সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : টেকসই বাঁধের অভাবে উপকূলীয় এলাকার চরম জরাজীর্ণ ৬০০ কি.মি বেড়িবাঁধ । আর এর কারণে উপকূলীয় ১৫ জেলার ২ কোটি মানুষ মরণফাঁদে। এই মরণ ফাঁদে রয়েছে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা খুলনা ,বাগেরহাট ,পিরোজপুর ,ঝালকাঠি, বরগুনা, পটুয়াখালী, ,ভোলা ,চাঁদপুর ,লক্ষীপুর ,কুমিল্লা ,ফেনী, নোয়াখালী ,চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার আর অর্ধশত কি.মি. অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ বর্ষা মৌসুমের ঝড় ঝঞ্ঝা ও জোয়ারের পানিতে ভেঙে হাজার হাজার একর জমি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় দিন যাপন করছে উপকূলবাসী। প্রতিবছর বাঁধ ভেঙে শত শত মৎস্য ঘের তলিয়ে হোয়াইট গোল্ড নামে খ্যাত চিংড়ি শিল্পের ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়। আর আমন চাষীরা চাষাবাদ করতে না পারায় হাজার হাজার একর ফসলি জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। অসহায় উপকূলবাসীর দেখার যেন কেউ নেই। তারা নীরবে নিভৃতে গুমরে গুমরে শুধু চোখের পানি ফেলে।
খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট উপকূলের ৬০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট প্লাবন মোকাবিলার সক্ষম নয়। প্রতিবছরই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে প্রবল জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয় উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা। ভাসিয়ে নেয় হাজারো মানুষের বসতি, কেড়ে নেয় জীবন-জীবিকা।
খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, গত ১৬ বছরে সুন্দরবনের উপকূলীয় জনপদে ১২টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। এছাড়া বেশ কিছু নি¤œচাপও মানুষের জীবন যাত্রাকে চরমভাবে ব্যাহত করেছে। এসব ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের উপকূলীয় জনপদে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এদিকে গত বুধবার উপকূলীয় এলাকায় মানববন্ধন পরবর্তী হাজার হাজার নারী পুরুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ‘সাহায্য নয়, টেকসই বাঁধ চাই’ এমন স্লোগানের আহাজারিতে সাতক্ষীরার দুর্গম এলাকার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। আগামী বর্ষা মৌসুমে উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ বাঁধ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে মেরামতের দাবি জানান তারা।
সূত্রমতে, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট উপকূলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি চিংড়ি চাষ। ওই জেলাগুলোর উপকূলীয় অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশ প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে চিংড়ি চাষের ওপর নির্ভরশীল। যখন লোকালয়ে সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশ করে তখন এসব অঞ্চলের চিংড়ি ঘেরগুলো পানিতে ভেসে যায়। ফলে বেশ মোটা অঙ্কের লোকসানে পড়তে হয় চিংড়ি চাষের সঙ্গে সম্পৃক্তদের। এ অঞ্চলের অর্থনীতি বেশ বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়। যে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পূর্বেই দরজায় কড়া নাড়তে থাকে নতুন কোনো ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এসব ঘের ব্যবসায়ীর জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না, যার ফলে এই ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হন এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের দাবি, উপকূলীয় ওই তিন জেলার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ বেশকিছু জায়গায় সংস্কার করা হয়েছে। আরো কিছু এলাকা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টেকসই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বাঁধের যেসব অংশ ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো পর্যবেক্ষণে রেখেছে পাউবো।
