সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর প্রভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের ঘটনাও দিনদিন বাড়ছে। তারই অংশ হিসাবে বাংলাদেশেও প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে দুর্যোগের তীব্রতা। এ দেশের মানুষ প্রতিনিয়ত বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, নদীভাঙ্গন, শৈত্যপ্রবাহ-সহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করছে।
এছাড়াও এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রকৃতিতে মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, নদীশাসন, বৃক্ষনিধন প্রভৃতি মানবসৃষ্ট কারণেও দেশে দুর্যোগের তীব্রতা বেড়েছে কয়েক গুণ। জার্মান ওয়াচের বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকির ২০২৪ সালের সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম। একটি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সবচেয়ে বড়ো বাধা এই দুর্যোগ। একটি মাত্র দুর্যোগ দেশকে কয়েক দশক পিছিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই দেশের উন্নয়নের চাকাকে সচল রাখতে প্রয়োজন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগকে বাধা দেওয়া বা বন্ধ করা যায় না, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি এবং তীব্রতা প্রশমন করা যায় মাত্র। তাই দেশের চলমান গতি ঠিক রাখার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্মের সূচনালগ্ন থেকেই দুর্যোগ মোকাবিলায় নেওয়া হয়েছে নানান পদক্ষেপ। ১৯৭২ সালে গঠিত হয়েছে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়। যা ক্রমেই রূপান্তরিত হয়ে ২০১২ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় হিসাবে পুনর্গঠিত হয়। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ‘জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ অনুযায়ী দুর্যোগ মোকাবিলায় পাঁচটি ধাপ বা স্তর রয়েছে। ধাপগুলোর মধ্যে রয়েছে, সঠিকভাবে বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসকরণ, জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সঠিক আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ, কোনো আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেতে জীবন ও সম্পদের রক্ষায় আগাম সতর্কবার্তা নিশ্চিতকরণ, দুর্যোগকালীন অবস্থায় জরুরি সাড়াদান এবং সবশেষে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ।
বাংলাদেশ সরকার দুর্যোগ মোকাবিলার সকল কার্যক্রম এবং ধাপকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে ২০১২ সালে একটি আইন প্রণয়ন করে, যা ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২’ নামে পরিচিত। এই আইনের বলে দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস-সহ জরুরি মানবিক সহায়তা, পুনরুদ্ধার এবং পুনর্বাসন কর্মসূচি পরিচালনার নিমিত্তে ২০১২ সালের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠা করা হয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। এই অধিদপ্তরের মূল উদ্দেশ্য হলো দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন দুর্যোগের বিপদাপন্নতা হ্রাস করা, বিশেষভাবে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য কার্যকর মানবিক সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং জরুরি সাড়াদানের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, আধাসরকারি এবং দাতা সংস্থাসমূহ কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।
এই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২ অনুযায়ী গঠন করা হয়েছে ‘জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট’ নামে একটি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান, যা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব-সহ নানা ধরনের দুর্যোগ প্রশমনের ব্যাপারে গবেষণা করে। যে-কোনো দুর্যোগ দ্রুত মোকাবিলা করতে গড়ে তোলা হয়েছে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় গ্রুপ। পাশাপাশি, সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে রয়েছে ৪১ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতীয় পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল’।
