সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: বাংলাদেশে বন্যা, খরা, ঝড় ও তাপপ্রবাহসহ চরম আবহাওয়া সংক্রান্ত ঘটনাগুলোর কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়ে থাকে। দেশের ৬৩ লাখের বেশি মানুষের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ‘দ্য ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৫’-এর প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। জার্মানওয়াচ বুধবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৯৯ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি।
বাংলাদেশ ঝুঁকি প্রতিরোধ ও অভিযোজনমূলক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে গত ৪০ বছরে ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ গুণের বেশি হ্রাস পেয়েছে। ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যা ২০০৭ সালে কমে দাঁড়ায় ৪,২৩৪ জনে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ভয়াবহ তাপপ্রবাহ ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে আঘাত হানে, যেখানে পাকিস্তানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৪৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এতে ৯০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।
১৯৯৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ৯,৪০০-এর বেশি চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রায় ৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং মোট ৪.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন, ভারত এবং ফিলিপাইন চরম আবহাওয়ার শিকার হলেও তবে এক্ষেত্রে ডমিনিকা, হন্ডুরাস, মিয়ানমার এবং ভানুয়াতু সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর শিকার হয়েছে।
গত ৩০ বছরে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে তিনটি ইউরোপীয় দেশ রয়েছে। দেশ তিনটি হলো- ইতালি, স্পেন এবং গ্রিস।
বন্যা, খরা, ঝড় ও তাপপ্রবাহের সংখ্যা এবং তীব্রতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিশ্বের কিছু অঞ্চলে এটি ‘নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতি’ হয়ে উঠছে।
জার্মানওয়াচ প্রকাশিত ‘দ্য ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩০ বছরে গ্লোবাল সাউথের চরম আবহাওয়া সংক্রান্ত ঘটনার প্রভাব সবচেয়ে বেশি মোকাবেলা করেছে।
প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে দেখা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চরম আবহাওয়া কীভাবে বিভিন্ন দেশকে প্রভাবিত করছে এবং এতে অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষতির ভিত্তিতে দেশগুলোর র্যাংকিং প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশটি শীর্ষে রয়েছে।
জার্মানওয়াচের আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতির প্রধান লরা শ্যাফার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘জলবায়ু সংকট এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে উঠেছে এবং এটি মোকাবেলায় সাহসী বহুপাক্ষিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। সপ্তাহান্তে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে নেতারা যখন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করবেন, তখন তারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি উপেক্ষা করতে পারবেন না।’
তিনি আরও বলেন, গত তিন দশকের পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো চরম আবহাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদি এসব দেশের তথ্য গ্লোবাল নর্থের অনেক দেশের মতো ব্যাপক হতো, তাহলে অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষতির আরও ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পেত। এক্ষেত্রে আমরা এমন এক সংকটময় এবং অনিশ্চিত পর্যায়ে প্রবেশ করছি, যা ভবিষ্যতে সংঘাত আরও বাড়াবে, সমাজকে অস্থিতিশীল করবে এবং বিশ্বব্যাপী মানব নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
এই তো কিছুদিন আগের ঘটনা। টানা বর্ষণে তলিয়ে গেল বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। অনেক জায়গায় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। টানা দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার কারণে মোবাইল টাওয়ারে সমস্যা হওয়ায় ফোনের নেটওয়ার্কও ঠিকমতো কাজ করছিল না। দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়া প্লাবিত হলো। বন্যায় ডুবে গেল বান্দরবান। উপদ্রুত এলাকার অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ত্রাণকার্যও যথাযথভাবে পরিচালনা করার সুযোগ ছিল না। তার চেয়েও ভয়াবহ খবর এসেছিল গণমাধ্যমে, যা মানুষের মনে ভীষণ ধাক্কা দিয়েছে। বন্যায় মারা যাওয়া লাশগুলো দাফন করার উপায় ছিল না। যেদিকেই চোখ যায়, সেদিকেই পানি! লাশ দাফন করতে মাটি প্রয়োজন। সে মাটি তখন পানির নিচে। বছরখানেক আগে এর চেয়েও ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা হয়েছিল সিলেটবাসীর। বাংলাদেশে নিয়মিত এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই আছে। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। যারা বেঁচে আছেন তারা বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের ঘরবাড়ি, বসতভিটা সব ভেসে গেছে। চরম দারিদ্র্য নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে দিন গুজরান করছেন তারা। তাছাড়া দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এসব রোগেও প্রাণ হারাচ্ছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ। এতে মানবসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে বাংলাদেশ প্রচুর পরিমাণে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘কি হাইলাইটস: কান্ট্রি ক্লাইমেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ফর বাংলাদেশ’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্যানুসারে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি ডলার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ভয়াবহ বন্যার সময় বাংলাদেশের জিডিপি ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে। তবে এগুলো কেবল সূচনামাত্র। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি রোধে পর্যাপ্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারলে, যতই দিন যাবে, বাংলাদেশ আরো ভয়াবহ সব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হবে। ফলে একদিকে যেমন মোট ভূখণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তলিয়ে যাবে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি বয়ে বেড়াতে হবে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির অভাব, কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে এ দেশের ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। আর এসব সংকটের সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হবে নারীরা। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অত্যধিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা। প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। আবহাওয়ার এমন পরিবর্তনের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সব কিছুর পেছনে মূল কারণ হলো জলবায়ুর পরিবর্তন। এর নেতিবাচক প্রভাব ঠেকাতে বাংলাদেশকে যথাযথ পরিকল্পনা ও কৌশল অনুসারে কাজ করতে হবে। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, বাংলাদেশ এমন একটি কারণে ভুগছে, এমন একটি বিষয় নিয়ে তাকে মাথা ঘামাতে হচ্ছে, যেটির জন্য তার দায় খুবই সামান্য। অন্যের দায়ভার কাঁধে নিয়ে ধুঁকতে হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী হয়ে ওঠার লড়াইয়ে থাকা দেশটিকে।
বাংলাদেশের বার্ষিক মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ দশমিক ৫ টন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ পরিমাণ ১৫ দশমিক ২ টন। বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ বেশি। সারা বিশ্বে যত কার্বন নিঃসরণ হয়, তার মাত্র দশমিক ৫৬ শতাংশের জন্য দায়ী বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনে এত নগণ্য ভূমিকা রাখলেও এর বিরূপ প্রভাবের কারণে অনেক বড় ঝুঁকিতে রয়েছে দেশটি। জার্মানওয়াচের গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স (সিআরআই) ২০২১ অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় সপ্তম অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। জার্মানওয়াচের তথ্যানুসারে, ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ১৮৫টি মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংঘটিত এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩৭২ কোটি ডলার।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের সংকট নিয়ে ‘দ্য ক্লাইমেট রিয়ালিটি প্রজেক্ট’-এ ২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রতিবেদনটিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের ঝুঁকি ও আর্থিক ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করব।
বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের তিন ভাগের দুই ভাগই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫ ফুটের কম উচ্চতায় অবস্থিত। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বাড়ছে। এ দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী উপকূলীয় অঞ্চলে বাস করে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রতি সাতজনের একজন বাস্তুচ্যুত হবে। এ সময়ের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৯ দশমিক ৬ ইঞ্চি (৫০ সেন্টিমিটার) বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশ ১১ শতাংশ ভূখণ্ড হারাবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। কেবল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণেই ২০৫০ সালের মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ তাদের বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হবে বলে প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। সময় যত গড়াবে, পরিস্থিতি তত ভয়াবহ হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’-এর বরাতে ‘দি ক্লাইমেট রিয়ালিটি প্রজেক্ট’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কয়েকজন বিজ্ঞানী পূর্বাভাস দিয়েছেন যে ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পাঁচ-ছয় ফুট বাড়বে। এর ফলে পাঁচ কোটি মানুষ গৃহহীন হবে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার আরো অনেক সমস্যা আছে। এর ফলে সমুদ্রের নোনা পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ে। পরিণতিতে জমিগুলো তাদের উৎপাদন ক্ষমতা হারায়। ‘বাংলাদেশ সয়েল রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট’-এর বরাতে প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত চার দশকে এ দেশের মাটিতে লবণাক্ততার পরিমাণ প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে। এভাবে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়তে থাকলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দেবে। এতে উপকূলীয় অঞ্চলের অন্তত এক কোটি লোক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে বাস্তুচ্যুত এ বিপুল জনগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে শহরে এসে অপরিকল্পিত বস্তি তৈরি করছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের শহরের বস্তিবাসীদের প্রায় ৫০ শতাংশ নদীভাঙনের ফলে সৃষ্ট বন্যায় গৃহহারা হয়ে বস্তিতে জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছেন। সেখানে তারা মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। সংগত কারণেই নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের আখড়া হয়ে উঠেছে বস্তিগুলো।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করা নিঃসন্দেহে বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ লক্ষ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান (বিসিসিএসএপি) ২০০৯, বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০, মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান ২০৩০ ইত্যাদির নাম উল্লেখযোগ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এড়াতে নেয়া এসব পদক্ষেপ যেন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকে সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোয় নিজের অবস্থান আরো বেশি শক্তিশালী করতে হবে। যেসব উন্নত দেশ অত্যধিক হারে কার্বন নিঃসরণ করে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে, তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক বৈঠকের আয়োজন করতে হবে। তাদের কর্মকাণ্ডের ফলে এ দেশ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরতে হবে এসব বৈঠকে। উন্নত দেশগুলোর অত্যধিক হারে কার্বন নিঃসরণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে তারা একটি নির্দিষ্ট হারে জরিমানা দিতে বাধ্য। সেই ফান্ড দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি এড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। বর্তমানে যে হারে ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে তা পর্যাপ্ত কিনা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে জরিমানার পূর্ণ হিস্যা বাংলাদেশ পাচ্ছে কিনা এবং তা যথাযথ খাতে ব্যয় করা হচ্ছে কিনা তাও খতিয়ে দেখতে হবে। সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এড়াতে একই সঙ্গে যুগোপযোগী স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অস্থায়ী কিংবা স্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশের এই বিপর্যয়কে বাংলাদেশ সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশনপ্ল্যান-এ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সত্যিই পড়ছে কী না, তার মানদন্ড বিবেচনা করা হয়েছে। কোথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশটি ক্ষতি মোকাবিলায় বা অভিযোজনের জন্য এরই মধ্যে কী ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে।
বাংলাদেশে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি একাধারে, হিমালয়ের বরফ গলার কারণে নদীর দিক পরিবর্তন, লবণাক্ততা সমস্যা, বন্যাসহ সব দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও অনেক বেশি। তাই উল্লিখিত মানদন্ডেই বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় শীর্ষে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর ২০১০-এ প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ। ১৯৯০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ১৯৩টি দেশের ওপর এই সমীক্ষা চালানো হয় । এই প্রতিষ্ঠানটি কর্তৃক প্রকাশিত ২০০৭ এবং ২০০৮ সালের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
প্রবাহমান ছয় ঋতুর কারণে বাংলাদেশকে ষড়ঋতুর দেশও বলা হয়ে থাকে। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে বর্ষা মৌসুম। এ সময় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, যা অনেক সময়ই বন্যায় ভাসিয়ে দেয়। এ ছাড়া মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের আগমুহূর্তে কিংবা বিদায়ের পরপরই স্থলভাগে ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো কিংবা সাগরে নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়, যার আঘাতে বাংলাদেশ প্রায় নিয়মিতই আক্রান্ত হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশের এই স্বাভাবিক চিত্রটি এখন অনেকখানি বদলে গেছে। বায়ুপ্রবাহ, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রস্তর সর্বদিক দিয়ে সংঘটিত এসব পরিবর্তন বাংলাদেশে জলবায়ুগত পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে।
এছাড়াও জলবায়ুর এই পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানিপ্রবাহ শুকনো মৌসুমে স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে না। ফলে নদীর পানির বিপুল চাপের কারণে সমুদ্রের লোনাপানি যতটুকু এলাকাজুড়ে আটকে থাকার কথা ততটুকু থাকে না। পানির প্রবাহ কম থাকার কারণে সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে লবণাক্ততা বেড়ে যায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল এলাকায়।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা দিন দিন আরো প্রকট হয়ে উঠবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যেই সুন্দরবনের সুন্দরীগাছে ব্যাপক মাত্রায় আগামরা রোগ দেখা দিয়েছে। অনেকে একে মানবসৃষ্ট কারণ উল্লেখ করতে চাইলেও গবেষকরা একে প্রাকৃতিক কারণ হিসেবেই শনাক্ত করেছেন। সুন্দরবনের অন্যান্য গাছও আগামরা ও পাতা কঙ্কালকরণ পোকার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে বাইনের বাগানও।
নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিত হলেও বিগত কয়েক বছরে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণে সেই পরিচিতি ম্লান হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। ১৯৬০ সালে বঙ্গীয় এলাকায় সর্বোচ্চ ৪২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ৩০ মে তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয় ৪৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, রাজশাহীতে। ১৯৯৫ সালে এসে নথিভুক্ত করা হয় ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০৯ সালের ২৬ এপ্রিল নথিভুক্ত করা হয় বিগত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস যশোরে।
এই পরিসংখ্যানে আপাতদৃষ্টিতে যদিও মনে হচ্ছে তাপমাত্রা কমছে, কিন্তু বস্তুত অতীতের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ছিল কম অথচ বর্তমানে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা অত্যধিক বেশি। কেননা, ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড-এর গবেষণায় দেখা যায়, শুধু ঢাকা শহরেই মে মাসের গড় তাপমাত্রা ১৯৯৫ সালের ওই মাসের তুলনায় বেড়েছে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস? নভেম্বর মাসে এই তাপমাত্রা ১৪ বছর আগের তুলনায় বেড়েছে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস? আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ৫০ বছরে দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ০.৫ শতাংশ। এমনকি ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের তাপমাত্রা গড়ে ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২১০০ সাল নাগাদ ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৃষ্টিপাত কমে যাচ্ছে দিন দিন, সময়মতো হচ্ছে না বন্যা। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের গড় বৃষ্টিপাত ছিল ২৩০০ মিলিমিটার, বরেন্দ্র এলাকায় গড় বৃষ্টিপাত হয়েছিল ১১৫০ মিলিমিটার। এ রকম স্বল্প বৃষ্টিপাত দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গিয়ে খরায় আক্রান্ত হবে বিপুলসংখ্যক মানুষ, যার মধ্যে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লোকই বেশি। এ রকম খরায় কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার ব্যাপারে বিভিন্ন উৎস থেকে আলাদা আলাদা উপাত্ত পাওয়া যায়। কারো মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ খরায় উদ্বাস্তু হবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ। বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস পেয়ে দেখা দিচ্ছে স্থায়ী মরুকরণ। রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকায় বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। যদিও এরমধ্যে মানবসৃষ্ট কারণ, বিশেষ করে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবও দায়ী। তবে অনাবৃষ্টির দরুন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া সুপেয় পানির অভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যাপক ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায়ও ভূগর্ভস্থ পানি কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশসহ সমুদ্রতীরের বেশকটি দেশে সামনের দিনে মিঠাপানির তীব্র সংকট দেখা দেবে। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এরমধ্যে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন এবং ভূমিধসের মাত্রা বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। আগে ১৫ কিংবা ২০ বছর পরপর বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে দু-তিন বছর পরপরই বড় ধরনের দুর্যোগ হানা দিচ্ছে? এমনকি ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্র্যাফ্ট-এর তালিকায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ১৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার আগে। জাতিসংঘের আন্তসরকার জলবায়ু পরির্বতন-সংক্রান্ত প্যানেলের পানিসম্পদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনে বলা এসব কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নানা রকম প্রাকৃতিক সম্পদ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে । অনেক প্রজাতিই হারিয়ে যেতে বসেছে। গাছ, মাছ, পাখি, ফুল, ফল সবকিছুতেই এই প্রভাব পড়ছে। ইউনেসকোর ‘জলবায়ুর পরিবর্তন ও বিশ্ব ঐতিহ্যের পাঠ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন কারণে সুন্দরবনের ৭৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে? এ কথা অনস্বীকার্য যে, এই বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাসে পরিবেশের ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনে মৎস্য খাতের ওপরও পড়ছে বড় প্রভাব। বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিক আচরণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেশের মৎস্যসম্পদের জন্য প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করে চলেছে প্রতিনিয়ত। মৌসুমি বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এবং অসময়ে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় মাছের প্রজননে নানাবিধ সমস্যা হচ্ছে, যেমন প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ায় এবং তাপমাত্রা বেশি থাকায় মাছ কৃত্রিম প্রজননে সাড়া না দেওয়ায় প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এজন্য ডিম শরীরে শোষিত হয়ে যাচ্ছে।
