মানছুর রহমান জাহিদ, পাইকগাছা : গত ৫ বছরে কয়েক দফায় ব্যয় বরাদ্দের পাশাপাশি মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ করা যাচ্ছেনা খুলনার বেতগ্রাম-কয়রা আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। প্রতি নিয়ত নতুন নতুন সংকটে আটকে যাচ্ছে প্রকল্পের বাঁক সরলী করনের এ কাজ।
সর্বশেষ বাঁক সরলীকরণ নিয়ে দক্ষিনের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক মোকাম কপিলমুনি সদরের ফকিরবাসা মোড় এলাকায় অধিগ্রহনকৃত প্রায় সাড়ে ১১ শতক জমির মালিক ও সওজের মধ্যে সেখানকার নক্সা নিয়ে মতপার্থক্য ও অধিগ্রহণের অর্থ প্রাপ্তি নিয়ে আইনী জটিলতায় আটকে গেছে সেখানকার সরলীকরনের কাজ।
এমন পরিস্থিতিতে শনিবার
(২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে দ্রুত সড়ক সরলীকরণের কাজ এগিয়ে নিতে মানববন্ধন করেছে নিরাপদ সড়ক চাই কপিলমুনি শাখা।
শাখা সংগঠনের সভাপতি এইচএম শফিউল ইসলামের সভাপতিত্বে এ সময় বক্তব্য রাখেন, মোঃ আসলাম, সাংবাদিক নজরুল ইসলাম, তপন পাল, মহানন্দ অধিকারী মিন্ট, শেখ আতিয়ার রহমান, মোঃ ফজর আলী, শ্রমিক নেতা রিজাউল ইসলামসহ অন্যান্যরা।
এ সময় বক্তারা বলেন, সড়কের নিরাপত্তায় নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে সকল জটিলতা দূর করে সরলীকরণের কাজ এগিয়ে নিতে হবে। প্রতিবন্ধকদের কারো ব্যাক্তি স্বার্থে কাজ পিছিয়ে গেলে কিংবা বরাদ্দ বাতিল হলে তার দায় তাদেরকেই নিতে হবে। অনতিবিলম্বে তারা সওজের প্রতি কার্যক্রম শুরুর দাবি জানান। অন্যথায় বিষয়টিকে সামনে রেখে তারা সকলকে সাথে নিয়ে বৃহত্তর কর্মসূচির ডাক দেন।
প্রসঙ্গত, সমস্যা সমাধানে গত ১৫ ডিসেম্বর কপিলমুনিতে ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানে একটি গণশুনানীর আয়োজন করে খুলনা জেলা প্রশাসকের অধিগ্রহন শাখা। খুলনা জেলা প্রশাসন ও সওজের তত্ত্বাবধায়নে প্রকল্প এলাকায় জমি মালিকসহ এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে গণশুনানী ও পরের বৃহস্পতিবার জমি মালিকদের সাথে জেলা প্রশাসনের পৃথক বসাবসিতেও নিস্পত্তি হয়নি সমস্যার।
সড়ক ও জনপদ বিভাগ (সওজ) বলছে, অটোকাড সফটওয়ারের মাধ্যমে এ বাকগুলো সরলীকরণ নক্সা প্রস্তুত করা হয়েছে। এখানে কারোও প্রতি কোন প্রকার পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই।
সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, ‘খুলনার ৩ উপজেলা ডুমুরিয়া, পাইকগাছা ও কয়রা, এবং সাতক্ষীরার একটি তালা উপজেলার ওপর দিয়ে বেতগ্রাম কয়রা ভায়া তালা-কপিলমুনি ও পাইকগাছার প্রায় ৬০ কিলোমিটার সড়কটি দুই লেনে উন্নীত করণে মেগা প্রকল্প গ্রহন করে তৎকালীণ সরকার। প্রকল্পে সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ ৩৪টি বাঁক সরলীকরণে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। ২০২০ সালে শুরু হয় কার্যক্রম। প্রায় ৫ বছরে দু’দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যায়বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়। যা চলমান রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দীর্ঘ সড়কের ৩৪ টি বাক সরলীকরন। ইতোমধ্যে প্রায় সবগুলো বাক সরলীকরণে জমি অধিগ্রহনপূর্বক কাজ শুরু হলেও বাধ সাধে পাইকগাছার কপিলমুনি বাজারের ফকির বাসা মোড় এলাকা সরলীকরণে। সেখানকার ১১.৩৯০ শতক জমি অধিগ্রহনে অসম দর নির্দ্ধারণ ও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করে আসছেন চিহ্নিত জমির মালিকরা। ইতোমধ্যে তারা আন্দোলন- সংগ্রামও করেন। তখন থেকে বন্ধ রয়েছে সেখানকার কাজ।
এর আগে প্রকল্প বাস্তবায়নে গত ৬ ডিসেম্বর বর্তমান নকশায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে সওজ। সেখানে মাদ্রাসার একটি একাডেমিক ভবন উচ্ছেদের পর স্থানীয় এক প্রয়াত সাংবাদিক ও এক আইনজীবির পরিবারসহ ক্ষতিগ্রস্থরা তাদের স্থাপনা উচ্ছেদের অন্তিম মূহুর্তে অধিগ্রহন ও ক্ষতিপূরণের টাকা বুঝে না দিয়ে কাজ চলমান রাখায় বাধ সাধেন।
এরপর গত ১৫ ডিসেম্বর ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানে একটি গণশুনানীর আয়োজন করে খুলনা জেলা প্রশাসকের অধিগ্রহন শাখা। এলক্ষে গত ১০ ডিসেম্বর ভূমি অধিগ্রহন কর্মকর্তা ইমরান হাসান স্বাক্ষরিত ৩১. ৪৪. ৪৭০০. ০১৪. ৯৯. ১৪৩. ২৫-৭১৬ নম্বর স্মারকের একটি অনুলিপি সরবরাহ করা হয় ক্ষতিগ্রস্থ মালিকদের বরাবর। এদিন গুণশুনানী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, সওজের খুলনা নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দীপঙ্কর দাশ সহ সওজ ও জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
