানি ঈদের দিন মোটরসাইকেলে করে যাওয়ার পথে সড়কের মেল্লেকবাড়ী মোড়ের কাছে ডাল ভেঙে গুরুতর আহত হন মোটরসাইকেল আরোহী ফারুক হোসেন।
আশাশুনির জাহানাবাজ এলাকার বাসিন্দা আকতার হোসেন, সিরাজুল ইসলাম ও গোপাল চন্দ্র মণ্ডল গতকাল জানান, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি মরা রেইনট্রি গাছের কারণে তাদের ছেলে-মেয়েরা নিরাপদে স্কুল-কলেজে যেতে পারে না। এসব মরা গাছের ডাল ভেঙে পড়ে যেকোনো সময় পথচারীদের জীবন বিপন্ন হতে পারে।
তারা আরো জানান, বৃষ্টিপাত কমেছে। পানির অভাবে কয়েক বছর আগে রেইনট্রি গাছগুলো মরেছে। এখন এসব গাছের ডাল ভেঙে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।
সাতক্ষীরা জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ জানান, সড়কটির দুই পাশে অসংখ্য মরা রেইনট্রি গাছ এখন যাত্রীবাহী যান চলাচলে মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রায়ই শুকনা গাছের ডাল ভেঙে পড়ে যাত্রীবাহী বাসের ওপর। এতে করে যাত্রীসহ বাস চলাচলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাতক্ষীরা-আশাশুনি সড়কটি।’ তিনি দ্রুত এসব মরা রেইনট্রি গাছ অপসারণ করে সড়কটি নিরাপদ রাখতে জেলা পরিষদসহ সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানান।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। জনবহুল ও ব্যস্ততম একটি সড়কে সহস্রাধিক মরা রেইনট্রি গাছ দীর্ঘদিনেও অপসারণ হয়নি। দায়িত্বে এত অবহেলা কেন? এ সড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে।’ তিনি অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে সব মরা গাছ অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা খলিলুর রহমান জানান, ফেব্রুয়ারির মধ্যে এসব মরা গাছ অপসারণ করা হবে। তিনি বলেন, ‘এসব গাছের আনুমানিক মূল্য নির্ধারণ করার জন্য সামাজিক বন বিভাগের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ করার পর দরপত্র আহ্বান করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সামাজিক বন বিভাগ সাতক্ষীরা জেলার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিএম মারুফ বিল্লাহ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সাতক্ষীরা-আশাশুনি সড়কের পাশে যেসব গাছ আছে তার মালিক জেলা পরিষদ। তবে মরা গাছের মূল্য নির্ধারণ করে এক বছর আগে সাতক্ষীরা জেলা পরিষদকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তার পরও কেন তারা গাছ অপসারণের জন্য দরপত্র আহ্বান বা অন্য কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণ করেনি তা বলতে পারব না।’