সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের উপকূল বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ড। একদিকে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য আর অন্যদিকে দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির মিতালি। নির্মল এই ছবির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নীরব অভিশাপ। তার নাম লবণাক্ততা। সমুদ্রের নোনা জল আজ শুধু পানিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি মিশে গেছে এই অঞ্চলের মানুষের রক্ত-ঘাম আর প্রতিদিনের সংগ্রামে। সেই সংগ্রামের অগ্রভাগে রয়েছেন অদম্য নারীরা। জলবায়ু পরিবর্তন আর মানবসৃষ্ট সংকটকে সঙ্গী করে তারা কীভাবে টিকে থাকেন।
আশির দশকে চিংড়িকে ‘ব্লু গোল্ড’ বা ‘সোনালি সম্ভাবনার’ স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রণোদনা আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হাজার হাজার হেক্টর ধানক্ষেত রূপান্তরিত হয়েছিল চিংড়ির ঘেরে। রপ্তানি আয় বাড়ার এই লোভনীয় হাতছানিতে লবণাক্ত পানি সচেতনভাবে প্রবেশ করানো হয় মিঠা পানির অঞ্চলে। স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক চক্রের ছত্রছায়ায় কৃষকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই আগ্রাসন চলতে থাকে। যে জমিতে একসময় সোনার ধান ফলত, তা ধীরে ধীরে বন্ধ্যা হয়ে পড়ে। এর সামাজিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ক্ষমতা আর অর্থের জোরে কৃষকের জমি দখল হয় এবং একটি ভূমিহীন শ্রেণির জন্ম হয়। এই সামাজিক ভাঙনের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় শিকার হয় নারী ও শিশুরা। যে চিংড়িকে ভাবা হয়েছিল আশীর্বাদ, তা-ই যেন আজ উপকূলের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি অভিশাপের নাম। এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে নারীদের।
উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র অভাব। একটি ওয়াটার ট্যাংক হয়তো একটি গ্রামের পানির চাহিদা মেটাতে পারে, কিন্তু যখন পুরো একটি অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হয়ে যায়, তখন প্রয়োজন হয় সমন্বিত এবং বৃহৎ আকারের পরিকল্পনার। যার অভাবে সবচেয়ে সমস্যায় পড়তে হয় নারীদের। কারণ, এখানকার প্রায় সব পরিবারের খাবার পানি নারীদেরই সংগ্রহ করা লাগে।
উপকূলীয় নারীর জীবন এক অনন্ত সংগ্রামের নাম। দিনের বড় একটি সময় তাদের লবণাক্ত পানিতে নেমে কাজ করতে হয়, যা তাদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। লবণাক্ত পানির আগ্রাসন শুধু মাটির গভীরে নয়, নারীর শরীরের গভীরেও পৌঁছেছে। দীর্ঘক্ষণ নোনা পানিতে কাজ করার ফলে নারীদের মধ্যে চর্মরোগ, খোসপাঁচড়া এবং চুলকানি একটি সাধারণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এর চেয়েও ভয়াবহ হলো জরায়ুর সংক্রমণ। অপরিষ্কার ও লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে বহু নারী মাসিকের সময় জটিলতায় ভোগেন এবং জরায়ুর ইনফেকশনসহ দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত হন। সামাজিক লজ্জা এবং দারিদ্র্যের কারণে তারা সহজে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অপ্রতুলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে একটি নিরাময়যোগ্য রোগও দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই শারীরিক সংকট কেবল নারীদের একার নয়, এটি প্রভাব ফেলে পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও। অসুস্থ মায়েদের সন্তানেরা প্রায়শই অপুষ্টি আর নানা জটিলতা নিয়ে জন্মায়।
তবে উপকূলের এই নারীরা শুধু পরিস্থিতির শিকার হয়ে বসে থাকেননি। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কাজের সন্ধানে শহরে পাড়ি জমালে সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে নারীর ওপর, যা তাদের জীবন-সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তোলে। তারা এই লবণাক্ততাকে সঙ্গী করেই খুঁজে নিয়েছেন নতুন পথের দিশা। প্রতিকূলতাকে শক্তিতে রূপান্তর করে তারা হয়ে উঠেছেন একেকজন সফল উদ্যোক্তা। যে লবণাক্ততা তাদের ধান চাষ কেড়ে নিয়েছে, সেই নোনা জলেই তারা শুরু করেছেন কাঁকড়া চাষ। পরিবারের পুরুষ সদস্যের পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই নারীরা কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন। এর মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পরিবারের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ দেখাচ্ছে। ফাতেমার মতো নারীরাও এখন চিংড়ি ঘেরের কাজের পাশাপাশি বাড়ির উঠোনে ছোট খাঁচায় কাঁকড়া চাষ করছেন। এর পাশাপাশি গৃহস্থালির সার্বিক দায়িত্বও তারা সামলান। বাড়ির উঠোনে হাঁস-মুরগি পালন কিংবা গবাদিপশু চরানো তাদের দৈনন্দিন কাজের অংশ। এসব থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে সন্তানের পড়াশোনার খরচ বা পরিবারের ছোটখাটো চাহিদা মেটানো হয়। অনেকে আবার হস্তশিল্পের মতো সৃজনশীল কাজেও নিজেদের যুক্ত করেছেন।
তাদের এই সংগ্রাম কেবল বেঁচে থাকার জন্য নয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার লড়াই। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছেন কীভাবে লবণ-সহনশীল সবজির চাষ করতে হয়। বাড়ির পাশে ছোট্ট এক টুকরো জমিতে তারা পুঁইশাক, লাউ বা ঢেঁড়সের মতো সবজি ফলিয়ে পরিবারের পুষ্টির জোগান দেন।
উপকূলের এই হার না মানা নারীরা শুধু টিকে থাকার যোদ্ধা নন, তারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সম্মুখসারির পথিকৃৎ। তাদের জীবনগাথা কেবল বঞ্চনা আর কষ্টের নয় বরং সাহস আর ঘুরে দাঁড়ানোর এক জীবন্ত দলিল। বড় বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যখন জলবায়ু ন্যায্যতা নিয়ে আলোচনা হয়, তখন উপকূলের এই নারীরা তাদের দৈনন্দিন সংগ্রামের মাধ্যমে সেই ন্যায়ের বাস্তব রূপটি দেখিয়ে দেন। একেকটি নতুন দিন তাদের জন্য নিয়ে আসে একেকটি নতুন লড়াইয়ের আহ্বান। আর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা প্রমাণ করেনÑ জীবন যতই কঠিন হোক না কেন, সংগ্রামের মাধ্যমে জয়ী হওয়া সম্ভব। তাদের এই অদম্য মানসিকতা আর অভিযোজনের ক্ষমতা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য এক অশেষ অনুপ্রেরণার উৎস।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলীয় এলাকার মানুষদের প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে মোকাবেলা করতে হয় জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্ভোগ। বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত, তেমনি লোনাপানি কারণে বিভিন্ন রকমের বাধার মুখে পড়ছে তাঁদের জীবন ও জীবিকা। সাতক্ষীরা অঞ্চলের জীবনযাত্রায় লোনাপানির প্রভাবের ওপর বেনারনিউজের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
“লোনা পানি আমাদের সবকিছু শেষ করে দিয়েছে,” বিলীনপ্রায় সবজি বাগানের সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন সালেহা খাতুন। একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে বসতবাড়ির এক টুকরো জমিতে কুমড়া, লাউ, ডাটা, ঢেঁড়স, পুঁই, কলমি শাকসহ অন্যান্য সবজি লাগিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মাদার নদীর লোনা পানি ঢুকে সবজি বাগানসহ তাঁর কুঁড়েঘরের দেয়ালও নষ্ট করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বৈশখালী গ্রামের সালেহাদের চারপাশ পানি দিয়ে ঘেরা থাকলেও সুপেয় পানির তীব্র কষ্টে ভুগতে হয় তাঁদের।
