
সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : সকল জল্পনা-কল্পনা, উৎকণ্ঠা ও নানা রকম জটিলতা ও গুজবের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। শত অনিশ্চয়তা ও অনেক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বাংলাদেশের জনগণের বহুল প্রত্যাশিত ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি মোটামুটিভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে। ভোটের হারও ছিল ভালো
ইতিহাসের বাস্তব সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের নারী-পুরুষের সম্মিলিত ভোট প্রদানের ফলে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো। জাতিসংঘসহ বহির্বিশ্বে বহুল প্রশংসিত এবারের নির্বাচন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেও অর্থনৈতিক সংকট দূরীভূত করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উন্নয়নমূলক পরিবর্তনের হাওয়া দ্রুত সামাল দিতে নতুন সরকারকে হিমশিম খেতে হতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতার কারণেই মূলত অনেকের মনে সন্দেহ থাকতে পারে। গণমানুষের আস্থার প্রতিফলনে মোটের ওপর এবারের নির্বাচনটি ছিল অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূল।
জনমনের অনেক বিচার-বিশ্লেষণ ও বিবেচনায় ২০২৬ সালের নির্বাচনটি অনেকের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। অনেকের নিকট অবিশ্বাস্যÑএই নির্বাচনে বিএনপি সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছে। অপরদিকে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে জামায়াত ও তার জোটের প্রার্থীরাও আশাব্যঞ্জকভাবে ৭৭টি আসন পেয়েছে। এবারের নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। যদিও কোনো কোনো আসনের বিজয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার অবকাশ রয়েছে। কয়েকটি আসনের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে বড় রকমের কোনো সহিংসতা ছাড়াই ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা।
এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। শুধু তা-ই নয়, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, বন্যা দুর্যোগ মোকাবিলাসহ সব ধরনের মব-সন্ত্রাস, অরাজকতা ও সহিংসতা মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনীর এই ভূমিকার কথা ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে অভ্যুত্থানের সময় সদলবলে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ ব্যতীত এবারের নির্বাচনকে ঘিরে অনেক ধরনের সমস্যা ও সংকটের অন্ত ছিল না। সবার মধ্যে ছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, অনেক সন্দেহ, সংশয়, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা।
আওয়ামীলীগ বিরোধী আন্দোলনে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ও রক্ত ঝরানোর মধ্য দিয়ে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং অন্যান্য অনেক সমস্যার মধ্যে পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ছিল অনেক চ্যালেঞ্জ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যাওয়া শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন ড. ইউনূসের সরকারকে অবৈধ ও ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দিতে থাকেন। বিগত ১৭ মাসের বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের কিছু নাশকতামূলক বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ডের ঘটনাও ছিল। তারা এবারের নির্বাচনকে অবৈধ ও প্রতিহত করার ঘোষণাও দিয়েছিল। এই লক্ষ্যে তারা নির্বাচনকালে বিদেশে তাদের নির্বাচনবিরোধী তৎপরতাও অব্যাহত রেখেছিল। যদিও সব উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
অনেকের ধারণাকে ছাপিয়ে বিএনপি সকল চ্যালেঞ্জ উতরে এবারের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ঈর্ষণীয় বিজয় অর্জন করেছে। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বিএনপির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আসীনের অভিযাত্রা।
তবে বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর বাংলাদেশের গণমানুষের আস্থা অর্জনে কোনো ভাটা পড়েনি। সকল আবেগ-অনুভূতির আধারে বরং তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির অগ্রযাত্রায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। একইভাবে আগামী দিনে বিএনপির সামনে আরও অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগোতে হবে।
আওয়ামী লীগের আচরণের মতো দেশের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি ও ধর্মীয় রাজনৈতিক দল জামায়াতের মধ্যেও কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে, যেখানে প্রধান রাজনৈতিক মিত্র বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার কথা ছিল, দুঃখজনক হলেও সেটি দেখা যায়নি। নির্বাচনে জেতার জন্য হেন কোনো অপপ্রচার ছিল না, যা বিএনপির বিরুদ্ধে ঘটানো হয়নি। ১৭ মাস ধরে বিএনপি ও তারেক রহমানের ওপর নানা রকমের মিথ্যা ন্যারেটিভ প্রচার করা হয়েছে। অতীতের সকল গ্লানি এবং স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার ইতিহাসের কথা ভুলে গিয়ে যেকোনোভাবেই হোক বিএনপিকে হারিয়ে জামায়াত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। অথচ স্বাধীনতার পর প্রথম জিয়াউর রহমানের আমলে জামায়াত বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ পায়। তার পর থেকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয় দলই জামায়াতকে সমর্থন করে এবং তাদের কাজে লাগায়। কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপি যেমন নিপীড়নের শিকার হয়, তেমনি জামায়াতের ওপরও অনেক নিপীড়ন, অত্যাচার ও নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হয় এবং অসংখ্য নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
