সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ, তবুও দেশের উপকূলীয় অঞ্চল পানযোগ্য পানির তীব্র অভাব। বিশেষ করে খুলনা জেলার কয়রা ও পাইকগাছা এবং বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনসংলগ্ন এ অঞ্চলগুলো পরিবেশগত এবং জলবায়ুগত হুমকির পাশপাশি পানযোগ্য পানির দুষ্প্রাপ্যতায় স্থানীয় মানুষের বেঁচে থাকতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
উপকূলীয় এ উপজেলাগুলোতে পানির অভাবের অন্যতম প্রধান কারণ লবণাক্ততা। জোয়ারের ঢেউ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের কারণে নদীর লবণাক্ত পানি খাল, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ জলাধারে প্রবেশ করা নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কয়রা এবং পাইকগাছায় অতিরিক্ত চিংড়ি চাষ মাটি ও পানির লবণাক্ততা আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যা ঐতিহ্যবাহী মিঠা পানির উৎসগুলো ব্যবহার এবং কৃষিকাজের জন্য অনুপযুক্ত করে তুলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংকটকে আরও তীব্র করেছে। আইলা, আম্পান ও রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড় বাঁধের মারাত্মক ক্ষতি করে। ফলে সমুদ্রের পানি গ্রামগুলোকে প্লাবিত করে এবং মিঠা পানির পুকুরগুলোকে লাবণাক্ত করে তোলে। মোরেলগঞ্জে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে ব্যবহারযোগ্য ভূপৃষ্ঠের পানির প্রাপ্যতা হ্রাস পেয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে বেশিরভাগ পুকুর শুকিয়ে যায় বা লবণাক্ত হয়ে যায়। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের একফোঁটা নিরাপদ পানির জন্য দূরবর্তী জলের উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়।
ইউএনডিপির সহযোগিতায় পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, কয়রা এবং পাইকগাছাসহ উপকূলীয় উপজেলার প্রায় ৭৩ শতাংশ পরিবার অনিরাপদ, লবণাক্ত পানি ব্যবহার করে, যা কোনোভাবেই ব্যবহারযোগ্য নয়। আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুসারে, পানীয় জলের লবণাক্ততা প্রতি লিটারে ১০০০ মিলিগ্রামের নিচে থাকা উচিত। তবে এ অঞ্চলের নলকূপগুলোতে লবণাক্ততার পরিমাণ গড়ে ১৪৫৩ মিলিগ্রাম/লিটার, পাইকগাছায় এর পরিমাণ আরও বেশি ১৫১০ মিলিগ্রাম/লিটার।
পানযোগ্য ও ব্যবহারযোগ্য পানির সংকট উপকূলের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে গভীর প্রভাব ফেলছে। খাওয়ার ও রান্নার পানির জন্য নারী ও শিশুদের প্রায়ই দীর্ঘ পথ হেঁটে অতিক্রম করে পানি সংগ্রহ করতে হয়। কখনো কখনো শুধু পানির জন্য দিনে কয়েক ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়। নিরাপদ পানির সীমিত সুযোগের কারণে উপকূলবাসীর লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে হয়। ফলে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ যেমন—ডায়রিয়া, কলেরা, চর্মরোগ ইত্যাদি তাদের নিত্যসঙ্গী। কোথাও কোথাও উচ্চ রক্তচাপ এবং কিডনি রোগও দেখা যায়। মাটিতে লবণাক্ততার কারণে কৃষি উৎপাদন অস্বাভাবিক হ্রাস পেয়েছে, কয়েক লাখ উপকূলবাসীর খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