“খাওয়ার পানির প্রচণ্ড কষ্ট। ৩০ লিটার পানি ২০ টাকা দিয়ে কিনে খেতে হয়। তিন জনের সংসারে পানি থেকে শুরু করে সবকিছু কিনে খাওয়া কঠিন। তার ওপর বছরে দুই-তিনবার ঘর ভাঙে। এভাবে কতদিন বাঁচা যায়?” বলছিলেন স্বামী হারানো সালেহা।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর, কালিগঞ্জ এবং খুলনার কয়রা উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে বেনার প্রতিবেদক সালেহা খাতুনের মতো অনেকের সাথে কথা বলেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের নানারকম দুর্ভোগ মোকাবেলা করছে এইসব উপকূলীয় এলাকার মানুষ। বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে তাঁরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি লোনাপানি বাড়ার কারণে বিভিন্ন রকমের বাধার মুখে পড়ছে তাঁদের জীবন ও জীবিকা।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে বসতি এলাকায় লোনাপানি ঢুকে মিঠা পানির উৎস আর কৃষিজাত ফসল দুটোকে বিলীন করে দিচ্ছে, যা সরাসরি হুমকি হয়ে উঠছে ওইসব এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে।
উন্নয়ন সংস্থা ওয়াটার এইডের ২০১৯ সালের একটি গবেষণামতে, গত ২৫ বছরে বাংলাদেশে লোনাপানির অনুপ্রবেশ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ, পাশাপাশি প্রতি বছর উপকূলের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিমাণ বেড়েই চলছে
সালেহা খাতুনের মতো এসব এলাকার বাসিন্দারা খাওয়া ও রান্নার প্রয়োজনসহ দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে সুপেয় পানিরও তীব্র সংকটে ভুগছেন। একই সাথে লোনাপানি ঢুকে কৃষি জমির ক্ষতি ও সেচের উপযোগী পানির অভাবে খাদ্য ও স্থানীয় আয়ের উৎসও হারিয়েছেন তাঁরা।
“পানির কষ্টের কারণে মেয়ের বিয়ে পর্যন্ত দিতে পারি না। কারণ, এই এলাকায় কেউ বিয়ে করতে চায় না। বৃষ্টির মৌসুম ছাড়া বছরের অন্যান্য সময় খাবার পানি কিনেই খেতে হয়,” বেনারকে বলেন বৈশখালী গ্রামের আরেক নারী রোমেছা বেগম (৪০)।
ফেরিওয়ালা স্বামীর দিনে ৩০০ টাকার মতো আয় হয় জানিয়ে তিনি বলেন, চাল, পানি থেকে শুরু করে জ্বালানি পর্যন্ত কিনতে হয়। এভাবে বেঁচে থাকা খুব কষ্টকর।”
“আরেক গ্রাম থেকে রান্নার পানি আনতে হয়। কিন্তু তারাও ধান চাষের জন্য মিঠা পানি সংরক্ষণ করে বলে পানি দিতে চায় না, এ জন্য কটু কথা শোনায়,” বলেন রোমেছা।
২০১৩ সালে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, সাতক্ষীরার বাসিন্দাদের প্রায় ৭০ শতাংশ দূরবর্তী পুকুরের পানির উপর নির্ভরশীল।
দূর থকে পানি আনার কাজ সাধারণত মেয়েরাই করেন। স্থানীয় নারীরা বেনারকে জানান, পরিবারের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে প্রতিদিন তাঁদের দুই থেকে পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়।
শুকনো এবং বৃক্ষহীন এলাকা মধ্যে দিয়ে গ্রামের মহিলারা কাঁখে পানির কলসি নিয়ে ফিরছেন- উপকূলীয় জেলাগুলোতে এ এক সাধারণ দৃশ্য। এই অঞ্চলটি বিশ্বের বৃহত্তম লোনাপানির বন বা ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের একেবারে কাছে।
এসব এলাকার রাস্তাঘাট অধিকাংশই কাঁচা, ফলে চলাচলেও অত্যন্ত কষ্ট করতে হয় সাধারণ মানুষকে।
লবণাক্ততার কারণে কৃষি জমি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পুরুষদের বড়ো একটি অংশকে পরিবার ছেড়ে শহরে কাজ করতে যেতে হয়। যাদের সে সামর্থ্য নেই, তাঁরা গ্রামে অলস সময় কাটান।
বিশ্বব্যাংকের ২০১৪ সালে পরিচালিত সমীক্ষা অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাবে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে পানীয় জল ও সেচের ঘাটতি বাড়বে, যা প্রায় ২৯ লাখ দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা অ্যাডভান্সিং আর্থ অ্যান্ড স্পেস সায়েন্সের গত বছর প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ অভিবাসী বা স্থানান্তরিত হবেন। নিম্নভূমির দেশ হওয়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ বিশেষভাবে সংবেদনশীল বলে জানানো হয় ওই প্রতিবেদনে।
কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকে গ্রামে পরিবার রেখে দূরে কাজে যান। এদেরই একজন গাবুরার বাসিন্দা শেখ আবদুল বারী, যিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে ইটের ভাটাগুলোতে সর্দার হিসেবে কাজ করেন।
“গ্রামে কোনো কাজ নেই। লবণাক্ততা এখানে উপার্জনের সব সুযোগ নষ্ট করে দিয়েছে। তাই অধিকাংশ সক্ষম পুরুষ কাজ করতে অন্য জেলায় যায়,” বেনারকে বলেন আবদুল বারী।
কয়রা উপজেলার কয়রা ইউনিয়নের সুবলা রানী বেনারকে জানান, ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ভাঙনে ঘর ভেসে যাওয়ার পরে পরিবার নিয়ে দুই ছেলের একজন রাঙ্গামাটি অন্যজন খুলনার দাকোপে চলে গেছে।
ছেলেদের বোঝা বাড়াবেন না বলে তিনি থেকে গেলেও সংসার চালাতে অত্যন্ত কষ্ট হয় বলে জানান।
পুরুষদের যারা গ্রামে থেকে যান, তাঁদের অনেকেই জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষি বা মৎস্য চাষে কাজ করেন।
এখনও পানি সরবরাহে লবণাক্ততার ক্রমবর্ধমান মাত্রা অর্থনৈতিক কার্যকলাপকে প্রভাবিত করছে, কারণ কিছু গ্রামবাসী চিংড়ি বা কাঁকড়ার ঘের করছে।
“আমাদের সব সমস্যার মূল হলো লোনাপানি। ঘূর্ণিঝড় আইলার (২০০৯) পর থেকে লোনাপানি ধীরে ধীরে এই এলাকাকে মরুভূমি বানিয়ে দিয়েছে,” বলছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার নয় নম্বর সোরা গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান (৫৬)।
“যেটুকু অল্প জমি ছিল তাতে একসময় ধান লাগাতাম। পুকুরে মাছ হতো। এখন লোনাপানির কারণে ধান চাষ করা যায় না। সবকিছু কিনে খেতে হয়, খাবার পানিও। গরু-ছাগল কিংবা হাঁস-মুরগিও পুষতে পারি না,” বলেন মাহবুবুর রহমান।
জয়াখালী গ্রামের মোহাম্মদ আলীমউদ্দিন গাজী (৫৮) বলেন, “আমার এই ৫৮ বছর বয়সে এত পানির কষ্ট কখনো পাইনি।”
চিংড়ি চাষের ঘেরের কারণে লবণাক্ততার তীব্রতা আরো বেড়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “লোনাপানির কারণে গাছপালা সব মরে এই এলাকা মরুভূমির মতো হয়ে যায়। ঘের না থাকলে গাছপালা জন্মাবে। ফসল ফলানো যাবে। গরু ছাগল পোষা যাবে। মানুষের অভাব কমবে।”
লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, মাছের ঘের তৈরির মতো মনুষ্যসৃষ্ট কারণকেও দায়ী করেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক ড. আনোয়ার জাহিদ। উপকূলীয় এলাকায় ঘের বন্ধ করতে পারলে এই ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমে আসবে মনে করেন তিনি।
২০১৪ সালের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলে চিংড়ি চাষ স্থানীয় পরিবেশগত মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে; যার মধ্যে রয়েছে মাটি এবং পানির গুণমানের অবনতি, ভূগর্ভস্থে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, স্থানীয় পানি দূষণ এবং স্থানীয় হাইড্রোলজি পরিবর্তন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের গবেষণায় বলা হয়েছে, “গবেষণা এলাকায় লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ স্থানীয় গাছপালা এবং বিশেষ করে ধান ও শাকসবজি উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।”
দেশের জনসংখ্যার আনুমানিক ৪১ ভাগ মানুষ সমুদ্রপিঠ থেকে ১০ মিটার (প্রায় ৩২ ফুট) নিচে বসবাস করেন বলে জানানো হয় ওই প্রতিবেদনে।
সরকারের একজন কর্মকর্তা অবশ্য বলেছেন, সরকার উপকূলীয় লবণাক্ততার সমস্যা সমাধান করছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ মোহসীন বেনারকে বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। এর প্রেক্ষিতে সরকারের সুপেয় পানির জন্য প্রকল্প আছে।”
“সমুদ্রের পানিকে সুপেয় করে অথবা জলাধারের পানি করে মানুষকে সরবরাহ করা হচ্ছে,” জানিয়ে তিনি বলেন, “পানির চাহিদা অনেক; এটি বিবেচনা করে এ ধরনের আরো বড়ো প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।”
“এ ছাড়া উপকূলীয় এলাকায় লবণ সহনশীল ধান বা ফসল চাষ করা হচ্ছে। লবণাক্ত পানি রোধ করতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে,” বলেন
দুর্যোগ সচিব বলেন, “ইতিমধ্যে আমরা লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং নদী ভাঙনের কারণে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন কর্মকৌশল প্রণয়ন করেছি। এখন আমরা কোন মন্ত্রণালয়ের, কী দায়িত্ব সেটা নির্ধারণ। পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে শেয়ার করে—কোথায় তাদের ইনটারভেনশন দরকার, সেটা জানার চেষ্টা করছে।
