ডেস্ক রিপোর্ট : ইরানি সশস্ত্র বাহিনী তাদের অপারেশন ‘ট্রু প্রমিজ–৪’ অভিযানের ৫৪ তম ধাপ শুরু করেছে। এই ধাপে ইসরায়েলি ও মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে দেশটি। এতে নানা ধরনের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়, যার মধ্যে ছিল সিজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রও। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া আরোপিত যুদ্ধের পর এই প্রথম সিজ্জিল ব্যবহার করা হলো।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির খবরে বলা হয়েছে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) গতকাল রোববার জানায়, প্রতিশোধমূলক এই অভিযান ‘ইয়া জাহরা’ সাংকেতিক নামে পরিচালিত হয়েছে। এ অভিযানে সুপার-হেভি খোররামশাহর ক্ষেপণাস্ত্র (দুটি ওয়ারহেডসহ), খাইবার, গদর এবং ইমাদসহ বহু ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
সলিড ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানিচালিত সিজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রটি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করে, তার পর প্রথমবারের মতো মোতায়েন ব্যবহার করা হলো। এটি ব্যবহার করে ইসরায়েলি রেজিমের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ মুসাভি তার সরকারি এক্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্টে নতুন প্রতিশোধমূলক হামলার এই ধাপে সিজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানায়, তেল আবিব, হার্জেলিয়া এবং অধিকৃত অঞ্চলের অন্তত ১৪১টি স্থানে সাইরেন বেজে ওঠে, যা আগত ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়ে বসতি স্থাপনকারীদের সতর্ক করে।
আশুরা নামেও পরিচিত সিজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রটি দুই ধাপবিশিষ্ট (টু-স্টেজ) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ক্ষেপণাস্ত্রটি সম্পূর্ণভাবে ইরানেই নকশা ও নির্মাণ করা হয়েছে। যদিও কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে এটি চীনের সহায়তায় তৈরি। ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ব্যবহৃত শাহাব শ্রেণির রকেটের পরিবর্তে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরি করা হয়। এর পাল্লা প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার এবং এটি কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করায় তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় দ্রুত উৎক্ষেপণ করা যায়।
প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে সিজ্জিলের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ মিটার এবং প্রস্থ ১ দশমিক ২৫ মিটার। এর ওজন ২৩ হাজার ৬০০ কেজি এবং এটি ৭০০ কেজি ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। এতে প্রচলিত বিস্ফোরক যেমন বহন করা যায়, তেমনি পারমাণবিক ওয়ারহেডও বহনের ক্ষমতাও রয়েছে।
এর গতিবেগ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য খুব বেশি নেই। তবে তেহরান অতীতে জানিয়েছে, মধ্য ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা হলে এটি প্রায় সাত মিনিটে তেল আবিবে পৌঁছাতে সক্ষম। উড্ডয়নের সব পর্যায়েই সেজ্জিল দিক পরিবর্তন করতে পারে (ম্যানুভারেবল)। ফলে প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে এটিকে প্রতিহত করা কঠিন। এমনকি ইসরায়েলের বহুল পরিচিত আয়রন ডোম ব্যবস্থাও এটিকে সহজে ঠেকাতে পারে না। এই উচ্চ ম্যানুভার ক্ষমতার কারণেই এর ডাকনাম হয়েছে ‘নৃত্যরত ক্ষেপণাস্ত্র’ বা ‘ড্যান্সিং মিসাইল।’
ইরান থেকে ইসরায়েলের দূরত্ব ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার ধরলে বলা যায়, প্রতি মিনিটে এই ক্ষেপণাস্ত্র ২৪৩ কিলোমিটার বা প্রতি সেকেন্ড ৪ হাজার ৫০ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। যা কিনা শব্দের গতির চেয়ে প্রায় ১২ গুণ বেশি দ্রুত। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এর সর্বোচ্চ গতি শব্দের গতির ১৩ গুণ বা মাক ১৩ পর্যন্ত হতে পারে।
এ ছাড়া সিজ্জিল-২ সংস্করণে অ্যান্টি-রাডার আবরণ রয়েছে, যা প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা রাডারের পক্ষে এটিকে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। থিংক ট্যাংক সিএসআইএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ইরান সিজ্জিলের উন্নয়ন শুরু করে। এটি পূর্ববর্তী ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বিশেষ করে জেলজাল স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (এসআরবিএম)। উন্নয়ন শেষ হওয়ার পর ২০০৮ সালে প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করা হয় এবং ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ৮০০ কিলোমিটার উড়েছিল বলে জানা যায়।
সিজ্জিল ব্যবস্থার একাধিক সংস্করণ থাকতে পারে। ২০০৯ সালে ইরান একটি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণকে সিজ্জিল-২ নামে উল্লেখ করে। আর একটি অপ্রমাণিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেজ্জিল-৩ নামে আরেকটি সংস্করণ উন্নয়নের পর্যায়ে থাকতে পারে। সেটি তিন ধাপবিশিষ্ট হবে, সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার এবং এটি ওয়ারহেডসহ প্রায় ৩৮ হাজার কেজি ওজন নিয়ে উড়তে পারবে।
রোববার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলায় সেজ্জিলের কোন সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এর আগে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিনা উসকানিতে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে আকাশপথে আগ্রাসন শুরু করে। এর প্রায় আট মাস আগে তারা কোনো উসকানি ছাড়াই দেশটির ওপর হামলা চালিয়েছিল। জবাবে ইরান দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা নেয় এবং ইসরায়েল অধিকৃত অঞ্চলসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ব্যাপক হামলা শুরু করে।