উল্লেখ্য, বিএনপির আমলে জামায়াত শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং আওয়ামী লীগের সময় নিপীড়িত হয়। আওয়ামী লীগ সব সময় জামায়াতকে বিএনপির সঙ্গী হিসেবে আখ্যা দেয়। বিএনপির সরকারের মন্ত্রিসভায় জামায়াতের দুজন সদস্য ছিলেন। সেই বদনাম বহন করেই বিএনপিকে চলতে হয়েছিল। অথচ সেই জামায়াত এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়েছে। নিজেদের দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলার আগেকার অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা পরিবর্তন করে তারা নতুন একটি কৌশল অবলম্বন করেছিল। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। তবে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশলের ফলে অভূতপূর্ব জনসমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘকাল স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মধ্যে থাকার কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সব ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে। সেখানে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারকে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে।
এক-এগারোর মইন-ফখরুদ্দীনের অভিশপ্ত সরকারের সময় বেগম খালেদা জিয়া ও জিয়া পরিবারের ওপর চরম অমানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছিল। বেগম খালেদা জিয়াকে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো অবস্থাতেই দেশ ছাড়তে রাজি হননি। তখন খালেদা জিয়ার দুই পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর ওপর অমানবিক নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানো হয়েছিল। জোরপূর্বক তারেক রহমান ও কোকোকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। বিদেশে কোকোর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। সেই কঠিন সময়ে বেগম খালেদা জিয়া কী পরিমাণ কষ্ট ও যন্ত্রণায় ভারাক্রান্ত ছিলেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বেগম জিয়ার প্রতি শেখ হাসিনার প্রতিহিংসা সকল সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল। তার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় খালেদা জিয়াকে তার স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে নিষ্ঠুরভাবে উচ্ছেদ করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে জেলে পাঠানো হয়। নীরব, নিস্তব্ধ জেলখানায় তিনি চরমভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সরকারের রোষানলে পড়ে তিনি কঠিন রোগে আক্রান্ত হন এবং উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। সেই কঠিনতম পরিস্থিতিতে তারেক রহমান লন্ডনের নির্বাসিত জীবনে থেকে দীর্ঘদিন বেগম খালেদা জিয়াকে বিএনপির দল পরিচালনায় সাহায্য করেছেন। এভাবেই তারেক রহমান দেশের মানুষের কাছে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।
বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণের পর তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। রাজনীতিতে তারেক রহমানের আবির্ভাব নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। বিগত বছরগুলোতে আওয়ামী লীগের নির্যাতনের শিকার হয়ে বিএনপির কোমর ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এক-এগারোর অভিশপ্ত সরকারের নিপীড়নের শিকার হয়েছিল জিয়া পরিবার।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব ঘটেছিল ধূমকেতুর মতো। তেমনি অত্যাবশ্যকীয়ভাবে রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার আবির্ভাবের ঘটনাগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একইভাবে সেই ধারাবাহিকতাকে কেন্দ্র করে তারেক রহমানের রাজনীতিতে আগমন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে উন্নীত হওয়ার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ।
গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য ন্যূনতম যে শর্তটি অপরিহার্য, তা হলো একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকার ছিল না। এবারের নির্বাচনে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা ও তার প্রতিফলন ঘটেছে। নির্বাচন কেবল সাংবিধানিক বিধান নয়, এটি নাগরিক মর্যাদার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। ২০০৮ সালের পর থেকে দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশ ও শাসনক্ষমতার প্রকৃত পালাবদল ঘটেনি। ঘটেছিল একদলীয় প্রাধান্য। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সকল নিয়ম ভেঙে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছিল। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার কোনো ভূমিকা ছিল না। বরং ফ্যাসিবাদী কাঠামোর মতো কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছিল। দুর্নীতি ও অনিয়মের মাত্রাতিরিক্ত পরিবৃদ্ধির ফলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট, বিদেশে অর্থ পাচার এবং সামগ্রিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের মুখোমুখি হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। এ ধরনের গণবিরোধী রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে জবাবদিহির বিষয়টি দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে রাষ্ট্রযন্ত্রের হস্তক্ষেপ নাগরিকের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে।