স্কুল বন্ধ থাকার সময় বাড়ির কাজ আর খেলাধুলা করেই কাটছিল আন্না খাতুনের (১৩) দ। হঠাৎ এক সন্ধ্যায় আন্নাকে আত্মীয়ের বাড়িতে নেও হয়, আন্না জানতে পারে একটু পরেই তার বিয়ে।
বছর না ঘুরতেই একটি সন্তানও জন্ম দেয় ওই কিশোরী। বাল্যবিয়ের শিকার আন্নার জন্ম দেওয়া শিশুটির বয়সও এখন প্রায় তিনমাস।
“আমি বুঝতে পারছিলাম না হঠাৎ করে কী ঘটল। বিয়ের পরে আর খেলাধুলা করা হয়নি, সারাক্ষণ সংসারের কাজ আর কাজ। এমনকি আমি গর্ভবতী অবস্থায়ও কাজ করেছি,” বলছিল সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার শৈলখালী গ্রামের এই কিশোরী।
বাল্যবিয়ের এই চিত্র বাংলাদেশের দুর্যোগ-প্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম খুলনা এলাকায় খুবই সাধারণ। দারিদ্র্য এবং অন্যান্য নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাল্যবিবাহের সংখ্যা প্রতিনিয়ত এ অঞ্চলে বাড়ছে। করোনা মহামারির সময়ে সেটা বহুগুণে বেড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম সাতক্ষীরা জেলায় বাল্যবিয়ের ঘটনা প্রায় ঘরে ঘরে।
শ্যামনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের কার্যালয়ের তথ্য অনুসারে, উপজেলার ৮৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোট ১,২১৪ জন মেয়ে শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়েছে। এদের মধ্যে ৭০৩ জন মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, ৫১১ জন বিভিন্ন মাদ্রাসার এবং ৩৩৩ জন বিভিন্ন কলেজের। তবে স্থানীয়রা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের এই তালিকা অনুযায়ী, পরানপুর এ রউফ মেমোরিয়ালে করোনাকালে স্কুল বন্ধ থাকার সময় কোনো শিক্ষার্থীর বাল্য বিয়ে হয়নি। তবে স্কুলটির একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে জানান, এই সময়ে মোট ১৯০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৪ জন মেয়ে শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়েছে। যাদের বয়স ১২-১৬ বছর।
মহামারির মধ্যে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী সুবর্ণা ইয়াসমিন হীরার। কয়েকমাসের মধ্যেই তার বিচ্ছেদও হয়। বাবার বাড়িতে ফিরে এসে আবারও পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ থাকলেও অভাবের কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানায় সে।
হীরা জানায়, তার ক্লাসে ৬৫ জন শিক্ষার্থী ছিল। করোনার পর জানা যায় তাদের মধ্যে ১২ জনেরই বিয়ে হয়ে গেছে।
খুলনার কয়রার একটি স্কুলের দশম শ্রেণির প্রেমা মণ্ডল বলেন, “করোনার পর স্কুল খুললে জানা গেলো করোনাকালে আমাদের ক্লাসের ১৪ জনের বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু আমি পড়তে চাই।”
বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে মেয়েদের এবং ২১ বছরের আগে ছেলেদের বিয়ে করা বেআইনি। তবে বাল্যবিয়ের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ দশ দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৫১ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশের বিয়ে হয় ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেয়েকে বিয়ে দেয়ার অভিজ্ঞতা আন্নার পরিবারের জন্য নতুন নয়। তার অন্য তিন বোনেরও এরকম বা এর চেয়ে কম বয়সে বিয়ে হয়েছে। তাঁরাও কম বয়সে মা হয়েছেন এবং নানা শারীরিক জটিলতায় পড়েছেন।
“আমরা গরিব মানুষ। বেশিদূর তো পড়ালেখা করাতে পারব না। ভালো পাত্র পেয়েছি বলেই দেরি না করে বিয়ে দিয়েছি,” বেনারকে বলেন আন্নার মা হাসিনা বেগম।
সরকারি তথ্য অনুসারে করোনা মহামারি দেশে প্রায় ২৫ লাখ মানুষকে নতুন করে দরিদ্র করেছে। এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমকে বেড়েছে।
শৈলখালী গ্রামটি ঘুরে ১৬-১৭ বছর বয়সী কোনো অবিবাহিত কিশোরী খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর আগেই তাদের বিয়ে হয়ে যায়।
