সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা : বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে সমতল ও সমুদ্রসৈকত ৩১০ কিলোমিটার, সুন্দরবন ১২৫ কিলোমিটার, নদীর মোহনা ও ছোট-বড় দ্বীপমালা মিলে ২৭৫ কিলোমিটার। টেকনাফের নাফ নদীর মোহনা থেকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল-কালিন্দী পর্যন্ত খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের মোট ১৪টি উপকূলীয় জেলায় বিস্তৃত, এই উপকূলেই রয়েছে দেশের প্রধান দুটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মংলা। বিশ্বের সেরা গহীন গরান বন সুন্দরবন এবং বিশ্বের অন্যতম অখন্ডিত সমুদ্রসৈকত বা বেলাভূমি কক্সবাজার অবস্থিত। দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ যেমন এই উপকূল অঞ্চলে বসবাস করে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপির একটা বিশাল অবদানও এই অঞ্চলেরই। অথচ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্তে¡ও এই অঞ্চলের অবকাঠামো এবং বসবাসকারী জনগণের অর্থনৈতিক জীবন নানা দুর্বিপাক, বৈষম্য, অবহেলা আর অমনোযোগিতার শিকার।
ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলটি তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত (ক) পূর্ব অঞ্চল (খ) কেন্দ্রীয় অঞ্চল (গ) পশ্চিমাঞ্চলীয় অঞ্চল। গঙ্গার জোয়ার সমভূমি হিসাবে পরিচিত পশ্চিমাঞ্চলটি আধা-সক্রিয় ব-দ্বীপ নিয়ে গঠিত এবং বহু চ্যানেল এবং খাঁড়ি দ্বারা ক্রস করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় অঞ্চলটি সক্রিয়তা এবং ক্ষয়ের সবচেয়ে সক্রিয় এবং ক্রমাগত প্রক্রিয়া। এই অঞ্চলটিতে মেঘনা নদীর মোহনা অবস্থিত। পূর্ব অঞ্চলটি পাহাড়ী অঞ্চল দ্বারা আচ্ছাদিত, যা আরও স্থিতিশীল। উপকূলরেখাটি ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা জঙ্গলের সমতলসহ বিভিন্ন পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ইন্টারফেসের সমন্বয়ে গঠিত। প্রায় ৭০টি দ্বীপ, স্বীকৃত জমি, সৈকত, একটি উপদ্বীপ, পল্লী জনবসতি, নগর ও শিল্প অঞ্চল এবং বন্দর নিয়ে গঠিত উপকূলীয় অঞ্চল। উপকূলীয় বাসিন্দাদের বেশিরভাগই দরিদ্র এবং সমগ্র জনগণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মানবসৃষ্ট বিপদ উভয়েরই সংস্পর্শে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন পরিচালিত ঘটনা যেমন সমুদ্র স্তর বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, ভারী বৃষ্টিপাত, উপকূলীয় জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ এবং ভূমি ক্ষয় প্রধান প্রাকৃতিক বিপর্যয়।
১৭৯৭ থেকে শুরু করে ২০০৯ সালে আইলা পর্যন্ত সময়ের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মোট ৪৭৮ বার মাঝারি ও মোটাদাগের জলোচ্ছ্বাস, গোর্কি, হারিকেন, সিডর, নার্গিসেরা বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৭৩ বছরে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে ৩২৯টি, এসেছে গড়ে ৫-১০ বছর পর পর। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ৪০ বছরে ১৪৯টি ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস ঘটেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সর্বশেষ সিডর আর আইলার আঘাতে সুন্দরবনও ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল প্রকৃতির বিরূপ আচরণের প্রথম ও প্রত্যক্ষ শিকার সব সময়ই। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতি সবচেয়ে ক্ষতির শিকার।
ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এবং খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভবিষ্যতে আরও ঘন এবং তীব্র হবে। ভৌগোলিক পরিস্থিতি, ঘন জনসংখ্যা এবং দারিদ্র্যের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ুর দুর্বলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চল বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কারণ পশ্চিমাংশটি বেশিরভাগ সুন্দরবনকে আচ্ছন্ন করে রাখে তবে এটি নিচু ভূমির অঞ্চল, অন্যান্য কেন্দ্রীয় অংশটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের আরও গতিশীল অংশ।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুণগত ও কার্যকরগত পরিবর্তন সময়ের প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট। স্বাধীনতা লাভের পর এতদিনে দেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে যতগুলো পরিবর্তন তথা সাফল্যজনিত সূচক শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে তার মধ্যে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন অন্যতম। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। সে সময় চাষাবাদযোগ্য ২৫৫ লাখ একর জমিতে ১০০ লাখ টন ধান উৎপাদিত হতো, সে তুলনায় ২০০৮ সালে জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৪০ লাখে দাঁড়ালেও এ সময় ২৬১ লাখ একর জমিতে ধান উৎপাদিত হয়েছে ২৯০ লাখ মেট্রিক টন অর্থাৎ প্রায় তিন গুণ।
দ্বিগুণ বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য তিন গুণ বর্ধিত খাদ্যশস্য উৎপাদন নিঃসন্দেহে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি বা সাফল্য। ১৯৭০ সাল থেকে ২০০৮ সময়ে বাজেটে ক্রমান্বয়ে কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ যথেষ্ট হ্রাস (১৯ থেকে ৭ শতাংশ) পাওয়া সত্তে¡ও এই প্রবৃদ্ধি একটি নীরব বিপ্লবের সাক্ষ্য বহন করে আর এর অগ্রসাধক হলো দেশের কৃষক সমাজ।
এই প্রেক্ষাপটে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির অবদান তুলনামূলকভাবে নিম্নমুখী। উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিখাত প্রধানত শস্য ও অশস্য (নন ক্রপ)-এ দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমত, বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত হওয়ার কারণে খাদ্যশস্য উৎপাদন তুলনামূলকভাবে এ ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পায়নি। একটি পরিশীলিত সমীক্ষা-গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যবর্তী মাত্র ১৩ বছরে জাতীয় পর্যায়ে যেখানে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ শস্য (খাদ্য ও অর্থকরী ফসল) উৎপাদিত হয়েছে, সেখানে উপকূলীয় অঞ্চলে একই সময় শস্য উৎপাদন বাড়েনি বরং কমেছে। ফলে উপকূলীয় নদ-নদীর ভাঙনপ্রবণ অঞ্চল চিহ্নিত করে বাঁধ নির্মাণ এবং পুরনো বাঁধ সংস্কার জরুরি। ক্ষেত্রবিশেষে ছয় থেকে সর্বোচ্চ দশ মিটার পর্যন্ত বাঁধ উঁচু করতে হবে। উপকূলীয় বাঁধগুলো টেকসই এবং নির্মাণ কাজে যথাযথ তদারক করা হলে আগামী ১০০ বছরেও এই বাঁধের কোনো ক্ষতি হবে না। টেকসই বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন হলে উপকূল এবং উপকূলের চর ও চরাঞ্চলগুলোর জীবন ও জীবিকার গতিপথ ত্বরান্বিত হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পরিমাপ করা হলেও এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীর গতিপ্রকৃতি, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রকৃতিও পরিবর্তিত হচ্ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে এখনই উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কথা ভাবতে হবে। সংরক্ষিত ও সমৃদ্ধ উপকূল গড়ে উঠলে মানুষের জীবনমানের উন্নতি হবে। সমৃদ্ধ উপকূলে মানুষের মুখে হাসি ফুটে উঠবে।
