
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সুন্দরবন উপকূলের মানুষকে বাঁচিয়েছেন দুই শতাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ । প্রাকৃতিক দুর্যোগের দ্বিতীয় পাঠ।১৯৮৩ (১৪-১৫ অক্টোবর) উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহ এবং চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর চরাঞ্চলে ঘণ্টায় ১২২ কিমি বায়ুপ্রবাহসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। ৪৩ ব্যক্তি নিহত, ৬টি মাছধরার ট্রলার ও ১টি যন্ত্রচালিত নৌকা নিমজ্জিত হয়। ১৫০ জন মৎস্যজীবী ও ১০০ মাছধরার নৌকা নিখোজ হয় এবং ২০% আমন ফসল বিনষ্ট হয়।
১৯৮৩ (৫-৯ নভেম্বর) ঘণ্টায় ১৩৬ কিমি বেগে বায়ুপ্রবাহ ও ১.৫২ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাসসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড় চট্টগ্রাম, কুতুবদিয়ার সন্নিকটস্থ কক্সবাজার উপকূল ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপের নিম্নাঞ্চল, টেকনাফ, উখিয়া, ময়িপং, সোনাদিয়া, বরিশাল, পটুয়াখালী এবং নোয়াখালীর উপর দিয়ে বয়ে যায়। ৫০টি নৌকা সহ ৩০০ মৎস্যজীবী নিখোঁজ হয় এবং ২,০০০ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়।
১৯৮৫ (২৪-২৫ মে) তীব্র ঘূর্ণিঝড় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী এবং উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহে (সন্দ্বীপ, হাতিয়া এবং উড়িরচর) আঘাত হানে। বাতাসের গতিবেগ ছিল চট্টগ্রামে ১৫৪ কিমি/ঘণ্টা, সন্দ্বীপে ১৪০ কিমি/ঘণ্টা, কক্সবাজারে ১০০ কিমি/ঘণ্টা এবং সেইসঙ্গে ৩.০-৪.৬ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস সংঘটিত হয়। এতে ১১,০৬৯ ব্যক্তি নিহত হয় এবং ৯৪,৩৭৯টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও মোট ১,৩৫,০৩৩ পশুসম্পদ বিনষ্ট হয়। মোট ৭৪ কিমি সড়ক ও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৯৮৬ (৮-৯ নভেম্বর) উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহ এবং চট্টগ্রাম, বরিশাল, পটুয়াখালী ও নোয়াখালীর চরাঞ্চল ঘূর্ণিঝড়ের শিকার হয়। বাতাসের গতিবেগ ছিল প্রতি ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১১০ কিমি এবং খুলনায় ৯০ কিমি। এতে ১৪ ব্যক্তি নিহত হয় এবং ৯৭,২০০ হেক্টর জমির ফসল বিনষ্ট হয়।
১৯৮৮ (২৪-৩০ নভেম্বর) যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহ এবং খুলনা-বরিশালের চরাঞ্চলের উপর দিয়ে ঘণ্টায় ১৬২ কিমি বেগে বায়ুপ্রবাহসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। মংলায় ৪.৫ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস সংঘটিত হয়। এতে ৫,৭০৮ ব্যক্তি নিহত হয় এবং ৬৫,০০০ গবাদিপশু মারা যায়। বহুসংখ্যক বন্য পশু মারা যায় – তার মধ্যে হরিণ ১৫,০০০ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার ৯; এবং ফসল বিনষ্ট হয় প্রায় ৯৪১ কোটি টাকার।