“আমার এলাকায় ১৪ বছরের বেশি বয়সী কোনো অবিবাহিত মেয়ে নেই, কারণ বেশিরভাগ বাবা-মা বিভিন্ন কারণে তাঁদের মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করছেন,” বেনারকে বলেন শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জি.এম. মাসুদ আলম।
তবে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা বাল্যবিবাহ বন্ধে কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরায় একটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত ভাসমান স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের নার্স ববিতা পারভীন বেনারকে বলেন, “এই এলাকায় বাল্যবিবাহ অত্যধিক বেশি। এরপর মেয়েরা অল্পবয়সে মা হয়ে যায়। তারা অত্যন্ত পুষ্টিহীনতায় ভোগে। পূর্ণ বয়সে মা না হওয়ায় অল্পবয়সী এসব মায়েরা নানারকম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে।”
২০০৭ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগে বাল্যবিবাহের হার সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ।
স্থানীয়রা জানান, উপকূলীয় অঞ্চলে, বিশেষ করে সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলায় বাল্যবিবাহ বৃদ্ধির একটি বড়ো কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রজনন ক্ষমতা হারানোর ভয়। কারণ লবণাক্ততার কারণে এই এলাকায় মেয়েদের অনেককে অল্পবয়সে জরায়ু অপসারণ করতে হয়।
“আমাদের স্কুল থেকে ছাত্রীদের ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিয়ে। অধিকাংশ মেয়েকে বিয়ের পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দেওয়া হয় না,” বেনারকে বলেন গাবুরা এপিজি আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক আবদুর রহমান।
গ্রামবাসী এবং স্থানীয় নেতাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগও বাল্যবিয়ের অন্যতম কারণ। নানা সংকটের সময়ে বাবা মায়েরা বিয়ে দিয়ে মেয়েকে অন্য সংসারে পাঠিয়ে নিজেদের বোঝামুক্ত করতে চান।
শ্যামনগরের শৈলখালী মদীনাতুল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক গোপাল চন্দ্র ঘোষ বেনারকে বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব অঞ্চলে অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। জীবন জীবিকার পরিবর্তন হয়েছে। যারা কৃষিকাজ, মাছ চাষে যুক্ত ছিল তাদের ক্ষতি হয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষ খুবই দরিদ্র।”
“অনেক মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। অভিভাবকরা মেয়েদের বোঝা বলেই মনে করে। তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে পারলে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে,” বলেন তিনি।
“জলবায়ু পরিবর্তন উপকূলীয় এলাকার পরিবারগুলোকে দারিদ্র্যের গভীরে ঠেলে দিয়েছে,” বলে বেনারকে জানান ইউনিসেফ বাংলাদেশের ক্লাইমেট-চেঞ্জ ফোকাল পার্সন ক্রিস্টিন ক্লাউথ।
তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝড় ও বন্যা আরো খারাপ হতে থাকে, যা মানুষের জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে; নিরাপদ পানি, খাবার বা স্কুল পাওয়াকে কঠিন করে তোলে। এসব মোকাবেলায় দুর্ভাগ্যবশত পরিবারগুলো তাদের অল্প বয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দেয়।”
ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে মেয়েরা বাল্যবিবাহ ও পাচারের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে এই ঝুঁকি অত্যন্ত প্রবল।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে প্রজনন স্বাস্থ্যসহ হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চল কয়রার মানুষের জীবনযাত্রা। নিয়ম করে বছরের বিভিন্ন সময় নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে নদ-নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীর স্বাস্থ্য ও জীবন-জীবিকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। সে সঙ্গে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
