সাতক্ষীরা প্রতিনিধি। ইলিয়াস শাহের পুত্র ও উত্তরাধিকারী সিকান্দার শাহ প্রায় তেত্রিশ বছর রাজত্ব করেন। তাঁর রাজত্বকাল ছিল গৌরবোজ্জ্বল। তিনি পান্ডুয়ার নিকটবর্তী গোয়ালপাড়ায় তাঁর পুত্র আজম শাহের সঙ্গে যুদ্ধে ১৩৯১-৯২ খ্রিস্টাব্দের দিকে মৃত্যুবরণ ক তোরেন। তাঁর মৃত্যুর পর আজম শাহ ‘সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ’ উপাধি ধারণ করে ৭৯২ হিজরিতে (১৩৯১-৯২ খ্রি.) সিংহাসনে আরোহন করেন। গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ একজন দক্ষ শাসক ছিলেন। আইনের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল। তিনি বৈদেশিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের জন্যও সুপরিচিত ছিলেন। তিনি ৮১৩ হিজরিতে (১৪১০-১১ খ্রি.) মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পরে তাঁর পুত্র সাইফুদ্দীন হামজাহ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি মাত্র এক বছর কয়েক মাস (৮১৩ হি./১৪১০-১১ খ্রি-৮১৪ হি/১৪১২ খ্রি.) বাংলা শাসন করেন। তাঁর রাজত্বকালে রাজশাহী জেলার ভাতুরিয়ার জমিদার রাজা গণেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠেন এবং তারই প্ররোচনায় সুলতানের ক্রীতদাস শিহাবউদ্দীন তার প্রভুকে হত্যা করে নিজেই বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। যখন এ ঘটনা ঘটছিল, তখন সম্ভবত মুহম্মদ শাহ বিন হামজাহ শাহ বাংলার কোনো এক অঞ্চলে নিজেকে সুলতান বলে ঘোষণা করেন এবং নিজ নামে মুদ্রা প্রচলন করেন। সম্ভবত তিনি তাঁর অবস্থান রক্ষা করতে পারেন নি এবং শেষ পর্যন্ত তিনি রাজা গণেশ ও শিহাবউদ্দীনের কাছে পরাজিত হন। এভাবে ইলিয়াস শাহী শাসনের বিরতি ঘটে।
সুলতান সাইফউদ্দীন হামজা শাহের ক্রীতদাস শিহাবউদ্দীন বায়েজীদ শাহ ৮১৪ হিজরি (১৪১২ খ্রি.) থেকে ৮১৭ হিজরি (১৪১৪ খ্রি.) পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। শিহাবউদ্দীন বায়েজীদ শাহ ও রাজা গণেশের মধ্যকার সুসম্পর্ক বেশি দিন স্থায়ী ছিল না। শিহাবউদ্দীন রাজা গণেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ পরিচালনা করেন এবং কিছু সময়ের জন্য তাকে আটক রেখে তার ক্ষমতা খর্ব করেন। তিনি সুলতান শিহাবউদ্দীন বায়েজীদ শাহ উপাধি ধারণ করে নিজ নামে মুদ্রা প্রবর্তন করেন। কিন্তু শীঘ্রই রাজা গণেশ সুলতানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন এবং তাকে আক্রমণ করে হত্যা করেন (৮১৭হি./১৪১৪ খ্রি.)। শিহাবউদ্দীন বায়েজীদ শাহের পুত্র আলাউদ্দীন ফিরুজ শাহ কোনো রকমে দক্ষিণ কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় পালিয়ে যান এবং সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হন। কিন্তু রাজা গণেশ তাকে আক্রমণ করে নিহত করেন এবং নিজেই ৮১৭ হিজরিতে (১৪১৪ খ্রি.) বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন।
রাজা গণেশের বংশ বাংলার শাসক হয়েই রাজা গণেশ মুসলিমদের প্রতি নির্যাতন শুরু করেন। এ পরিস্থিতিতে পান্ডুয়ার সুফি-দরবেশ নূর কুতুব আলম জৌনপুরের সুলতান ইবরাহিম শর্কীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এতে রাজা গণেশ ভীত হয়ে দরবেশের কাছে এ মর্মে আবেদন জানান যেন ইবরাহিম শর্কী বাংলা থেকে তার বাহিনী প্রত্যাহার করে নেন। রাজা গণেশ তার পুত্র যদুকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে এবং তাকে সিংহাসনে বসাতে সম্মত হলে দরবেশ তার প্রস্তাব মেনে নেন। ৮১৮ হিজরিতে (১৪১৫ খ্রি.) এ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ইবরাহিম শর্কী দরবেশের অনুরোধে বাংলা ত্যাগ করেন।