৫২৫ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ব্যবস্থা, গভীর নলকূপ এবং বিপরীত অসমোসিস প্লান্টের মতো সরকারি প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ এবং টেকসই চ্যালেঞ্জের কারণে অনেক প্রযুক্তি দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে। তবে কয়রা, পাইকগাছা এবং মোরেলগঞ্জে সরকারের পাশাপাশি সুপেয় পানির ঘাটতি মোকাবিলায় হেলভেটাস বাংলাদেশের সহযোগিতায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ডর্প অ্যাকশন টু ক্লাইমেট চেঞ্জ ইনসিউরিং সাসটেইনেবল সলিউশন (একসেস) প্রকল্প সিএসও এবং সিবিও বিশেষ করে ওয়াশ বাজেট মনিটরিং ক্লাব এবং মা সংসদ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে এসব উদ্যোগ স্থায়ী করতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ব্যবস্থা, এলাকাভিত্তিক পুকুরের পানি বিশেষ ফিল্টারের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য করে সমস্যা লাঘবের চেষ্টা করছে। তবে এটি সমস্যার স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। এর জন্য প্রয়োজন লবণাক্ত পানির লবণ হ্রাসকরণ প্লান্ট, বাঁধের স্থায়ী সুরক্ষা এবং টেকসই নদী শাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ হ্রাস এবং জলবায়ু-সহনশীল চাষ ব্যবস্থাপনা, স্বাদুপানির প্রাপ্যতা পুনরুদ্ধারে বেদখল খাস পুকুরগুলো দখলমুক্ত করা জরুরি। সে ক্ষেত্রে এসব অঞ্চলের জন্য সঠিক পরিকল্পনা এবং এর বাস্তবায়নের জন্য চাহিদাভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ একান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনঅংশগ্রহণ গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর লবণাক্ততার থাবায় উপকূলজুড়ে মিঠা পানির উৎস প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ফলে খাওয়া, রান্না থেকে শুরু করে গোসল পর্যন্ত এখন নির্ভর করছে কেনা পানির ওপর। এ পানির জন্য সবচেয়ে বেশি ভুগছে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কৈখালী, পদ্মপুকুর, গাবুরা, মুন্সীগঞ্জ ও নওয়াবেঁকী ইউনিয়ন এবং খুলনার কয়রা ও প্রতাপনগর এলাকায় মিঠাপানি এখন দুর্লভ। শুষ্ক মৌসুমে এক কলসি পানি সংগ্রহ করতে গ্রামীণ নারীদের দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। ঘরের কাজ শেষে পানি সংগ্রহের জন্য তাদের ছুটতে হয় কয়েক কিলোমিটার দূরে।
এ অবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ে পানি সরবরাহের জন্য গড়ে উঠেছে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও খুলনার কয়রায় প্রায় ১৫ থেকে ২০টি প্লান্ট বসানো হয়েছে, যার মধ্যে শুধু শ্যামনগরেই আছে সাতটির মতো। প্রতিটি প্লান্টে দৈনিক ২৫ থেকে ৩০ হাজার লিটার পানি বিশুদ্ধ করা হয়। নূরনগরের মঈনুদ্দীন লাভলুর প্লান্ট থেকে প্রতিদিন চার হাজারের মতো পরিবার পানি নেন। জারপ্রতি ৩০ লিটার পানি বিক্রি হয় ২৫ থেকে ৪০ টাকায়, দূরত্ব ও পরিবহন খরচ অনুযায়ী এ দাম ওঠানামা করে। স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফ ঢালী জানান, তিনি প্রায় এক দশক ধরে এসব পানি মানুষের ঘরে পৌঁছে দেন। শুরুতে শুধু খাওয়া ও রান্নার কাজে কেনা পানি ব্যবহৃত হলেও এখন অনেক পরিবার গোসলের কাজেও এই পানি ব্যবহার করছে। বর্ষাকালে দুই মাস ছাড়া বাকি ১০ মাস কেনা পানিতেই চলে মানুষের জীবন।
গাবুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা রবিউল ও মাসুদের অভিযোগ, লবণপানির চিংড়ি ঘেরের কারণে আশপাশের পুকুর ও জলাশয়গুলোতেও মিঠা পানির অস্তিত্ব নেই। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে তৈরি হওয়া জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরো খারাপ করেছে। ফলে স্থানীয়রা চর্মরোগ, ডায়রিয়া, আমাশয়সহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রতাপনগরের সমাজকর্মী শাহিন শানা বলেন, বর্ষার সময় পুরো এলাকা ডুবে যায়। তখন পুকুর-ডোবা থাকলেও সেগুলো ব্যবহারযোগ্য থাকে না। তাই সারা বছরই কেনা পানির ওপর ভরসা করতে হয়।