এক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়নে জেন্ডার সমতার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে উপকূলের নারীদের সমতা দূরের কথা, এখনো স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করাই সম্ভব হয়নি। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কারণে নারী স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
গত কয়েক দশকে উপকূলীয় এলাকায় পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশের বিপন্নতার প্রভাব প্রথম এসে পড়ে নারীর ওপর। পানির স্তর নিচে নেমে যায়, নদীর পানি লবণাক্ত হয়ে যায়, নদী শুকিয়ে যায়, দু-একটি নলকূপে- যেখানে মিষ্টি পানি ওঠে সেখানেও পানির জন্য হাহাকার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা না হলে কলসি নিয়ে পানির খোঁজে দীর্ঘপথ হাঁটতে হয় এসব নারীদের। আবার রান্নার জন্য জ্বালানি সংগ্রহ করতে নারীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনের ভেতরে যেতে হয় কাঠ কুড়াতে।
উপকূলের নারীদের শুধু খাওয়ার পানিই নয়, সংসারে সবকিছুর জন্য যে পানি প্রয়োজন, সেই পানি সংগ্রহ করার দায়িত্বও নারীর। তাই সেই বিপর্যয় মোকাবিলায় নারীকে সামনে দাঁড়াতে হয়।
উপকূলীয় অঞ্চল খুলনার কয়রা উপজেলার নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে চুল ও ত্বকের ক্ষতি হয়। এ ছাড়া গর্ভপাত ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। সেখানকার নারী ও শিশুরা চিংড়ি পোনা ধরার জন্য নদীর লবণাক্ত পানিতে প্রায় ৪-৫ ঘণ্টা তাদের থাকতে হয়। ফলে প্রজনন স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েন এসব নারী ও শিশুরা।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তি তাপমাত্রা, বন্যা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে গর্ভবতী নারীরা নানা স্বাস্থ্য সমস্যা যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, ডেলিভারি সম্পর্কিত জটিলতা, অকাল প্রসবসহ বাচ্চার জন্মগত সমস্যা মোকাবিলা করছেন। লবণাক্ত পানির কারণে নারীরা এখন জরায়ু ক্যান্সারের মতো জটিল রোগে ভুগছে।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর যে কয়েক লাখ নারী জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ উপকূলীয় অঞ্চলের নারী। নারীদের জরায়ুসংক্রান্ত অসুখের তীব্রতা লবণাক্ততা প্রবণ গ্রামগুলোয় বেশি দেখা যায়। সে জন্য অল্প বয়সেই এ এলাকার নারীরা জরায়ু কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন।
শাকবাড়িয়া নদীর পাশে বসবাসকারী স্বামী পরিত্যক্তা বনজীবী নারী রেহানা খাতুন বলেন, উপকূলে জীবিকা নির্বাহের জন্য ৫০ শতাংশ নারীকে নদীতে মাছ ধরাসহ মৎস্য ঘেরে কাজ করতে হয়। আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে যাবার পর থেকে আমি নদীতে জাল টেনে ও মৎস্য ঘেরে কাজ করে দুই মেয়েকে নিয়ে কোনো রকম সংসার চালাই। লবণ পানিতে নামলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে অ্যালার্জি, ঘা-পাঁচড়া, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়াসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হতে হয়। অকাল গর্ভপাতের ঘটনাও ঘটছে। বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। আমাদের অঞ্চলে জরায়ু কেটে ফেলার ঘটনা অহরহ।
কয়রার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের বতুল বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি উম্মেহানী আক্তার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীর মধ্যে দেখা দেয় পুষ্টিহীনতা। প্রায় সময় নারীর মধ্যে অনিয়মিত ঋতুস্রাব, জরায়ুতে সিস্ট, অসময়ে মেনোপোজসহ প্রজনন স্বাস্থ্যের নানা জটিলতা। কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারী ও কিশোরীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো গেলে এ সমস্যা কমিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।