এছাড়াও ১৯৭২ সাল থেকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় রয়েছে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি প্রোগাম। এই প্রোগ্রাম ঘূর্ণিঝড়ের প্রাথমিক সতর্কতা, আশ্রয়, প্রাথমিক চিকিৎসা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং পুনর্বাসন ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত আইন, নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের জন্য এসব দপ্তর-সংস্থা যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যেমন, জরুরি মানবিক সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম-সংক্রান্ত নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সংশ্লিষ্ট সকল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ডাটাবেস প্রস্তুত ও সংরক্ষণ, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ প্রদান, আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে সমন্বয় রক্ষা, ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ প্রভৃতি।
এছাড়াও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হ্রাসকল্পে সরকারের রয়েছে বেশ কিছু বিশেষ প্রজেক্ট। যেমন, গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা), গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টেস্ট রিলিফ), দুঃস্থদের খাদ্য সহায়তা (ভিজিএফ), জিআর (খাদ্য), নগদ অর্থ সহায়তা (জিআর), শীত বস্ত্র সহায়তা, অতি দরিদ্রদের ঝুঁকিহ্রাসকল্পে বছরের বিভিন্ন সময়ে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) প্রভৃতি।
দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা প্রচারে জেলা তথ্য অফিসসমূহ, রেডিও ও টেলিভিশন কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। পাশাপাশি সার্বক্ষণিক, দ্রুত ও অধিকতর কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে দুর্যোগ-সংক্রান্ত যে-কোনো তথ্য ও সহযোগিতার জন্য টোল ফ্রি ১০৯০ নম্বর চালু করা হয়েছে। এছাড়াও, বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৩২টি কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা প্রচার করা হচ্ছে৷ স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য রয়েছে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। দেশের ৬৪টি জেলায় নির্মাণ করা হয়েছে জেলা ত্রাণ গুদাম এবং জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তথ্য কেন্দ্র।
সম্মিলিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলার জন্যও রয়েছে কিছু স্বতন্ত্র ব্যবস্থা। যেমন, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রায় ২৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলমান। পাশাপাশি ভূমিকম্পসহ বড়ো ধরনের দুর্যোগ-পরবর্তী অনুসন্ধান, উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বিতভাবে মোকাবিলার লক্ষ্যে ওয়ান স্টপ সেন্টার হিসাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ন্যাশনাল ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার। এছাড়া বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে ও পূর্বাভাস প্রদানের নিমিত্তে ‘হাওরঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’ এবং ‘বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে দেশব্যাপী বজ্রনিরোধক কাঠামো স্থাপন’ শীর্ষক দুটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগকবলিত মানুষকে উদ্ধার করার জন্য ৬০টি বিশেষ ধরনের নৌকা তৈরি ও হস্তান্তর কার্যক্রম চলমান। দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্র ৩২৭টি, স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্র ১৪১১টি, গণপূর্ত অধিদপ্তর কর্তৃক নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্র ৫টি এবং অন্যান্য সংস্থা কর্তৃক নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্র ৩২০৬টি।
যদিও দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার নানাবিধ পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তবু দুর্যোগ প্রশমন এবং দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের ক্ষেত্রে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। শুধু আইনের প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব পালনও দুর্যোগ প্রশমনে বড়ো ভূমিকা পালন করে। অপরিকল্পিত স্থাপনা, বিল্ডিং কোড না মানা, পরিবেশ দূষণ, অপরিকল্পিত বৃক্ষনিধন ও বন উজাড়, জলাধার ভরাট, পাহাড় কাটা, অনিয়ন্ত্রিত যান্ত্রিকতা সবই দিনে দিনে দুর্যোগের প্রবণতাকে বাড়িয়ে তুলছে কয়েক গুণ। একজন সুনাগরিকের দায়িত্ব হলো, এসব কাজ থেকে নিজে বিরত থাকা, অন্যকে বিরত রাখা। পাশাপাশি ব্যক্তি ও সামাজিক উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা ক্যাম্পেইন, পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার প্রভৃতি কার্যক্রম দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। এছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় তরুণদের উদ্যোগে গঠিত হতে পারে স্থানীয় যুব উন্নয়ন সমিতি, যা স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। সর্বোপরি সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে দুর্যোগের ক্ষতি থেকে দেশকে ও নিজেকে রক্ষা করতে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগকে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা সম্ভব। তাই জনগণের জানমাল রক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সঠিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজন কার্যকর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারের সঠিক পদক্ষেপ এবং জনসচেতনার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হবে টেকসই ও উন্নত বাংলাদেশ।
২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আবহাওয়া চরম অবস্থায় পৌছাবে। এরপর ২১০০ সালের মধ্যে এ পরিস্থিতি চরম থেকে চরমতম হয়ে পড়বে। এ সময়কালে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে দুর্যোগ আশংকা অনেক গুণ বেড়ে যাবে। আবহাওয়ার উপাদানসমূহ যেমন তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বন্যা, খরা, নদীভাঙ্গন, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রেপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ইত্যাদি অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌছাবে। জলবায়ু পরির্বতন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্যানেল (আইপিসিসি) এবং বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনার রির্পোটে এমনি আশংকার কথা বলা হয়েছে। এই আশংকার প্রেক্ষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক রির্পোটে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৭ম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। একই সাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বৈশ্বিক ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন নবম। এমনি একটি কঠিনতম ভবিষ্যত বাস্তবতায় দুর্যোগ মোকাবেলায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে না পারলে বাংলাদেশের কোন উন্নয়ন পরিকল্পনাই টিকে থাকবে না, অভিমত বিশেষজ্ঞ মহলের।
সূত্র বলছে, একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি অন্য দিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, সাথে আবার যুক্ত হয়েছে অপ-উন্নয়নের ঝুঁকি। এই ৩ ঝুুঁকির যাঁতাকলে বাংলাদেশের আগামীর ভবিষ্যত খুবই সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌছেছে। এমনি ঝুঁকির বাস্তবতায় উপকূলের ৭২০ কিলোমিটারের দীর্ঘ উপকূলরেখার ৩ কোটি মানুষ কার্যত অরক্ষিত রয়েছে।
আইপিসিসি রির্পোটের বরাত দিয়ে সূত্রটি জানায়, বাংলাদেশ ব-দ্বীপের জটিল ভৌগলিক অবস্থানের জন্য সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আইপিপিসির রিপোর্ট অনুযায়ী ২১০০ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা ১ মিটার বা ৩ ফুটেরও বেশী পরিমাণ পর্যন্ত বাড়বে। চরম পরিস্থিতিতে ২০৫০ হতে ২১০০ সালের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যভাগ ও পশ্চিমভাগের বন্যার পরিমাণ ৫-৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে ঘূর্ণিঝড়ের সাথে সাথে প্রতি বছর বন্যাকেও মোকাবেলা করতে হবে।
জানা যায়, দুর্যোগের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হলেও সে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কার্যত নাস্তানাবুদ অবস্থায়ই রয়েছে। বিশ্বের সার্বিক ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশ্বে নবম, জলবায়ুর ঝুঁকি বিবেচনায় সপ্তম এবং দুর্যোগে বাস্তুচূতির ঝুঁকি বিবেচনায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে। এই ঝুঁকিগুলিকে সমন্বিতভাবে মোকাবেলা করার ব্যকরণ ভিত্তিক নীতিমালা, আইন ও বিধিবিধান বাংলাদেশে কমতি নেই। এছাড়াও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রটোকলের আওতায়ও বাংলাদেশ বেশ কিছু ফর্মুলা ফলো করে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় হতে তৃনমুল পর্যন্ত নানা ধরণের কমিটি রয়েছে। এত কিছুর পরও বাংলাদেশ দুর্যোগের ঝুঁকিকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে পারছে না। যার কারণে প্রতি বছর প্রায় ৬৩ লক্ষ মানুষ নানা ধরণের দুর্যোগে আক্রান্ত হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, দুর্যোগে বাংলাদেশে গড়ে প্রতিবছর প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে যা বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো চর্চার মাধ্যমে এক্ষেত্রে প্রশমনমুলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় তাহলে এ ক্ষতি ২০২৫ সাল নাগাদ জিডিপির ৯ শতাংশে পৌছাতে পারে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বাংলাদেশে বহুমাত্রিক দুর্যোগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের বিপদাপন্নতা থেকে