সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জলবায়ু দুর্যোগের ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লাখো শিশুর লেখাপড়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে
সকাল সাড়ে ১০টা। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফিরছে নিশাত তাসনিম, ইসরাত তাসনিম ও মারিয়া আক্তার। তারা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কলবাড়ী নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে সুন্দরবনসংলগ্ন রাস্তায় কথা হচ্ছিল তাদের সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে তারা জানায়, বৃষ্টির মধ্যে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে এলেও অন্য শিক্ষার্থীরা না আসায় বিদ্যালয় থেকে ফিরে যেতে হচ্ছে। তিন-চার দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। নিশাত তাসনিম জানায়, বৃষ্টির কারণে চাইলেও অনেক সময় বিদ্যালয়ে আসা হয় না। তখন পড়ালেখার ক্ষতি হয়।
শুধু নিশাত, ইশরাত বা মারিয়া নয়, জলবায়ু দুর্যোগের ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লাখো শিশুর লেখাপড়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষা খাতে। অতিসম্প্রতি জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের প্রতিবেদনমতে, চরমভাবাপন্ন তাপমাত্রার কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৮৫ দেশে প্রায় ২৪ কোটি ২০ লাখ শিশুর পড়ালেখা ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী শিক্ষার্থীদের এ তথ্য বিবেচনায় নিলে বলা যায়, প্রতি সাতজন শিশুর মধ্যে প্রায় একজনের পড়ালেখা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে সাড়ে ৩ কোটি শিশুর লেখাপড়া ক্ষতি হয়েছে। জলবায়ু সমস্যার কারণে শিশুদের পড়ালেখা সবচেয়ে বেশি বিঘ্নিত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়। ২০২৪ সালে প্রায় ১৩ কোটি শিশুর পড়ালেখা ব্যাহত হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের অন্য প্রতিবেদন বলছে, ২০২২ সালে চরম আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন দেশে ৪০ কোটির বেশি শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় স্বল্পসময়ের জন্য বন্ধ ছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবমতে, স্বল্প আয়ের দেশে প্রায় ১৮ দিন বিদ্যালয় বন্ধ ছিল।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে শিক্ষার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘রাইজিং টু চ্যালেঞ্জ ইয়ুথ পারস্পেকটিভ অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এডুকেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ইউনিসেফ জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় ক্ষতি হয়। প্রায় ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর ওপর কোনো না কোনোভাবে এ প্রভাব পড়ে।
শুধু চরম আবহাওয়া নয়, বিভিন্ন স্থানে ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলাবদ্ধতা, বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পাহাড়ধস, নদী ভাঙন ও মহামারিতে বিদ্যালয় বন্ধ রাখার মতো অভিজ্ঞতা রয়েছে। বন্যা ও নদী ভাঙনের শিকার হয়ে অনেক শিশুর জীবনে আর পড়ালেখা করা হয়ে ওঠে না। ইউনিসেফের অন্য প্রতিবেদনমতে, ১ কোটি ২০ লাখ শিশু বন্যাপ্রবণ এলাকার কাছাকাছি বসবাস করে, ৪৫ লাখ শিশু ঘূর্ণিঝড়পূর্ণ এলাকায় বসবাস করে ও খরাপ্রবণ এলাকায় বসবাস করে প্রায় ৩০ লাখ শিশু।