যদু জালালউদ্দীন আবুল মুজাফফর মুহম্মদ শাহ নামে ৮১৮ হিজরিতে মুদ্রা চালু করেন। তিনি মাত্র এক বছর ও কয়েক মাস রাজত্ব করেন। তাঁর পিতা রাজা গণেশ ৮১৯ হিজরিতে (১৪১৬-১৭ খ্রি.) সিংহাসন দখল করে নেন এবং জালালউদ্দীনকে পুনরায় হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত করান। এবারে রাজা গণেশ দনুজমর্দন দেব উপাধি ধারণ করে ৮২১ হিজরি (১৪১৮ খ্রি.) পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। অতঃপর তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মহেন্দ্র সিংহাসনে বসেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর ভ্রাতা যদু কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হন (৮২১ হি./১৪১৮ খ্রি)। এ সময়ে যদু পুনরায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং জালালুদ্দীন মুহম্মদ শাহ উপাধি ধারণ করেন। তিনি শান্তিপূর্ণভাবে প্রায় পনের বছর রাজত্ব করে ৮৩৭ হিজরিতে (১৪৩৩ খ্রি.) মৃত্যুবরণ করেন। সুলতান জালালউদ্দীনের পর তাঁর পুত্র শামসুদ্দীন আহমদ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং তিনি ৮৩৯ হিজরি (১৪৩৫-৩৬ খ্রি.) পর্যন্ত রাজত্ব করেন। আহমদ শাহের নির্যাতনমূলক কার্যকলাপ সকলকেই হতাশ করে। এ অবস্থায় নাসির খান ও সাদী খান নামে তার দুজন ক্রীতদাস তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাকে হত্যা করেন। এর অব্যবহিত পরেই নাসির খান ও সাদী খান সিংহাসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ন হন এবং এ বিবাদে নাসির খান তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যা করেন। কিন্তু তিনি মাত্র কয়েকদিন বাংলা শাসন করার সুযোগ পান। শীঘ্রই অভিজাতবর্গ তার ক্ষমতার বিরোধিতা করেন এবং তাকে হত্যা করেন।
পরবর্তী ইলিয়াসশাহী বংশ শামসুদ্দীন আহমদ শাহের হত্যার পর সৃষ্ট রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পরিপ্রেক্ষিতে অভিজাতবর্গ সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের এক বংশধর নাসিরউদ্দীনকে ৮৩৯ হিজরিতে (১৪৩৫-৩৬ খ্রি.) বাংলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন। এভাবে ইলিয়াসশাহী বংশের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন সুলতান নাসিরউদ্দীন ‘আবুল মুজাফফর মাহমুদ শাহ’ উপাধি নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে প্রায় চবিবশ বছর রাজত্ব করেন। তিনি ৮৬৪ হিজরিতে (১৪৫৯-৬০ খ্রি.) মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রুকনুদ্দীন বারবক শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ন্যায়বান, উদার, বিদ্বান ও বিজ্ঞ সুলতান ছিলেন। হাবশী ক্রীতদাসদের প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল এবং এ কারণে তিনি বহুসংখ্যক হাবশীকে নিয়োগ দান করেন। এ হাবশী ক্রীতদাসরা বাংলার রাজনীতিতে খুবই শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। বারবক শাহ ৮৭৯ হিজরিতে (১৪৭৪ খ্রি.) মৃত্যুবরণ করেন এবং তাঁর পরে তার পুত্র শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ সিংহাসনে বসেন। ইউসুফ শাহের রাজত্বকালের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল যে, তিনি রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে শরীয়া আইন কঠোরভাবে এবং নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের বিধানসমূহ পালিত হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য আলেমদের নির্দেশ দেন। ইউসুফ শাহের মৃত্যুর পর (সম্ভবত ৮৮৬ হি./১৪৮১ খ্রি.) অভিজাতগণ তাঁর পুত্র দ্বিতীয় সিকান্দরকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন। কিন্তু কয়েকদিন নামমাত্র রাজত্ব করার পর অভিজাতগণ তাকে সিংহাসনচ্যুত করে নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের পুত্র ফতেহ শাহকে সিংহাসনে বসান। তিনি জালালউদ্দীন মুজাফফর ফতেহ শাহ উপাধি ধারণ করেন। তাঁর রাজত্বকালের শেষের দিকে হাবশী ক্রীতদাসগণ দরবারে বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং দরবারের গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ পদ দখল করে নেয়। ফতেহ শাহ বারবক নামে তার এক ক্রীতদাস কর্তৃক ৮৯৩ হিজরিতে (১৪৮৭ খ্রি.) নিহত হন। ফতেহ শাহের মৃত্যুর সাথে সাথে ইলিয়াস শাহী বংশের শাসনের অবসান ঘটে।
১৩৪২ থেকে ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে ইলিয়াস শাহ, সিকান্দর শাহ, জালালউদ্দীন মুহম্মদ শাহ, নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহ, রুকনউদ্দীন বারবক শাহ, ইউসুফ শাহ ও জালালউদ্দীন ফতেহ শাহ-এর আমলে বাংলার সালতানাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। বলতে গেলে, সমগ্র বাংলা এবং পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিকটবর্তী কিছু এলাকা বাংলা সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
ইলিয়াস শাহী বংশ যথানিয়মে পরম্পরা অনুসারে যোগ্য শাসকদের তৈরি করেছে। এ শাসকগণ তাদের সহিষ্ণুতা ও শিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর ওপর প্রায় সত্তর বছর শাসন কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা ছিল তাদের বড় কৃতিত্ব; পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া ছিল আরও বড় কৃতিত্বের কাজ। এ সবই তাদের জনপ্রিয়তার সাক্ষ্য বহন করে।
গ্রন্থপঞ্জি Ziauddin Barani, Tarikh-i-Firuz Shahi, Calcutta, 1862; Yahiya bin Ahmad, Tarikh-i-Mubarak Shahi, Calcutta, 1931; আব্দুল করিম, বাংলার ইতিহাস (সুলতানী আমল), ঢাকা, ১৯৭৭; ABM Shamsuddin Ahmed, Bengal under the Rule of the Early Iliyas Shahi Dynasty, Unpublished Thesis, Dhaka University, Dhaka, 1987।
হাবশী শাসন জালালউদ্দীন ফতেহ শাহের রাজত্বকালের শেষের দিকে হাবশী ক্রীতদাসগণ বাংলার শাহী দরবারে একটি বিপজ্জনক শক্তিতে পরিণত হয়। ক্ষমতালাভের উদ্দেশ্যে শাহজাদা নামে এক হাবশী খোজা ও ক্রীতদাসদের নেতা ৮৯৩ হিজরিতে (১৪৮৭ খ্রি.) ইলিয়াসশাহী বংশের শেষ সুলতান জালালউদ্দীন ফতেহ শাহকে হত্যা করে বাংলার সিংহাসন দখল করে। এভাবে বাংলায় হাবশী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলায় হাবশী (আবিসিনীয়) শাসন ৮৯৩ হিজরি (১৪৮৭ খ্রি.) থেকে ৮৯৯ হিজরি (১৪৯৩ খ্রি.) পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর স্থায়ী হয়েছিল। এ সময় চার জন সুলতান পর পর দেশ শাসন করেন। তারা হলেন বারবক শাহ শাহজাদা, সাইফউদ্দীন ফিরুজ শাহ, দ্বিতীয় নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহ ও শামসুদ্দীন মুজাফফর শাহ।
বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করে শাহজাদা সুলতান বারবক শাহ উপাধি গ্রহণ করেন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের সুনিয়ন্ত্রিতভাবে অপসারণের নীতি ছিল তার শাসনকালের বৈশিষ্ট্য। অবশ্য এ নীতি তাকে রক্ষা করতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত তিনি মালিক আন্দিল কর্তৃক নিহত হন। বারবক শাহের রাজত্বকাল মাত্র ছয় মাস স্থায়ী হয়।
মালিক আন্দিল অভিজাতদের সম্মতিতে ৮৯৩ হিজরিতে (১৪৮৭ খ্রি.) সাইফউদ্দীন আবুল মুজাফফর ফিরুজ শাহ উপাধি গ্রহণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। ঐতিহাসিকগণ গরীব ও নিঃস্বদের প্রতি তাঁর বদান্যতা ও করুণার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি ন্যায়বান, উদার ও হিতৈষী শাসক ছিলেন। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ও বদান্যতার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করেন এবং প্রজাদের জন্য শান্তি ও স্বস্তি নিশ্চিত করেন। তিনি শিল্পকলা ও স্থাপত্যেরও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর মুদ্রা ও শিলালিপি থেকে মনে হয় যে, তিনি বাংলার এক বিশাল অঞ্চল শাসন করেন। তিন বছর রাজত্ব করার পর তিনি ৮৯৬ হিজরিতে (১৪৯০ খ্রি.) স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন কিংবা গোপনে নিহত হন।
সাইফউদ্দীন ফিরুজ শাহের পর দ্বিতীয় নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর রাজত্বকালে হাবাশ খান বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেন। এতে সিদি বদর দীউয়ানা নামে অপর এক হাবশী ক্রীতদাস ঈর্ষান্বিত হন এবং শেষ পর্যন্ত পাইকদের সহায়তায় তিনি হাবাশ খান ও মাহমুদ শাহকে হত্যা করেন। মাহমুদ শাহ মাত্র কয়েকমাস রাজত্ব করেছিলেন।
দ্বিতীয় মাহমুদ শাহের হত্যার পর সিদি বদর ৮৯৬ হিজরিতে (১৪৯০ খ্রি.) শামসুদ্দীন আবু নছর মুজাফফর শাহ উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের কবল থেকে মুক্তির জন্য তিনি গৌড় নগরের অনেক পন্ডিত, ধার্মিক ও অভিজাতদের হত্যা করেন। তিনি তাঁর প্রজাদের কাছ থেকে উচ্চহারে রাজস্ব আদায় করতেন। তিনি তাঁর স্থায়ী সৈন্যবাহিনীর বিরাট অংশ ভেঙ্গে দেন এবং সৈন্যদের বেতন হ্রাস করেন। নির্মম হলেও মুজাফফর শাহ একেবারে হূদয়হীন অত্যাচারী শাসক ছিলেন না। তিনি শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি সুফি-দরবেশদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি গৌড়ে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তাঁর রাজত্বকাল ৮৯৬ হিজরি (১৪৯০ খ্রি.) থেকে ৮৯৯ হিজরি (১৪৯৩ খ্রি.) পর্যন্ত প্রায় তিন বছর স্থায়ী ছিল। তাঁর মুদ্রা ও শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, সমগ্র উত্তর বাংলা এবং বাংলার সীমান্তবর্তী বিহারের কিছু অংশ তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মুজাফফর শাহের নিপীড়নমূলক শাসনের ফলে তিনি সকল শ্রেণীর লোকের সহানুভূতি হারান। ফলে তার আরব বংশোদ্ভূত প্রধান উজির সৈয়দ হুসাইনের নেতৃত্বে এক গণবিদ্রোহ সংগঠিত হয়। মুজাফফর শাহ নিহত হন এবং তাঁর হত্যার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলায় হাবশী শাসনের অবসান ঘটে। [এ.বি.এম. শামসুদ্দীন আহমদ]
হোসেনশাহী শাসন বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাসে হোসেনশাহী আমল এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে। এ আমল ছিল বাংলার স্বাধীন সালতানাতের খ্যাতির সর্বোচ্চ পর্যায়। রাজ্যের সম্প্রসারণ, প্রশাসনের সুস্থিতকরণ এবং ধর্ম, সাহিত্য, শিল্পকলা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে তাৎপর্যময় অগ্রগতি দ্বারা হোসেনশাহী শাসনামল বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। এ আমলে উত্তর ভারত থেকে বাংলার চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পুনরুজ্জীবন ও বিকাশে সহায়তা করে। সাহিত্যিক পুনর্জাগরণ এ আমলকে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছিল। এটা ছিল স্থানীয় প্রতিভার পুস্পোদ্মম, যা পূর্ববর্তী আমলে ছিল অবদমিত। এ আমলে বাংলায় নতুন ধরনের কোনো শিল্পের বিকাশ না ঘটলেও চারুকলা ও স্থাপত্যের বিদ্যমান নমুনা ছিল এ আমলের শিল্প বিকাশের উন্নত নিদর্শন এবং এতে এ আমলের সমৃদ্ধির প্রতিফলন ঘটেছে। হোসেনশাহী শাসকরা তাদের বহিরাগত পরিচয় পরিহার করে নিজেদের