এসডিজির টেকসই উন্নয়নের তিনটি মাত্রা। যথা অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত। এগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার। সম্পদ ব্যবহার এবং বৃদ্ধি থেকে একাধিক পরিবেশগত, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করে, কীভাবে মহাসাগর, সমুদ্র এবং উপকূলীয় অঞ্চলে সরবরাহিত পরিষেবাগুলোর টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে সে সম্পর্কে নীতি ও নির্দেশিকা প্রণয়ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। উপকূলীয় পর্যটন, মৎস্যজীবী ও উপকূলীয় অর্থনীতি এবং জীবিকার অনেকগুলো পরিষেবার একটি টেকসই বিধানের জন্য কার্যকর উপকূলীয় বাস্তুশাস্ত্রের উপর নির্ভরশীল।
উপকূলীয় অঞ্চলগুলো থেকে মানুষ অনেক সুবিধা অর্জন করে, বিশেষত স্বল্পোন্নত উপকূলীয় অঞ্চল এবং দ্বীপসমূহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করে। একই সময়ে, উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান মানব ও পরিবেশগত চাপ উপকূলীয় ব্যবস্থাগুলোতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। তাই বিশ্বব্যাপী উপকূলীয় অঞ্চলে জরুরি মনোযোগ প্রয়োজন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ২০৩০ টেকসই উন্নয়নের জন্য এজেন্ডা (এখন থেকে ২০৩০ এজেন্ডা) মহাসাগর, সমুদ্র এবং সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং টেকসই ব্যবহারের লক্ষ্যে উপকূলীয় অঞ্চলকে তার দুটি লক্ষ্যে স্পষ্টভাবে বিবেচনা (১৪.২ এবং ১৪.৫) করা আছে। উপকূলীয় বাংলাদেশের একটি অঞ্চল নির্দিষ্ট কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা পূর্ববর্তী বেশ কয়েকটি উদ্যোগ এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নীতি ও কর্মসূচিতে স্বীকৃত ছিল। ইন্টিগ্রেটেড কোস্টাল জোন ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (আইসিজেডএমপি) প্রকল্পটি পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা কর্তৃক বাস্তবায়িত হয়েছিল। প্রকল্পের অন্যতম প্রধান ফলাফল হলো উপকূলীয় অঞ্চল নীতি, যা সরকার কর্তৃক ১৭ জানুয়ারি ২০০৫ এ অনুমোদিত হয়েছিল এটি উপকূলীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য দিক নির্দেশনা দেয়। উপকূলীয় উন্নযন কৌশল (সিডিএস) উপকূলীয় অঞ্চল নীতি বা¯তবায়নের উপর জোর দেয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি আইসিজেডএমপিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় পরিচালনা কমিটির দ্বিতীয় সভায় সিডিএস অনুমোদিত হয়।
উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে আমরা বিভিন্নভাবে কাজে লাগাতে পারি। যেমন- ১. সমুদ্র তীরে বা অগভীর সমুদ্রে বা চরাঞ্চলে সোলার প্যানেল স্থাপন করে বা বাতাস কল ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে। ২. উপকূলবর্তী অঞ্চলে সামুদ্রিক ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে জোয়ার ভাটায় বিদ্যুৎ উৎপাদন। ৩. সামুদ্রিক ঢেউ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন। ৪.মহাসামুদ্রিক তাপীয় শক্তি মহাসমুদ্রের গভীরের শীতল জল এবং নিরিক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রের উপরিভাগের উষ্ণ জল এর তাপমাত্রার তফাৎ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন। ৫. জীবাশ্ম জ্বালানি সংগ্রহ করে জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা যায়।