অপরদিকে আশাশুনির পল্লীতে মানববন্ধন থেকে জলবায়ুু পরিবর্তনজনিত কারণে অভিবাসিত পরিবারগুলোর তালিকা প্রণয়ন করে সরকারি সহায়তার আওতায় আনা, তাদের জন্য নিরাপদ আবাসন, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি (ভিজিডি, ভিজিএফ, প্রতিবন্ধী ভাতা, বিধবা ভাতা, স্বামী পরিত্যাক্ত ভাতা, বয়স্ক ভাতা ইত্যাদি) প্রদানে অগ্রাধিকার প্রদান করা, অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য টেকসই পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, নদীভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানি নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়।
সূত্রমতে, জলবায়ুু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে এই অঞ্চলে প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ ঘটে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ুু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের কারণে অনেক পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়ে শহরের বিভিন্ন বস্তি ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসনে বাধ্য হচ্ছে। এসকল স্থানান্তরিত জনগোষ্ঠীর জীবিকা, আশ্রয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতাপ নগরের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, গত কয়েক বছর উপকূলীয় বেড়িবাঁধের প্রকল্পগুলো নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দীর্ঘসূত্রতা স্থানীয় লোকজনের জান-মালের নিরাপত্তা আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। সামনে বর্ষা ও ঝড়ের মৌসুম নতুন করে উৎকণ্ঠায় ফেলেছে উপকূলীয় বাসিন্দাদের। আমরা সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ চাই। উপকূলবাসীর আর কোনো চাওয়া পাওয়া নেই।
এ বিষয়ে কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন, ‘টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি আমাদের বহুদিনের। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদের জানালেও তারা শুধু আশ্বাস দেন। পরিকল্পিত ও স্থায়ী বাঁধ নির্মিত না হওয়ায় প্রতি বছর ভাঙন দেখা দেয়। এজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের গাফিলতি দায়ী। আবার যেসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো শেষ করা হচ্ছে না।’
বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে সমতল ও সমুদ্রসৈকত ৩১০ কিলোমিটার, সুন্দরবন ১২৫ কিলোমিটার, নদীর মোহনা ও ছোট-বড় দ্বীপমালা মিলে ২৭৫ কিলোমিটার। টেকনাফের নাফ নদীর মোহনা থেকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল-কালিন্দী পর্যন্ত খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের মোট ১৪টি উপকূলীয় জেলায় বিস্তৃত, এই উপকূলেই রয়েছে দেশের প্রধান দুটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মংলা। বিশ্বের সেরা গহীন গরান বন সুন্দরবন এবং বিশ্বের অন্যতম অখন্ডিত সমুদ্রসৈকত বা বেলাভূমি কক্সবাজার অবস্থিত। দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ যেমন এই উপকূল অঞ্চলে বসবাস করে, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপির একটা বিশাল অবদানও এই অঞ্চলেরই। অথচ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্তে¡ও এই অঞ্চলের অবকাঠামো এবং বসবাসকারী জনগণের অর্থনৈতিক জীবন নানা দুর্বিপাক, বৈষম্য, অবহেলা আর অমনোযোগিতার শিকার।
ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলটি তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত (ক) পূর্ব অঞ্চল (খ) কেন্দ্রীয় অঞ্চল (গ) পশ্চিমাঞ্চলীয় অঞ্চল। গঙ্গার জোয়ার সমভূমি হিসাবে পরিচিত পশ্চিমাঞ্চলটি আধা-সক্রিয় ব-দ্বীপ নিয়ে গঠিত এবং বহু চ্যানেল এবং খাঁড়ি দ্বারা ক্রস করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় অঞ্চলটি সক্রিয়তা এবং ক্ষয়ের সবচেয়ে সক্রিয় এবং ক্রমাগত প্রক্রিয়া। এই অঞ্চলটিতে মেঘনা নদীর মোহনা অবস্থিত। পূর্ব অঞ্চলটি পাহাড়ী অঞ্চল দ্বারা আচ্ছাদিত, যা আরও স্থিতিশীল। উপকূলরেখাটি ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা জঙ্গলের সমতলসহ বিভিন্ন পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ইন্টারফেসের সমন্বয়ে গঠিত। প্রায় ৭০টি দ্বীপ, স্বীকৃত জমি, সৈকত, একটি উপদ্বীপ, পল্লী জনবসতি, নগর ও শিল্প অঞ্চল এবং বন্দর নিয়ে গঠিত উপকূলীয় অঞ্চল। উপকূলীয় বাসিন্দাদের বেশিরভাগই দরিদ্র এবং সমগ্র জনগণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মানবসৃষ্ট বিপদ উভয়েরই সংস্পর্শে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন পরিচালিত ঘটনা যেমন সমুদ্র স্তর বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, ভারী বৃষ্টিপাত, উপকূলীয় জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ এবং ভূমি ক্ষয় প্রধান প্রাকৃতিক বিপর্যয়।
১৭৯৭ থেকে শুরু করে ২০০৯ সালে আইলা পর্যন্ত সময়ের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মোট ৪৭৮ বার মাঝারি ও মোটাদাগের জলোচ্ছ্বাস, গোর্কি, হারিকেন, সিডর, নার্গিসেরা বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৭৩ বছরে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে ৩২৯টি, এসেছে গড়ে ৫-১০ বছর পর পর। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ৪০ বছরে ১৪৯টি ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস ঘটেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সর্বশেষ সিডর আর আইলার আঘাতে সুন্দরবনও ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল প্রকৃতির বিরূপ আচরণের প্রথম ও প্রত্যক্ষ শিকার সব সময়ই। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতি সবচেয়ে ক্ষতির শিকার।
ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এবং খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভবিষ্যতে আরও ঘন এবং তীব্র হবে। ভৌগোলিক পরিস্থিতি, ঘন জনসংখ্যা এবং দারিদ্র্যের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ুর দুর্বলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চল বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কারণ পশ্চিমাংশটি বেশিরভাগ সুন্দরবনকে আচ্ছন্ন করে রাখে তবে এটি নিচু ভূমির অঞ্চল, অন্যান্য কেন্দ্রীয় অংশটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের আরও গতিশীল অংশ।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুণগত ও কার্যকরগত পরিবর্তন সময়ের প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট। স্বাধীনতা লাভের পর এতদিনে দেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে যতগুলো পরিবর্তন তথা সাফল্যজনিত সূচক শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে তার মধ্যে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন অন্যতম। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। সে সময় চাষাবাদযোগ্য ২৫৫ লাখ একর জমিতে ১০০ লাখ টন ধান উৎপাদিত হতো, সে তুলনায় ২০০৮ সালে জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৪০ লাখে দাঁড়ালেও এ সময় ২৬১ লাখ একর জমিতে ধান উৎপাদিত হয়েছে ২৯০ লাখ মেট্রিক টন অর্থাৎ প্রায় তিন গুণ।
দ্বিগুণ বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য তিন গুণ বর্ধিত খাদ্যশস্য উৎপাদন নিঃসন্দেহে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি বা সাফল্য। ১৯৭০ সাল থেকে ২০০৮ সময়ে বাজেটে ক্রমান্বয়ে কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ যথেষ্ট হ্রাস (১৯ থেকে ৭ শতাংশ) পাওয়া সত্তে¡ও এই প্রবৃদ্ধি একটি নীরব বিপ্লবের সাক্ষ্য বহন করে আর এর অগ্রসাধক হলো দেশের কৃষক সমাজ।