বাঁচার উপায় প্রসংগে বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়ায় কার্যকর ও টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরী করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের নানাবিধ বিধি বিধান রয়েছে যেমন- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন-২০১২। এছাড়াও বেশ কিছু নীতিমালা যেমন-দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০১৫, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা-২০১৬, ঝুঁকি হ্রাসে ‘সেন্দাই অবকাঠামো-২০১৬-৩০’, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী আদেশাবলী-২০১৯, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা-২০২৫-৩০ ইত্যাদি রয়েছে যার প্রতিটিতেই দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস করে সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলি প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায় সরকারের এত বিধি বিধান সত্ত্বেও এগুলি অনেকটা ‘কাগুজে বাঘ’ হিসেবেই রয়েছে। ফলশ্রুতিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ‘ত্রাণনির্ভর’ ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে। এতে ‘ঝুঁকি হ্রাস’ কর্মসূচী হিসেবে জনপ্রিয় হয়নি। জনপ্রিয় হয়েছে ‘ত্রাণনির্ভর’ কার্যক্রম হিসেবে। তিনি বলেন এ অবস্থা থেকে আমাদের বের হতে হবে। তার মতে এ কথা সত্যি যে, বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ‘রোল মডেল’। কিন্তু কার্যকর অর্থে এক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সীমাবদ্ধতাগুলো উতরাতে পারলে দুর্যোগের ঝুকি অনেক হ্রাস পেতে পারে।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ড. আনজুম তাসনুভা বলেন, আমাদের অনেকগুলো নীতিমালা, বিধি বিধান এবং আইন রয়েছে। কিন্তু সেগুলি কেন জানি মিসিং মনে হয়। বাস্তবায়ন পর্যায়ে আমরা সেগুলিকে পাই না। আসলে যাদের এগুলি বাস্তবায়ন করার কথা তারা দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখেন না। এখানে একটি বড় গ্যাপ রয়েছে। আমাদের গ্যাপটি কি তা’ বের করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা মিটিগেশন নিয়ে বড্ড হৈচৈ করি। আশ্রয়কেন্দ্র, উপকূলীয় বাঁধ ইত্যাদিসহ অন্যান্য হার্ডওয়্যার ভিত্তিক অবকাঠামোই যে একমাত্র দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নয়- এটি আমরা ঝুঝতে চাই না। তার মতে, প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনা ফেজে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, পরিকল্পনার চক্রটিকে ঠিকঠাক মত অনুসরণ করা গেলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় টেকসই কাঠামো তৈরী হবে। কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতের প্রশ্নে তিনি সমন্বয়কে দুর্যোগ কর্মকান্ডের অন্যতম প্রধান দিক উল্লেখ করে বলেন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় তথ্য এবং ডেটার সহজলভ্যতা তৈরী করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের আশংকা সামনের দিনগুলিতে আরও বিধ্বংসী দুর্যোগ আঘাত হানতে পারে বাংলাদেশে। সে জন্য যে প্রস্তুতি এবং ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা দরকার তা’ বাংলাদেশের এখনো নেই। তারা বলছেন, একটি দুর্যোগ বাংলাদেশকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিতে পারে। যেমন আইলা ও সিডর অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। সিডরে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল ১ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সাইক্লোন আমফানে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর আইলায় অথনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল ২৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রতি দুর্যোগে এত বিপুল পরিমাণ ক্ষতি বাংলাদেশের অর্ধনীতিকে এগুতে দিচ্ছে না। তাই বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা না গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে এ ক্ষতি দাঁড়াবে বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৯ শতাংশ। তাদের মতে, এমনি বাস্তবতায় বৈশ্বিক দুর্যোগ মাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে আমাদের ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’কে অনেক বেশী গুরুত্ব দিতে হবে। জাতিসংঘের ‘হুগো ফ্রেমওয়ার্ক অব এ্যাকশন’ কে অনুসরণ করতে হবে। একটি দুর্যোগ সাধারণত কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, পরিবেশ, ব্যবসা-বিনিয়োগ, শিক্ষা ইত্যাদি নানা সেক্টরে সরাসরি আঘাত করে। যেহেতু ভৌগলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঘেড়াটোপে আকন্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে সেহেতু এ ক্ষেত্রে পরিত্রাণের একটিই উপায় অভিযোজনের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়ানো এবং ঝুঁকি কমানো। এই কাজটি করতে হবে ব্যক্তি পর্যায়ে, সমাজ পর্যায়ে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সকল ক্ষেত্রেই- অভিমত বিশেষজ্ঞ মহলের। তাদের মতে, টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ত্রাণ নির্ভরতাকে বাদ দিতে হবে। এর বদলে দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এক্ষেত্রে ‘সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক অব ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন’ অনুযায়ী দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমনে টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা যেতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ মহল।জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এর জন্য বাংলাদেশ দায়ী না হলেও এর বিরূপ প্রভাবে দেশের খাদ্য, কৃষি, স্বাস্থ্যসহ নানাবিধ ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বর্তমান বিশ্বে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন একটি নৈমিত্তিক ঘটনা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। অতিমাত্রায় গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়সহ ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হচ্ছে কৃষি, যা এ দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ শ্রমশক্তি এ খাতে নিয়োজিত। এ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তাসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা এখনো কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। বিবিএস ২০১৪-১৫-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটির সঙ্গে প্রতি বছর ২০ লাখ জনসংখ্যা যোগ হচ্ছে। ২০৪৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে হবে প্রায় ২২ দশমিক ৫ কোটি। এ বাড়তি জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্য উৎপাদন এবং ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ আবশ্যক। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে সামগ্রিকভাবে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে; যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের কৃষি তথা সার্বিক জীবনযাত্রার ওপর।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শস্যের গুণাগুণ ও উৎপাদনেও পরিবর্তন আসবে। বর্তমান চাষযোগ্য এলাকায় উৎপাদন হ্রাস পাবে। পানির স্বল্পতা বৃদ্ধি পাবে, হ্রাস পাবে মাটির উর্বরতা। একই সঙ্গে নতুন নতুন রোগবালাই দেখা দিতে পারে। ফলে কৃষিতে কীটনাশক ও সারের প্রয়োগ বৃদ্ধি পাবে। কৃষিজমিতে সেচের ব্যাপকতা বাড়বে, বাড়বে ভূমিক্ষয়। কমে যাবে জীববৈচিত্র্য। রাসায়নিকের ব্যাপক ব্যবহার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। দরিদ্রতা বাড়বে এবং সমাজে এর প্রতিকূল প্রভাব দেখা দেবে। এ কারণে ২১ শতকে সার্বিকভাবে কৃষির উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে। ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ধান ও গমের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাবে, শুধু তাই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সমুদ্র উপকূলে নদী ভাঙন বাড়বে, বাড়বে লবণাক্ততার পরিমাণ। সমুদ্র উপকূলে বসবাসকারীদের মধ্যে উদ্বাস্তুর হার বাড়বে, বাড়বে রোগব্যাধি এবং অপুষ্টিজনিত সমস্যা। কাজেই জলাবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়বে দেশের কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বহুলাংশে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জোগান দিয়ে থাকে কৃষি। কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, বীজ, গজানো, পরাগায়ন, ফুল ও ফল ধরা, পরিপক্বতা হতে সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আদ্রতা, বৃষ্টিপাত ও সূর্যালোক প্রয়োজন। জলবায়ুর এ উপাদানগুলো পরিবর্তিত হয়েছে কিন্তু বীজ বপন ও চারা রোপণের সময় পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। ফলে কৃষি মৌসুমের সঙ্গে ফসলের চাষাবাদে খাপ খাওয়ানো যাচ্ছে না। গড় তাপমাত্রা বাড়ার কারণে গম, ছোলা, মসুর, মুগডালসহ কিছু ধানের উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষকরাও কৃষি থেকে অনেকাংশে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কাজেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষিকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হলে কৃষি খাতে, শস্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে হবে।