যেহেতু সমুদ্রের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিদ্যমান উপকূল ভিত্তিক শিল্পাঞ্চল বা বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন উপকূলীয় মানুষের জীবন মানের পরিবর্তন হবে অন্যদিকে সমুদ্রের মাধ্যমে মুক্ত সমুদ্রের সুফল ব্যবহার করা যাবে। ফলে এই শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদেশি বিনোয়োগে আকৃষ্ট করানো যাবে এবং বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের এক বিশাল সম্ভাবানা সৃষ্টি হবে। এর পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে প্রক্রিয়াজাত মাছের কারখানা দেওয়া যেতে পারে। কারণ, শুধু মাত্র সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত না করার ফলে একটা সামুদ্রিক মাছের বিশাল বাজার আমরা হারাচ্ছি।
সমুদ্র, উপকূল, উপকূলীয় জল ও সামুদ্রিক পরিবেশকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কার্যকলাপকে বলা হয় ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি। গোটা বিশ্বেই সমুদ্রকেন্দ্রিক এ অর্থনীতির সম্প্রসারণ ঘটছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বর্তমানে এর আকার দাঁড়িয়েছে ৩ ট্রিলিয়ন বা ৩ লাখ কোটি ডলারে। আর জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্সের (ইউএনডিইএসএ) হিসাবে, ২০২৪ সালের শেষে এর আকার ছিল ৩ থেকে ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের মধ্যে।
যদিও এতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখানে একেবারেই নগণ্য। ২০১৫ সালে দেশের অর্থনীতিতে সমুদ্রকেন্দ্রিক বা সুনীল অর্থনীতির অবদান ছিল ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন বা ৬২০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ। তবে ওই সময়ের পর থেকে দেশে সুনীল অর্থনীতির অবদান খুব একটা বাড়ানো যায়নি। বরং এর বেশকিছু খাত-উপখাত এ সময়টিতে সংকোচনের মধ্য দিয়ে গেছে। সে অনুযায়ী একেবারে রক্ষণশীলভাবে হিসাব করলেও বলা যায়, বৈশ্বিক সুনীল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের হিস্যা কোনোভাবেই দশমিক ২ শতাংশের বেশি নয়।
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভারি বৃষ্টিপাত, বন্যা, উপকূলীয় ভাঙন এবং লবণাক্ততার কারণে প্রায়ই আলোচিত হয় দেশের উপকূলীয় অঞ্চল। যদিও এখানেই লুকিয়ে আছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় ভাণ্ডার। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় ৭১০ কিলোমিটারের উপকূল ও বিস্তৃত অভ্যন্তরীণ জলজ নেটওয়ার্ককে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারলে দেশের অর্থনীতিকে আরো সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি খুলে যেত নতুন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ, সমুদ্রবন্দরভিত্তিক শিল্প, অফশোর জ্বালানি অনুসন্ধান, এমনকি পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে অবদান রাখার মাধ্যমে দেশের প্রবৃদ্ধিতে বড় জায়গা করে নিতে পারত উপকূলীয় অঞ্চল।
উপকূলবর্তী ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশাল সমুদ্র অঞ্চল সঠিকভাবে ব্যবহারে বেশ পিছিয়ে বাংলাদেশ। যদিও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সাগর-মহাসাগরের অবদান এখন ক্রমেই বাড়ছে। বৈশ্বিক জ্বালানির ৩০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি আসছে সাগর থেকেই। প্রায় আট বিলিয়ন মানুষের ১৫ শতাংশ আমিষের জোগান দিচ্ছে সমুদ্রের মাছ ও উদ্ভিদ। যদিও সম্ভাবনাময় এ বিশাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব আধা শতাংশের অর্ধেকেও পৌঁছেনি।
