ডেস্ক রিপোর্ট : স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে উচ্চশিক্ষার আমূল সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, বর্তমান চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সার্টিফিকেট বা সনদসর্বস্ব শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই; বরং প্রযুক্তি-নির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
রোববার (৭ জুন) সকালে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতে বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন শুধু জনগণের রাজনৈতিক অধিকারই কেড়ে নেয়নি, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। এই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের মাধ্যমে শহীদ ও গণতন্ত্রকামীদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে হবে। ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, দেশের ২ হাজারেরও বেশি কলেজে অধ্যায়নরত ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সেই বিশ্ববিদ্যালয়কেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের কারণে অনেক সনাতন পেশা বিলুপ্ত হলেও অসংখ্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকার প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শিক্ষাক্রমকে বাস্তবমুখী করার কাজ শুরু করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষা কারিকুলামকে পূর্ণাঙ্গ করতে বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিছু সফট স্কিল ও উন্নত প্রযুক্তির বিষয় যুক্ত করছে। সফট স্কিলের মধ্যে রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সাইবার সিকিউরিটি, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল এন্টারপ্রেনারশিপ, ডিজিটাল কমিউনিকেশন, প্রেজেন্টেশন স্কিল, লিডারশিপ এবং ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি। এছাড়া উন্নত প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়ো টেকনোলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট অব থিংস, ন্যানো টেকনোলজি এবং ৫জি ওয়ারলেস টেকনোলজি। আগামী দিনগুলোতে এইসব বিষয়গুলো সম্পর্কে উদাসীন থেকে কর্মে সাফল্য অর্জন অসম্ভব হয়ে উঠবে।
শিক্ষিত বেকারত্বের হার কমানোর লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উচ্চ একাডেমিক সার্টিফিকেট থাকলেও প্রায়োগিক দক্ষতা না থাকায় যুবসমাজ বেকারত্বের অভিশাপের মুখোমুখি হচ্ছে। এই সংকট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, ইন্টার্নশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি একাডেমিয়া লিংকেজ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে এই শিক্ষাকালীন কর্মদক্ষতা অর্জনের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীগণ একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থী অবস্থাতেই কর্মদক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হবেন এবং শিক্ষা জীবন শেষে তাকে আর বেকার থাকতে হবে না।
সরকারপ্রধান বলেন, চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং ক্যাম্পাস থেকেই যাতে তরুণরা চাকরিদাতা বা উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, সে লক্ষ্যে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইনোভেটিভ বিজনেস আইডিয়া বাণিজ্যিকীকরণ করতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় সরকার সিড ফান্ডিং বা ইনোভেশন গ্র্যান্ট প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে তরুণরা পড়াশোনা অবস্থাতেই নিজস্ব উদ্যোগ শুরু করতে পারবেন এবং চাকুরীর জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই আরও কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবেন।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি যত্নশীল হতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক নৈতিক মূল্যবোধে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় আরেকটি ভাষা শেখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি, যা দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের পথ সুগম করবে।
শিক্ষকদের সমাজের রোল মডেল, সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় উন্নয়ন কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়, এটি একটি সম্মিলিত যাত্রা। এই যাত্রায় বর্তমান সরকার বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নাগরিক সমাজ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর সকলের সহযোগিতা আশা করে। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি, তাহলে আমাদের অগ্রযাত্রা কেউ রুদ্ধ করতে পারবে না।
প্রধানমন্ত্রী সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন আমরা সবাই মিলে এমন একটি কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলি যা শুধু সনদ প্রদান করবে না, বরং দেশে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি করবে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করবে। শিক্ষা শুধু চাকরিজীবী তৈরি করবে না বরং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করবে। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, সামাজিক রূপান্তরেরও ভিত্তি নির্মাণ করবে। শুধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়, জাতীয় সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে।