1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৩ অপরাহ্ন

উপকূলীয় অঞ্চলে ফল চাষে উপযোগী ও সম্ভাবনা

  • প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের দক্ষিণে সাগর সংলগ্ন অঞ্চলকে বলা হয় উপকূলীয় অঞ্চল। এ দেশের আয়তনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূমি এই অঞ্চলে। মোট আবাদী জমির প্রায় ৩০ শতাংশ রয়েছে উপকূলীয় অঞ্চলে। এ অঞ্চল নানারকম প্রাকৃতি দূর্যোগে মোকাবেলা করে টিকে আছে ও ফসল উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। দেশের আগামি দিনের কৃষিতে সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে উপকূলীয় অঞ্চল। এ অঞ্চলের উপযোগী কিছু ফলচাষের ক্ষেত্রেও সৃষ্টি হয়েছে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। বিশেষ করে পেয়ারা, আমড়া, নারিকেল, সফেদা, কুল, জাম্বুরা, মাল্টা প্রভৃতি ফল অনেক চাষির ভাগ্য বদ সহায়ক হয়েছে।
এ দেশের প্রায় ২৮% মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করে। এসব অঞ্চলে জমি থাকলেও সেসব জমিতে লবণাক্তার প্রভাবে সারা বছর বহুমূখী ফসল চাষ করা কঠিন, বিশেষ করে ফল। প্রধান ফসল আমন ধান ছাড়া অন্য ফসল দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানে আবাদ হয় না। আবার লবণাক্ততা ও নিচু জমির কারণে ফলচাষ করাও কঠিন। তাই ফল উৎপাদনের প্রধান সুযোগ বা উৎস হলো হলো এ অঞ্চলের বসতবাড়ির আঙ্গিনাসমূহ। উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা সহ্য করে দামি ফল সফেদা ভালো হয়, সম্প্রতি মাল্টাও ভালো ফলন দিচ্ছে। তাই এ অঞ্চলের বসতবাড়ির জন্য উপযুক্ত ফলগাছ নির্বাচন করে আধুনিক নিয়ম মেনে চাষ করতে পারলে বহু রকমের ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।
এজন্য এ অঞ্চলে যেসব ফল ভালো হয়, স্থানীয়ভাবে সেসব ফলের পরিকল্পিত চাষের ওপর গুরুত্ব অবশ্যই দিতে হবে। ফল উৎপাদন করে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর জন্য প্রথমে বসতবাড়ির বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিতভাবে ফল চাষের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
যেসব নিচু জমিগুলোতে মাছের ঘের গড়ে উঠেছে, সেসব ঘেরের পাড়ে কুল, পেয়ারা, কলা, নারিকেল ইত্যাদি ফলের বাগান করে ফল উৎপাদন বাড়াতে হবে।
কাঠের গাছ লাগানো হচ্ছে যেসব জমিতে – সেখানে কাঠের গাছের সাথে ফলের গাছ লাগিয়ে এগ্রো ফরেস্ট্রি করতে হবে।
মাঝারি নিচু ধানের জমিতেও বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে ‘পিরামিড রেইজড বেড’ পদ্ধতিতে ক্ষেতের মাঝে মাঝে মাটির ঢিবি তৈরি করে সেখানে ফলগাছ লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
নিচু জমি, যেখানে প্রতিনিয়ত জোয়ার ভাটা চলে সেখানে নালা কেটে তার মাটি পাশে স্তুপ করে উঁচু বেড করে ‘সরজন’ পদ্ধতিতে ফলগাছের নার্সারি ও ফলবাগান করা যেতে পারে।
এসব উদ্যোগ নেয়ার আগে দেখতে হবে যে উপকূলীয় অঞ্চলে আসলে কোন কোন ফল ভালো হয়।
উপকূলীয় অঞ্চলে ফল উৎপাদনে বসতবাড়ির অঙ্গিনাকে গুরুত্ব বেশি দিতে হবে। প্রতিটি বসতবাড়ির বাগান থেকে শুধু সুপারি নয়, বারো মাস পাওয়া যায় এমন ফলগাছ নির্বাচন করতে হবে।
যে ফলের যে জাত এ অঞ্চলের বসতবাড়িতে ভালো হয় সেসব জাত নির্বাচন করতে হবে।
পরীক্ষামূলকভাবে কিছু নতুন ফল নিয়ে এ অঞ্চলে সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে গবেষণা করা যেতে পারে। যেমন ড্রাগন ফল।