দেশের বিপুল পরিমাণ জীবজন্তু সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধিতে হারিয়ে যাবে বা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। সমুদ্রের লোনাজলের উচ্চতা বাড়লে খুলনার সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বিচরণোপযোগী বনভূমি কমে যাবে। এতে বাঘের শিকার কমে যাবে। ফলে স্বভাবতই বাঘের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। নদীতে বিচরণকারী শুশুক কমে যাবে। মায়া হরিণ চিরতরে হারিয়ে যাবে। চিত্রা হরিণও কমে যাবে। শঙ্খচূড় সাপ কমে যাবে। মাস্কড কিনফুট একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাবে। পলাশ ফিস ঈগলও নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তবে কীটপতঙ্গ, যেমন মশার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কীটপতঙ্গের সংখ্যা বৃদ্ধি মারাত্মক আকার ধারণ করবে।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের জন্য যেখানে ছিল যথাযোগ্য তাপমাত্রা ছিল ছয়টি আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ঋতু। সেখানে দিন দিন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতু হারিয়ে যেতে বসেছে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা সবকিছুতে আমূল পরিবর্তন আসছে। ফলে অনিয়মিত, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, সেচের পানির অপর্যাপ্ততা, উপকূলীয় অঞ্চলে বর্ষা মৌসুম ছাড়াও বিভিন্ন সময় উপকূলীয় বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে লবণাক্ত পানিতে জমি ডুবে যাওয়া এবং শুষ্ক মৌসুমে মাটির নিচের লবণাক্ত পানি ওপরের দিকে বা পাশের দিকে প্রবাহিত হওয়ার মতো নানাবিধ সমস্যায় বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ চরম হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশনির্ভর উপজীবীরা তাদের জীবিকা হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়বে। এতে দেশে বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করবে। যেমন মাছের উৎপাদন কমে গেলে স্বাদুপানির মৎস্যজীবী, সমুদ্রগামী জেলে, উপকূলীয় জেলে ও তাদের পরিবারগুলো জীবিকার উৎস হারাবে।
নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষ জলবায়ুর এই পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে। শ্বাসকষ্ট, হিটস্ট্রোক বা গরমজনিত মৃত্যু কিংবা তীব্র ঠান্ডাজনিত মৃত্যু ইত্যাদি এখন খুব সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূমন্ডলীয় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রভাবিত হবে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা। উপকূলীয় এলাকায় বর্ধিত হারে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। এসব আশ্রয়হীন উদ্বাস্তুরা আশ্রয় নিচ্ছে নিকটবর্তী বড় শহরগুলোয় কিংবা রাজধানী শহরে। ফলে বাড়ছে সেসব শহরের জনসংখ্যা। বাড়তি জনসংখ্যার চাপ সামলাতে সেসব শহর হিমশিম খাচ্ছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য আয়ের অতিরিক্ত উৎস তৈরি না হওয়ায় উদ্বাস্তু মানুষ বেছে নেয় নানা অপকর্মের পথ। সমাজে দেখা দিতে শুরু করে বিশৃঙ্খলা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে থাকে দিনের পর দিন। জাতীয় পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রয়োজনে বাংলাদেশকে প্রতি বছর বাজেটে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে হয়। ফলে সরকারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, খরা ইত্যাদি এ দেশে মানুষের নিত্যসঙ্গী। প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা, মৌসুমি ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটছে। বস্তুত ভৌগোলিক গঠন ও বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশে এ পর্যন্ত বিপুল প্রাণের ক্ষয়, ফসলের ক্ষতি, সম্পদহানি হয়েছে। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসে প্রায় কয়েক লাখ লোকের মৃত্যু হয়। ১৯৮৮ সালের বন্যায় প্রায় এক কোটি লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৭ সালে দেশে বন্যায় ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় সোয়া কোটি মানুষ। খেতের ফসল, বাড়িঘর, গবাদিপশু, গাছপালা সবই ধ্বংস হয়ে যায়। ভেঙে পড়ে দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে প্রাণ হারায় প্রায় দেড় লাখ মানুষ।
আসলে বাংলাদেশ হচ্ছে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প ও খরাপ্রবণ দেশ। ২০১৭ সালের বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকিসূচক অনুযায়ী, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান সারা বিশ্বে ষষ্ঠ। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩২০ কোটি ডলার বা ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০১৮ সালে বিশ্ব ঝুঁকি প্রতিবেদনে ১৭২ দেশের ভূমিকম্প, সুনামি, হারিকেন এবং বন্যার ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব দুর্যোগ মোকাবিলা করার মতো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সক্ষমতা আছে কি না, তা যাচাই করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিকে গবেষকরা এমন চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। উক্ত প্রতিবেদনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকির মধ্যে থাকা শীর্ষ ১৫ দেশের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ নবম স্থানে রয়েছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে কম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে কাতার।
ঝুঁকির এই সূচকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কার পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় সেই দেশ কতটুকু প্রস্তুত, সেটাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে হিসাব করা সেই দেশগুলোয় নির্মিত ভবনগুলোর পরিস্থিতি বা বিল্ডিং কোড, দারিদ্র্যসীমার মাত্রা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা। এ কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ হওয়া সত্ত্বেও অনেক দেশের নাম ঝুঁকির তালিকায় নেই। যেমন প্রতিনিয়ত ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা জাপান ও চিলি। এই দুই দেশের নাম শীর্ষ ২০ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের বাইরে রয়েছে।