এ সুনীল অর্থনীতির বড় অংশজুড়ে রয়েছে মৎস্য শিল্প। বিশেষ করে চিংড়ি রফতানি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্প এখনো প্রধানত উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্তৃত ঘের, নদীনির্ভর সংগ্রহ এবং আধা-নিয়ন্ত্রিত চাষাবাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে অবদান রাখছে বাগদা, গলদা, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক ও মিঠাপানির প্রজাতি মিলিয়ে বাংলাদেশের চিংড়ি খাত। তবে এ অবদান যে খাতটির সম্ভাবনার তুলনায় এখনো খুবই কম, তা সরকারি পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চিংড়ি রফতানি আয় বছরে প্রায় ৩৫-৪০ কোটি ডলারের মধ্যে ওঠানামা করেছে। অথচ কয়েক বছর আগেও এ খাতের রফতানি আয় ছিল ৫০ কোটি ডলারের কাছাকাছি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিসহায়তা ও যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে খাতটির রফতানির প্রবাহ স্থিতিশীলভাবে বাড়েনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ধীরে ধীরে আরো কমে এসেছে।
নীতিসহায়তা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাবেই বিশ্ব চিংড়ি বাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে বলে মনে করেন এমইউসি ফুডসের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শ্যামল দাস। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ভারত, একুয়েডরসহ চিংড়ির বিশ্ববাজারে যেসব দেশ এগিয়ে আছে, তারা সবাই ভেনামি চিংড়ি রফতানির মাধ্যমেই নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। অথচ আমাদের দেশে ভেনামি চাষ শুরুই হয়েছে ভারতের ১২ বছর পর। পরিবেশসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে দেশে ভেনামি চাষের অনুমোদন বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে কিছুটা চাষ হচ্ছে। আবার দেশে চিংড়ি চাষ এখনো প্রায় পুরোটাই সনাতনী পদ্ধতিতে রয়ে গেছে। দেশের ১ শতাংশ চিংড়িও প্রযুক্তিগতভাবে চাষ হয় না। ফলে হেক্টরপ্রতি উৎপাদনেও আমরা পিছিয়ে আছি। চাষীদের সফলতার হারও কম। আবার ব্রুড স্টক (প্রজননক্ষম চিংড়ি) আমদানি করতে গেলেও আমাদের ২৫ শতাংশ শুল্ক ও ১৪-১৬ শতাংশ সুদহার দিতে হয়। এসব বিষয় আমাদের বিশ্ববাজারে অনেক পিছিয়ে রেখেছে।’
আদিকাল থেকেই বাংলা অঞ্চল কৃষিনির্ভর ছিল। তবে আঠারো শতকের শুরুর দিকে বাংলাকে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয় তুলা ও সিল্কের তৈরি পণ্য। মসৃণতা, গুণমান ও তুলনামূলক সস্তা দামের কারণে প্রচুর চাহিদা থাকায় মোগল সাম্রাজ্যের বাইরে ইউরোপের বাজারেও তখন রফতানি হতো এ পণ্য। উনিশ ও বিশ শতকে পাট, বস্ত্র ও চিনি শিল্পের উত্থান বাংলার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। পাকিস্তান আমলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কাগজ শিল্প। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ পুরনো শিল্পের জায়গায় নতুন করে স্থান নেয় তৈরি পোশাক শিল্প। যদিও এ অঞ্চল তথা বাংলাদেশ মূলত প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর। বনজ সম্পদের পাশাপাশি মৎস্য, বিশেষ করে চিংড়ি উপকূলীয় ভৌগোলিক সুবিধার কারণে বড় শিল্প খাতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশে একসময় নদী, খাল-বিল, উপকূলের অগভীর জল আর গভীর সাগর থেকে চিংড়ি ধরে বাজারে আনা হতো। ধারণা করা হয়, ১৯২৯-৩০ সালের দিকে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে চিংড়ি চাষ শুরু হয়। ১৯৫০ সালের আগে সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের নদীঘেঁষা এলাকায় পাড় তুলে ঘের বানানো হতো, যেখানে প্রাকৃতিক খাবার খেয়ে বড় হয়ে ওঠা চিংড়ি সংগ্রহ করে বাজারজাত করা হতো। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড উপকূলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ তোলার পর এ পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ বন্ধ হয়ে যায়।