চব্বিশের রক্তাক্ত বিপ্লব এবং সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নানাবিধ পরিবর্তনের পর এমন এক সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ, যেখানে গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন এবং সর্বস্তরে গণতন্ত্রকে সুসংহত করার প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। তাই অতীতের মতো না হয়ে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রকাঠামো এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নতুন সরকারের অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটাতে হবে। গণতান্ত্রিক উত্তরণের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক উপাদানগুলোর একীভূতকরণ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলনের যে সুযোগ এনে দিয়েছে, তার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হয়।
এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং দেশের সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক ভিত্তি পুনর্গঠনের একটা পরীক্ষাও বটে। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন অর্থনৈতিক উন্নয়নের রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
নির্বাচন চলাকালীন ভোট গ্রহণের সময় রাজনৈতিক দলগুলো যে স্বতঃস্ফূর্ততা, ধৈর্য ও সংযম দেখিয়েছে, আমাদের প্রত্যাশা-নির্বাচনের পর তারা একই মনোভাবের পরিচয় দেবেন। একইভাবে বিএনপিকে তাদের অতীতের ভুলগুলোর সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ আইনের ন্যায়-নীতিসম্পন্ন সরকার ব্যবস্থাপনার দিকে ফিরে আসতে হবে, যাতে গণতন্ত্রের প্রকৃত বিকাশ ঘটে এবং জনগণের কল্যাণে একটি সুন্দর স্বনির্ভর রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।
সংসদে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। দেশের মানুষের কল্যাণ, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে নতুন প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং কার্যকর ভূমিকার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলকেও গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত রাখতে সরকারের সঙ্গে যৌথ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে হবে। নতুন সরকার অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও দেশের নাগরিক সমাজের মধ্যকার শান্তি-শৃঙ্খলা ও তার পুনর্গঠন জরুরি। দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজের পরিবর্তন ঘটানোর জন্য গণমানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। সরকারের যেকোনো অন্যায় সিদ্ধান্তের সমালোচনার সুযোগ থাকতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। সবাইকে সরকারের নীতিনির্ধারণে গঠনমূলক অংশগ্রহণের ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে হবে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সকল প্রকার অপরাধ ও অরাজকতার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দলীয় প্রাধান্যের বিপরীতে বিরোধী রাজনৈতিক দলের অধিকারের বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘদিন সরকারদলীয় প্রাধান্যের শাসনসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে; পর্যায়ক্রমে তার দূরীকরণ ঘটাতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যে মবোক্রেসির উত্থান ঘটেছিল, নতুন সরকারকে সেটিকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। দেশের সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা রাষ্ট্রশক্তির প্রয়োগব্যবস্থার সঙ্গে নাগরিক অধিকারের একটি সমন্বয় ও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার ক্ষেত্রে নতুন সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতা ঠিক রাখা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক ঘাটতি কাটিয়ে বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। বেসরকারি বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনা, আর্থিক খাতের সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি রক্ষা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিÑএসব বিষয়ে আগামী সরকারকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিষয়টিকেও গুরুত্বসহকারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমেই দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথ সুগম হবে।
উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটার এবং নারী ভোটারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্মসংস্থান ও সুযোগ-সুবিধার প্রতি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকরিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের যে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, সেটিকে সামনে রেখেই সরকারের পরিকল্পনা থাকা জরুরি, যেন জনগণ তাদের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন দেখতে পারেন। আর যদি এই সুযোগ অবহেলিত থেকে যায় এবং সরকার তার দলীয়করণের দিকে ধাবিত হয়, তবে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। দেশে আবারও ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। জাতীয় পর্যায়ে গণমানুষকে আবারও অনাকাক্সিক্ষত অধ্যায়ের মুখোমুখি দাঁড় করাবে। নতুন সরকারকে সে বিষয়ে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে মনে রাখতে হবে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতা জনগণের হাতেই ন্যস্ত থাকে এবং শাসকেরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জনগণের বাক্স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা প্রয়োজন। একইভাবে আইনের চোখে সুবিচার নিশ্চিতকরণ এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং সর্বোপরি দেশের গণমানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা আশা করি, এবারের নতুন সরকার জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা
নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় এবং তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ। চাল, ডাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজ, আলু, ডিম, মুরগি ও সবজিসহ প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্থিরতা সাধারণ মানুষের জীবনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের সঞ্চয় ভেঙে খরচ চালাতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথেই বাজার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় এবং তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ। চাল, ডাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজ, আলু, ডিম, মুরগি ও সবজিসহ প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পণ্যের দামে অস্থিরতা সাধারণ মানুষের জীবনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের সঞ্চয় ভেঙে খরচ চালাতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথেই বাজার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছরে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের দাম, ডলার সঙ্কট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল, গম ও চিনির দামের ওঠানামা দেশের খুচরা বাজারে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক কারণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এবং বাজার তদারকির ঘাটতিও মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েকটি পণ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা সাধারণ পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতায় চাপ সৃষ্টি করেছে। বাজার পর্যবেক্ষণ ও সরকারি সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চাল, পেঁয়াজ, ডিম, সবজি ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মিনিকেট ও ব্র্যান্ডেড চালের দাম স্থিতিশীল হলেও মোটা চালের দাম এখনও বেশি। ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দামও ওঠানামা করছে। বোতলজাত তেলের দাম সরকারি নির্ধারিত দামের কাছাকাছি থাকলেও খোলা তেলের দাম বেশি নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। পেঁয়াজ ও আলুর মতো কৃষিপণ্য মৌসুমভেদে দামের বড় ব্যবধান তৈরি করছে। কাওরানবাজারের এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, পাইকারি বাজারে দাম একটু বাড়লেই খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়ে। আবার দাম কমলেও পাইকারি পর্যায়ে তাৎক্ষণিক সমন্বয় হয় না। ফলে খুচরা বিক্রেতারা চাপে পড়েন।
সরকারের পরিসংখ্যান সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা আগের মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রমজানকে কেন্দ্র করে চাহিদা বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে পড়তে শুরু করেছে।
রাজধানীর কাওরানবাজার, খিলগাঁও ও মিরপুরের বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত এক মাসে কয়েকটি নিত্যপণ্যের দামে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খেসারি ডাল বিক্রি হচ্ছে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা কেজি, যা এক মাস আগে ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। মসুর ডাল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি। ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১১৫ টাকা কেজি, যা রমজানে ইফতার সামগ্রীর প্রধান উপাদান।
ভোজ্যতেলের বাজারেও অস্থিরতা রয়েছে। বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৮৫ থেকে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা। পাম তেল ১৫৫ থেকে ১৬৫ টাকা লিটার। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার কারণে খুচরা বাজারেও প্রভাব পড়ছে।