স্থানীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অভিন্নরূপে গণ্য করার চেষ্টা করেন এবং এ সময়ে দেশিয় সংস্কৃতির ধারায় মুসলিম মানসের কমবেশি বিকাশ ঘটে। এ সময়ে বাংলায় ইউরোপীয়দের আগমন ঘটে। এ আমলের শেষ দিকে মুগল শাসন শুধু বাংলার সীমান্তের কাছাকাছি অঞ্চলে পৌঁছেছিল এবং ইউরোপীয় বাণিজ্য তখন শুরু হওয়ার পথে। পরবর্তী শতকগুলিতে দেশের জীবনধারার রূপদানকারী নতুন শক্তিগুলির প্রাথমিক কিছু লক্ষণ এ আমলে প্রত্যক্ষ করা যায়। সে অর্থে এ আমল ছিল বাংলার ইতিহাসের গঠনযুগ।
হাবশী সুলতান শামসুদ্দীন মুজাফফর শাহকে হত্যা করে এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দীন হোসেন শাহ সিংহাসন অধিকার করেন। তিনি মুজাফফর শাহের অধীনে উজির পদে নিয়োজিত ছিলেন। মুজাফফরের জীবনের করুণ পরিণতিতে হোসেনের ভূমিকা ছিল এবং ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে নেতৃস্থানীয় অভিজাতগণ তাকে সুলতান নির্বাচিত করে। তার রাজত্বকালে বাংলার সালতানাতের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। কামরূপ ও কামতা জয় করে তার সৈন্যবাহিনী আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার আরও উত্তরে অগ্রসর হয়। উড়িষ্যারাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি সাময়িক সাফল্য অর্জন করেন এবং ‘কামরূপ ও কামতা, জাজনগর ও উড়িষ্যা বিজয়ী’ আখ্যান তার মুদ্রায় উৎকীর্ণ করেন। তিনি ত্রিপুরার একাংশ তার রাজ্যভুক্ত করতে সক্ষম হন। চট্টগ্রাম ছিল তার রাজ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। হোসেন শাহের রাজত্বের শেষ দিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে পর্তুগিজ প্রতিনিধিদল বাংলায় আসে। ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে হোসেনের রাজত্বের সমাপ্তি ঘটে। তার রাজত্বকালে দেশে নিরবছিন্ন শান্তি বিরাজ করছিল। সমসাময়িক কবি বিজয় গুপ্ত তাকে ‘নৃপতি-তিলক’, ‘জগৎ-ভূষণ’ ও ‘কৃষ্ণ-অবতার’ রূপে আখ্যাত করেছেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি তার নীতি ছিল সহিষ্ণু ও উদার। তিনি তাদের উচ্চ রাজপদে নিয়োগ করেন এবং তাদের ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন।
আলাউদ্দীন হোসেন শাহের মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠপুত্র নুসরত সুলতান নাসিরউদ্দীন নুসরত শাহ উপাধি ধারণ করে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। উত্তর ভারতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে নুসরত ত্রিহুত (উত্তর বিহার) পর্যন্ত তার রাজ্য সম্প্রসারণ করেন। পরাজিত কতিপয় আফগানকে আশ্রয়দান করলেও পানিপথের যুদ্ধে (১৫২৬) জয়লাভের পর পূর্ব ভারতের দৃশ্যপটে অবতীর্ণ বাবুরএর সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘর্ষ তিনি চতুরতার সঙ্গে পরিহার করতে চেষ্টা করেন। নুসরত তার নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাহমুদ লোদী কর্তৃক আফগান দলপতিদের নিয়ে গঠিত মুগল-বিরোধী জোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পরিহার করেন। কিন্তু এসব কৌশল সত্ত্বেও নুসরত বাবুরের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এড়াতে পারেন নি। গোগরার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে নুসরত বাবুরের সঙ্গে সন্ধি করে বাংলাকে আসন্ন বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন। দৌরাহ্র যুদ্ধে (১৫৩১) নুসরত আফগানদের সঙ্গে যোগদানে বিরত থাকেন। হুমায়ুন এ যুদ্ধে মাহমুদ লোদীর নেতৃত্বাধীন আফগানদের পরাজিত করেন। নুসরতের রাজত্বকালে কামরূপ ও কামতার ওপর বাংলার নিয়ন্ত্রণ সম্ভবত অক্ষুণ্ণ ছিল। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের ব্যাপারে ব্যস্ততার কারণে আসামের প্রতি নজর দেওয়ার কোনো সুযোগ তার হয় নি। বাংলার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ১৫২১ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে পর্তুগিজদের দুটি প্রতিনিধিদল নুসরতের দরবারে আসেন। তার রাজত্বকালে পর্তুগিজরা বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় ছিল। চট্টগ্রামের দূরবর্তী উপকূলীয় এলাকায় চট্টগ্রামের গভর্নরদের বহুবার পর্তুগিজ হুমকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছিল।
নুসরত শাহ মহৎ গুণাবলির অধিকারী ছিলেন। তিনি তার ভাইদের এবং আফগানদের সঙ্গেও সদয় ব্যবহার করেন। খ্যাতিমান পিতার তুলনায় তাকে দুর্বল চিত্তের মানুষ বলে মনে হয়। কিন্তু তিনি যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন তাও মনে রাখা উচিত। আফগান রাজনীতির অনিশ্চিত প্রকৃতি ও মুগলদের শ্রেষ্ঠত্ব ছিল তার অবস্থানগত দুর্বলতার প্রধান কারণ। নুসরত বাংলা সাহিত্যের একজন মহান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন; সাহিত্যে বারবার তার নাম উল্লেখিত হয়েছে। কথিত আছে যে, গৌড়ে তার পিতার সমাধি জিয়ারতকালে তার এক ক্রীতদাস তাকে হত্যা করে।
নুসরত শাহের রাজত্বকালে হোসেনশাহী শাসনে যে অবক্ষয় ও ভাঙন শুরু হয়, তার উত্তরাধিকারীদের রাজত্বকালে তা চরমে পৌঁছে। নুসরত তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা মাহমুদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করলেও অভিজাতদের একটি অংশ তার তরুণ পুত্র ফিরুজকে আলাউদ্দীন ফিরুজ শাহ |আলাউদ্দীন ফিরুজ শাহ]] উপাধি দিয়ে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে (১৫৩২)। ফিরুজের রাজত্বকাল মাত্র নয় মাস স্থায়ী হয়েছিল (১৫৩২-৩৩) এবং তিনি তার পিতৃব্য মাহমুদের হাতে নিহত হন। ছন্দোবদ্ধ প্রেমকাহিনী বিদ্যাসুন্দর রচয়িতা শ্রীধর বারবার ফিরুজের নাম এবং শিল্প সাহিত্যের প্রতি তার অনুরাগের উল্লেখ করেছেন।
শেষ হোসেনশাহী সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহ তার রাজ্যের বিভিন্ন অংশে কেন্দ্রবিরোধী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলিকে রোধ করতে পারেন নি। দূরবর্তী অঞ্চলের গভর্নরগণ কার্যত স্বাধীন হয়ে ওঠেন। তার সাম্রাজ্যের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের শাসনকর্তা খোদাবখশ কর্ণফুলি নদী ও আরাকান এর পর্বতমালার মধ্যবর্তী এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে সামন্ত রাজার ন্যায় আচরণ করতে থাকেন। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মাহমুদের নাজুক অবস্থার সুযোগ নিয়ে ত্রিপুরার রাজা বাংলার অংশবিশেষ দখল করে তার রাজ্যসীমা সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা চালান। শেরশাহ শূর কর্তৃক চূড়ান্তভাবে বাংলা অধিকারের পূর্ব পর্যন্ত খোদাবখশ সম্ভবত আরাকান ও ত্রিপুরাকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বিহারে শেরখান শূরের উত্থানের সময় থেকেই মাহমুদের সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে সমস্যা শুরু হয়। মাহমুদ বিহারে শেরখানের প্রতিদ্বন্দ্বী জালাল খান লোহানীর পক্ষে বিহার আক্রমণের জন্য ইবরাহিম খানের নেতৃত্বে একটি সৈন্যবাহিনী পাঠান। সুরজগড়ের যুদ্ধে (১৫৩৪) ইবরাহিম পরাজিত হন এবং জালাল খান মাহমুদের শরণাপন্ন হন। এতে করে বিহারে শেরখানের কর্তৃত্বের পথ প্রশস্ত হয়। গুজরাটে হুমায়ুনের ব্যস্ততার (১৫৩৫) সুযোগে শেরখান ভাগলপুর পর্যন্ত এলাকা দখল করে নেন। ১৫৩৬ খ্রিস্টাব্দে শেরখান