এ অঞ্চলের বসতবাড়িতে কাঠ ও ফলগাছের বর্তমান গড় অনুপাত ৫ঃ১। অর্থাৎ এখনো এ অঞ্চলের মানুষ ফলের চেয়ে কাঠের গাছ লাগাতেই বেশি আগ্রহী। অনেকেরই ধারণা, কাঠের গাছ ঝড়—ঝাপটা থেকে বাড়িকে রক্ষা করবে। এ ধারণা থেকে তাদের বের করে আনতে হবে ও ফলগাছ রোপণের বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। প্রয়োজনে ভর্তুকি বা প্রণোদনা দিয়ে হলেও ফলগাছ লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
বহুস্তরী ফলগাছ মডেল বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
এগ্রো ফরেস্ট্রি বা ফসলের জমিতে ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে কিছু ফলগাছ লাগাতে হবে।
ফলচাষের কিছু বিশেষ কৌশলের প্রবর্তন বা সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে। বিশেষ করে নিচু জমিতে সরজন পদ্ধতিতে ফল চাষ, ডোয়ার্ফ হাইব্রিড নারিকেল চাষ, পিরামিড বেডে ফল চাষ, ঘেরের পাড়ে ফল চাষ, রাস্তার ধারে নারিকেল, আমলকি, হরিতকি, বহেড়া ইত্যাদি ফল চাষ করার কথা ভাবতে হবে।
এ অঞ্চলের কোনো বসতবাড়ির ফলগাছে সাধারণত কোনো পরিচর্যা করা হয় না, সার—সেচ দেয়া হয় না। বসতবাড়িতে বিদ্যমান ফলগাছসমূহের সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে।
কিছু কিছু ফলকে বাণিজ্যিক গুরুত্ব দিয়ে চাষের ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন— কুল, সফেদা, পেয়ারা, আমড়া, নারিকেল, মাল্টা, আম ইত্যাদি। সম্ভব হলে ছোট আকারে এসব ফলের প্রদর্শনী স্থাপন করে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
উপকূলীয় অঞ্চলে ফলগাছে ও ফলে উত্তরাঞ্চলের চেয়ে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। সেজন্য কৃষক প্রশিক্ষণসহ সেসব বালাই ব্যবস্থাপনার কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।
উপকূলীয় অঞ্চলে ফলচাষ সম্প্রসারণে স্থানীয়ভাবে মানসম্মত চারাকলমের উৎপাদন করা দরকার। ফলের চারা কলম উৎপাদনের জন্য এ অঞ্চলে কিছু উপজেলায় ইতোমধ্যে নার্সারি ব্যবসা রীতিমত শিল্পে রূপ নিয়েছে (স্বরূপকাঠী দৃষ্টান্ত)। তবে সেখানে মানের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে নার্সারি কমীর্দের প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। সরকারি হর্টিকালচার সেন্টারসমূহে মাতৃবাগান করে সেখান থেকে উন্নত জাতের সায়ন বা কলমদ্রব্য স্থানীয় নার্সারি কমীর্দের কাছে সরবরাহ করা যেতে পারে।
ফলভিত্তিক শিল্প স্থাপন করে এ অঞ্চলের মানুষের আয় বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে নারিকেলভিত্তিক বহুমুখী শিল্প (পিরোজপুরের নেছারাবাদের দৃষ্টান্ত), পেয়ারার জ্যাম—জেলী, অরবরই, বরই, কেওড়া, কাউফল ইত্যাদির আচার তৈরির কারখানা স্থাপন করা যায়।
সর্বোপরি উপকূলীয় অঞ্চলে চাষের উপযোগী ফলগাছ বাছাই ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফলের জাত উদ্ভাবনে গবেষণা কার্যক্রম করতে হবে সুপরিকল্পিতভাবে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর আরও অনেক দেশেই আমাদের দেশের মতো উপকূলীয় অঞ্চল রয়েছে। সমভাবাপন্ন আবহাওয়ায় সেসব দেশে উপকূলীয় অঞ্চলে ফলচাষের অগ্রসরমান অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগানো যেতে পারে।