পেঁয়াজ ও রসুনের দামও বেড়েছে। দেশী পেঁয়াজ কেজি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, যা আগে ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। আমদানিকৃত পেঁয়াজ ৭০ টাকার ঘরে। দেশী রসুন ১১০ থেকে ১২০ টাকা কেজি, আমদানি করা রসুন ১৪০ টাকার বেশি। আদা বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৪০ টাকা কেজি।
রমজানকেন্দ্রিক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য খেজুর। নি¤œমানের খেজুর ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি, মাঝারি মানের খেজুর ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি ব্যয় ও ডলারের উচ্চমূল্যের প্রভাব দামে পড়েছে। মুরগির বাজারেও ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। ব্রয়লার মুরগি কেজি ১৯০ থেকে ২১০ টাকা, সোনালি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। গরুর গোশত ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি, যা গত মাসের তুলনায় কিছুটা বেশি। চাল বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে বাড়তি দাম দেখা গেছে। মাঝারি মানের মিনিকেট চাল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি, যা এক মাস আগে ছিল ৫৮ থেকে ৬০ টাকা। মোটা চাল ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মিরপুরের এক গৃহিণী অভিযোগ করেন, সরকার বলে দাম কমেছে, কিন্তু বাজারে গেলে তা বোঝা যায় না। মাসে বাজার খরচ কমপক্ষে তিন-চার হাজার টাকা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের কৌশল নিতে হবে। স্বল্পমেয়াদে টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি বাড়ানো, ওএমএস কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি মজুদদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ সুবিধা উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খল আধুনিকীকরণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকার ইতোমধ্যে চাল ও গম আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে। এ ছাড়া রমজানকে সামনে রেখে চিনি, ডাল ও তেলের মজুদ বাড়ানো হয়েছে। তবে ব্যবসায়ী মহল বলছে, এলসি খোলার জটিলতা, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সঙ্কট এবং ডলার বিনিময় হারের অস্থিরতা আমদানিতে প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে বাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। আলু, পেঁয়াজ বা ডিম উৎপাদনে ঘাটতি না থাকলেও সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে মৌসুম শেষে দাম বেড়ে যায়। কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা সীমিত হওয়ায় কৃষক ন্যায্য দাম পান না, আবার ভোক্তাকে বেশি দাম দিতে হয়। ফলে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে দামের বড় ব্যবধান তৈরি হয়। নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রত্যাশা ব্যবস্থাপনা। নির্বাচনী প্রচারণায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। ফলে জনগণ দ্রুত ফল দেখতে চায়। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমানো একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, আমদানি নীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া তা সম্ভব নয়।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি এখন শুধু বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে নয়, অভ্যন্তরীণ বাজার কাঠামোর দুর্বলতার কারণেও স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, পর্যাপ্ত বাজার তদারকির অভাব এবং নীতির অসামঞ্জস্যতা পরিস্থিতিকে জটিল করছে।’ তিনি মনে করেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে দামের স্থিতিশীলতা আসবে না।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন উচ্চপর্যায়ে থাকলে নি¤œ আয়ের মানুষের বাস্তব আয় কমে যায়। তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যে ব্যয় হয়। ফলে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি সামাজিক বৈষম্য আরো বাড়িয়ে দেয়। তিনি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং টার্গেটেড ভর্তুকির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় না থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। তার ভাষায়, ডলার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য আনতে হবে। কেবল সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, সরবরাহপক্ষেও কার্যকর পদক্ষেপ দরকার।
দেশের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, সংরক্ষণ সুবিধা ও সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে তুললে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে দামের ব্যবধান কমবে। এ ছাড়া বাজারে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালুরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও তা অনেক সময় সাময়িক প্রভাব ফেলে। স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা, যেখানে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যন্ত দামের তথ্য সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হবে। এতে কারসাজি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। তবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এবং তাদের মতে বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ মানুষ এখনো শেখ হাসিনাকে সমর্থন করেন এবং ভালোবাসেন।