ডুমুরিয়া প্রতিনিধি : খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় এ বছর আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের শঙ্কা কাটিয়ে উপজেলার বিভিন্ন বাগানে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে সুস্বাদু আম। গাছে গাছে আমের এমন সমারোহ দেখে স্বস্তি ও আশাবাদে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে স্থানীয় আমচাষিদের মুখ।
উপজেলার খর্নিয়া, রঘুনাথপুর, শরাফপুর, মাগুরখালী, সাহস, গুটুদিয়া ও আটলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন বাগানে এখন শোভা পাচ্ছে ল্যাংড়া, হিমসাগর, আম্রপালি, মল্লিকা, কাটিমন ও ব্যানানা ম্যাংগোর মতো উন্নত জাতের আম। বিশেষ করে আম্রপালি ও হিমসাগরের গাছে গাছে এত বেশি ফল ধরেছে যে অনেক স্থানে ডাল নুয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর আবহাওয়া তুলনামূলক অনুকূলে থাকায় আমের গুটি ঝরে পড়া কম হয়েছে। ফলে ফলনও অনেক ভালো হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও পরিচর্যার কারণে পোকামাকড়ের আক্রমণও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের টিপনা গ্রামের আমচাষি মো. আতিয়ার রহমান সরদার বলেন, “গত বছর আবহাওয়ার কারণে আশানুরূপ ফলন পাইনি। কিন্তু এ বছর গাছে প্রচুর আম এসেছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী পরিচর্যা করায় গাছও ভালো আছে। এখন যদি বড় কোনো ঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হয়, তাহলে এ মৌসুমে ভালো লাভ হবে বলে আশা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমের বাজার ভালো থাকলে গত কয়েক বছরের ক্ষতিও অনেকটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।”
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ডুমুরিয়ার মাটি ও জলবায়ু আম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ফলে প্রতিবছরই এখানে আমের আবাদ ও উৎপাদন বাড়ছে। বর্তমানে অনেক কৃষক ধান ও অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে আম চাষে ঝুঁকছেন।
কৃষি বিভাগ জানায়, এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় ডুমুরিয়ার আম সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নাজমুল হুদা বলেন, “ডুমুরিয়ার কৃষকরা এখন অনেক আধুনিক পদ্ধতিতে আম চাষ করছেন। কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। নিরাপদ ও বিষমুক্ত আম উৎপাদনের লক্ষ্যে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তিও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।”
তিনি আরও বলেন, “ফ্রুট ব্যাগিং ব্যবহারের ফলে আমে পোকার আক্রমণ কমে, রাসায়নিকের ব্যবহারও কম হয়। এতে আমের গুণগত মান ও বাজারমূল্য দুটোই বাড়ে।”
উপজেলার বিভিন্ন বাগান ঘুরে দেখা গেছে, অনেক চাষি এখন দেশীয় জাতের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের বিদেশি জাতের আম চাষেও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এতে করে এলাকার বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এদিকে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ সবিতা সরকার বিভিন্ন সময় আমচাষিদের নিরাপদ ও মানসম্মত আম উৎপাদনে উৎসাহিত করছেন। তিনি চাষিদের প্রতি আমে কোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক বা ফরমালিন ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “ভোক্তাদের কাছে নিরাপদ ও বিষমুক্ত আম পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ডুমুরিয়ার আমের সুনাম ধরে রাখতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে।”
ইউএনও আরও বলেন, “প্রথাগত চাষের বাইরে এসে উন্নত ও বাণিজ্যিক জাতের আম চাষে কৃষকদের আরও আগ্রহী হতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ডুমুরিয়ার আম দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।”
বর্তমানে আম পাকার অপেক্ষায় দিন গুনছেন বাগান মালিকরা। আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পুরোদমে আম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ শুরু হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, এ বছর ডুমুরিয়ার আম দেশের বিভিন্ন জেলায় চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।