তেলিয়াগড়ে উপস্থিত হন। পর্তুগিজ সৈন্যদের সহায়তায় মাহমুদের সৈন্যদল তাকে প্রতিহত করে। ঝাড়খন্ড হয়ে শেরখান গৌড়ের উৎকণ্ঠে এসে উপস্থিত হন। মাহমুদ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং শেরখান তার রাজ্য তেলিয়াগড়ি-এ পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। মাহমুদ পর্তুগিজদের স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের অধিকারসহ চট্টগ্রাম ও সাতগাঁওএ তাদের দুর্গ ও বাণিজ্যকুঠি নির্মাণের অনুমতি দান করেছিলেন। এতে বাংলায় পর্তুগিজদের ক্ষমতা বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।
১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে বিহারে শেরখানের অবস্থান ছিল নিরাপদ এবং তিনি তেলিয়াগড়ে গিরিপথ নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। দ্বিতীয়বারের মতো শেরখান গৌড়ে উপস্থিত হন এবং বার্ষিক কর হিসেবে মাহমুদের কাছে এক বিশাল অঙ্কের টাকা দাবি করেন। মাহমুদ এতে অসম্মতি জানালে শেরখান গৌড় অবরোধ করেন এবং ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে আফগানরা গৌড় দখল করে নেয়। শেষ মুহূর্তে মাহমুদ শেরখানের বিরুদ্ধে হুমায়ুনের সঙ্গে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু গৌড়ে আফগানরা তার দু পুত্রকে হত্যা করলে মাহমুদ মানসিক যন্ত্রণায় বিপর্যস্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এভাবে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলার স্বাধীন সালতানাতের অবসান ঘটে। মাহমুদ তখনকার বিপজ্জনক রাজনৈতিক পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ বাংলার ইতিহাসের এক গুরুত্বপুর্ণ যুগের সমাপ্তি ঘটে এবং বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকর এক যুগের সূচনা হয়। সতেরো শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত বাংলার জনজীবনে এ অবস্থা বিরাজ করছিল। [আবদুল মমিন চৌধুরী]
গ্রন্থপঞ্জি JN Sarkar (ed), History of Bengal, II, Dhaka, 1948; সুখময় মুখোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর: স্বাধীন সুলতানদের আমল, কলকাতা, ১৯৬২; আব্দুল করিম, বাংলার ইতিহাস: সুলতানী আমল, ঢাকা, ১৯৮৭; MR Tarafdar, Husain Shahi Bengal, 2nd revised ed, Dhaka, 1999।
আফগান শাসন (১৫৩৯-১৫৭৬) বাংলায় ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে রাজমহলের যুদ্ধে দাউদ কররানীর বিরুদ্ধে মুগল বিজয়ের ফলে। কিন্তু ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে মুগল শাসনকর্তা জাহাঙ্গীর কুলী খানের কাছ থেকে শেরখানের (যিনি চৌষার যুদ্ধে জয়লাভের পর শেরশাহ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন) বাংলা দখলের বহু পূর্বেই আফগানরা বাংলার সুলতানদের অধীনে চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। জৌনপুরের শার্কি সুলতানদের মতো বাংলার সুলতানগণও বিভিন্ন বিভাগে আফগানদেরকে নিয়োগ করতেন। সুতরাং শেরশাহ যখন বাংলা অধিকার করেন, তখন আফগানেরা অচেনা বলে বিবেচিত হয়নি। ফলে তারা সিংহাসনে নিজেদের লোক দেখতে পান- প্রথমে বাংলা ও বিহারে এবং পরে ভারতীয় সাম্রাজ্যে।
শাসনকর্তাদের (গভর্নরস) অধীনে বাংলা (১৫৩৯-১৫৫৩) সাম্রাজ্য গড়ার কাজে বাংলার গুরুত্বকে যথার্থভাবে অনুধাবন করে শেরশাহ বাংলার প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের প্রতি মনোনিবেশ করেন। তিনি প্রতারণামূলক কার্যকলাপের জন্য প্রথম গভর্নর খিজির খানকে চাকরিচ্যুত করেন এবং চট্টগ্রামসহ বাংলাকে ছোট ছোট কয়েকটি ইউনিটে বিভক্ত করে প্রত্যেক ইউনিটকে এক একজন মুক্তার অধীনে ন্যস্ত করেন। তিনি সকল মুক্তার ওপর প্রধান তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজী ফজীলতকে নিয়োগ করেন। শেরশাহের পরিকল্পনা খুবই ফলপ্রসূ হয় এবং আফগানরা বাংলায় এমন স্থায়ীভাবে নিবাসিত হয়।
