মোল্লাহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি: কৃষি প্রধান বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই উৎপাদনের ভিত্তি হলো সুস্থ ও উর্বর মাটি। অথচ বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলায় বৈধ–অবৈধ বহু দোকানে সরকারের অনুমোদনবিহীন, ভেজাল ও নিষিদ্ধ কোম্পানির সার–কীটনাশক অবাধে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এতে কৃষক যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা ও খাদ্য উৎপাদন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
ওই বিষয়ে খুলনা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম আসাদ জানান, ভেজাল ও নিম্নমানের সার ব্যবহারে মাটির ওপর বহুমাত্রিক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। তিনি বলেন, “ভেজাল সারে পরিমিত পুষ্টি উপাদান না থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায় না। ফলে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। পাশাপাশি এসব সারে ভারী ধাতু যেমন লেড, ক্যাডমিয়াম ইত্যাদি থাকলে তা মাটির ভৌত গঠন, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ও অনুজীবের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে।” তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, মাটিতে জমা হওয়া এসব ভারী ধাতু খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তার মতে, মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সুষম ও নির্ভেজাল সার প্রয়োগই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের একমাত্র পথ।
তথ্য সংগ্রহে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চুনখোলা ইউনিয়নের আঙরা গ্রামের সুকলা বিশ্বাস তার বাড়ির সামনে পরিচালিত মুদি দোকানের পেছনের কক্ষে সার ও কীটনাশক বিক্রি করছেন। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর তিনি ফোনে শিহাব মুন্সী নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেন। ফোনে ওই ব্যক্তি নিজেকে ব্যবসার মালিক দাবি করে জানান, যথাযথ নিয়মে বিক্রি করা হচ্ছে।
পরে সুকলা বিশ্বাস বলেন, তার স্বামী শিহাব মুন্সীর দোকানের ম্যানেজার। তিনি শুধু কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার–কীটনাশক পরিমাপ করে দেন, কিন্তু দামের বিষয়টি জানেন না এবং কোনো অর্থ গ্রহণ করেন না; কৃষকরা টাকা তার স্বামী বা মালিকের কাছে পরিশোধ করেন।
একপর্যায়ে উপস্থিত হয়ে শিহাব মুন্সী বলেন, “কীটনাশকের লাইসেন্স থাকলে সার বিক্রি করা যায়।” তিনি দাবি করেন, দোকানের ম্যানেজারের অনুপস্থিতিতে সুকলাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিক্রির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সুকলার বক্তব্য ও মালিকের দাবির মধ্যে অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়।
চুনখোলা বাজারের খুচরা ডিলার শরীফ এবাদুল হকের দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশক দেখা গেলে তিনি জানান, সেগুলো কোম্পানিতে ফেরত পাঠানো হবে। একই বাজারে আরেক খুচরা ডিলারের দোকানে বিপুল পরিমাণ ভুয়া কোম্পানির সার মজুত থাকতে দেখা গেছে।
এছাড়া পাশের মেসার্স জাফর বীজ ভান্ডারে ম্যানেজার পরিচয়ে মোস্তাফিজুরকে লাইসেন্স ছাড়াই বীজের সঙ্গে সার বিক্রি করতে দেখা যায়।
কোদালিয়া ইউনিয়নের চাউলটুরী বাজারে দীর্ঘদিন ধরে সুবাস মৃধা নামে এক ব্যক্তি লাইসেন্স ছাড়াই সার ও কীটনাশক বিক্রি করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, তার কীটনাশকের লাইসেন্স আছে; তবে প্রদর্শিত লাইসেন্সটি ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ এবং অন্য নামের। এ সময় তার পক্ষে দোকানঘরের মালিক সাংবাদিকদের অনৈতিক সমঝোতার প্রস্তাব দেন।
চুনখোলা ইউনিয়নের প্রধান সার ডিলার আরিফুল মুন্সী সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেন, “চুরি বন্ধ হলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন, লাইসেন্স ছাড়া সার ও কীটনাশক বিক্রয়কারীরা কৃষকের দোরগোড়ায় বিক্রি করে। এসব নিউজ না করে ভাই-ব্রাদার হিসেবে সুযোগ দেন।” তিনি আরও দাবি করেন, মোল্লাহাটের সব অবৈধ ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেই এমন অনুরোধ করা হচ্ছে। তার এ বক্তব্যে বিষয়টির গভীরতা ও প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তার প্রস্তাবে রাজি না হলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামানন্দ কুন্ডু জানান, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত বাজার মনিটরিং, লাইসেন্স যাচাই, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল পণ্য জব্দ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাটি পরীক্ষাভিত্তিক সারের ব্যবহার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।