স্থানীয় এনজিওর নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল জানান, তার নিজের ঘরেও কেনা পানিই একমাত্র ভরসা। গ্রীষ্মে গোসলের পানিও কিনতে হয়। এ প্রসঙ্গে শ্যামনগরের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার রিভার্স অসমোসিস (আরও) প্লান্ট বসালেও তা শুধু এক বছর তদারক করা হয়। পরে স্থানীয় কমিটির হাতে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কোনো বাজেট না থাকায় এ খাতে সরকারি সহযোগিতা আর থাকে না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রনি খাতুন স্বীকার করেন, উপকূলের পানি সংকটের পেছনে বড় কারণ চিংড়ি চাষ। তিনি জানান, খাল-নালা সংস্কার ও পুকুর খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ না হলে সংকট কমবে না।
ওয়াটারকিপার অ্যালায়েন্সের কার্যনির্বাহী সদস্য ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ শরীফ জামিল বলেন, মিষ্টি পানির সংকট শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। ভারত শুষ্ক মৌসুমে অভিন্ন নদীগুলো থেকে পানি সরিয়ে নেওয়ায় লবণাক্ততা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব- সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় লবণাক্ততা আরো ভেতরে ঢুকে পড়ছে। ফলে উপকূলের মিঠা পানির উৎস দিন দিন বিলীন হচ্ছে।
উপকূলের সাধারণ মানুষ আজ এক কঠিন বাস্তবতায় বেঁচে আছেন। যেখানে প্রতিটি ফোঁটা পানি কিনতে হয়, আর রোগশোককে সঙ্গী করে জীবন চালাতে হয় পুরো পরিবারকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের টেকসই উদ্যোগ, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন সমস্যার সমাধান এবং স্থানীয় পর্যায়ে লবণপানির ঘের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
সময়টা দুপুরের কিছু আগে। পাঁচ-সাতজন নারী শৃঙ্খলা মেনে সিলভারের কলসিতে পুকুরের পানি ভরছেন। কলসি ভরা শেষে একে একে ফিরছেন বাড়ির পথে। এই দৃশ্য সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরার মধ্যম খলশিবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে লাগোয়া সরকারি পুকুরপাড়ের। ওই পুকুরের পাড়েই রয়েছে একটা পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ)। তবে অকেজো।
এই পুকুরের ওপর ভরসা করেন মধ্যম খলশিবুনিয়া, চকবারা, ঢালীবাড়ি, কালীবাড়ি, গাজীপাড়াসহ আশপাশের কয়েক পাড়ার মানুষ। দেড়-দুই কিলোমিটার দূর থেকে নারীরা এখানে আসেন পানি নিতে। অনেকেই আবার একই সঙ্গে দুই কলসি পানি নেন।
পুকুর থেকে পানি নিয়ে ফিরছিলেন সাহিদা বেগম। সাহিদার বাড়ি পুকুরপাড় থেকে দেড় কিলোমিটারের মতো দূরের খোলপেটুয়া গ্রামে। এই পথ পাড়ি দিয়ে দিনে দুইবার পানি নেন তিনি। সাহিদা বলেন, ‘সবকিছুতেই আমাদের কষ্ট। তবে পানির কষ্টটা আর গেল না। আশপাশের সব পানিতে লবণ। এই পুকুরও আইলার সময় ডুবে যাওয়ার পর পানি আগের মতো মিষ্টি নেই। তারপরও চালাতে হয়। সামনে আবার গরম কাল; তখন কষ্টের শেষ থাকবে না।’
শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা। এ জনপদের তিন দিকে নদী ও এক দিকে সুন্দরবন। চারদিকে পানি থাকলেও সাহিদার মতো সুন্দরবনসংলগ্ন এ জনপদের মানুষ সুপেয় পানির জন্য বছরজুড়েই নিরন্তর লড়াই চালান।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে সুপেয় পানির সংকট নিরসনের দাবিতে খালি কলসি হাতে নিয়ে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী। সম্প্রতি উপজেলার মথুরাপুর গ্রামের জেলেপাড়ায়
গাবুরার মতো শ্যামনগরের অন্য এলাকার মানুষকেও সুপেয় পানির জন্য একই রকম সংগ্রাম করতে হয়। একফোঁটা বিশুদ্ধ পানি মহামূল্যবান তাঁদের কাছে। ফাল্গুনের শুরু থেকে জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সংকট তীব্র হয়। অগভীর বা গভীর নলকূপ এখানে অকার্যকর। বৃষ্টি ও পুকুরের পানিই ভরসা। অনেকে টাকা দিয়ে পানি সংগ্রহে বাধ্য হন।
মানুষ বর্ষার শুরু থেকে আশ্বিনের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সরাসরি বৃষ্টির পানি পান করেন। এরপর কিছুদিন চলে জমিয়ে রাখা বৃষ্টির পানি দিয়ে। তবে বেশির ভাগ পরিবারের পানি জমিয়ে রাখার বড় পাত্র বা ট্যাংক নেই। কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) নামমাত্র টাকা রেখে ছোট-বড় প্লাস্টিকের ট্যাংক দিচ্ছে। তবে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের এই উপজেলার অসংখ্য পরিবার এ সুবিধার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সুপেয় পানির পাশাপাশি গোসল ও গৃহস্থালির পানিরও সংকট দেখা দিয়েছে এই অঞ্চলে। গ্রীষ্মের দাবদাহ বাড়ার সঙ্গে এই সংকট আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় লোকজন। মধ্যম খলশিবুনিয়া গ্রামের শেখ সাইফুল ইসলাম বলেন, খাওয়ার পানির কষ্ট তো আছেই। এখন পুকুরগুলো সব শুকিয়ে যাচ্ছে। গোসল আর ধোয়া-মোছার পানির সংকটটাও আর বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র বলছে, সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এই উপজেলায় দীর্ঘকাল ধরে সুপেয় পানির সংকট ছিল। ঘূর্ণিঝড় আইলার পর সুপেয় পানির জলাধারগুলোয় লবণপানি ঢুকে সংকট আর ঘনীভূত হয়। সুপেয় পানির সংকটের বড় কারণ লবণাক্ততা। উপজেলার বেশির ভাগ জায়গায় ভূগর্ভে পানযোগ্য পানির স্তর না পাওয়ায় গভীর নলকূপ চালু করা যায় না। বছর দশেক আগেও কিছু অগভীর নলকূপের পানি পান করা যেত। এখন অগভীর নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা। আর এপ্রিলের শেষভাগ থেকে পরের তিন মাস পানির সংকট তীব্র হয়। ওই সময় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ নলকূপে পানি ওঠে না।
পানি সমস্যা দূরীকরণে শ্যামনগরে জনস্বাস্থ্য বিভাগের পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ), আরডব্লিউএইচ (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং), গভীর ও অগভীর নলকূপ, আরও (রিভার্স অসমোসিস), মার (ম্যানেজ একুইফার রিসার্চ), পুকুর, দিঘি মিলিয়ে ৮ হাজারের বেশি পানির উৎস রয়েছে। উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে কৈখালী, বুড়িগোয়ালিনী, পদ্মপুকুর, গাবুরা, আটুলিয়া, নুরনগর ও ইশ্বরীপুর ইউনিয়নের পানির সংকট বেশি। তবে বেসরকারি খাত ওই জনপদে কিছু সুপেয় পানির উৎস তৈরি করেছে।
শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী বেসরকারি খাত পরিচালিত নিরাপদ খাবার পানির প্রকল্প ‘প্রবাহ’ পানি প্ল্যান্টে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই পানি নেওয়ার জন্য মানুষের দীর্ঘ সারি। তাদের কেউ কেউ দুই-তিন কিলোমিটার দূর থেকে এসেছেন। প্রতি লিটার ৩০ পয়সা দরে তারা পানি নিয়ে থাকেন। প্রবাহ প্রকল্পটি সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, আশাশুনি ও নলতা উপজেলায় মোট আটটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে। যার মাধ্যমে হাজারো মানুষ উপকার পাচ্ছে।
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের গাজীপাড়ার বাসিন্দা আবুবকর সিদ্দীক বলেন, বর্ষা মৌসুমের বাইরে অন্য ছয় মাস পানির জন্য খুবই চিন্তা করতে হতো। এই সময়ের বাইরে পুকুরের পানি পান করতেন। কিন্তু প্রবাহের পানি প্ল্যান্ট হওয়ার পর খুব সুবিধা হয়েছে। পানিবাহিত নানা অসুখ থেকে তাঁরা রেহাই পাচ্ছেন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর শ্যামনগরের উপসহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, খরা মৌসুমে দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে পুকুর-জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় পানির সংকট তীব্র হয়। এখানকার নলকূপ কার্যকর হচ্ছে না। আর স্থানীয় মানুষ পিএসএফ ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করেন না। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে পিএসএফগুলো কার্যকর থাকে না। সরকার নানাভাবে পানিসংকট সমাধানে কাজ করছে। কিছু বেসরকারি খাত ছোট পরিসরে হলেও এই সংকট নিরসনে চেষ্টা করছে।
দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের অন্তত চার কোটি মানুষ ভয়াবহ খাবার পানির সংকটে ভুগছে। এটা তাদের জীবনযাত্রার সবচেয়ে কঠিন সংকট। চারদিকে অফুরান পানি থাকলেও তা পানযোগ্য নয়। লবণাক্ততার বিস্তার মারাত্মক রূপ নিয়েছে। সুপেয় ও বিশুদ্ধ পানির আধার কমে গেছে। কুয়া, পুকুর, দীঘি, জলাশয়, খাল-বিল ইত্যাদি লবণাক্ততার গ্রাসে পরিণত হয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এমন কি লবণাক্ততা মাটির বিভিন্ন স্তরে প্রবেশ করেছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানিও আর লবণাক্ততামুক্ত নয়। দেশের দক্ষিণ-পূর্বের টেকনাফ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমের সাতক্ষীরা-খুলনা পর্যন্ত ৭১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলভাগের ১৯টি জেলা কমবেশি আগ্রাসী লাবণাক্ততার শিকার। লবণাক্ততার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষি। ধান উৎপাদন মারাত্মক বিপর্যয়ে পড়েছে। মাটিতে অতিরিক্ত লবণের কারণে ধানের গাছ বাড়ে না, শুকিয়ে যায়, শীষে দানা আসে না। ফলে ফলন আশানুরূপ হয় না। অনেক সময় ধানী জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখতে বাধ্য হয় কৃষক। এক পরিসংখ্যান মোতাবেক উপকূলীয় এলাকায় অন্তত ১০ লাখ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়েছে। কৃষির এই বিপুল ক্ষতি পূরণের কোনো উপায় নেই। কৃষির সঙ্গে মিঠা পানির ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। কৃষির জন্য মিঠা পানির পর্যাপ্ত যোগান অপরিহার্য। খাদ্যশস্য বা অন্য কোনো কৃষিপণ্য বাইরে থেকে আমদানি করে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু খাবার পানির মতো নিত্য প্রয়োজনীয় ও ব্যবহার্য উপকরণের চাহিদা সেভাবে পূরণ করা সহজসাধ্য নয়। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য খাবার পানি সংগ্রহ করা এখন অন্য যে কোনো কাজের চেয়ে বড় কাজ। সাধারণত মহিলা ও শিশুরা খাবার পানি সংগ্রহ করে থাকে। কলসী ও পাত্র নিয়ে তাদের মাইলের পর মাইল গিয়ে কোনো কুয়া, পুকুর বা অন্য কোনো উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। পানির এই অভাব বা সংকটকে পুঁজি করে বিভিন্ন এনজিও পানির ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। গভীর নলকূপ বসিয়ে তারা পাইপে পানি সরবরাহ করে। নির্দিষ্ট অংকের টাকা দিয়ে এই পানি কিনে নিতে হয়। কোথাও কোথাও এলাকার লোকজন একসঙ্গে মিলে গভীর নলকূপ বসায়। এজন্য এনজিওরা ঋণ দেয়। পর্যায়ক্রমে সুদাসলসহ এই