ষাটের দশকে দক্ষিণ উপকূলে জোয়ার-ভাটা নিয়ন্ত্রণ করে ধান উৎপাদনের জন্য বড় বড় বেড়িবাঁধ তৈরি হয়। ফলে প্রাকৃতিক মৎস্য ভূমিগুলো পোল্ডারে পরিণত হয়। এতে ধান চাষ বাড়লেও মৎস্য ও চিংড়ির স্বাভাবিক আবাস ব্যাহত হয়। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে তখন কোথাও লবণ, কোথাও সামান্য ধান চাষ চলত। সত্তরের দশকে এসব পোল্ডারে লোনাপানি আটকে রেখে নতুনভাবে চিংড়ি চাষ শুরু হয়। এ সময়েও বিজ্ঞানসম্মত পর্যায়ে পৌঁছতে না পারলেও বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ায় চিংড়ি চাষ দ্রুত বিস্তৃত হয়। মূলত প্রাকৃতিক উৎসের পোনা সংগ্রহ করে ঘেরভর্তি করে লালন-পালন করা হতো। পরে খুলনা, বাগেরহাট, পাইকগাছা, সাতক্ষীরা ছাড়িয়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মহেশখালী, চকরিয়া, কুতুবদিয়া ও টেকনাফেও চিংড়ি চাষের বিস্তার ঘটে।
প্রযুক্তি উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে চিংড়ি চাষ জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা খুলে দেয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে কক্সবাজারের খুরুশকুল এবং চকরিয়ায় বেড়িবাঁধ দিয়ে আধুনিক বাগদা চাষ শুরু হয়। কক্সবাজারে বহুদিন ধরে লবণ মাঠে ছোট আকারে চিংড়ি চাষ চললেও চকরিয়ার প্রায় ৫-৬ হাজার হেক্টর সংরক্ষিত ভূমি জোয়ার প্লাবিত চাষের আওতায় আনা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৮ সালে ৫ হাজার একর জমি স্বল্প খাজনায় ৩৯ জন চাষীর কাছে ইজারা দেয়া হয়। ১৯৮৫-৮৬ সালে প্লটগুলো ১০ একর করে ভাগ করে নতুন মেয়াদে ইজারা দেয়া হয়।
১৯৮২ সালে এডিবির সহায়তায় মৎস্য বিভাগের চাষ উন্নয়ন প্রকল্পের দুটি উপপ্রকল্প কক্সবাজারে চালু হয়। এর একটি গলদা পোনা উৎপাদন কেন্দ্র, আরেকটি চকরিয়ায় বাগদার প্রদর্শনী খামার। একই সময় উপকূলে প্রদর্শনী চাষ প্রকল্পের অংশ হিসেবে বাঁকখালীতে আরেকটি খামার স্থাপিত হয়।
চিংড়ি খাতকে আধুনিকায়ন করতে ১৯৮৫-৮৬ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আইডিএ প্রকল্প শুরু হয়। এতে চিংড়ি প্রযুক্তি উন্নয়ন, সহজ শর্তে ঋণ, সম্প্রসারণ ইউনিট, প্রদর্শনী খামার, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং বাগদা প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ব্যক্তি পর্যায়ে নয়টি হ্যাচারি স্থাপনের অনুমতি ও সহায়তা দেয়া হয়।
১৯৮৮ সালে এডিবির দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পে কক্সবাজারের ব্যক্তিমালিকানাধীন ১০-২৫ একর আকারের ৩৬টি খামারকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দেয়া হয় এবং সমুদ্র পোনা সংগ্রহ পদ্ধতি উন্নত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। সে সময় কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে চিংড়ি চাষে নতুন দিগন্ত তৈরি করে।
বাংলাদেশের ৭১০ কিলোমিটার উপকূলরেখা এবং উপকূলীয় জোয়ার-ভাটার বিস্তৃত চরাঞ্চল প্রাকৃতিকভাবেই চিংড়ি চাষের উপযোগী। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, সঠিক প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ ও রফতানি ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটাতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চিংড়ি উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে শক্ত অবস্থান গড়ে নিতে পারবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। ঘের ব্যবস্থাপনার বড় অংশ এখনো আধা-প্রাকৃতিক ও নিয়ন্ত্রণহীন পরিবেশে পরিচালিত হয়। উন্নত বায়োসিকিউরিটি (জৈব নিরাপত্তা), পানির মান নিয়ন্ত্রণ, প্রজাতিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। দেশের অধিকাংশ ঘের এখনো সনাতন পদ্ধতিতেই পরিচালিত হয়।