শেরশাহের পুত্র ও উত্তরাধিকারী ইসলাম শাহ (১৫৪৫-১৫৫৩) সমগ্র বাংলার উপর তার দৃঢ় শাসন প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু শাসন ব্যবস্থাকে আরও কেন্দ্রীভূত করার প্রচেষ্টায় তিনি কাজী ফজীলতকে পদচ্যুত করেন এবং সেখানে শাসনকর্তা হিসেবে তার আত্মীয় মুহম্মদ খান শূরকে ১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দে নিযুক্ত করেন। নতুন শাসনকর্তা, (১৫৪৬-১৫৪৮) খ্রিস্টাব্দে সুলায়মান খান ওরফে কালিদাস গজদানী নামক এক বিদ্রোহীকে কঠোরভাবে দমন করার পদক্ষেপ নিয়ে তার পদমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হন। পরবর্তী সময়ে যখন অযোগ্য আদিল শাহ ইসলা
অতপর বখতিয়ার তিববত অভিযানে বের হন। তিববত অভিমুখে রওনা হওয়ার পূর্বে বিজিত অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে তার অনুপস্থিতিকালের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থাদি গ্রহণ করেন। উড়িষ্যা (জাজনগর) থেকে সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তিনি মুহম্মদ শিরাণ খলজীকে সীমান্ত এলাকা প্রহরার জন্য একদল সৈন্য সহ বীরভূম জেলার লখনৌতির অভিমুখে প্রেরণ করেন। ত্রিহুত ও অযোধ্যার দিক থেকে আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তিনি ইওজ খলজীকে পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্ব দেন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রংপুরের উপকণ্ঠে তিনি আলী মর্দান খলজীকে মোতায়েন করেন। অবশ্য এ তিববত অভিযানে বখতিয়ারের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। ব্যর্থ অভিযান শেষে চরম হতাশাগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত অবস্থায় দেবকোটএ ফিরে এসে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন অথবা আলী মর্দান খলজী কর্তৃক নিহত হন।
সমসাময়িক ও আধুনিক তথ্যাদির ভিত্তিতে বখতিয়ারের অধিকৃত রাজ্যের ভৌগোলিক পরিসীমা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা করা যায়। অযোধ্যার মির্জাপুর জেলায় অবস্থিত তাঁর মূল জায়গির ছাড়াও দক্ষিণ বিহার এবং উত্তর বিহারে গঙ্গা নদীর উত্তর তীরবর্তী ভূখন্ড তাঁর রাজ্যভুক্ত ছিল। বাংলা অঞ্চলে রাজমহল, মালদহ, দিনাজপুর, রাজশাহী ও রংপুর জেলাগুলি তাঁর রাজ্যভুক্ত ছিল। তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র-করতোয়া নদী লখনৌতি রাজ্যের পূর্ব সীমানা নির্দেশ করে।
প্রাথমিক যুগ (১২০৬-১২২৭) আকস্মিক মৃত্যুর কারণে বখতিয়ার তার উত্তরাধিকারী নিয়োগ করে যেতে পারেন নি। ফলে তাঁর মৃত্যুর পর আলী মর্দান, হুসামউদ্দীন ইওজ ও মুহম্মদ শিরাণ খলজী সিংহাসন দখলের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন।
১২০৬ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ারের মৃত্যুর পর থেকে ১২২৭ খ্রিস্টাব্দে ইওজ খলজীর মৃত্যু পর্যন্ত সময়কে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনাপর্ব বলে অভিহিত করা যায়। বখতিয়ারের মৃত্যু এতই আকস্মিক ছিল যে, তিনি এ সময়ে উত্তরাধিকারের প্রশ্নে কোনো মনোযোগই দিতে পারেননি। ফলে আলী মর্দান, হুসামউদ্দীন ইওয়াজ এবং মুহম্মদ শীরন সিংহাসনের জন্য নিজেরাই কলহে লিপ্ত হয়ে পড়েন। এ পর্যায়ে প্রথম ছয় বছর বখতিয়ারের সেনাপতিদের মধ্যে উত্তরাধিকার যুদ্ধ চলে। ১২১২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পর্যন্ত ছিল ইওয়াজ খলজীর শাসনকাল।