সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ও সেপ্টেম্বর ,অক্টোবর নভেম্বর ,এবং মার্চ, এপ্রিল ,মে ,মাসে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদ। বিশেষ করে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ,পিরোজপুর ,ঝালকাঠি, বরিশাল ,বরগুনা, পটুয়াখালী ,ভোলা ,লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর ,ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবে বারবার এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাস। একটানা বৃষ্টির ফলে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বেড়িবাঁধ ছাপিয়ে যাচ্ছে। এতে উপকূল রক্ষা বাঁধে দেখা দিচ্ছে ভাঙন। ফলে বছরের এ সময় এলেই সংশয় আর উৎকণ্ঠা নিয়ে দিন কাটছে উপকূলবর্তী মানুষের। উপকূলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে আছে এ জনপদে। কিন্তু বারবার উপকূল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় একটি সময় গিয়ে অনেকে স্থানত্যাগ করে অন্যত্র পাড়ি দিচ্ছে। এতে দেখা দিচ্ছে পারিবারিক, সামাজিক সমস্যাসহ নানা সংকট। এ বছর বৃষ্টি মৌসুমে উপকূলে বড়সড় কোনো ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব না পড়লেও, সাম্প্রতিককালে সাতক্ষীরার আশাশুনিতে কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ ও তালা উপজেলার শাহাজাতপুর গ্রামে কপোতাক্ষের বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে যেকোনো সময় বেড়িবাঁধ ভেঙে গিয়ে বিস্তীর্ণ এসব এলাকা প্লাবিত হতে পারে। এজন্য উপকূলীয় জনপদের মানুষ এখন দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে দিন পার করছে। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে উপকূলের মানুষ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে। কিন্তু তাদের এ চিৎকার, আর্তনাদ সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল পর্যন্ত পৌঁছেও পৌঁছাচ্ছে না। ফলে বারবার প্লাবিত হয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের অনান্য অঞ্চলের থেকে উপকূলীয় জনপদের মানুষ কয়েক বছর পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই তাদের দিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জরুরি ভিত্তিতে নজর দেওয়া প্রয়োজন। উপকূলের এসব সংকট মোকাবিলায় উপকূলীয় বোর্ড গঠন করলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা যায়।
বর্ষা মৌসুম এলেই এ অঞ্চলের মানুষের হাহাকার শুরু হয়। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব একটু পড়তেই ঘরবাড়ি ছেড়ে তাদের আশ্রয় নিতে হয় সাইক্লোন সেন্টারে। সেখানেও খাবার কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের সংকট লেগেই থাকে। এদিকে সারা বছর নিরাপদ খাবার পানি থেকে বঞ্চিত হয় তারা। সাধারণত উপকূলবর্তী বেশিরভাগ মানুষ পুকুরের পানি খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় বা নদীর লোনাপানি বৃদ্ধি পাওয়ায় যখন পুকুর ডুবে যায় তখন তাদের খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। সরকার প্রতি বছর এ সংকট মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু তা কোনোভাবেই ফলপ্রসূ হচ্ছে না। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকার প্রকল্প ভেস্তে যাচ্ছে। নানা সংকটের কথা বলে বছরের পর বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড দিন পার করে দেয়। ভাঙন দিয়ে পানি ঢোকার পর তারা জিও বস্তা আর কয় কোদাল মাটি দিয়ে বেড়িবাঁধ সংস্কার করতে তোড়জোড় শুরু করে দেয়। কিন্তু বছর না পার হতেই সেই ভাঙা জায়গার আশপাশ দিয়ে আবার বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। এভাবে দায়সারা ফাটল সংস্কারের কাজ করে কোনোভাবেই উপকূলীয় জনপদ বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি উপকূলের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে সরকারকে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিগত দুই দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি বিধ্বস্ত হয়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদ। নদীর পানি বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বারবার ভেঙেছে উপকূল রক্ষায় নির্মিত বেড়িবাঁধ। এসব জনপদে আঘাতহানা আইলা, সিডর, আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ আজও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তার ওপর প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কোথাও না কোথাও ভেঙে যায় এই বাঁধ। ফলে সংকট যেন তাদের পিছে লেগেই থাকে। তা ছাড়া দেখা যায়, উপকূলের অনেক বেড়িবাঁধ মূল সড়কের পাশে রয়েছে। সেখানে যদি ভাঙন দেখা দেয় তাহলে সেই ভাঙন সংস্কারে সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়। কারণ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) তারা একে অন্যকে দোষারোপ করতে থাকে। এজন্য সরকারের এসব দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরগুলোর সমন্বয় করা জরুরি। অনেক সময় কর্তৃপক্ষের স্বজনপ্রীতির জন্য টেকসই বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে ঠিকাদাররা অনিয়ম-দুর্নীতি করে থাকে। তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর না গিয়ে ফাটল দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁধ সংস্কার করার বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে এরই মধ্যে যেসব প্রকল্প পাস হয়েছে, সেগুলো পরিকল্পিতভাবে এবং স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারলে উপকূলের সংকট অনেকটা কেটে যাবে বলে প্রত্যাশা আমাদের সবার।