উপকূলীয় অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ুতে এখন অনেক ফলই ভালো হচ্ছে। ইতোমধ্যে কোনো কোনো ফলের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালি, লতাচাপালী, ভোলার চর ফ্যাশন ইত্যাদি স্থানে এখন প্রচুর পরিমাণে তরমুজের চাষ হচ্ছে। এ অঞ্চলের বসতবাড়িতে কি কি ফল ভালো হয় তা এসব অঞ্চলের বসতবাড়ি ও ঘেরগুলো ঘুরে একটু জরিপ চালালেই বুঝা যায়। এর জন্য খুব বেশি গবেষণার দরকার হয় না। তারপরও নতুন ফল বা নতুন জাতের ফল চাষ সম্প্রসারণে অবশ্যই স্থানপযোগী বিশেষ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। দ্বীপসমূহের বসতবাড়িতে ফলগাছ কম রয়েছে। দ্বীপসমূহে নারিকেলগাছের প্রাধান্য বেশি। এ তালিকার বাইরেও কিছু ফল উপকূলীয় অঞ্চলের বসতবাড়িসমূহে চাষ হচ্ছে বা চাষ করা যেতে পারে। যেমন – পেঁপে, স্ট্রবেরি, কলা, অরবরই বা নোয়াল, বিলিম্বি, জংলিবাদাম, পানিফল, আমরুল, বৈঁচি, লুকলুকি, বাঙ্গি, মরমা ইত্যাদি। ঘেরের পাড়ে কুল, কলা ও আম্রপালি আম চাষে বেশ সাফল্য দেখা যাচ্ছে। বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার ঘেরগুলোর পাড়ে নারিকেল চাষেও সফলতা পাওয়া দেখা গেছে। কক্সবাজার, বাগেরহাট, নোয়াখালী, বাগেরহাটে সুপারি খুব ভাল হচ্ছে। পিরোজপুর, বরিশাল ও ঝালকাঠীতে বিলাতি গাব ভাল হচ্ছে। খুলনায় নোয়াল ও বিলিম্বি চাষে ভাল ফল দেখা গেছে। পিরোজপুরে মাল্টার বাণিজ্যিক বাগান গড়ে উঠেছে। সাতক্ষীরায় বাণিজ্যিকভাবে এখন পানিফলের চাষ হচ্ছে।
উপকূলীয় অঞ্চল আমচাষের জন্য উপযোগী নয়, এমন ধারণাই এতকাল ছিল। বিশেষ করে জলমগ্নতা, জোয়ারভাটার প্লাবন, লবণাক্ততা, আমের মুকুল আসার সময় গরম আবহাওয়া, অধিক ঝড়বাতাস, আমের পোকা ইত্যাদি কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে অতীতে আম উৎপাদন ভালো হতো না। কিন্তু এখন কিছু কিছু জাতের আম বিশেষ প্রযুক্তি মেনে চাষ করে সাফল্য পাওয়া গেছে। সাতক্ষীরার আম এখন ইউরোপের বাজারে রপ্তানী হচ্ছে। সেখানকার গোবিন্দভোগ, বোম্বাই, আম্রপালি, লতাবোম্বাই, নীলাম্বরী ইত্যাদি জাতগুলো বেশ ভালো ফলন দিচ্ছে। উপকূলের বসতবাড়িসমূহে ইতোমধ্যে আম্রপালি জাতটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ও ভালো ফল দিচ্ছে। বারি আম ৪ জাতটিও এ অঞ্চলে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। থাই পেয়ারা চাষের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বিশেষ করে পুকুরপাড়ে ও ঘেরের পাড়ে থাই পেয়ারা, পেঁপে, ডোয়ার্ফ নারিকেল ইত্যাদি চাষ করা যায়। ঘেরের পাড়ে কলা, কুল, তরমুজ ইত্যাদি ভালভাবে জন্মে। সম্ভাবনাময় সফেদা ফল বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বসতবাড়িতে চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোটেকনোলজি বিভাগের গবেষকবৃন্দ লবণাক্ততা সইতে পারে কোন কোন ফলের গাছ তা নিয়ে গবেষণা করে সফলতা পেয়েছেন বলে জানা গেছে। তারা পেয়ারা, কাঁঠাল, স্যাপোডিলা বা সফেদা, কুল, জাম্বুরা— এই পাঁচটি ফল নিয়ে গবেষণা করে এসব ফলের কিছু নতুন জাত উদ্ভাবনের পথে রয়েছেন। তারা আশা করছেন, হয়তো আগামি তিন বছরের মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকরা এসব নতুন জাতের ফল চাষ শুরু করতে পারবেন। সেসব ফলের স্বাদও যাতে ভালো হয় সেজন্য তারা গবেষণায় সে বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ অঞ্চলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কাজুবাদাম চাষের সম্ভাবনা নিয়েও গবেষণা করছেন।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।