টাকা পরিশোধ করতে হয়। এই ঋণ গ্রহীতাদের অধিকাংশই নারী। তারা অভিনব পানির ঋণে বন্দী হয়ে অসহায় অবস্থার শিকার হচ্ছে। ইনকিলাবের এক খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, কাগজে-কলমে ‘পানির ঋণ’ লেখা থাকে না। অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে যে ঋণ দেয়া হয় সেই ঋণের টাকার বিনিময়ে প্রতিদিনই পানি কিনতে বাধ্য হচ্ছে নারীরা। আবার নলকূপ বা গভীর নলকূপ বিকল বা অচল হয়ে পড়লে আবার ঋণ নিয়ে তা মেরামত করতে হয়। এভাবে এনজিও’র ক্ষুদ্র ঋণের নামে মহাজনী চক্রবৃদ্ধি সুদে সর্বসান্ত¦ হচ্ছে লাখ লাখ দরিদ্র মানুষ। এনজিও’র এরকম নির্বিচার শোষণে মানুষ অতিষ্ঠ ও ক্ষুব্।
উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠা পানির সংকট নতুন নয়। বিভিন্ন কারণে বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তনে এ সংকট বাড়তে বাড়তে এখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এক সময় চিংড়ী চাষের জন্য মিঠা পানির ধানী জমিতে সাগরের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ীর পোনা ছাড়া হতো। এভাবে চিংড়ীর চাষ হলেও ধান চাষের জন্য ওইসব জমি বন্ধা হয়ে যায়। এরূপ বহু জমি ধান চাষের অনুপযোগী হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঘূর্ণিঝড় ও জালোচ্ছ্বাসের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিডর, আইলা, ফনী, আস্ফান ইত্যাদি প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বিপুল সংখ্যক উপকূলবাসী হতাহতই হয়নি, তাদের ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত, বৃক্ষ-বাগান, ধ্বংস হয়েছে। আরো একটা বড় ক্ষতি হয়েছে এই যে, উপকূলভাগে লবণাক্ততার বিস্তার ঘটেছে এবং অনেক স্থানে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। সুপেয় পানির সংকট, লবণাক্ততা সম্প্রসারণের সংকট, আবাদ-উৎপাদনের সংকট, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সংকটসহ উপকূলীয় জনপদ সুরক্ষার, সংকট মোকাবিলার উপযুক্ত পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য বলে গণ্য হলেও গত ৫৪ বছরে কোনো সরকারই কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। উপকূলজুড়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও বনায়ন, সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার তাকিদ যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। যে সব বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়েছে, তা উঁচু ও টেকসই হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে সংস্কার-মেরামত উপেক্ষিত হয়েছে। বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে প্রতি বছরই বড় অংকের বরাদ্দ দেয়া হলেও তা তেমন কাজে আসে না। অনুরূপভাবে উপকূলীয় বনায়ন ও সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার জন্যও বরাদ্দ দেয়া হয়ে থাকে, যা কমই কাজে আসে। অরক্ষিত উপকূল অরক্ষিতই রয়ে গেছে, যা আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি ও দুর্ভোগের কারণ হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেশের মানুষের বিপুল প্রত্যাশা ছিল। যেহেতু পতিত স্বৈরাচারের সাড়ে ১৫ বছরে দুঃশাসন, খুন, জুলুম, লুটপাট, পাচার ইত্যাদিই ছিল মূল লক্ষ্য, সুতরাং গণপ্রত্যাশা অপূর্ণই থেকে গেছে। উপকূল সুরক্ষা ও উপকূলব্যবস্থাপনার কিছুই ওই সরকার করেনি। উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানির সংকট প্রকট আকার নিলেও তা