জলবায়ু পরিবর্তন শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়িয়ে দেয়। উপকূলীয় জেলাসমূহে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দিনদিন প্রকট হচ্ছে। চলতি শতাব্দীর মধ্যে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখার যে প্রতিশ্রুতি, তা রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ক্রমবর্ধমানভাবে পৃথিবী নামক ছোট্ট গ্রহটি উষ্ণ করে তুলেছে। তুলনামূলক আরামদায়ক ও গরমে স্বস্তির ব্যবস্থা আছে এমন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে পারে বেশি। বিভিন্ন সময় চরম আবহাওয়ার দরুন দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় সঠিক সময়ে খোলা রাখা যায়নি। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়েছিল। কেননা জানুয়ারিতে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি বা তার কম নেমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার কারণে উপকূলে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শিশুরা। দুর্যোগের কবলে পড়া শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে
বর্ষা মৌসুমে বন্যার সময় শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। বন্যায় বিভিন্ন স্থানে দিনের পর দিন বিদ্যালয়ের ভবন ও খেলার মাঠ পানিতে ডুবে থাকে। ফলে পাঠদান সম্ভব হয় না। এ সময় দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে। শুধু গ্রাম পর্যায়ে নয়, শহরের দরিদ্র শিক্ষার্থীরাও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিদ্যালয়বিমুখ হয়ে পড়ে। দুর্যোগের সময় অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করার সুযোগ বিবেচনায় নেওয়া হয় না। দুর্যোগের সময় পরিবার পর্যায়ে শিশু শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতাও থাকে না। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রকাশিত তথ্য বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ২০১৯ সালে ৪৯২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৪ হাজার ৫০০ মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়, প্রায় ১ হাজার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ২ হাজারের বেশি কলেজসহ শত শত মাদ্রাসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার কারণে গত বছরে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
জলবায়ু দুর্যোগের শিকার হয়ে অনেক পরিবার স্থানান্তর হতে বাধ্য হয়। স্থানান্তরিত পরিবার শিশু সন্তানের পড়ালেখার খরচ চালাতে হিমশিম খায়। ফলে অভিভাবক তার সন্তানকে আয়বর্ধক কাজে লিপ্ত করার মতো সুযোগ খুঁজতে থাকে। এ সময় সন্তানের পড়ালেখার প্রতি উদাসীনতা লক্ষ করা যায়। বাল্যবিবাহের ঝুঁকি তৈরি হয়। উপর্যুপরি দুর্যোগ শিক্ষার্থীদের মনোবল ভেঙে দেয়। অভাবের চক্রে ঘুরতে থাকা অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর সাহস হারিয়ে ফেলে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে দাবদাহের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়েছিল। দাবদাহে হিটস্ট্রোকে শিশু শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটে। সব মিলিয়ে শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে ৩ কোটির বেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখার মনোযোগ হারিয়ে ফেলে।