নকশা অনুযায়ী বাঁকটি সরলীকরণের কাজ শেষ করতে পারলেই প্রকল্পের অন্যান্য কাজ দ্রুত সম্পন্ন হবে বলে দাবি করেছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, প্রায় ৬৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কয়রা-বেতগ্রাম আঞ্চলিক সড়কটি যথাযথ মানে উন্নীতকরণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি। এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ৩৪টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক সরলীকরণের পাশাপাশি সড়ক প্রশস্ত ও মজবুতকরণের মাধ্যমে উপকূলের কয়েক লাখ মানুষের জেলা শহরে যাতায়াত নির্বিঘœ করা। ২০২২ সালের ৩০ জুন প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও একাধিকবার সময় বাড়িয়ে এখন পর্যন্ত ৮০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়। প্রকল্পের আওতায় থাকা অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক সরলীকরণের কাজ কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়াই শেষের পথে। মাত্র একটি বাঁকের জটিলতার কারণে প্রকল্পের চলমান কাজ মারাতœকভাবে বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের পক্ষে।
এদিকে খুলনা ও সাতক্ষীরার অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক মোকাম কপিলমুনি। সপ্তাহের প্রতি রবি ও বৃহস্পতিবার সেখানে হাট বসে। বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ী-কৃষকরা পাইকারি ও খূচরা মালপত্র কেরা-বেঁচা করতে আসেন এ হাটে। গত প্রায় ৫ বছর সড়কটির এ অংশের বেহাল অবস্থায় ফেলে রাখায় বাজারে যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ক্রেতারা। এছাড়া কয়রা-খুলনা ভায়া পাইকগাছার একমাত্র সড়ক এটি হওয়ায় প্রতিনিয়ত শত শত বিভিন্ন শ্রেণির বাস,ট্রাক, পরিবহন সহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচলে চরম দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয় গাড়িচালকরা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ কপিলমুনির বাজারস্থ সড়কের এ বাঁকটির কারণে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনায় পড়তে হচ্ছে তাদের। তাছাড়া কাজ অসমাপ্ত রাখায় সড়কের প্রায় দুইশ মিটারজুড়ে অসংখ্য গর্ত বর্ষা মৌসুমে যা রীতিমত খাদের সৃষ্টি করে। এক পসলা বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় সড়কের বিস্তির্ণ অংশ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের বাঁক সরলীকরণের ওই স্থানের একপাশে কপিলমুনি জাফর আউলিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অবস্থান। অধিগ্রহণের চিঠি পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির অংশের স্থাপনা ভেঙ্গে নির্মাণকাজের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ঠিক তার সামনে মরহুম শেখ সামজেদুল ইসলামের দুছেলেদের দখলীয় বাড়িসহ স্থাপনা। এছাড়া সড়কের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া জমিতে মৃত জীতেন্দ্র নাথ সাহার ওয়ারেশদের মালিকানাধীন দোকানসহ আরোও দু’ব্যক্তির আরও দুটি স্থাপনা। অধিগ্রহণের চিঠি পাওয়ার পরও স্থাপনাগুলি ভাঙ্গা হয়নি। আর এসব স্থাপনাগুলি ভাঙ্গা-গড়া নিয়েই যত বিপত্তি। তাদের দাবি, নকশা পরিবর্তন করে সড়কের বিপরীত পাশের স্থাপনা উচ্ছেদ হলেই বাঁক সরলীকরণ সহজ হবে। তা নাহলে আরেকটি বাঁকের সৃষ্টি হয়ে যাতায়াতের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে মাদ্রাসার নব নির্মিতন আইসিটি ভবনটি।
কপিলমুনি জাফর আউলিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মাওলানা জামিরুল ইসলাম বলেন, কয়রা-বেতগ্রাম সড়কের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক এটি। দুর্ঘটনা এড়াতে এই বাঁকটি সোজা করা জরুরি মনে করে অধিগ্রহণের চিঠি পাওয়ার পর পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাদ্রাসা অংশের স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যান্য স্থাপনাগুলি সরানোর বিষয়টি নিতান্তই তাদের।
প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোজাহার এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবির খোকন বলেন, প্রকল্পের সমগ্র কাজের মধ্যে মাত্র ২শ মিটার এ বাঁকটি সরলীকরণে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে। কাজ বন্ধ রাখায় গোটা প্রকল্পে এর প্রভাব পড়ছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) দীপঙ্কর দাশ বলেন, সড়কের বাঁক সরলীকরণের জন্য ওই স্থানে প্রায় ১২ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যার প্রায় ৪ শতাংশ জমি সরকারি পেরিফেরিভুক্ত হওয়ায় তার দখলীয় মালিক পক্ষের সাথে ক্ষতিপূরণ দাবি নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক বলেন, প্রকল্পের আওতায় ৩৪টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকের মধ্যে মাত্র ১টি বাকের সরলীকরণে প্রতি মূহুর্তে নতুন নতুন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অন্যগুলোর সরলীকরণে কোন ঝামেলা না থাকায় এসেব এলাকায় কাজ চলমান রয়েছে। তবে সর্বশেষ বাঁক সরলীকরণেও চেষ্টা চলছে। অচীরেই এর সমস্যা সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।