এই প্রেক্ষাপটে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির অবদান তুলনামূলকভাবে নিম্নমুখী। উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিখাত প্রধানত শস্য ও অশস্য (নন ক্রপ)-এ দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমত, বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত হওয়ার কারণে খাদ্যশস্য উৎপাদন তুলনামূলকভাবে এ ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পায়নি। একটি পরিশীলিত সমীক্ষা-গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যবর্তী মাত্র ১৩ বছরে জাতীয় পর্যায়ে যেখানে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ শস্য (খাদ্য ও অর্থকরী ফসল) উৎপাদিত হয়েছে, সেখানে উপকূলীয় অঞ্চলে একই সময় শস্য উৎপাদন বাড়েনি বরং কমেছে। ফলে উপকূলীয় নদ-নদীর ভাঙনপ্রবণ অঞ্চল চিহ্নিত করে বাঁধ নির্মাণ এবং পুরনো বাঁধ সংস্কার জরুরি। ক্ষেত্রবিশেষে ছয় থেকে সর্বোচ্চ দশ মিটার পর্যন্ত বাঁধ উঁচু করতে হবে। উপকূলীয় বাঁধগুলো টেকসই এবং নির্মাণ কাজে যথাযথ তদারক করা হলে আগামী ১০০ বছরেও এই বাঁধের কোনো ক্ষতি হবে না। টেকসই বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন হলে উপকূল এবং উপকূলের চর ও চরাঞ্চলগুলোর জীবন ও জীবিকার গতিপথ ত্বরান্বিত হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পরিমাপ করা হলেও এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীর গতিপ্রকৃতি, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রকৃতিও পরিবর্তিত হচ্ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে এখনই উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের কথা ভাবতে হবে। সংরক্ষিত ও সমৃদ্ধ উপকূল গড়ে উঠলে মানুষের জীবনমানের উন্নতি হবে। সমৃদ্ধ উপকূলে মানুষের মুখে হাসি ফুটে উঠবে।
এসডিজির টেকসই উন্নয়নের তিনটি মাত্রা। যথা অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত। এগুলোর ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার। সম্পদ ব্যবহার এবং বৃদ্ধি থেকে একাধিক পরিবেশগত, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করে, কীভাবে মহাসাগর, সমুদ্র এবং উপকূলীয় অঞ্চলে সরবরাহিত পরিষেবাগুলোর টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে সে সম্পর্কে নীতি ও নির্দেশিকা প্রণয়ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। উপকূলীয় পর্যটন, মৎস্যজীবী ও উপকূলীয় অর্থনীতি এবং জীবিকার অনেকগুলো পরিষেবার একটি টেকসই বিধানের জন্য কার্যকর উপকূলীয় বাস্তুশাস্ত্রের উপর নির্ভরশীল।
উপকূলীয় অঞ্চলগুলো থেকে মানুষ অনেক সুবিধা অর্জন করে, বিশেষত স্বল্পোন্নত উপকূলীয় অঞ্চল এবং দ্বীপসমূহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করে। একই সময়ে, উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান মানব ও পরিবেশগত চাপ উপকূলীয় ব্যবস্থাগুলোতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। তাই বিশ্বব্যাপী উপকূলীয় অঞ্চলে জরুরি মনোযোগ প্রয়োজন। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ২০৩০ টেকসই উন্নয়নের জন্য এজেন্ডা (এখন থেকে ২০৩০ এজেন্ডা) মহাসাগর, সমুদ্র এবং সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং টেকসই ব্যবহারের লক্ষ্যে উপকূলীয় অঞ্চলকে তার দুটি লক্ষ্যে স্পষ্টভাবে বিবেচনা (১৪.২ এবং ১৪.৫) করা আছে। উপকূলীয় বাংলাদেশের একটি অঞ্চল নির্দিষ্ট কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা পূর্ববর্তী বেশ কয়েকটি উদ্যোগ এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নীতি ও কর্মসূচিতে স্বীকৃত ছিল। ইন্টিগ্রেটেড কোস্টাল জোন ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (আইসিজেডএমপি) প্রকল্পটি পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা কর্তৃক বাস্তবায়িত হয়েছিল। প্রকল্পের অন্যতম প্রধান ফলাফল হলো উপকূলীয় অঞ্চল নীতি, যা সরকার কর্তৃক ১৭ জানুয়ারি ২০০৫ এ অনুমোদিত হয়েছিল এটি উপকূলীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য দিক নির্দেশনা দেয়। উপকূলীয় উন্নযন কৌশল (সিডিএস) উপকূলীয় অঞ্চল নীতি বা¯তবায়নের উপর জোর দেয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি আইসিজেডএমপিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় পরিচালনা কমিটির দ্বিতীয় সভায় সিডিএস অনুমোদিত হয়।
উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে আমরা বিভিন্নভাবে কাজে লাগাতে পারি। যেমন- ১. সমুদ্র তীরে বা অগভীর সমুদ্রে বা চরাঞ্চলে সোলার প্যানেল স্থাপন করে বা বাতাস কল ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে। ২. উপকূলবর্তী অঞ্চলে সামুদ্রিক ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে জোয়ার ভাটায় বিদ্যুৎ উৎপাদন। ৩. সামুদ্রিক ঢেউ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন। ৪.মহাসামুদ্রিক তাপীয় শক্তি মহাসমুদ্রের গভীরের শীতল জল এবং নিরিক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রের উপরিভাগের উষ্ণ জল এর তাপমাত্রার তফাৎ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন। ৫. জীবাশ্ম জ্বালানি সংগ্রহ করে জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা যায়।
যেহেতু সমুদ্রের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বিদ্যমান উপকূল ভিত্তিক শিল্পাঞ্চল বা বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন উপকূলীয় মানুষের জীবন মানের পরিবর্তন হবে অন্যদিকে সমুদ্রের মাধ্যমে মুক্ত সমুদ্রের সুফল ব্যবহার করা যাবে। ফলে এই শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদেশি বিনোয়োগে আকৃষ্ট করানো যাবে এবং বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের এক বিশাল সম্ভাবানা সৃষ্টি হবে। এর পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে প্রক্রিয়াজাত মাছের কারখানা দেওয়া যেতে পারে। কারণ, শুধু মাত্র সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত না করার ফলে একটা সামুদ্রিক মাছের বিশাল বাজার আমরা হারাচ্ছি।
সাগর কোলে জেগে উঠছে বিস্তীর্ণ ভূমি উজানের ঢল-বন্যায় ভারত থেকে হাজারো নদ-নদী দিয়ে ভাটিতে আসা কোটি কোটি টন পলিমাটি জমা হচ্ছে দক্ষিণের সমুদ্র উপকূলজুড়ে ইতোমধ্যে জেগে উঠেছে অন্তত ১০ হাজার বর্গ কি.মি. দ্বীপ ও চরভূমি : চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, খুলনা উপকূলে ভূমি জাগার হার ক্রমেই বাড়ছে
দেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে এখানে-সেখানে সৃষ্টি হচ্ছে ছোট ছোট চর ও দ্বীপাঞ্চল। উপকূলভাগে বাংলাদেশের ভূখ-ের প্রায় ১০ ভাগের এক ভাগ সমান জেগে উঠছে প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সম্ভাবনাময় আরেক নতুন বাংলাদেশ। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া দ্বীপ, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ থেকে নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ, ভোলা হয়ে খুলনার সুন্দরবন পর্যন্ত বিশাল উপকূলীয় অঞ্চলের কাছে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে উত্তাল বঙ্গোপসাগরের ঢেউ। জেগে উঠছে দিগন্ত বিস্তৃত নতুন নতুন চর। খনিজসম্পদ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব দীপাঞ্চল প্রাকৃতিক খনিজসম্পদে ভরপুর। তারা বলছেন, দীপের প্রাকৃতিক সম্পদের এই সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে বদলে যাবে দেশের অর্থনীতি।
জানতে চাইলে খনিজসম্পদ-বিষয়ক গবেষক প্রফেসর ড. ফোরকান আলী বলেন, বাংলাদেশ খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ। প্রয়োজনের তুলনায় এ দেশে খনিজসম্পদের আহরণের পরিমাণ খুবই কম। উপকূলীয় অঞ্চলে জেগে ওঠা চরগুলো প্রাকৃতিক খনিজসম্পদের ভা-ার। এগুলো থেকে প্রাকৃতিক খনিজসম্পদ আহরণ করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বদলে দেয়া সম্ভব।
দেশের অর্থনীতিবিদ ও খনিজসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলের প্রাকৃতিক খনিজসম্পদকে কাজে লাগাতে চাইলে প্রযুক্তি-জ্ঞানসম্পন্ন প্রকৌশলী ও প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি, খনিজসম্পদ অনুসন্ধান, আহরণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব এসব করা হলে আমাদের মাটি, পাহাড় ও পানির নিচে লুকিয়ে থাকা বিপুল খণিজসম্পদ বিশেষ করে তেল, গ্যাস, মিথেন, কয়লাসহ অন্য খনিজসম্পদ আহরণ করে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে দ্বীপ জেলা ভোলা, পাহাড়ি অঞ্চল সিলেট, নোয়াখালীর সুবর্ণচর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিপুল পরিমাণ গ্যাস প্রাপ্তি এবং তা উত্তোলন করা হচ্ছে।
