পাইকগাছা প্রতিনিধি : টাকা দ্বিগুণ করার রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের কষ্টের কোটি কোটি টাকা লুটে নিয়ে উধাও হয়েছে একটি এনজিও।খুলনার পাইকগাছায় ‘হেলথ এডুকেশন অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (ঢেউ)’ নামের একটি কথিত এনজিওর এমন অভিনব ও নির্মম প্রতারণায় এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে উপজেলার অন্তত ৩০০টি পরিবারের। সঞ্চিত সব অর্থ হারিয়ে দিশেহারা ভুক্তভোগী আমানতকারীরা এখন তাদের শেষ সম্বলটুকু ফিরে পেতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
• পরিবারতন্ত্রের সিন্ডিকেটে লুটপাটের মহোৎসব
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে উপজেলার দেলুটি ইউনিয়নের দারুন মল্লিক গ্রামের সুকান্তি সরকার নামের এক ব্যক্তি ‘ঢেউ’ নামের এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। জনকল্যাণের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে মূলত শুরু থেকেই এটি ছিল একটি পারিবারিক লুটেরা সিন্ডিকেট। এই এনজিওর সভাপতি সুকান্তির ভাই অবন্তি সরকার, সহ-সভাপতি স্ত্রী পুষ্প রানী সরকার, ক্যাশিয়ার ভাগ্নে মধুসূদন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক নিজের বোন বনানী সরকার। ফলে কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই পুরো পরিবার মিলে সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
• গ্রাহকের টাকায় কোটি টাকার বিলাসী প্রাসাদ!
লুটপাটের এই বিশাল সাম্রাজ্য চালাতে সাধারণ মানুষের চোখের সামনেই গড়ে তোলা হয়েছে আভিজাত্যের এক বিশাল দুর্গ। গ্রাহকের রক্ত পানি করা আমানতের টাকা দিয়েই এনজিওর প্রধান সুকান্তি সরকার তৈরি করেছেন এক চোখধাঁধানো বিলাসবহুল দুই তলা ভবন, যা মূলত এই প্রতারণার প্রধান কার্যালয়। তিন শতাধিক মানুষের পেটে লাথি মেরে, তাদের জমানো টাকায় নির্মিত কোটি টাকার এই আলিশান ভবনে বসেই চলেছে কোটি কোটি টাকা লোপাটের নিখুঁত ব্লু-প্রিন্ট। যে ভবনের প্রতিটি ইট আর পাথরে মিশে আছে নিঃস্ব আমানতকারীদের হাহাকার, সেই বিলাসী প্রাসাদকে ঘিরেই এখন প্রশাসনের চোখ খোলার দাবি সাধারণ মানুষের।
• টাকা চাইলে মেলে 'নিখোঁজের নাটক'!
অধিক মুনাফা ও ডিপিএস-এফডিআর-এর নামে তিন শতাধিক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় এই চক্রটি। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অরবিন্দ মুখার্জির ৫ লাখ, দীপক রায়ের ২ লাখ ৫০ হাজার, মিলন গোলদারের ৬ লাখ ও শিউলি গোলদারের ৭৫ হাজার টাকাসহ শত শত নারীর শেষ সম্বল রয়েছে এই তালিকায়। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর আমানতকারীরা টাকা ফেরত চাইতে গেলেই শুরু হয় টালবাহানা। একপর্যায়ে জানা যায়, মূল হোতা নির্বাহী পরিচালক সুকান্তি সরকার টাকা নিয়ে চম্পট দিয়েছেন। আর এই জালিয়াতি ঢাকতে ও আইনি ঝামেলা এড়াতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানায় একটি 'নিখোঁজ ডায়েরি' (জিডি) করিয়ে সুকান্তি সরকারকে পরিকল্পিতভাবে আত্মগোপনে রাখা হয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের জোরালো দাবি।
• প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন
একটি ভুঁইফোড় এনজিওর এমন প্রকাশ্য ডাকাতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তিন শতাধিক প্রান্তিক মানুষের হাহাকার আর অশ্রু ভেজা এই টাকা উদ্ধারে প্রশাসনের আর কালক্ষেপণ না করে। ভুক্তভোগীদের দাবি—অবিলম্বে সুকান্তি সরকারসহ এই পারিবারিক সিন্ডিকেটের সবাইকে আইনের আওতায় এনে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক এবং তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে হলেও যেন গরিব মানুষের এই ৩ কোটি টাকা দ্রুত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
• 'দয়া' চান সভাপতি, ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকা
এদিকে টাকা হারিয়ে ক্ষুব্ধ আমানতকারীরা শনিবার (০৬ জুন) সকালে প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ের সামনে এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। শিক্ষক গৌর সুন্দর সরকারের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, "আমাদের কষ্টের টাকা নিয়ে পুরো পরিবার ছিনিমিনি খেলছে। প্রশাসন অবিলম্বে এই প্রতারক চক্রকে গ্রেফতার না করলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।"
অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানের সভাপতি অবন্তি সরকারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে বলেন, "বিষয়টি নিয়ে যা লিখবেন, দয়া করে আমার ও পরিবারের যেন কোনো ক্ষতি না হয় সে বিষয়টি বিবেচনা করবেন।" টাকা লোপাটের পর দায়বদ্ধতার বদলে এমন 'অনুরোধ' আমানতকারীদের জখমে নুনের ছিটার মতো কাজ করেছে।