এমইউসি ফুডসের স্বত্বাধিকারী শ্যামল দাস বলেন, ‘আমাদের কৃষকরা মানসম্মত পোনা পান না। পিসিআর ল্যাব ছাড়া পোনা যাচাই করার সুযোগও থাকে না, যা আবার কৃষকদের পক্ষে কেনা সম্ভব না। সরকার হ্যাচারিগুলোতে পিসিআর সরবরাহ করতে পারে, যাতে মানসম্মত পোনা নিশ্চিত হয়। এতে কৃষকরা সহজেই হ্যাচারি থেকে পোনা যাচাই করতে পারবেন। এজন্য প্রয়োজনে তাদের থেকে নামমাত্র মূল্য নেয়া যায়।
ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে গবেষণা ও পরামর্শ দানকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালে বৈশ্বিক চিংড়ির বাজারের আকার ছিল ৪০ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৪ সালে চিংড়ির বাজারের আকার দাঁড়ায় ৪২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৪-৩২ সময়ে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ ধরলে ২০৩২ সালে চিংড়ির বৈশ্বিক বাজারের আকার দাঁড়াবে ৭৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে। এ উত্থানপর্বে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের স্থান একেবারেই নগণ্য। এমনকি গত পাঁচ বছরে দেশে চিংড়ি রফতানি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে।
চিংড়ির বিশ্ববাজারে একসময় রাজত্ব করেছে বাগদা ও গলদা চিংড়ি। এ বাজার এখন দখল করে নিয়েছে ভেনামি। উচ্চফলনশীল এবং দাম কম হওয়ায় হাইব্রিড জাতের এ চিংড়ি চাষ করে এরই মধ্যে ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইন্টিগ্রেটেড ট্রেড সলিউশনের (ডব্লিউআইটিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে চিংড়ি থেকে ভারতের রফতানি আয় ছিল ৮৮ কোটি ডলার। ২০০৫ সালে তা আরো কমে ৮৬ কোটি ডলারে নেমে আসে। বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়াতে এর পরই চিংড়ি চাষে বড় পদক্ষেপ নেয় দেশটি। ২০০৮ সালে দেশটিতে ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষের অনুমোদন দেয়া হয়। ২০১০ সালের মধ্যেই চিংড়ি রফতানি থেকে দেশটির আয় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছে যায়। এরপর দ্রুত বাড়তে থাকে খাতটি থেকে ভারতের রফতানি আয়। এরপর এ খাত থেকে দেশটির রফতানি আয় ২০১৫ সালে ৩০৮ কোটি, ২০২০ সালে ৩৭৯ কোটি ও সর্বশেষ ২০২৪ সালে ৪২৯ কোটি ডলার হয়েছে।
একই চিত্র অন্যান্য দেশেরও। ২০০০ সালেও ভিয়েতনামের চিংড়ি রফতানি থেকে বার্ষিক আয় ছিল ৬২ কোটি ডলার। এখন তা দাঁড়িয়েছে ১৮০ কোটি ডলারে। একই সময়ের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার আয় ৯৩ কোটি থেকে ১০৬ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের অবস্থান দিনে দিনে আরো নিম্নগামী হয়েছে। ২০০০ সালে বাংলাদেশ চিংড়ি রফতানি করে ৫১ কোটি ডলার আয় করেছিল।
সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চিংড়ি রফতানি থেকে আয় হয়েছে ২৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। এর আগে ২৪ কোটি ৮৩ লাখ ডলার আয় ছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় হয়েছিল ৩০ কোটি ডলার। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৪০ কোটি ৭২ লাখ ডলার।