দেশের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গোপসাগর ও দ্বীপাঞ্চলে অনুসন্ধান চালানো গেলে অদূর ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ খনিজসম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ জন্য খনিজসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে আরো উদ্যোগী হতে হবে। বাংলাদেশ খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ, তবে এর অনেক সম্ভাবনা এখনো অনাবিষ্কৃত আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুসন্ধান এবং উত্তোলনে আরো উদ্যোগ নিলে এই সম্পদ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। একই সঙ্গে, চলমান জ্বালানি সঙ্কট নিরসন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের (জিএসবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাকৃতিক খনিজসম্পদের মজুদের মূল্য ২.২৬ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৪১.৯৭ ট্রিলিয়ন টাকা।
খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর (বিএমডি) উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান ইনকিলাবকে বলেন, উপকূলীয় এবং নদী অঞ্চলে, যেমনÑ কক্সবাজার, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদে খনিজ বালু পাওয়া গেছে। বড় নদীগুলোতেও মূল্যবান খনিজ বালু রয়েছে, তবে সেগুলো উত্তোলনের উদ্যোগ এখনো সীমিত। সাগর উপকূলে যে সমস্ত চর জাগছে সেগুলোতেও খনিজসম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেগুলোতে অনুসন্ধান চালাতে হবে।
উপকূলে ইতোমধ্যে দেশের ১০ ভাগের এক ভাগ সমান চর জেগে উঠেছে। যা পাল্টে দিতে পারে বাংলাদেশের মানচিত্র। বদলে দিতে পারে দেশের অর্থনীতিকেও। ‘২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ১০ ভাগ ভূখ- সমুদ্রে তলিয়ে যাবে’Ñমর্মে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের থিউরি ও এনজিওদের এই বয়ান অসাড় প্রমাণিত হতে চলেছে। কেননা, সামুদ্রিক জোয়ারের আঘাতে উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলে যতটা ভূমি ভাঙছে তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে ছোট ছোট চরে পলল ভূমি জেগে উঠছে। বাড়ছে দেশের আয়তন। এটি প্রমাণ ও উপলব্ধি করার জন্য ‘বিশেষজ্ঞ ব্রেইনে’র দরকার হয় না। বৃহত্তর নোয়াখালী উপকূলে গেল দুই থেকে চার দশকের মধ্যে জেগে ওঠা নিঝুম দ্বীপ, স্বর্ণদ্বীপ, ভাসানচর, ঢালচরসহ অনেকগুলো চরাঞ্চল এখন দৃশ্যমান। চরে চরে উর্বর পলিমাটি। আদিগন্ত সবুজের সমারোহ, ফল-ফসল, ক্ষেত-খামার, পাখির কলতান, হাঁসের ঝাঁক, শত শত মহিষের পাল, গরু-ছাগলের বাথান, হাঁসের খামার, শুঁটকি পাড়া, এমনকি চপল হরিণের দলে দলে বিচরণ, সর্বোপরি মানুষের কর্মচাঞ্চল্য নিত্যদিনের প্রাণবন্ত ছবি এবং জ্বলজ্যান্ত বাস্তবতা।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ সূত্রে জানা গেছে, প্রকৃতির আপন নিয়মেই উজানের ঢলে বন্যাকবলিত হয়ে ভাসে গোটা বাংলাদেশ। তবে এই ঢল-বন্যা আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায় যখন উজানে বিশেষ করে হিমালয় পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হওয়া এবং ভারত হয়ে আসা ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ, গঙ্গা-পদ্মা নদী ও মেঘনা নদীর অববাহিকাসহ ৫৪টি অভিন্ন বড় বড় নদ-নদী এবং এছাড়াও দেশের এক হাজারেরও বেশি নদ-নদীর সহ¯্র ¯্রােতধারা ভাটির দিকে বয়ে নিয়ে আসে কোটি কোটি টন পলিমাটি, পাথুরে মাটি ও বালু। যা বঙ্গোপসাগরের মোহনায় বা কোলে প্রতিনিয়তই জমা হচ্ছে। এই পলিমাটির পরিমাণ বার্ষিক অন্তত ১০ কোটি মেট্রিক টন।
বিপুল পরিমাণ এই পলিমাটি ক্রমাগত জমা হচ্ছে দক্ষিণের সমুদ্র উপকূলে। এই প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে গত ২৫ থেকে ৫০ বছরে জেগে উঠেছে অন্তত ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার দ্বীপ ও চরাঞ্চল। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ভোলা, খুলনা উপকূলে ভূমি জেগে ওঠার হার ক্রমেই বাড়ছে। সেখানে মানুষ চাষবাস ছাড়াও নতুন নতুন বসতি স্থাপন করছে। সত্তরের দশকে বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বাংলাদেশের দাবির বিপরীতে ভারতের পাল্টা দাবির এক পর্যায়ে সেটি ভারত কব্জা করে নেয়। তালপট্টি দ্বীপে মাটির নিচে বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাসসহ খনিজসম্পদ থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্র ¯্রােতের পরিবর্তনের প্রভাবে প্রায় ২৫শ’ বর্গকি.মি. আয়তনের তালপট্টি দ্বীপের অস্তিত্ব হারিয়ে যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে ক্রমাগত উজানের নদীসমূহ দিয়ে আসা পলিমাটি জমে ওঠে এবং মাইলের পর মাইল চর ও দ্বীপভূমি জেগে ওঠে। নতুন নতুন এসব চর জোয়ার-ভাটায়ও বিলীন হয়নি; বরং টেকসই হয়ে যাচ্ছে। সেখানে চাষবাস, বসতি গড়ছে মানুষ।
