সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : আজ পহেলা ফাল্গুন। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে সেজে উঠেছে প্রকৃতি, জেগে উঠেছে বাঙালির মন। দক্ষিণা হাওয়ার মৃদুমন্দ ছোঁয়ায় চারদিকে যেন উৎসবের আবহ। কোকিলের কূজন, পলাশ-শিমুলের লাল আগুন আর ফুলের ঘ্রাণে মুখর হয়ে উঠেছে জনপদ। বসন্তের এই প্রথম দিনে দেশজুড়ে চলছে বর্ণিল আয়োজন।
ফাল্গুনের হাত ধরেই বসন্তের আনুষ্ঠানিক আগমন। প্রকৃতির রঙিন সাজে মুগ্ধ মানুষের মনেও লেগেছে উচ্ছ্বাসের দোলা। নতুন দিনের প্রত্যয়, ভ্রাতৃত্ব আর সৌন্দর্যের বার্তা নিয়ে এসেছে বসন্ত। কবির ভাষায়—ফুল ফুটুক আর না-ই ফুটুক আজ বসন্ত’—এই আহ্বান যেন নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পহেলা ফাল্গুন উপলক্ষে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। হলুদ-লাল রঙের পোশাকে সেজেছেন তরুণ-তরুণীরা। খোঁপায় গাঁদা ফুলের মালা, হাতে রঙিন অলংকার—সব মিলিয়ে বসন্তের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে চারপাশ। নগরজীবনের পাশাপাশি গ্রামেও বসন্তের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে সমানভাবে। আমের মুকুলের ঘ্রাণ, পিঠাপুলির আয়োজন আর গ্রামীণ উৎসবে বসন্তকে বরণ করে নিচ্ছে মানুষ।
শীতের জড়তা কাটিয়ে প্রকৃতিও যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নাগলিঙ্গমসহ নানা বৃক্ষ-লতা নবপল্লবে সেজে উঠেছে। ফুলেল এই ঋতু বয়ে আনছে মধুময় আবহ, যা মানুষের মনকে করে তুলছে উদ্দীপ্ত ও প্রাণবন্ত।
ইতিহাস-ঐতিহ্যেরও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, শহীদদের আত্মত্যাগের রক্তরাঙা দিন—সবকিছুই বসন্তের সঙ্গে মিশে আছে গভীরভাবে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির পলাশরাঙা দিন বাঙালির চেতনায় আজও অম্লান।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৫ সালে বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে যে উৎসবগুলো চালু করা হয়েছিল, তার অন্যতম ছিল বসন্ত উৎসব। সময়ের বিবর্তনে এ উৎসব আজ বাঙালির সার্বজনীন প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা বলছেন, বসন্ত উৎসব কেবল আনন্দ-উল্লাসের নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারকও। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই ঐতিহ্য ছড়িয়ে দিতে পারলেই বসন্তের প্রকৃত তাৎপর্য সার্থক হবে।
বর্ণিল আয়োজনে, প্রাণের উচ্ছ্বাসে আর ঐতিহ্যের আবহে বসন্তের এই শুভক্ষণে নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা সকলের।
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কথায় ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত। শান-বাঁধানো ফুটপাতে, পাথরে পা ডুবিয়ে এ কাঠখোট্টা গাছ, কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে হাসছে। ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত। সত্যিই আজ পয়লা ফাগুন। ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। শীতের রিক্ততা ভুলিয়ে আবহমান বাংলার প্রকৃতিতে আজ ফাগুনের ছোঁয়া, আগুনরাঙা বসন্তের সুর। গাছে গাছে ফুটবে রক্ত শিমুল-পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নাগলিঙ্গম।
ফুল ফুটবার পুলকিত এ দিনে বন-বনান্তে কাননে কাননে পারিজাতের রঙের কোলাহলে ভরে উঠবে চারদিক। কচি পাতায় আলোর নাচনের মতই বাঙালির মনেও লাগবে দোলা। হৃদয় হবে উচাটন। পাতার আড়ালে আবডালে লুকিয়ে থাকা বসন্তের দূত কোকিলের মধুর কুহুকুহু ডাক। কবি মনে জেগে উঠবে নতুন নতুন সব পঙক্তি। বসন্ত বাতাস দোলা দিবে সবার মনে; সাজবে বাসন্তি সাজে। বসন্তরাণীর আগমনে মাতাল হবে সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশ। এজন্যই কবি বলেছেন, ‘ এই ফাগুনে সাঝিয়েছি অঞ্জলি, আমার হৃদয়ের থালা ভরে। দেখা হোক, আদর হোক ভালোবাসায়। দু’টি হৃদয় একটি থালায়, শিমুল ও পলাশের ফুলে ফুলে।
যদি এবার বসন্তের আগমন নিয়ে কিছু দ্বিধায় পড়েছেন বাঙালিরা। এর আগে প্রতিবছর ১৩ ফেব্রুয়ারি পহেলা ফাগুন পালিত হতো। কিন্তু এবছর নতুন সংশোধিত বর্ষপঞ্জিতে পহেলা ফাগুন ১৩ নয়, ১৪ ফেব্রুয়ারিতে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ ও বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দিনগুলো সে সময়ের বাংলা তারিখের সাথে মিল রাখতে গিয়েই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলা একাডেমি। ফলে এখন থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারিই পালিত হবে বসন্তের প্রথম দিন।
যেদিনই হোক ফাগুন যে এসেছে তাই কবি সুফিয়া কামাল বলেছেন, “হে কবি! নীরব কেন-ফাগুন যে এসেছে ধরায়, বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?”