দেশে চিংড়ি ব্যবস্থাপনা শৃঙ্খলা ভালোভাবে প্রস্তুত না হওয়ায় ও মানসম্পন্ন চিংড়ি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারার কারণেই বাংলাদেশ পণ্যটির উৎপাদন ও রফতানিতে পিছিয়ে আছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘চিংড়িতে একসময় আমরা যথেষ্ট সম্ভাবনাময় ছিলাম। তবে যথাযথ ব্যবস্থাপনা শৃঙ্খলা তৈরি না হওয়ায় এ খাতে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। যেখানে চিংড়ি চাষ হয়, সেখানে আমাদের হিমাগার নেই। চিংড়ির কোনো বৈশ্বিক ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারিনি আমরা। বিদেশী সুপারশপগুলোয় সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারিনি। বিদেশে যে চিংড়ি রফতানি হয়, সেটার ভোক্তা শুধু প্রবাসীরাই। এসবের মূল কারণ হলো আমরা মানসম্পন্ন চিংড়ি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে পারিনি। মানসম্পন্ন চিংড়ি উৎপাদনের দিকে আমাদের নজরই নেই। কারণ দেশের বাজারেই এখন চিংড়ির ভালো দাম পাওয়া যায়। মানহীন চিংড়ি দেশের বাজারে বিক্রি করা গেলে বিদেশে রফতানির দিকে কেন ঝুঁকতে চাইবেন উৎপাদকরা? চিংড়িকে আমরা এক্সপোর্ট রেডি প্রডাক্টে (রফতানির জন্য প্রস্তুত পণ্য) রূপ দিতে পারিনি বলেই আমরা বৈশ্বিক বাজারে পিছিয়ে পড়েছি।’
এছাড়া ভেনামিতে রূপান্তরকে গ্রহণ করতে না পারাও বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ভালো অবস্থান তৈরি না হওয়ার কারণ বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক চিংড়ির বাজার এখন ভেনামির ওপর নির্ভরশীল। সরকার মাঝখানে ভেনামির সম্প্রসারণ করতে চাইলেও এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। আমাদের আরেকটা সমস্যা হলো আমরা কোনো পণ্য বড় আকারে উৎপাদন করতে পারি না। হুট করে কোনো ক্রেতা অনেক বেশি পরিমাণে পণ্য চাইলে আমাদের দেয়ার সক্ষমতা থাকে না। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে পারলেই বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারব আমরা।’
বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্প এখনো প্রধানত বাগদা ও গলদার ওপর নির্ভরশীল। অধিক রোগ সংবেদনশীল ও উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার কারণে চিংড়ি উৎপাদনে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। পরিবেশগত দিক বিবেচনায় ভেনামি চাষ নিয়ে সরকারও দ্বিধায় ছিল। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পরীক্ষামূলকভাবে কিছু এলাকায় ভেনামি চাষ শুরু হয়েছে। এ খাতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে হলে সরকারি সংস্থাগুলোকে নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সভাপতি ও রিভারাইন ফিশ অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘চিংড়ি রফতানি খাতে বাংলাদেশের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু কিছু নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলেই এ খাতে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব আমরা। এমনকি তৈরি পোশাক খাতের পর চিংড়ি থেকেই আমরা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারব। এজন্য ভেনামি চাষ সম্প্রসারণের জন্য সরকারের প্রকল্প নিতে হবে। একসময় বাগদা চিংড়ি চাষের জন্য যেভাবে সরকারের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেয়া হয়েছে, ভেনামিতেও এভাবে এগিয়ে আসা দরকার। চিংড়িকে আলাদা শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার কারণে ব্যাংককে অনেক বেশি সুদ দিতে হয়। যেখানে কৃষি খাতে মাত্র ৭ শতাংশ সুদহার বিদ্যমান। অথচ চিংড়ি কৃষিরই অংশ। যে জমিতে চিংড়ি চাষ করা হয়, সেখানেই তো ধান চাষ করা হয়। তাহলে উভয়ের জন্য আলাদা নিয়ম কেন? সরকারের উচিত চিংড়িকেও কৃষির আওতায় নিয়ে আসা।’
চিংড়ি শিল্পে সম্ভাবনার পাশাপাশি অনেক চ্যালেঞ্জ থাকলেও সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।