সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : লবণাক্ততার প্রভাবে দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদের আবাদি জমি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশ কৃষি জমি চাষাবাদের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। কোনো কৃষি জমিতে লবণ পানি প্রবেশ করলে পরববর্তী কয়েক বছর সেখানে কোনো ফসল হয় না। তাই বাধ্য হয়ে কৃষকরা পতিত জমি পরিত্যক্ত ঘোষণা করছেন। অনেকে আবার ওই জমিতে ঘের তৈরি করছেন।
জেলায় লবণাক্ততায় শীর্ষে রয়েছে সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর অঞ্চল। সুন্দরবন বেষ্টিত এই জনপদের অধিকাংশ মানুষ কৃষি ও মৎস্য খাত থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। কৃষি আবাদি জমি চাষের অনুপোযোগী হওয়ায় অনেকেই ইতোমধ্যে কৃষি পেশা পরিবর্তন করেছেন।
অন্যদিকে, কৃষি জমির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় জনপদের গাছপালাসহ অন্যান্য উদ্ভিদ। লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের গাছের ওপর ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়েছে। পাশাপাশি এই প্রভাব গবাদি পশু থেকে শুরু করে মানুষের ওপরেও বিস্তার লাভ করেছে।
ভুক্তভোগী এই জনপদের বাসিন্দাদের ভাষ্য মতে, বছরের বেশিরভাগ সময় লবণ পানি সহজে প্রবেশ করতে পারে এই অঞ্চলের কৃষি জমিতে। ফলে জমিতে লবণাক্ততার প্রভাব থেকে যায় কয়েক বছর। বাধ্য হয়ে অনেকে কৃষি জমিকে পরিণত করেছেন মৎস্য ঘেরে। তাছাড়া গরু-ছাগলসহ অন্যান্য গবাদি পশু পালন করাটাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। কারণ এই অঞ্চলে পর্যাপ্ত গাছপালা না থাকায় গবাদি পশু পালনের সুবিধা দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দাবি, উপকূলীয় এলাকার পতিত জমিতে লবণ সহিষ্ণু জাতের ধান ও সবজি চাষের আওতায় আনা হয়েছে যা আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষি ক্ষেত্রে সেটার প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাতক্ষীরার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬২৬ হেক্টর আবাদি জমির মধ্য ৮১ শতাংশের বেশি অর্থাৎ ১ লাখ ৫৩ হাজার ১১০ হেক্টর কৃষি জমি লবণাক্ততার প্রভাবে অকৃষি জমিতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে পতিত জমি রয়েছে ৪০ হাজার ১০১ হেক্টর।
লবণ পানির প্রভাবে ক্ষতিতে শীর্ষে রয়েছে সাতক্ষীরার উপকূলীয় সুন্দরবন অঞ্চল। এই জনপদের ৩৭ হাজার ১৪৬ হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ অর্থাৎ ৩৬ হাজার ৯১০ হেক্টর জমি লবণাক্ততায় রূপ নিয়েছে।
তাছাড়া সদর উপজেলায় ২৯ হাজার ৩১৯ হেক্টর জমির মধ্যে ৬৩ শতাংশ, কলারোয়ায় ১৭ হাজার ৪২১ হেক্টর জমির প্রায় ৩৮ শতাংশ, তালায় ২৮ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমির ৬৪ শতাংশ, দেবহাটায় ১৪ হাজার ৭৬১ হেক্টর জমির ৬১ শতাংশ, কালীগঞ্জে ২৬ হাজার ৭৫৩ হেক্টর জমির ভেজতে ১৬ শতাংশ ও আশাশুনি উপজেলায় ৩৪ হাজার ৪৫৬ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৮৭ শতাংশ জমি লবণাক্ততায় রুপ নিয়েছে।
গাবুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা হালিম হোসেন বলেন, প্রতি বছরই এই উপকূলীয় জনপদে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। তাছাড়া পার্শ্ববর্তী বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদী থাকায় খুব সহজে লবণ পানি কৃষি জমিতে প্রবেশ করে। লবণ পানি যে বছর জমিতে প্রবেশ করে পরবর্তী তিন থেকে চার বছর ওই জমিতে আর কোনো ফসল হয় না। আমার নিজেরও কয়েকটি আবাদি জমি ছিল, কিন্তু প্রতিবছর প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও লবণাক্ততার কারণে ওই জমিগুলোকে বছর চুক্তিতে অন্যকে দিয়েছি। সেখানে বর্তমানে চিংড়ি ঘের করেছে। আমার মতো শত শত কৃষক এই অঞ্চলে রয়েছে যারা বর্তমানে কৃষি পেশা পরিবর্তন করেছে।
উপকূলীয় পাতাখালী গ্রামের মাসুম বিল্লাহ বলেন, এই অঞ্চলজুড়ে এক সময় অধিকাংশ জমিই কৃষি খাতে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে জমিগুলো রূপ নিয়েছে মৎস্য ঘের আর পতিত জমিতে। এর মূল কারণ হচ্ছে কৃষি জমিতে লবণাক্ততার প্রভাব। আবার অনেকেই রয়েছেন যারা জমিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে। কারণ সেখানে ঘের করার উপযুক্ত না। তাই বাধ্য হয়ে জমিতে চাষাবাদ বন্ধ করে দিয়েছে।
রমজান নগর ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দা বলেন, বাধ কেটে জমিতে লবণ পানি প্রবেশ করানোর কারণে জমির উর্বরতা হারিয়ে গেছে। যার ফলে এখন আর আগের মতো আবাদ করা সম্ভব হয় না। তাই কৃষি জমিকে ঘের ব্যবসায়ীদের কাছে বছর চুক্তিতে মৎস্য ঘের করতে দেওয়া হয়েছে। এতে করে এই অঞ্চলে উৎপাদিত কৃষি পণ্য সংকট তৈরি করেছে।
রমজান নগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আল মামুন বলেন, এই ইউনিয়নজুড়ে লবণাক্ততার একটি বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। যার ফলে এখানে কিছু অঞ্চলের জমিতে লবণ পানি সহিষ্ণু ধান ও তরমুজ হয়ে থাকে। তাছাড়া অন্য কোনো ফসল এই অঞ্চলজুড়ে তেমন হয় না। অনেকেই আগে কৃষি জমিকে মৎস্য ঘেরে পরিণত করেছেন, তবে বর্তমানে সেটা কমেছে কারণ মৎস্য ঘেরে তুলনামূলক লাভ নেই।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার দেদারুল ইসলাম এই প্রতিবেদক কে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে লবণ সহিষ্ণু ধানের বীজ বিতরণ করা হয়। কৃষকরা সেই বীজ রোপন করে লাভবান হচ্ছেন। লবণ সহিষ্ণু এই অঞ্চলের জন্য শাক সবজিসহ ধানের বীজ আলাদাভাবে বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সাধারণত এই অঞ্চলে লবণাক্ততার প্রভাব বেশি থাকায় এখানে অন্য অঞ্চলের শাকসবজিগুলো হয় না। তাই সরকারের পক্ষ থেকে লবণ সহিষ্ণু বীজ বিতরণসহ অন্যান্য কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ঘের ব্যবসাতেও তেমন লাভ নেই। তাই কৃষকরা নতুন করে তাদের জমিকে ঘেরে পরিণত করছে না।পড়ন্ত বিকেলে সুন্দরবনের কাছে শাকবাড়িয়া নদীর তীরে একা বসে ছিলেন প্রমীলা মণ্ডল। দৃষ্টি নিজের পুরোনো বসতভিটার দিকে, যেটি ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর পানিতে তলিয়ে যায়।
৪৫ বছর বয়সী এই নারী জানান, তাঁর জীবনেই বহুবার নিজেদের ঘর ভাঙতে দেখেছেন। কয়বার—সেটি সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারলেন না। গত মে মাসে আম্পানের পর বসতবাড়ি হারিয়ে একটি ঘেরের পাশে ঘর তুলে বাস করছে তাঁর পরিবার। আবার ঝড় এলে সেটিও থাকবে কি না, সেই শঙ্কা উঠে এল তাঁর কথায়।
প্রমীলা খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের আংটিহারা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি যে বাঁধটির ওপর বসে ছিলেন, সেটি নতুন করে তৈরি। ৩০০ গজের মতো দূরে আরেকটি বাঁধ ছিল, সেটির ধারেই ছিল তাঁদের বাড়ি। সেখানে এখনো বসতভিটার কিছু চিহ্ন রয়ে গেছে, যা ভাটার সময় দেখা যায়।
উপকূলবাসীর এলাকা ছাড়ার প্রধান কারণ বসবাসের অনিশ্চয়তা। টেকসই বাঁধ হলে মানুষ অন্তত নিজের ভিটায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে। সেই নিশ্চয়তা পেলে এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার প্রবণতা কমে যাবে।
দেড় দশকে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, মহাসেন এবং সর্বশেষ আম্পানের আঘাতে প্রমীলাদের মতো উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হয়েছে। একসময়ের সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো জমি ও সম্পদ হারিয়ে দরিদ্র হয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত খুলনা ও বাগেরহাটের উপকূলীয় এলাকার অন্তত ১০টি ইউনিয়নের ৩০টির বেশি গ্রাম ঘুরে দেখা যায় মানুষের জীবনসংগ্রামের চিত্র। জনপদে ঘোরার সময় প্রায় সবার মুখেই শোনা গেল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা। স্থানীয়রা আরও জানান, দুর্যোগে টিকতে না পেরে অনেকে এলাকা ছেড়েছেন। অনেকে ছাড়ার পথে রয়েছেন।
প্রমীলা মণ্ডলের সঙ্গে আলাপ হয় গত ২৮ সেপ্টেম্বর। তিনি যে বাঁধটির ওপর বসে ছিলেন, তার পাশেই গোলপাতা আর বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ছোট ছোট কুঁড়েঘর। কিছু কিছু আবার পাকা। দেখেই বোঝা যায় ঘরগুলো নতুন। সেগুলো আম্পানের আঘাতের পর তৈরি হয়েছে। মিঠাপানির কারণে আংটিহারা গ্রামের চারপাশে গাছপালা ভরে থাকায় এলাকায় প্রকৃতির রুক্ষতা নেই। তবে ভিন্ন চিত্র আশপাশের অনেক গ্রামে। লবণাক্ততার কারণে ওই গ্রামগুলোর মানুষকে খাওয়ার পানির জন্য রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়।
এলাকাবাসী জানান, নদীর পানিতে লবণ বেশি, তাই এলাকায় ধান বা অন্য ফসল খুব একটা হয় না। মাছের ঘের বেশি। কিন্তু সেখানে কর্মসংস্থান হয় খুব কম মানুষেরই। বেশির ভাগ মানুষের প্রধান জীবিকা সারা দিন কোমরপানিতে ডুবে রেণুপোনা সংগ্রহ, মাছ ও কাঁকড়া ধরা।
দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বলেন, ইউনিয়নটির তিন দিক ঘিরে রয়েছে সুন্দরবন। তাই যেকোনো ছোট-বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবার আগে আছড়ে পড়ে ওই ইউনিয়নে। তিনি বলেন, দক্ষিণ বেদকাশীতে মোট সাড়ে ২৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। আইলার সময় বাঁধ ভেঙে চার বছরের বেশি সময় পানিবন্দী থাকতে হয়েছে মানুষকে। তখন মাত্র ১০ শতাংশের মতো ঘরবাড়ি টিকে ছিল। তিনি আরও বলেন, আইলার পর আড়াই হাজারের মতো পরিবারকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছে।
কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের কাঠমারচর, কাশিরহাটখোলাসহ অন্তত চারটি গ্রামে মানুষের জীবন জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল। গ্রামগুলোর সঙ্গে সড়কপথের যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন। জোয়ারের সময় পানি বাড়লে নৌকা নিয়ে চলাচল করতে হয় তাদের। নদীর পানি বাড়ার আগেই রান্না ও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার কাজ সারতে হয়।
প্রতাপনগর বাজার ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি পাকা সড়ক সাতক্ষীরা সদরের দিকে চলে গেছে। একটি জায়গায় (কালভার্ট এলাকা) সড়কটি ভেঙে নদীর পানি প্রবেশ করছে। চলাচলের একমাত্র উপায় ট্রলার বা নৌকা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, জোয়ার-ভাটা আসা-যাওয়া করায় ভাঙা বাঁধ এলাকায় গভীর খালের সৃষ্টি হয়েছে। বর্ষা মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত মেরামত করা সম্ভব নয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ভূমিরূপ একেবারেই নতুন। পানিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মাটির কণাগুলো একে অপরের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে রাখার ক্ষমতা হারাচ্ছে, অর্থাৎ ঝুরঝুরে হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভাঙন বাড়ছে, বাঁধগুলো টিকছে না। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবাধ জোয়ার-ভাটার (টিআরএম) মাধ্যমে ভূমি উঁচু করার সুপারিশ করেন তিনি।
আইলায় বাঁধ ভেঙে চার বছরের বেশি সময় পানিবন্দী থাকতে হয়েছে মানুষকে। আইলার পর আড়াই হাজারের মতো পরিবারকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় আইলার পর বসতবাড়ি হারানো দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের জোড়সিং গ্রামের বাসিন্দা মো. হামিদ এক বছর বাঁধের ওপর টংঘর করে বসবাস করেন। এরপর পরিবার নিয়ে খুলনায় চলে যান। বর্তমানে খুলনা শহরে ভাড়া বাসায় থাকেন। হামিদ রিকশা চালান। স্ত্রী অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। তিনি বলেন, ওই সময় কয়রা থেকে অনেক পরিবার খুলনায় চলে আসে। তাঁদের বেশির ভাগই রিকশা চালান ও দিনমজুরি করেন।
দাকোপের কালাবগি গ্রামের ফকিরের কোনাপাড়ার শেষ মাথায় বসবাস করেন আবুল হোসেন গাজী ও তাঁর বড় ভাই আবু বক্কর গাজী। তাঁদের মা-বাবা বেঁচে নেই। তবে দাদি ও এক প্রতিবন্ধী চাচা তাঁদের সঙ্গে থাকেন। দুই ভাই যেখানে বাস করেন, সেটি মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ। ওই দ্বীপের এক পাশে শিবসা ও অন্য পাশে সুতারখালী নদী। অন্য দুই পাশে সুন্দরবন। তাঁদের চলাচলের একমাত্র উপায় নৌকা। যদিও আম্পানের আগে এমনটি ছিল না। আম্পানের তাণ্ডবে হঠাৎ করেই বিচ্ছিন্ন হয় গেছে সেটি।
নৌকা নিয়ে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ঘরসহ ছোট উঠানের চারপাশে জোয়ারের পানি থইথই করছে। নদীতে ছোট একটি নৌকা। উঠানে শুকাতে দেওয়া হয়েছে মাছ ধরার জাল। শৌচাগার বলতে যা বোঝায়, তা হলো উঠান থেকে কিছুটা দূরে নদীর মধ্যে ঝুলন্ত একটি গোলপাতার ঘর। সেখানে যেতে বাঁশ দিয়ে সাঁকো তৈরি করা হয়েছে। উঠানের এক কোনায় কয়েকটি বড় বড় প্লাস্টিকের ড্রামে খাওয়ার পানি রাখা।
আবুল হোসেনের দাদি কুলসুম বেগমের বয়স প্রায় ৮০ বছর। তিনি বলেন, প্রায় ২৫ বছর আগেও ওই এলাকায় তাঁদের ১২ বিঘা জমি ছিল। চিংড়ি চাষ ও নদীতে মাছ ধরে খুব ভালোভাবেই সংসার চলে যেত তাঁদের। একসময় ভাঙন শুরু হলো। এখন কোনোরকমে মাথা গোঁজার জন্য ২০ হাতের মতো জমি ৫ হাজার টাকায় কিনে বসবাস করছেন।
ওই এলাকার মানুষের সুপেয় পানির একমাত্র উৎস বৃষ্টি। বাড়িতে বাড়িতে প্লাস্টিকের ড্রাম থাকে। সেখানে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা হয়। ফুরিয়ে গেলে অন্য জায়গা থেকে পানি কিনে আনতে হয় তাঁদের। চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যায় না। দ্রুতগতির একমাত্র বাহন ট্রলার। এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ওই এলাকার একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও নদীতে বিলীন হওয়ার পথে। ভেঙে পড়ছে মসজিদ মাদ্রাসা।