আগুন রাঙা এ ফাগুনে প্রকৃতিতেই শুধু উচ্ছ্বাসের রঙ ছড়ায় না, রঙ ছড়ায় প্রতিটি তরুণ প্রাণে। প্রাণের টানে, আর প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে মন হয়ে ওঠে উত্তাল, বাঁধনহারা। বসন্ত নিয়ে যেন তরুণদের উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। কোকিলের কুহুতান, দখিনা হাওয়া, ঝরা পাতার শুকনো নুপুরের নিক্কন, প্রকৃতির মিলন সবই এ বসন্তেই। বসন্ত মানেই পূর্ণতা। বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। বসন্ত মানেই একে অপরের হাত ধরে হাঁটা। মিলনের এ ঋতু বাসন্তী রঙে সাজায় মনকে, মানুষকে করে আনমনা। এমনও মধুর দিনে এমন শঙ্কাও কি জাগে না অধীর প্রতিক্ষায় থাকা কোন মনে- ‘সে কি আমায় নেবে চিনে/ এই নব ফাল্গুনের দিনে- জানিনে...?’।
এদিনেই অসংখ্য রমনী বাসন্তী রঙে রাঙিয়ে তোলে রাজধানীর রাজপথ, পার্ক, বইমেলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুশোভিত সবুজ চত্বরসহ পুরো নগরী। এ সময়েই শীতের জীর্ণতা সরিয়ে ফুলে ফুলে সেজে ওঠে প্রকৃতি। গাছে গাছে নতুন পাতা, স্নিগ্ধ সবুজ কচি পাতার ধীর গতিতে বাতাসে সঙ্গে বয়ে চলা জানান দেয় নতুন কিছুর। শীতে খোলসে ঢুকে থাকা বন-বনানী অলৌকিক স্পর্শে জেগে উঠে। পলাশ, শিমুল গাছে লাগে আগুন রঙের খেলা। প্রকৃতিতে চলে মধুর বসন্তে সাজ সাজ রব। কবির ভাষায় ‘ ও হে ফাগুন, পলাশে জ্বালিয়েছ আগুন। আগুন, পাগল করেছ তুমি প্রেমিককে, প্র্রেমিক বানিয়েছ তুমি শালিককে।
বসন্তের প্রথম সকালে বাসন্তি রঙা শাড়ি, কপালে টিপ, হাতে চুড়ি, পায়ে নূপুর, খোঁপায় গাঁদা ফুল জড়িয়ে বেরিয়ে পড়বে তরুণী-বধূরা। বাসন্তি পাঞ্জাবি, ফতুয়া পরা হাজারো ছেলে-বুড়োর ঢল নামবে বসন্ত বরণের নানা আয়োজনে। বসন্তের আমোদনে ফাগুনের ঝিরিঝিরি হাওয়া, রক্তিম পলাশ, শিমুল, কাঞ্চন পারিজাত, মাধবী, গামারী আর মৃদু গাঁদার ছোট ছোট ফুলের বর্ণিল রূপে চোখ জুড়াবে। বোটানিক্যাল গার্ডেন, রমনা পার্ক, বলধা গার্ডেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক, বনানী লেক, মিন্টো রোড, হেয়ার রোড, চারুকলার পেছনের সবুজ প্রাঙ্গণ ফুলে ফুলে বর্ণিল, উচ্ছল-উজ্জ্বল হয়ে উঠে ফাল্গুন এলে বাসন্তি হাওয়ায়। বসন্ত তারুণ্যেরই ঋতু, তাই সবারই মনে বেজে ওঠে, কবির এ বাণী- ‘বসন্ত ছুঁয়েছে আমাকে। ঘুমন্ত মন তাই জেগেছে, পয়লা ফাল্গুন আনন্দের দিনে’। ২৬ বছর আগে বঙ্গাব্দ ১৪০১ সাল থেকে প্রথম ‘বসন্ত উৎসব’ উদযাপন করার রীতি চালু হয়। সেই থেকে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদ বসন্ত উৎসব আয়োজন করে আসছে। এ বছরের বসন্ত উৎসবের অনুষ্ঠানমালায় কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। বসন্তের নাচ, গান ও কবিতার পাশাপাশি প্রতিবাদী নাচ, গান ও আবৃত্তিরও আয়োজন করেছে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ। আজ চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় সুর মূর্ছনা দিয়ে শুরু হবে বসন্ত আবাহনের দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের প্রথমভাগের কর্মসূচী। এরপর থাকবে বসন্ত শোভাযাত্রা, আবীর ও ফুলের প্রীতিবন্ধনীর পাশাপাশি থাকবে নাচ ও গানের আয়োজন।