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড ১ ও ২ এর আওতাধীন জেলায় ৬৭৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ২১টি পয়েন্টের ৩৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে পাউবো বিভাগ-১-এর অধীনে ছয়টি পয়েন্টে তিন কিলোমিটার ও বিভাগ-২-এর অধীনে ১৫টি পয়েন্টে ৩০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী বড় ধরনের কোন ঘুর্ণিঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আভাস শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার নদীভাঙন এলাকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষ।
ঘূর্ণিঝড়ের স্বাভাবিক ক্ষয়ক্ষতির বাইরেও উপকূলীয় সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরী করে এই অঞ্চলের নদ নদীর বেড়িবাঁধ। ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রা যাই হোক না কেন, নদীতে জোয়ারের সময় সামান্য ঝড়েও বাধগুলো ভেঙে লোকালয় ও ফসলী জমি প্লাবিত হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৬ মে মধ্যরাতে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উপকূলের সমুদ্র তীরবর্তী এবং আশপাশের অঞ্চলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় রেমাল। ২০২৩ সালের ১৪ মে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের উপকূলে আঘাত হানে মোখা। এতে বাংলাদেশে কোনো প্রাণহানি না ঘটলেও সাতক্ষীরা উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ২০২২ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় আসানিতে প্রাথমিকভাবে অন্ধপ্রদেশ প্রভাবিত হয়। বাংলাদেশে কম ক্ষতি হয়। ২০২১ সালের ২৬ মে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস।
২০২০ সালে সুপার সাইক্লোন আম্ফান বাংলাদেশে আঘাত হানে ২০ মে। এতে উল্লেখযোগ্য ধ্বংস এবং প্রাণহানি ঘটে। ২০১৯ সালের ২ ও ৩ মে ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্রাণ হারান ৯ জন। ফণী ভারতের ওড়িশা উপকূলে আঘাত হানে এবং পরে কলকাতা ও বাংলাদেশের ওপর দিয়ে চলে যায়।
ঘূর্ণিঝড় মোরা উপকূল এলাকায় আঘাত করে ২০১৭ সালের ৩০ মে। প্রতি ঘণ্টায় বাতাসের গতি ছিল ১১০ কিমি.। মোরার প্রভাবে উপকূলে মারাত্মক ক্ষতি হয়। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু উপকূলে আঘাত হেনেছিল ২০১৬ সালের ২১ মে। এতে চট্টগ্রামে ২৪ জনের মৃত্যু হয়। ৪-৫ ফুট উঁচু ঝড়ের ঢেউয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় লক্ষাধিক পরিবার। ঘূর্ণিঝড় মহাসেন উপকূলে আঘাত হানে ২০১৩ সালের ১৬ মে। এতে ১৭ জনের মৃত্যু হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী এসব ঘূর্ণিঝড়ের কয়েকটি বাদে অধিকাংশতেই সাতক্ষীরা ও খুলনা উপকূলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ফলে মে মাস এলেই এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।
উপকুলীয় বাসিন্দা প্রসাদ মন্ডল জানান, প্রতিবছর মে মাস আসলে আমাদের মনে খুব ভয় ধরে। বিভিন্ন দুর্যোগে নদের বাঁধ ভেঙে গ্রামে পানি ঢুুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সাইক্লোন সেন্টার গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়। জোয়ারের পানিতে ঘরের ভেতর থাকা মালামাল জিনিসপত্র সব ভেসে যায়
উপকূলীয় কপোতাক্ষ নদীর চরের বাসিন্দা নুরজাহান খাতুন বলেন, প্রতিবছর এই মে মাসে বিভিন্ন ঝড় ঝঞ্ঝা আসে। আমরা নদীর চরে থাকি আমাদের ঘর ভেঙে যায়। আবার কষ্ট করে ঠিক করি। মহেশ্বরীপুর গ্রামের বাসিন্দা মোঃ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, মে মাসে খুব ভয় হয় বিভিন্ন দুর্যোগে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখনো সে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তিনি আরো বলেন, আমাদের বাড়ির সামনের বেড়িবাঁধটা ঠিক করলে রাতে একটু ঘুম পড়তে পারতাম।
উপকূলের বাসিন্দা আশাশুনির বিছট গ্রামের আব্দুল হাকিম মোড়ল জানান, পাউবো বিভাগ-২-এর আওতাধীন ৭/২ পোল্ডারের বিছট সরকারি প্রাইমারি স্কুল থেকে বিছট খেয়াঘাট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ খুই ঝুঁকিপূর্ণ। গত ৩১ মার্চ ঈদের দিন সকালে স্কুলের কিছুটা দূরে বেড়িবাঁধ ভেঙে আনুলিয়া ইউনিয়নের সাতটি গ্রাম প্লাবিত হয়। বর্তমানে বিছট গাজীবাড়ি, সরদারবাড়ি ও মোড়লবাড়ির সামনের বেড়িবাঁধ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ এই তিনটি পয়েন্টে মেরামতের কাজ শুরু হলেও দীর্ঘদিন ধরে তা বন্ধ রয়েছে। ফলে এই তিনটি পয়েন্টে বাঁধের অবস্থা খুবই নাজুক।
তিনি বলেন, খরস্রোতা খোলপেটুয়া নদীতে জোয়ারের সঙ্গে একটু জোরে বাতাস হলেই এই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙে যাবে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানোর পরও তারা এ বিষয়ে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। তিনি দ্রæত এই বাঁধ সংস্কারের কাজ শেষ করার দাবি জানান।
সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম এই প্রতিবেদককে জানান, যে কোনো আপত্কালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের বিশেষ প্রস্তুতি রয়েছে। অমাদের ৭৫টি জিও টিউবের পাশাপাশি ৭৫ হাজার জিও ব্যাগ রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টেগুলো আমাদের স্পেশাল কেয়ারে আছে। এছাড়া আমরা জিও ফিল্টার ও জি পলেস্টার মজুত করে রেখেছি। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে তাৎক্ষনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।