দুর্যোগের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে পাঠদান সম্ভব হয় না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইউরোপের দেশগুলোয় এক বছর বা ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১৮৫ দিন ধরে শিক্ষাবর্ষ শেষ করা হয়। ভারতে ১৮৫-২০০ দিন ধরে শিক্ষাবর্ষের পরিকল্পনা করা হয়। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বাংলাদেশেও ১৮৫ দিন ধরে শিক্ষাবর্ষ ঠিক করা হয়। বছরের এ শিক্ষাবর্ষ আন্তর্জাতিক মানের তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশে শিক্ষাবর্ষ ঠিক রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সব এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমানভাবে খোলা রাখা যাচ্ছে না। কোথাও মৌসুমভিত্তিক তীব্র শৈত্যপ্রবাহ, আবার কোথাও চরম দাবদাহ। এ ছাড়া বন্যা, নদী ভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো চিরচেনা দুর্যোগ তো রয়েছেই। শিক্ষার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের পরোক্ষ প্রভাব আরও ভয়াবহ। শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার কারণে উপকূলে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিশু শ্রমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শিশুরা। দুর্যোগের কবলে পড়া শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। সর্বোপরি পরিবার ও সমাজ পর্যায়ে তাদের স্বাভাবিক অগ্রগতি হ্রাস পাচ্ছে। দুর্যোগে আক্রান্ত শিশুরা শুধু শিক্ষা নয়, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও বিনোদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সমাধান কোন পথে : শিক্ষার ওপর জলবায়ুর প্রভাব এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। শিক্ষার ওপর নানাবিধ প্রভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। জলবায়ুগত সমস্যা আগামীতে আরও বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা আভাস দিয়েছেন। সে বিবেচনায় শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব আরও প্রকট হবে বলে ধরে নেওয়া যায়। শিক্ষার ওপর এ নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষা দিয়েই মোকাবিলা করার উপায় খুঁজতে হবে। জলবায়ুসৃষ্ট পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য অভিযোজন পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। জলবায়ু প্রভাবকের কথা মাথায় রেখে স্থিতিস্থাপক ও টেকসই অবকাঠামোয় গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত রক্ষার স্বার্থে স্থিতিস্থাপক অবকাঠামোগত উন্নতি ও শিক্ষা খাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতি জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া জলবায়ুসৃষ্ট এলাকাভিত্তিক দুর্যোগের কথা মাথায় রেখে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে পৃথক শিক্ষা ক্যালেন্ডার তৈরির কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।
ভোরেরও যেন ঘুম ভেঙেছে মাত্রই। কিন্তু তারও আগে উঠে পড়েছে অতসী মুন্ডা। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্ডাপাড়ায় তার বাড়ি। প্রতিদিন তার একই কাজ। খাওয়া ও রান্নার পানি সংগ্রহ করতে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে ভেটখালি বাজার বা সুন্দরবন গ্রামের দিকে যেতে হয়। অতসীর মতো মুন্ডা শিশুদের জীবন কাটে পানির খোঁজে। পানি জোগাতে গিয়েই পড়াশোনার স্বপ্ন আড়ালে পড়ে যায়।
'সকালে ঘুম থেকে উঠি, বাড়ির বাসি কাজ সেরে জল আনতে যাই। খাবার জল যখন থাকে না, তখন কয়েক কিলো দূরে সুন্দরবন গ্রামের দিকে যাই। জল আনতে সবমিলে ২ ঘণ্টার মতো লাগে। খরায় ভিড় বেশি, আরও সময় লাগে,' বলছিল ১৫ বছর বয়সী অতসী।
অতসীর বাবা অসুস্থ, মা দিনমজুর। তাই ছোটবেলা থেকেই ঘরের সব দায়িত্ব তার কাঁধে। স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল খুব কষ্টে। এখন তা প্রায় অসম্ভব। অতসীর এ গল্প পানির সংকটে থাকা প্রায় প্রতিটি মুন্ডা পরিবারের।
আতসী বলে, 'আগে যখন স্কুলে যেতাম, সকালে দুই ঘণ্টার মতো হেঁটে জল এনে আবার প্রায় ঘণ্টাখানেক হেঁটে স্কুলে যেতাম, রান্নার জল আনতাম ৩-৪ বার করে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরার একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী মুন্ডা। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ২২টি গ্রামে প্রায় ৪৫০ মুন্ডা পরিবারের বসবাস। সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থা (সামস) জানায়, গহীন সুন্দরবন কেটে বসতি গড়তে ব্রিটিশরা প্রায় আড়াইশ বছর আগে তাদের নিয়ে এসেছিল ভারতের ঝাড়খণ্ড থেকে। কতজনকে নিয়ে এসেছিল শ্যামনগরে, তার সঠিক সংখ্যা জানা নেই তাদের। একসময় নিজের জমি ছিল মুন্ডাদের। জীবন ছিল কিছুটা স্বাবলম্বী। এখন তাদের ৯৫ শতাংশ ভূমিহীন, স্বল্পশিক্ষিত। দিনমজুরি করেই চলে জীবন।
প্রতিটি মুন্ডা পরিবারে নারী-পুরুষ বাইরে কাজ করেন। শিশু ও কিশোররা ঘর সামলায়, পানি আনতে যায়। খরা মৌসুমে তাদের পরিশ্রম হয় দ্বিগুণ। পানি টেনে আনতে পারলেও প্রায় প্রতিটি পরিবারের পানি কেনার একটা আলাদা খরচ ধরে রাখতে হয় খরার সময়। ২০ লিটার এক ড্রামের দাম পড়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। দিনে গড়ে এক ড্রাম পানি কিনলেও মাসিক খরচ হয় প্রায় ৯০০ টাকা—যা অনেক পরিবারের পক্ষে যোগার করা কষ্টের।
কথা হচ্ছিলো সজনী মুন্ডা ও তার মায়ের সঙ্গে। সজনীরা চার বোন, দুই ভাই—এক ভাই প্রতিবন্ধী। বাড়িতে সবসময় অন্তত পাঁচজন মানুষ থাকে। পানি কিনে খাওয়ায় তাদের রয়েছে বাড়তি খরচের চাপ।
'গেরস্ত বাড়িতে যত জল লাগে, এত তো টেনে আনা যায় না। জলের টান যখন বেশি, তখন কিনে খাই। মাসে হাজারখানেকের মতো জলের টাকাই লাগে।'
সজনীর কথা ধরে তার মা বলেন, 'যে সময় কাজের বড় অভাব হয়, তখন মাসে ৫-৭ হাজার টাকা রোজগার হয়। এতগুলো মানুষের মুখে খাবার যোগান দিতি হয়। মেয়েটার পড়াশোনার পেছনে কিছু খরচ করব, সেই সামর্থ্যও থাকে না। শুধু জলের পেছনেই অনেকটুকু চলে যায়।'
সাতক্ষীরা অঞ্চলে অগ্রহায়ণ থেকে আষাঢ়ের আগ পর্যন্ত পানি সংকট চলে। আশপাশের পুকুরগুলো শুকিয়ে লবণাক্ত হয়ে যায়। মেয়ে শিশুদের তখন বাধ্য হয় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় পানি সংগ্রহ করতে।
পানির সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মেয়েরা। অতসী, সজনীসহ আরও অনেকে জানায়, তারা স্কুলে যাওয়ার বদলে অনেক সময়ই পানি আনতে যায়। ফলে স্কুলে নিয়মিত যেতে পারে না, অনেকেই ঝড়ে পড়ছে।
শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ায় বৈষম্য ও দারিদ্র্য প্রবল হচ্ছে। এই সংকট শুধু মৌসুমি নয়, সারা বছরের। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা ও পরিকল্পনার অভাবে মুন্ডাদের ভবিষ্যৎ যেন ঝুঁকিতে।
দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশে সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ ও লবণাক্ত পানির সংকট নতুন নয়। ১৯৮০-এর দশকে অপরিকল্পিত চিংড়িঘের থেকে সংকটের শুরু। ঘের থেকে মুন্ডারা আর্থিকভাবে খুব একটা লাভবান না হলেও ঘেরের লবণাক্ত পানি ফাটল ধরা মাটির ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে বসতবাড়ি, পুকুর ও খালে। এতে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় মিঠা পানির উৎস।
সেই ক্ষতির চূড়ান্ত রূপ শুরু হয় ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে। ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা এবং পরবর্তীতে আম্ফান, বুলবুলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাঁধ ভেঙে পানির তীব্র লবণাক্ততা ছড়িয়ে দেয় গ্রামে গ্রামে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ২০২১ সালের জরিপ অনুযায়ী, ৭৩ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ লবণাক্ত পানি পান করছে। শতকরা ৫২ শতাংশ পুকুর ও ৭৭ শতাংশ নলকূপের পানি পানের উপযোগী নয়। ফলে, পানি সংগ্রহে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় হচ্ছে, সেইসঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