খুলনার কয়রা ও দাকোপ হয়ে এবার রওনা হলাম উপকূলের আরেক জেলা বাগেরহাটের দিকে। সেখানকার মোংলা উপজেলায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দরটি রয়েছে। ওই জনপদের চিলা ইউনিয়নের চিলাবাজারের একটি অংশ পশুর নদে বিলীন হয়েছে। আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়ও ভাঙনের মুখে রয়েছে। অনেকে নদের তীরে কোনোরকমে ঘর করে বসবাস করছেন। আবার অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, গত ২০ বছরে কালাবগি গ্রামের প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকা নদে বিলীন হয়েছে। গুনারী গ্রামের কিছু অংশ শিবসা নদীতে চলে গেছে। এ ছাড়া কয়রা, শ্যামনগর, আশাশুনি মোংলা এলাকার বাঁধ ভেঙেছে ৫০ থেকে ৩০০ মিটারের মতো। নদীবেষ্টিত অন্যান্য এলাকায়ও ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
কয়রা থেকে খুব সহজে মহারাজপুর হয়ে দশাহালিয়া খেয়াঘাট পার হয়ে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় যাওয়া যায়। ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে আটটার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, চারজন মানুষ খেয়া পার হওয়ার জন্য অপেক্ষারত। তাঁদের একজন বাবুল গাজীর (২৩) হাতে একটি মাটি কাটার কোদাল। বাড়ি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের নাকলা গ্রামে। কয়েক দিন আগে কাজের সন্ধানে খুলনায় গিয়েছিলেন। না পেয়ে আবার বাড়ি ফিরেছেন।
বাবুল গাজী বলেন, ‘খুলনায় এখন দিনমজুরের কাজ অনেক কমে গেছে। কয়েক দিন অপেক্ষা করেও কোনো কাজ না পাওয়ায় ফিরে আসতে হয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে সাগরে মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া। এখন মাছ ধরার দলের সঙ্গী হওয়ার চিন্তায় আছি।’
এলাকায় কর্মসংস্থান না থাকায় ইটভাটায় কাজ করতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে দেখা যায় কয়রার বিভিন্ন এলাকার মানুষকে। বেশির ভাগ কিশোর ও যুবক প্রতিবছরই ইটভাটায় কাজ করতে যান। এমনকি অনেকেই পরিবার নিয়ে চলে যান ইটভাটায়। অনেকে আগেই সরদারের কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়ে সংসার চালান।
উপকূলের মানুষের বেঁচে থাকার সমাধান খুঁজতে গিয়ে যে বিষয়টি সবার আগে উঠে এসেছে তা হলো টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ। ওই সব এলাকার লোকজন বলছেন, তাঁরা জন্মগতভাবেই প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে শিখেছেন। এ কারণে বড় ঝড়বৃষ্টি তাঁদের দমিয়ে রাখতে পারে না। কিন্তু নদীর বাঁধ ভেঙে গেলে তাঁরা মনোবল হারিয়ে ফেলেন। কারণ, এটি তাঁদের সর্বস্বান্ত করে দেয়, এটি মোকাবিলার শক্তিও তাঁদের নেই।
নদী বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত মনে করেন, উপকূলবাসীর এলাকা ছাড়ার প্রধান কারণ বসবাসের অনিশ্চয়তা। টেকসই বাঁধ হলে মানুষ অন্তত নিজের ভিটায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে। সেই নিশ্চয়তা পেলে এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার প্রবণতা কমে যাবে। আর উপকূল ঘিরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে উপকূলীয় ১৮ জেলার ৯৩টি উপজেলা বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততার কবলে পড়েছে। দিন দিন উন্মুক্ত জলাধার কমে যাওয়ার কারণে তাপপ্রবাহ বাড়ছে। আর এর প্রভাবে মানুষসহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাণীকূল। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, স্বাস্থ্য ও পানি খাত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয়ভাবে সমন্বিত উদ্যোগ ও পরিকল্পনা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ খুব বেশি দায়ী না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় দিন দিন বাস্তুহীন ও গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি ফসল, মৎস্য উৎপাদন কমছে। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় খেটে খাওয়া মানুষ বিশেষ করে নারী ও শিশুস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে। যে কোনো ধরনের নীতিমালা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিমতকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় আনতে হবে। ভুক্তভোগী ও সংকটাপন্ন মানুষ কীভাবে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠবে বা কীভাবে ক্ষতিপূরণ পেতে পারে সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। সুস্থ্য জীবনযাপনের জন্য পরিবেশগত বায়ু, পানি ও শব্দ দূষণ কমানো, বৃক্ষরাজি গড়ে তোলা, নদী-খাল, হাওর, বাঁওড়গুলোর পানিপ্রবাহ নিশ্চিত, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বিশেষ করে অপরিকল্পিত উন্নয়ন বন্ধ এবং ভূগর্ভস্থ পানির নির্ভরতা যথা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দেশি ও আন্তর্জাতিক আইন-নীতিমালাগুলোর সমন্বয় করতে হবে। সেইসঙ্গে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সচেতনভাবে এসব কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে। ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সেটা যেমন আমরা জানি। তেমনি বিশ্ব নেতারাও জানে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাঁচতে ও সুরক্ষা পেতে নানা দিক নিয়ে ভাবছি, পরিকল্পনা করছি এবং সে অনুসারে কাজও করছি। তবে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা ৫৪টি নদীর ফয়সালা না হলে এর প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া বাস্তবিক অর্থে কঠিন। পানিপ্রবাহ না থাকায় নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। এক ফসলির জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদন করায় পানি সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। কারণ উজানের পানি নেই। বাধ্য হয়ে সাগরের পানির ওপর ভরসা করায় লবণের মাত্রা বাড়ছে। সুন্দরবন সুরক্ষায় ঘষিয়াখালী খালের সুফল পাওয়া যাচ্ছে পুনঃখননের মাধ্যমে। ৫৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮৩টি খাল খনন করার পরও পানি সংকটের সমাধান হচ্ছে না। নিয়মিত খনন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। উজানের পানি প্রবাহ আনতে ৫৪ নদীর সমাধান দরকার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বেশি আছে কৃষি ও পানির ওপর। বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় মাছ চাষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে মাছের স্বাভাবিক উৎপাদনও বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাওয়ায় তাপমাত্রায় পরিবর্তন আসছে। মৌসুমি বৃষ্টি নিয়েও শঙ্কা বাড়ছে। লবণাক্ততা বাড়ছে। মিষ্টি পানির স্থলে লবণ পানি পৌঁছে গেছে। ফলে খাদ্য উৎপাদনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যা উদ্বেগের বিষয়। সেইসঙ্গে মানব স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য নিরাময় ও অভিযোজনের ওপর জোর দিতে হবে। তবে আশঙ্কার কথা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কোনো তহবিল নেই। নিজস্ব উদ্যোগে পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি মানুষ থেকে আসে মাত্র দশমিক ৫ শতাংশ। এটাই আমাদের জন্য প্রধান উদ্বেগের বিষয়। বায়ুমণ্ডলে কম কার্বন নিঃসরণ করতে হবে। পলিথিন উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ বেশি হওয়ায় পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। দেশে ১০০ টন পলিথিন ব্যবহার হয়। যার ৫০ শতাংশ দেশে উৎপাদন হয়। বাকিটা বাইরে থেকে আসে। পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করতে অভিযান চলছে। জেল জরিমানা করা হচ্ছে। তবুও বন্ধ হচ্ছে না। দশমিক ৭ শতাংশ কার্বনডাই অক্সাইড মনুষ্য সৃষ্ট। এটা বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরকে সাধ্যমতো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের দেশের নদী ও খালগুলো দিন দিন দখল হয়ে যাচ্ছে। বর্জ্য ও পলি অপসারণ করে খালের পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। এখন কেবল শহরেই নয়, গ্রামেও বাড়ি করতে হলে প্ল্যান নিতে হচ্ছে। এটা পরিকল্পিত উন্নয়নেরই অংশ। জলবায়ু পরিবর্তন ও শহরায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করে পদক্ষেপ নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিবর্তন মোকাবিলায় বাসযোগ্য শহরের পাশাপাশি পরিষ্কার নগর পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে। কেননা সেচের জন্য পানির অভাব দেখা দিয়েছে। সেই সঙ্গে জলাবদ্ধতা, কৃষি শ্রমিক স্বল্পতা ও বেড়িবাঁধ সমস্যা তো রয়েই গেছে। নদী ও খাল খনন করাসহ স্লুইস গেট সংস্কার করা প্রয়োজন। খালের ইজারা মৎস্য চাষিদের দেয়ার কারণে কৃষক পানি পায় না। অথচ সরকার নামমাত্র রাজস্ব পায়। খালের পানি প্রবাহ গতিশীল থাকবে। জলাধার থাকতে হবে। জলাধার নেই বলেই তাপপ্রবাহ বাড়ছে। একটা কথা স্মরণ রাখা দরকার যে, প্রকৃতিকে বাঁধাগ্রস্ত করলে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেবে। ১৯৭৩ সালে জরিপে ৮ লাখ ৩৩ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততা পাওয়া যায়। ২০০০ সালের জরিপে লবণাক্ততার মাত্রা ১ লাখ ২০ হাজার ৭৫০ হেক্টর। ২০০৯ সালের জরিপে লবণাক্ততা ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ২৬০ হেক্টর। ২০২১ সালের জরিপের ফলাফল আগামী নভেম্বরে প্রকাশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ১৯৭৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ জমি লবণাক্ত হয়। ২০০০ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত লবণাক্ত হয় ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি। বৃষ্টি কমলে লবণাক্ততা বেড়ে যায়। আগে আমন চাষের পর জমি পতিত থাকত। তবে আশার কথা হচ্ছে এখন ভুট্টা ও সূর্যমুখীসহ লবণসহিষ্ণু ধান চাষ হচ্ছে। এটা সম্ভব হয়েছে দেশের কৃষি বিজ্ঞানীদের গবেষণা আর সরকারের তরফ থেকে এ ব্যাপারে যথেষ্ট প্রণোদনা দেয়ার ফলে। প্রাকৃতিক কারণে আমাদের উপকূল লবণাক্ততার শিকার হচ্ছে। তবে আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণে।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামার বাড়ির) উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে কৃষি আবাদ যোগ্য জমির মাঠের চারপাশজুড়ে উঁচু করে বাধ দেওয়ার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যাতে করে পার্শ্ববর্তী নদ-নদী থেকে লবণ পানি সহজে কৃষি জমিতে প্রবেশ করতে না পারে। উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলের জন্য ধানের ছয় থেকে সাতটি জাতের বীজের গবেষণা চলমান রয়েছে। তাছাড়া ইতোমধ্যে উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে ধানগুলো চাষাবাদ করে কৃষকরা বেশ লাভবান হয়েছে। লবণাক্ততার কারণে এখানে অন্য কোনো শাকসবজি সহজে চাষাবাদ করা সম্ভব না। তবে বৃষ্টিকালীন সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির শাকসবজি চাষাবাদ করা যায়। কারণ বৃষ্টির পানিতে লবণাক্ততা ধুয়ে চলে যায়। এ সময় কৃষকরা কিছু অংশে শাকসবজি চাষাবাদ করে থাকেন।
জমির বুক ফুঁড়ে আর ফসল গজায় না। বীজ বোনা হয়, কিন্তু চারা ওঠে না। আর যদি ওঠেও, লবণের ঝাঁজে পুড়ে মরে যায়। সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জে এটি এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। এক সময় যেখানে তিন মৌসুমে ধান, পাট, ডাল আর সবজির সমাহার থাকত, সেই জমিগুলো আজ লবণাক্ততার কারণে অনাবাদি হয়ে পড়ে থাকে মাসের পর মাস।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, ভাঙা ও দুর্বল বেড়িবাঁধ আর বারবার নোনা পানির আগ্রাসনে মাটিতে বাড়ছে লবণের মাত্রা। জমি শুকালেও মাটির উপরিভাগে সাদা লবণের স্তর জমে থাকে, যা ফসল জন্মানোর প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আইলা, আম্পান, বুলবুল, ইয়াসের মতো সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলীয় জমিতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা লবণাক্ততা আজ কৃষিকে করে তুলেছে প্রায় অসম্ভব এক কাজ।
অনেক এলাকায় ফসল ফলাতে না পারায় কৃষকের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ কেউ কৃষিকাজ ছেড়ে চিংড়ি চাষে ঝুঁকেছেন। কেউ আবার পেশা পরিবর্তন করে জীবিকা টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে নেমেছেন। কিন্তু এতে কৃষির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। অনেকেই এনজিও ঋণের চাপে পড়েছেন, কেউবা বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন। তবে আশার কথা হচ্ছে কিছু কৃষক লবণ সহনশীল ধানের জাত নিয়ে নতুনভাবে চেষ্টা করছেন, তবে তেমন প্রশিক্ষণ ও সহায়তা না থাকায় তাদের সাফল্য সীমিত।
লবণাক্ততায় দিশাহারা কৃষকদের সামনে এখনো কিছু আশার আলো রয়েছে। কৃষি ও মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা বলছেন, সঠিক তথ্যসেবা, প্রশিক্ষণ এবং সহনশীল জাত ব্যবহারের মাধ্যমে এই সংকট কিছুটা মোকাবিলা করা সম্ভব। বর্ষার পরে যখন জমির লবণাক্ততার মাত্রা কিছুটা কমে আসে, তখন সে সময়কে কাজে লাগিয়ে লবণ সহনশীল ধানের জাত যেমন ব্রি ধান-৬৭, ৯২, ৯৩, ৯৯ কিংবা বিনাধান-৮, ১০ চাষের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি জমি ধোয়ার কৌশল, জৈব সার, কচুরিপানা ও খড়ের মালচিং ব্যবহারে লবণাক্ততা কমানো যায় বলেও জানিয়েছেন তারা।
তবে চাষাবাদের আগে মাটির লবণাক্ততার মাত্রা পরীক্ষা এবং কৃষকরা কী ধরনের জাত চাষ করবেন সে বিষয়ে পরামর্শ পাওয়ার জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ও স্থানীয় এনজিও থেকে তথ্য নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাতক্ষীরা পরিসংখ্যান অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বর্তমানে কৃষি খানা রয়েছে ৫ লাখ ১৪ হাজার ৩৬৬টি, যাদের মালিকানায় আবাদযোগ্য জমি রয়েছে ২ লাখ ৭১ হাজার ৪৭০ একর। অথচ ২০০৮ সালের কৃষিশুমারিতে দেখা গিয়েছিল, জেলার কৃষি খানার সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৮৭ হাজার।