সমাধানে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। চীন-শ্রীলংকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সাগরের পানি শোধন করে খাবারের পানিতে পরিণত করার ক্ষেত্রে সাফল্য দেখালেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার পূর্বের সরকারগুলোর মতোই আচরণ করছে। এ সরকার ‘এনজিও সরকার’ বলে অভিহিত হয়ে থাকে। এ কারণে এনজিওদের প্রভাব পতিপত্তি বেড়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলসহ সারাদেশেই তার প্রমাণের অভাব নেই। সাদা পাথর আর প্রবাল রক্ষায় সরকারের অতিরেক দায়িত্বশীলতা লক্ষ করা গেছে। অথচ উপকূল রক্ষা, যানজট নিরসন, আইন শৃংখলার উন্নয়ন, রাস্তাঘাটের সংস্কার, নাগরিক নিরাপত্তা প্রদান, চাঁদাবাজি প্রতিরোধ প্রভৃতি অতি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তার যথেষ্ট নজর আছে, এমন প্রমাণ নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানতম যে কাজ অর্থাৎ অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হাস্তানন্তরÑ সে ক্ষেত্রেও তার লেজেগোবর অবস্থা দৃশ্যমান। রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ নিয়ে সরকার এ যাবৎ যা করেছে তা সম্পূর্ণ বিফলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সংস্কারের পরিধি কতদূর হবে, জুলাই সনদের অবস্থান কোথায় হবে, তার বাস্তবায়নই বা কীভাবে হবে, সংবিধানে নেই, আরপিওতে নেই, এমন দাবি অর্থাৎ পিআর দাবিরই বা কী হবে এসব বিষয়ে, সরকারের কোনো বক্তব্য নেই। এটা তার দুর্বলতার লক্ষণ। কাজেই, তার উচিত সংস্কার ও জুলাই সনদ নিয়ে কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন সম্পন্ন করা। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা দরকার, দেশের গুরুতর সমস্যাসহ প্রতিদিনের সমস্যা নিয়ে সরকারের যেমন মাথাব্যথা নেই, তেমনি বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কাঙিক্ষত দায়িত্বশীলতাও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এটা কাম্য নয়। আগামীর ক্ষমতাকামী দলগুলোর উচিত জনগণের সংকট-সমস্যা, আশা-প্রত্যাশার সঙ্গে সব সময় সম্পর্কিত থাকা। সমাধান ও বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখা।
সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা ফাতেমা পান করার পানি সংগ্রহ করেন পুকুর থেকে। পুকুরের পানি কতটা নিরাপদ তার জানা নেই, তবে চাহিদা মেটাতে আর বিকল্প নেই। ভোরে অনেকেই কলসি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন পানির খোঁজে। কারণ সেটাই পান করবে সবাই, সেটাই ব্যবহার হবে রান্নায়। দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলের মানুষ এ পানি ব্যবহার করে আসছেন।
সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। ভৌগোলিক কারণে বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছে থাকায় জেলার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায় পানির সংকট অন্য উপজেলার চেয়ে বেশি। এসব এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বড় এসব এলাকার জনগোষ্ঠীকে খাবার পানির জোগানে একেক ঋতুতে একেক উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বৃষ্টির সময় রিজার্ভ ট্যাংকে পানি ধরে রাখা যায়। যা দিয়ে তিন-চার মাসও চলে যায়। বাকি সময় কখনও পুকুর ফিল্টার (পিএসএফ) বা সরাসরি পুকুরের পানি অথবা ব্যক্তি উদ্যোগে স্থাপিত লবণ বিমুক্তকরণ প্ল্যান্ট থেকে এখানকার মানুষের খাবার পানি পায়।
গরমের সময় প্রাকৃতিক উৎস বেশিরভাগই অচল থাকে। ফলে মানুষকে এই সময় পানি কিনে খেতে হয়। এই পানির দাম প্রতি লিটার এক টাকা।