গ্রাম পুলিশ গোপাল মুন্ডা তাদের খেত-বাড়ি দেখিয়ে বলেন, 'ঘূর্ণিঝড়ের পর দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি জমে ছিল। পানি নামতে সময় লাগায় সমস্যা ছড়িয়ে পড়েছে। এখন পানি সংকট খুবই তীব্র।'
কালিনচীরের এক মুন্ডা কৃষকের অভিযোগ, 'আমাদের জমি আমরা চাষ করতে পারি না। বাইরের লোক এসে ঘের তৈরি করে, আমরা বাধা দিতে পারি না। ঘের হয়, আমাদের পানির কষ্ট হয়, কেউ শোনে না।'
জাতীয় চিংড়ি নীতিমালা-২০১৪ অনুযায়ী উপকূলীয় এলাকায় চিংড়ি চাষের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে সেই নীতিমালার কোনো কার্যকর প্রয়োগ তারা দেখতে পান না। এলাকার বাইরে থেকে আসা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা চিংড়ি চাষ করেন। নীতিমালায় জমির মালিকের সম্মতি বাধ্যতামূলক হলেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই ভূমিহীনদের জমি ব্যবহার নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের সাতক্ষীরা জেলা পর্যায়ের তথ্য অনুসারে, সাতক্ষীরার ১৩ শতাংশ এলাকায় খাদ্য ও পানির ঘাটতি রয়েছে। ভৌগোলিক কারণে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলা সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি অবস্থিত, তাই অন্যান্য উপজেলার তুলনায় পানির ঘাটতি বেশি।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০২১ সালের জরিপের ফলাফল অনুসারে, সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলায় বসবাসকারী ৭৩ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ লবণাক্ত পানি পান করছেন। প্রতি লিটারে এক হাজার মিলিগ্রামের বেশি লবণাক্ততা পান করার অযোগ্য বলে বিবেচিত। কিন্তু ওই উপজেলাগুলোর পানিতে লবণাক্ততা এক হাজার ৪২৭ মিলিগ্রাম থেকে দুই হাজার ৪০৬ মিলিগ্রাম প্রতি লিটারে। অধিকন্তু, এই অঞ্চলের ৫২ শতাংশ পুকুর ও ৭৭ শতাংশ নলকূপে লবণাক্ততার মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে।
বিশ্বব্যাপী অলাভজনক সংস্থা ওয়াটার-এর মতে, বিশ্বজুড়ে শিশুরা প্রতিদিন ২০ কোটি ঘণ্টা পানি সংগ্রহে ব্যয় করে, যার ফলে স্কুলের সময় থাকে না। তাদের কাছে স্কুলে যাওয়া মানে সপ্তাহে দু-একদিন যেতে পারা। যারা ঝড়ে পড়ছে, তারা সেটুকুও যেতে পারছে না।
'খরার সময় স্কুলে যেতে পারি সপ্তাহে দু-একদিন। আমাদের ক্লাসে ৩১ জন পড়াশোনা করে, খরার সময় উপস্থিত থাকে ১০-১২ জন,' বলছিল অষ্টমী মুন্ডা।
কথা হয় ভেটখালীর ৯৩ নং নতুনঘেরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শর্বাণী বিশ্বাসের সঙ্গে। ১৫ বছর ধরে তিনি শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে স্কুলটিতে রয়েছে ১৫৭ জন শিক্ষার্থী, যার মধ্যে ১৫ জন মুন্ডা। বাচ্চাদের সুবিধার কথা চিন্তা করে স্কুলটিতে শিফটভিত্তিক পাঠদান করা হয়। পড়াশোনার প্রতি খুব আগ্রহ থাকলেও প্রাথমিকে প্রতি বছর চার-পাঁচজন মুন্ডা শিশু ঝড়ে পড়ে বা মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেয় বলে তিনি জানান।
শর্বাণী বলেন, 'খরার সময় ওরা অনেক দেরিতে আসে বা আসতেই পারে না। স্কুলে সাইক্লোন শেল্টারে দুটো পানির ট্যাংকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা হয়। তখন বাচ্চারা ২-৩ লিটার বোতলে পানি নিয়ে যায়। নিজেদের জন্য, বাড়ির জন্যও। কিন্তু বৃষ্টির পানি ফুরিয়ে গেলে ওদের অনুপস্থিতি বেড়ে যায়।'
যখন পানি থাকে না, পানির ঘাটতি মেটাতে স্কুলে প্রতিদিন ১২০ লিটারের মতো পানি কিনতে হয়। খরচ মিটাতে না পারায় ছাত্র-ছাত্রীদের আর বাড়তি পানি দেওয়ার সুযোগ থাকে না। শর্বাণীর আকুতি, 'স্কুলগুলোতে যদি পানির ব্যবস্থা করে দেওয়া যেত, তাহলে বাচ্চারা নিয়মিত স্কুলে আসার আরও উৎসাহ পেত।'
মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও একই চিত্র। সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি থাকা অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে। একেকটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে যেখানে ৫০-৬০ জন শিক্ষার্থী থাকে, দশম শ্রেণিতে টিকে থাকে মাত্র ১০-১২ জন। ধুমঘাটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অভিজিৎ কুমার মণ্ডল জানান, তাদের স্কুল থেকে এবারই প্রথম একজন মুন্ডা শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। মোট ১২ জন মুন্ডা শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০ জন ছাত্রী ও দুজন ছাত্র। তবে তাদের উপস্থিতির হার বরাবরই কম।
'বৃষ্টির পর কিছুটা নিয়মিত হলেও যখন পানি সংকট বেড়ে যায়, তখন ওদের অনেকেই আর আসতে পারে না,' বলেন অভিজিৎ।
মুন্ডা শিক্ষার্থীরা জানায়, আগের তুলনায় এখন পানিবাহিত রোগ কিছুটা কমেছে। তবে বন্যার পর আবার তা বেড়ে যায়। কিশোরী মেয়েদের মধ্যে অনিয়মিত মাসিক ও জরায়ু সমস্যাও দেখা যাচ্ছে। যদিও এখন অনেকেই স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করে, তবু খরার সময় তাদের বাধ্য হয়েই পুকুরের পানি ব্যবহার করতে হয়।
ভেটখালীর কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ প্রোভাইডার আবু নূর তথ্য দেন, 'ডায়রিয়া, টাইফয়েড, আমাশয় নিয়ে স্কুলপড়ুয়া শিশুরা আসে, মুন্ডা বাচ্চারাও আসে। মেয়েরা মাসিকের সমস্যা বলতে লজ্জা পায়। আমরা যতটা পারি সাহায্য করি, কিন্তু আমাদের আলাদা বাজেট নেই।'
শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান কিন্তু আবু নূরে সঙ্গে একমত নন, 'সারা দেশেই কিশোরীদের মাসিক সমস্যা হয়। মুন্ডাদের মধ্যে তা খুব বেশি নয়। জরায়ুর সমস্যাও বয়ঃসন্ধি পার হওয়ার পর দেখা যায়। এ নিয়ে আলাদা পরিসংখ্যান নেই।'
তার মতে, মুন্ডা জনগোষ্ঠীদের নিয়ে আলাদা কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও, সামগ্রিকভাবে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের জমা দেওয়া মাসিক প্রতিবেদনে গুরুতর কোনো অস্বাভাবিকতা তার চেখে ধরা পড়েন।
শ্যামনগর উপজেলায় পাঁচ হাজার ৭৯৫টি পুকুর ও ১৩৬টি জলাশয় আছে। যার মধ্যে মাত্র ৪৫৩টি পুকুরে বালির ফিল্টার থাকলেও ব্যবস্থাপনার অভাবে অধিকাংশ অনুপযোগী। প্রায় এক হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপের বেশিরভাগ অকেজো, ৪২২টি অগভীর নলকূপের মধ্যে তিনটি বন্ধ। অধিকাংশ নলকূপে লবণাক্ত পানি উঠে আসে। উপজেলায় চলতি বছর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ৮৮টি নলকূপ বসিয়েছে। পানি সংকট মোকাবিলায় তারা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং), গভীর নলকূপ ও লবণাক্ত পানি পরিশোধনের ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে পরিশোধিত পানিতে প্রয়োজনীয় উপাদান ঠিকভাবে বজায় রাখা জটিল—এ কথা তারা নিজেরাই স্বীকার করেছেন। তাদের মতে, সীমিত সামর্থ্যের কারণে যতটা করা হচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
গভীর নলকূপ বা পানির ট্যাংক বরাদ্দ দেওয়া হয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক সময় জনপ্রতিনিধিরা প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে নলকূপ বসায় না। জনস্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, এ ধরনের অভিযোগ থাকলেও তারা সবসময় প্রতিটি অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন না।
সাতক্ষীরার মুন্ডা সম্প্রদায়ের পানি সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা সক্রিয়—ওয়াটারএইড, সুশীলন, রূপান্তর, কারিতাস, ফ্রেন্ডশিপ। তারা এসব এলাকায় বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ট্যাংক ও লবণাক্ত পানি পরিশোধনের ফিল্টার স্থাপন করেছে। এই উদ্যোগ বর্ষাকালে সাময়িক স্বস্তি দেয়।
তবে শুষ্ক মৌসুমে এসব সমাধান প্রায়ই অপর্যাপ্ত হয়। অনেক ট্যাংক বড় পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম নয়। এছাড়া, এনজিওগুলো প্রায়শই বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার ফলে কিছু এলাকায় সমস্যা থেকে যায়। সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থার (সামস) নির্বাহী পরিচালক কৃষ্ণপদ মুন্ডা বলেন, 'আমরা পানি সংরক্ষণের জন্য ড্রাম দিয়ে থাকি এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করি। দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে আমাদের সক্ষমতা কম, আর সরকারের কাছ থেকেও বিশেষ সহায়তা পাওয়া যায় না। তাই আমাদের জনগোষ্ঠী সার্বিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে।'
গভীর নলকূপ বসানো হলেও সব জায়গায় মিষ্টি পানির স্তর পাওয়া যায় না। ভেটখালীর মুন্ডাপাড়ায় এখনো কোনো গভীর নলকূপ নেই। ওই এলাকায় শিক্ষার হারও কম। তবে কালিনচী গ্রামে ২০১২-১৩ সাল থেকে কিছু ঘরে গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি মিলছে। এতে মুন্ডা পরিবারের জীবন কিছুটা হলেও সহজ হয়েছে। অনেক শিশু পানির চাপ মুক্ত হয়ে, এখন স্কুলে যেতে পারছে।
গ্রাম পুলিশ গোপাল মুন্ডা জানান, ২০১২ সালে মিষ্টি পানির স্তর পাওয়া গেলে তার মেয়েই প্রথম এসএসসি পাস করে এখন স্নাতকে পড়ছে। তবে সেই পানিও একেবারে সুপেয় নয়।
স্থানীয় নারী রিতা মুন্ডা বলেন, 'কলে পানি আসার আগে জীবন অনেক কষ্টের ছিল। এখন খাওয়ার পানি সহজে পাই, কিন্তু রঙ লালচে কেরোসিনের মতো, স্বাদও খারাপ হচ্ছে দিনে দিনে। পুকুরের পানি বর্ষায় মিষ্টি থাকলেও গরমে শুকিয়ে আরও লবণাক্ত হয়ে যায়। এক কাজ দুই-তিনবার করতে হয়। খাওয়ার তো নয়ই, রান্নাবান্না বা অন্য কাজেও কষ্ট হচ্ছে। তিতা, তামাটে স্বাদ আর গন্ধ।
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের তথ্যমতে, ৭৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলছে, যার মাধ্যমে ২০২৬ সালের মধ্যে জেলার অন্তত দুই লাখ মানুষ সুপেয় পানি পাবে। কাজের অগ্রগতি দেখে তা কবে নাগাদ শেষ হবে তা নিয়ে হতাশ স্থানীয়রা। তবে এই প্রকল্পে মুন্ডাদের জন্য সরকার বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ মুন্ডাদের।
সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর থেকে মুন্ডাদের জন্য কোনো বিশেষ ভাতা নেই। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর বা শিক্ষা বিভাগ প্রতি বছর কতজন মুন্ডা শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে, তার সঠিক তথ্যও রাখে না।
মুন্ডাদের আক্ষেপ, 'ভোটের সময় শুধু আমাদের কথা মনে পড়ে, বাকি সময় আমরা অবহেলিত।'
গ্রামের দুজন পুলিশ ও হাতে গোনা কয়েকজন মাঠপর্যায়ের এনজিও কর্মী ছাড়া জনপ্রতিনিধিত্ব করার মতো কেউই নেই। সরকারি চাকরিজীবী নেই, আছেন জাতীয় পর্যায়ে সাফ বিজয়ী ফুটবল খেলোয়াড় সাথী মুন্ডা।
রিতা মুন্ডা হতাশ হয়েই বলেন, 'আমরা কোথায় যাবো? আমাদের কথা কেউ শোনে না। অন্যরা নিজের কথা বলতে পারে, আমরা শুধু পানির জন্য ঘুরে বেড়া।
ফিরে আসি অতসীর কাছে—যে সকাল শুরু করে পানি সংগ্রহের দীর্ঘ যাত্রায়, আর দিন শেষ করে ক্লান্ত শরীরে।
'খুব ইচ্ছা ছিল কলেজে পড়ব,' বলে সে কিছুটা চুপ হয়ে যায়, চোখের আলো ঝাপসা হয়ে যায় যেন।
'পানির কষ্ট না থাকলে হয়তো পড়তে পারতাম। যে পানিটা কিনে খেতে হয়, ওই টাকায় আরেকটু হয়তো পড়তে পারতাম। কিন্তু আমার বাপ-মারই কিছু নেই, আমার হবে কীভাবে?'
