দাকোপ (খুলনা) প্রতিনিধি : খুলনার দাকোপে গ্রীষ্মকালীন সবজি সজনে ডাটার বাম্পার ফলন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং প্রাকৃতিক কোন দূর্যোগ না হওয়ায় এবার সজনের উৎপাদানও অনেক বেশি। সজনে এখন শুধু জনপ্রিয় সবজি নয়। পুষ্টিগুণে ভরপুরের কারণে সজনে ডাটা সুপার ফুড হিসেবেও পরিচিত। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও সজিনের চাহিদা বাড়ছে। ফলে অনেকে নিজেদের পারিবারিক চাহিদা মিটিয়েও অতিরিক্ত সজনে বাজারে বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
এলাকাবাসি সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে অসংখ্য সজনে গাছ রয়েছে। এসব গাছে এবছর প্রচুর পরিমানে সজনে ডাটা ধরেছে। অন্যান্য সবজির চেয়ে সজনে ডাটা মুখরোচক, পুষ্টিগুণ ও স্বাদে বেশি হওয়ায় যে কোন বয়সের মানুষ সজনে খেতে ভালোবাসে। যে কারণে স্থানীয় হাট-বাজারে সজনে ডাটার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বাজারে সজনের আমদানীও বেড়েছে দ্বিগুণ। অনেকে নিজেদের পারিবারিক চাহিদা ও আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে দিয়েও অতিরিক্ত সজনে বাজারে বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। এছাড়া সজনে ডাটা স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি খুলনা, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রপ্তানী করছে পাইকারী ব্যবসায়ীরা। আবার অনেক ব্যবসায়ীরা এলাকায় এলাকায় গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে অগ্রিম সজনে গাছ কিনে নিচ্ছেন। সজনে একদিকে অর্থকরী ফসল অন্যদিকে পুষ্টির আধার। সাধারণত কৃষকরা ঘেরের আইলে ও বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে সজনে গাছ লাগিয়ে থাকেন। সজনে হয়ে যাবার পর ডাল কেটে তা কয়েকদিন শুকিয়ে আবার লাগিয়ে দেওয়া যায়। তাতে পরের বছর ফলন আসে। তাছাড়া এতে বাড়তি কোন খরচ ও পরিশ্রম করতে হয় না। ফলে বাণিজ্যিকভাবে সজনে চাষের প্রতি দিন দিন কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। অনেকে আবার নার্সারি থেকে
১২ মাসি সজনের চারা সংগ্রহ করে বাড়িতে রোপন করছেন। চিকিৎসাবিদদের মতে সজনে সবজিতে ক্যালসিয়াম, খনিজ লবণ, আয়রণসহ প্রোটিন ও শর্করা জাতীয় খাদ্য রয়েছে। এছাড়া ভিটামিন এ.বি.সি সমৃদ্ধ সজনে ডাটা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। শরীরের পুষ্টির জন্য গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোদ করে বলে সজনে ডাটা ঔষাধি সবজি হিসাবেও ব্যাপক সমাদৃত। এছাড়া সজনে গাছের ছাল এবং পাতা রক্তামাশয়, পেটের পিড়া ও উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
পানখালী এলাকার মানষ রায় জানান, তার ঘেরের আইলে ও বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে ছোট বড় প্রায় ১৪০টির বেশি সজনে গাছ রয়েছে। সজনেও ধরেছে খুব ভালো। ব্যবসায়ীরা সব গাছ মিলে তার দাম বলেছে ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু এখনো তিনি সজনের ডাটা বিক্রি করেনি। একই এলাকার নীল কোমল রায় বলেন, পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে ছোট ছোট ১০ থেকে ১২টি সজনে গাছ সাড়ে ৯ হাজার টাকায় অগ্রিম বিক্রি করেছে। এতে তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। তাদের মতো বিভিন্ন এলাকার একাধিক কৃষক একই ধরনের অভিমত ব্যক্ত করেন এ প্রতিবেদকের কাছে।
সজনের ডাটা ব্যবসায়ী আনন্দ মোহন রায় জানান, মৌসুমের শুরুতেই প্রতি কেজি সজনের ডাটা স্থানীয় বাজারে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে। আবার মৌসুমের শেষ দিকে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কিছুটা কমে ৫০ থেকে ১০০ টাকা নেমে আসবে। তবে উৎপাদন ভালো হলে বিক্রির পরিমাণ বাড়ে। ফলে কৃষকের লাভও বেশি হয়।
এবিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর পরিমানে সজনে গাছ রয়েছে। কৃষকরা সাধারণত ঘেরের আইলে ও বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে সজনে গাছ লাগান। এবছর সজনের ডাটার ফলনও হয়েছে খুব ভালো। এতে প্রায় ২৫০০ মেট্রিক টন সজনে উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া কৃষকরা নিজেদের পারিবারিক চাহিদা মিটিয়েও অতিরিক্ত সজনে বাজারে বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। তবে বিগত পাঁচ বছর ধরে কৃষি অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের সজনের চারা দিয়ে সজনের উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা এবং পরামর্শ দেওয়া হয়। তাছাড়া কৃষকরা নিজেদের উদ্যোগেও সজনে গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারেন। সজনের ডাটা একটি জনপ্রিয় সবজি এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর। সজনে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থাকে অনেক শক্তিশালী করে তোলে। সজনের বাকল, শিকড়, ফল, পাতা, বীজ এমনকি ফুলেও ঔষাধি গুণাগুণ রয়েছে। সে কারণে এ সময়ে বেশি বেশি সজনে খাওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।