মনে রাখা দরকার, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। তাই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কম বেশি ঝুঁকিতে দেশের সব মানুষ। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের জন্য যেখানে ছিল যথাযোগ্য তাপমাত্রা, ছিল ছয়টি আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ঋতু, সেখানে দিন দিন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতু হারিয়ে যেতে বসেছে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা সবকিছুতে আমূল পরিবর্তন আসছে। ফলে অনিয়মিত, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত; সেচের পানির অপর্যাপ্ততা; উপকূলীয় অঞ্চলে বর্ষা মৌসুম ছাড়াও বিভিন্ন সময় উপকূলীয় বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে লবণাক্ত পানিতে জমি ডুবে যাওয়া এবং শুষ্ক মৌসুমে মাটির নিচের লবণাক্ত পানি ওপরের দিকে বা পাশের দিকে প্রবাহিত হওয়ার মতো নানাবিধ সমস্যায় বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চিত এবং রীতিমতো হুমকির মুখে।
অসময়ে বৃষ্টিপাত কিংবা বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিভিন্ন রকম ফসল। বর্ষার মাঝামাঝি বন্যা এ দেশে স্বাভাবিক বিধায় এই সময়টুকু মাথায় রেখেই কৃষকরা চাষাবাদ করেন। কিন্তু দেশের উত্তর-পূর্বাংশে, নিকটবর্তী পাহাড়ি ঢলে সৃষ্টি হওয়া অনিয়মিত বন্যা ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। জুন-জুলাইয়ে বৃষ্টিপাতের মাত্রা বেড়ে গেলে হাওর অঞ্চলে শস্যের তেমন ক্ষতিসাধন না করলেও পাট, আখ ও অন্যান্য নিচু জমির ফসল নষ্ট করে। এ রকম বৃষ্টি আমনের বীজতলাও নষ্ট করে দেয়।
জলবায়ুর বিরূপ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিশেষ করে বিভিন্ন অভিযোজন কলাকৌশল রপ্ত করতে হবে; যাতে করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কৃষিকে মুক্ত রাখা বা ঝুঁকি কমানো যায়। এ ছাড়া দুর্যোগমুক্ত সময়ে শস্য বহুমুখীকরণ ও ফসলের নিবিড়তা বাড়িয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়। দেশের খাদ্য ও কৃষিব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন ও দুর্যোগ ঝুঁঁকি হ্রাস কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য, উপাত্ত এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন উপযোগী কলাকৌশল ও সার্বিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিগত ১০০ বছরে এ দেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ৫৮টি প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়। ৫০ বছরে হয়েছে ৫৩টি বন্যা, তার মধ্যে ছয়টি ছিল মহাপ্লাবন। ১৫৩ বছরে হয়েছে ২০টি বড় ধরনের ভূমিকম্প। ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এ দেশে ছোট ও বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও কালবৈশাখীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৭টি। তার মধ্যে ১৫টি ছিল ভয়াবহ। এতে সম্পদের ক্ষতি হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা (বিএমডি, ২০০৭)।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি জলবায়ুর ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক অবস্থাকে অস্বাভাবিক ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষির ওপর। কেননা, কোনো একটি নির্দিষ্ট শস্যের বেড়ে ওঠার জন্য একটি পরিমিত মানের জলবায়ুর তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আদ্রতা, বায়ুপ্রবাহ প্রভৃতি উপাদানগুলোর প্রয়োজন হয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ইতোমধ্যেই বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২১০০ সাল নাগাদ সাগরপৃষ্ঠ সর্বোচ্চ ১ মিটার উঁটু হতে পারে, যার ফলে বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হতে পারে।
বৈরী জলবায়ু তা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মতো ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন ও আবাদ বাড়াতে হবে; নতুন শস্য পর্যায় ও অভিযোজন কৌশলের ওপর ব্যাপক গবেষণা জোরদার করতে হবে; অভিযোজন কৌশল ও নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে কৃষিজীবী, কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি গবেষকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে; পরিবেশবান্ধব সমন্বিত ফার্মিং সিস্টেমের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে হবে; নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে ড্রেজিং কার্যক্রম জোরদার করতে হবে, যা সরকার ইতোমধ্যেই শুরু করেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে সবুজবেষ্টনী গড়ে তোলার কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; পরিবেশের জন্য হুমকি হয় এমন কর্মকান্ড পরিহার করতে হবে।