অতসীর কাঁধে পানির বোঝা যেন মুন্ডা জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকেও হারিয়ে দিচ্ছে।
কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরারটেক সমুদ্র উপকূলের খাসজমিতে নদীভাঙনের শিকার ও ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি হারানো লোকজনের বসবাস। ওই এলাকার এমন ১৬টি মহল্লায় (গ্রাম) এসব ভাসমান মানুষের বসবাস। এসব মহল্লায় পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় বেশির ভাগ শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ওই এলাকায় কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত একটি িবদ্যালয়, দুটি মাদ্রাসা ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অল্প কিছু শিশু পড়াশোনা করলেও অধিকাংশ শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। দিনমজুরি করে, সাগরে মাছ ধরে ও শুঁটকিপল্লিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে এই এলাকার মানুষ। পরিবারকে সাহায্য করার জন্য অধিকাংশ শিশুও নানা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়িত হয়ে পড়ছে। সরেজমিনে দেখে ও এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
এই এলাকার বাসিন্দারা ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের হিসেবে নাজিরারটেকে প্রায় ৫০ হাজার ভাসমান মানুষজনের মধ্যে ১২ হাজারই শিশু। তবে ১৬টি মহল্লায় ঠিক কত মানুষ বসবাস করছে, কোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কাছে সে–সংক্রান্ত কোনো জরিপ নেই। স্থানীয় লোকজন জানান, মহল্লাগুলোর প্রায় ১০ হাজার শিশু বিদ্যালয়ে যায় না। পড়াশোনার বদলে চিংড়ির পোনা শিকার ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে এই শিশুরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাজিরারটেক এলাকায় বসরকারি সংস্থা কোডেকের ১৮টি শিখন িবদ্যালয় আছে। সব মিলিয়ে এসব বিদ্যালয়ে পড়ছে প্রায় সাড়ে ৫০০ শিশু। এ ছাড়া এই এলাকার কুতুবদিয়াপাড়া উপকূলীয় বহুমুখী নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩৫২, উপকূলীয় আদর্শ শিক্ষা নিকেতনে ২৫০, দারুল কুতুব একাডেমিতে ৩০০ ও কুতুবদিয়াপাড়া মহিউসসুন্নাহ মাদ্রাসায় ৬০০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার শিশুর পড়ার ব্যবস্থা থাকলেও বাকি ১০ হাজার শিশু বিদ্যালয়ে যায় না।
গত ২৭ অক্টোবর সকালে নাজিরারটেকের সমিতিপাড়া সৈকতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ জন শিশু নিষিদ্ধ জাল দিয়ে উপকূলে চিংড়ি পোনা ধরছে। পাশের কুতুবদিয়াপাড়া, নাজিরারটেক, ফদনারডেইল সৈকতেও দেখা মিলেছে একই চিত্র।