গবেষকদের ধারণা, দেশের চর ও দ্বীপাঞ্চলে উত্থিত নতুন পললভূমি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের মূল ভূখ-ের ১০ ভাগের এক ভাগ সমান আয়তনকে ছাড়িয়ে গেছে। পুরোপুরি জেগে উঠার অপেক্ষায় আছে আরো কয়েকগুণ বেশি। বৃহত্তর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কক্সবাজার, পটুয়াখালী, ফেনী এবং ভোলা জেলায় সৃজিত হয়েছে প্রায় ১০ হাজার বগকি.মি. চরের নয়া জমি। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার আয়তন প্রায় ৫০ হাজার বর্গকি.মি.। ১৯টি জেলার ৪৮টি উপজেলা এর অন্তর্ভুক্ত। উপকূলীয় এলাকা দেশের আয়তনের ৩০ শতাংশ। মোট জনসংখ্যার ২৮ ভাগ লোক এ অঞ্চলে বসবাস করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ব্যাপক অংশই যখন সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, তখনই বঙ্গোপসাগরের কোলে ক্রমাগত জেগে উঠছে ছোট ছোট দ্বীপ ও চরভূমি। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে যেন জেগে উঠছে অন্য এক নতুন বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বঙ্গোপসাগরের কোলে এবং এর সংলগ্ন উপকূলীয় অনেক নদী-খাল-খাঁড়িতে প্রতি বছরে গড়ে প্রায় ১৬ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি নতুন ভূমি জেগে উঠছে।
স্বর্ণদ্বীপের ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ভাসানচর। ভাসানচরের আয়তন প্রায় ২৫০ বর্গকিলোমিটার। ভাসানচরের দেড় কি.মি. দক্ষিণে প্রায় একশ’ কিলোমিটার আয়তনের গাঙ্গুরিয়া চরের অবস্থান। এ ছাড়া হাতিয়ার দক্ষিণে আরো বেশ কয়েকটি চর জেগে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ পশ্চিমে ঢাল চর, চর মোহাম্মদ আলী, সাহেব আলীর চর, চর ইউনুস, চর আউয়াল, মৌলভীর চর, তমরদ্দির চর, উত্তরে নলের চর, জাগলার চর, কেয়ারিং চর, জাহাইজ্জার চর ইত্যাদি। অনেক চর বা দ্বীপ ভূমি অনেক আগে থেকেই বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে মোহনায় জেগে উঠেছে। তাছাড়া ৩০ থেকে ৪০টি ডুবোচর ভাটার সময় জেগে উঠে, জোয়ারের সময় ডুবে যায়। সেসব চর ও দ্বীপ ভূমি জেগে উঠার অপেক্ষায় রয়েছে। হাতিয়ার উর্বর চর বা দ্বীপ ভূমিতে চাষাবাদ শুরু হওয়ার সাথে জনবসতি গড়ে উঠেছে এবং তা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
খুলনা অঞ্চলে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীর আশপাশেও ছোট ছোট চর জেগে উঠেছে। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের প্রায় ১৫০ বর্গকিলোমিটার দ্বীপ ঘিরে চারপাশে নতুন ভূমি গড়ে উঠেছে সন্দ্বীপের আয়তনের চেয়েও দেড় থেকে দ্বিগুণ। এ ছাড়া মেঘনা নদীর পাড় ঘিরে বিভিন্ন সময় সৃষ্টি হওয়া আরো ৬০টির বেশি চর ও দ্বীপ ভূমি জেগে উঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় আগামী দুই দশকে বর্তমান বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক সমান নতুন চর ও দ্বীপ ভূমি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
গবেষণা তথ্য মতে, ১৯১৩ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত একশ’ বছরে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে নোয়াখালী উপকূল ৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অর্থাৎ সমুদ্রমুখী হয়ে প্রসারিত হয়েছে। মেঘনার ভাঙন থেকে নোয়াখালীকে রক্ষা করতে ১৯৫৭ এবং ১৯৬৪ সালে দুটি ক্রসড্যাম নির্মাণ করা হয়। এর ফলে উজানের ঢল-বান হয়ে আসা পলিমাটি জমে নোয়াখালী অঞ্চল উঁচু হয়ে যায়। আশপাশে জাগতে শুরু হয় নতুন নতুন চর।