২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে প্রচুর ক্ষতি হয় এই জেলার মানুষের। তারপর থেকেই পানির ভয়াবহ সংকট শুরু। এসময় সাতক্ষীরা পৌরসভা, শ্যামনগর ও আশাশুনিতে কয়েকটি এনজিও এগিয়ে আসে নিরাপদ পানি সরবরাহে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত, নদীর নাব্যতা হ্রাস ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া প্রভাব পড়ছে টিউবওয়েলের ওপরও। টিউবওয়েল থেকেও মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পাচ্ছে। আর লবণাক্ততার কারণে এ সব উৎসের পানি ব্যবহারও দুরূহ হয়ে উঠেছে।
সংকট দূর করতে ২০১৫ সাল থেকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে চাহিদা মেটানোর কাজ করছে ওয়াটারএইড। তাদের সহযোগিতায় সেটা বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় এনজিও রূপান্তর। এখন পর্যন্ত এসব এলাকার ৪১টি স্কুলে এবং ১৭টি কমিউনিটি ক্লিনিকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি ফিল্টার হয়ে চেম্বারে যাচ্ছে আর সেটি পান করছে স্কুলের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ।
মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের ত্রিপানি বিদ্যাপিঠের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন পানি খাচ্ছিল স্কুলের পেছনের দিঘি থেকে। তাতে নানারকম শারীরিক সমস্যার পাশপাশি স্কুলে আসার প্রবণতাও কমে যেত। ২০১৮ সালে এই স্কুলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। শিক্ষার্থীরা জানালো, তারা দিঘি থেকে সরাসরি পানি খেতো। পরে পানির স্থাপনা হওয়ার পর তারা এখান থেকেই পানি খায়।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো আবুল কালাম মল্লিক জানান, আগে অধিকাংশ শিশুই পানি নিয়ে আসতো বাড়ি থেকে। অনেক সময় দেখা গেছে পানির অভাবে হয়তো তারা ছুটি চাইতো। দুই-একদিন স্কুলেও আসতো না। এলাকায় এ সমস্যা দীর্ঘদিনের। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করায় কিছুটা সুবিধা হয়েছে। পানির কারণে আর শিক্ষার্থী ঝরছে না।
এই স্কুলে যে পানির চেম্বার করা করা হয়েছে সেটার ধারণক্ষমতা ২০ হাজার লিটার। রূপান্তরের কর্মকর্তারা জানান, এই সিস্টেমে একটি ডিসপেনসার পয়েন্ট আছে। এখান থেকে শিশুরা পানি নেয়। বৃষ্টি যখন হয় তখন পানিটা প্রথমে একটি লাইনে এসে পড়বে। পাইপের একটি পয়েন্টে ফিল্টার স্থাপন করা হয়েছে। এই ফিল্টার হওয়ার পর পানিটা ট্যাংকে চলে যাবে। তাছাড়া পাইপের সঙ্গে যুক্ত আছে ফাস্ট ফ্লাশিং সিস্টেম। বৃষ্টি যখন হয় তখন প্রথম বৃষ্টির পানিতে ময়লা থাকে। প্রথম ২৫-৩০ মিনিট এই ফাস্ট ফ্ল্যাশের মাধ্যমে ফেলে দিতে হয়। এই সময় পর সেটি বন্ধ করে দিলে পানি সরাসরি চেম্বারে চলে যাবে।
তিনি আরও জানান, আমরা হিসাব করি যে স্কুলে শিশুর সংখ্যা কত এবং তাদের জন্য ৯ মাসে কী পরিমাণ পানির প্রয়োজন। তার ওপর নির্ভর করে আমরা ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করি।
খাবার পানির মান সম্পর্কে ওয়াটার এইডের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার রিভেন চাকমা জানান, আমরা একটা মেকানিজমের মাধ্যমে পানিকে ফিল্টার করছি। ফিল্টার হওয়ার পর সেটি কতটুকু নিরাপদ সেটা নিশ্চিত করতে আমরা কয়েকটি প্যারামিটার পরীক্ষা করি। এগুলো হচ্ছে—ফিকাল কলিফরম, পিএইচ মাত্রা। ল্যাবরেটরি টেস্টের পর শতভাগ নিরাপদ হলে আমরা ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেই। ৯ মাস এই পানি যেহেতু থাকে আমরা ছয় মাস পর ।