১৯৯১ (২৯ এপ্রিল) এ ঝড়টিকে ‘১৯৯১-এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়’ নামে চিহ্নিত করা হয়। এটি ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল রাত্রে বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করে। ঝড়টির উৎপত্তি হয় প্রশান্ত মহাসাগরে, বাংলাদেশের ভূখন্ড থেকে ৬,০০০ কিমি দূরে। বাংলাদেশের উপকূলে পৌঁছাতে ঝড়টির সময় লেগেছিল ২০ দিন। আকারের দিক থেকে ঘূর্ণিঝড়টির বিস্তার ছিল বাংলাদেশের আকৃতির চেয়েও বড়। কেন্দ্রীভূত মেঘপুঞ্জের ব্যাস ছিল ৬০০ কিমি। বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল সন্দ্বীপে ঘণ্টায় ২২৫ কিমি। এ ছাড়া অন্যান্য ঝড় কবলিত অঞ্চলে বাতাসের গতিবেগ ছিল নিম্নরূপ: চট্টগ্রামে ঘণ্টায় ১৬০ কিমি, খেপুপাড়া (কলাপাড়া) ১৮০ কিমি, কুতুবদিয়া ১৮০ কিমি, কক্সবাজার ১৮৫ কিমি এবং ভোলা ১৭৮ কিমি। নোয়া-১১ (NOAA-11) উপগ্রহের ২৯ এপ্রিল ১৩ঃ ৩৮ ঘণ্টায় তোলা দূর অনুধাবন চিত্র অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়টির বাতাসের প্রাক্কলিত সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৪০ কিমি। স্পারসো (SPARRSO) সর্বপ্রথম ২৩ এপ্রিল তারিখে নোয়া-১১ এবং জিএমএস-৪ (GMS-4) উপগ্রহগুলি থেকে গৃহীত চিত্র বিশ্লেষণ করে ঘূর্ণিঝড়টিকে একটি নিম্নচাপ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল (যার বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৬২ কিমি এর নিচে)। নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয় ২৫ এপ্রিল। প্রাথমিক অবস্থায় ঘূর্ণিঝড়টি কিছুটা উত্তরপশ্চিম দিকে পরে উত্তর দিকে সরে যায়। ২৮ এপ্রিল থেকে এটি উত্তরপূর্ব দিকে সরে আসা শুরু করে এবং ২৯ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম বন্দরের উত্তর দিয়ে বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করে। ঘূর্ণিঝড়টি ওই দিন সন্ধ্যা থেকেই উপকূলীয় দ্বীপ সমূহে (যেমন নিঝুম দ্বীপ, মনপুরা, ভোলা, সন্দ্বীপ) আঘাত হানতে শুরু করেছিল। ঘূর্ণিঝড়কালীন ঝড়ো জলোচ্ছ্বাসের প্রাক্কলিত উচ্চতা ছিল ৫ থেকে ৮ মিটার। এ দুর্যোগে জীবন ও সম্পদ ক্ষতির পরিমাণ বিশাল। সম্পদের প্রাক্কলিত আর্থিক ক্ষতি ৬,০০০ কোটি টাকা। মোট ১,৫০,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, গবাদিপশু মারা যায় ৭০,০০০।
১৯৯১ (৩১ মে থেকে ২ জুন) উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহ এবং পটুয়াখালী, বরিশাল; নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের চরাঞ্চলে ঘণ্টায় ১১০ কিমি বায়ুপ্রবাহ ও ১.৯ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাসসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়। মানুষ ও গবাদিপশুর প্রাণহানিসহ বেশ কিছু নৌযান নিখোঁজ হয় এবং ফসল বিনষ্ট হয়।
১৯৯৪ (২৯ এপ্রিল ৩মে) উপকূলবর্তী দ্বীপ এবং কক্সবাজারের চরাঞ্চল ঘণ্টায় ২১০ কিমি বায়ুপ্রবাহসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের শিকার হয়। প্রায় ৪০০ মানুষের মৃত্যু এবং ৮,০০০ গবাদিপশুর প্রাণহানি ঘটে।
১৯৯৫ (২১-২৫ নভেম্বর) উপকূলবর্তী দ্বীপ এবং কক্সবাজারের চরাঞ্চলে ঘণ্টায় ২১০ কিমি বেগে বায়ুপ্রবাহসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। প্রায় ৬৫০ জনের মৃত্যু ও ১৭,০০০ গবাদিপশুর প্রাণহানি ঘটে।
১৯৯৭ (১৬-১৯ মে) উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহ এবং চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী ও ভোলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ঘণ্টায় ২২৫ কিমি বায়ুপ্রবাহ ও ৩.০৫ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাসসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের (হারিকেন) শিকার হয়। সরকার ও জনসাধারণের যথাযথ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে এ মহাদুর্যোগে মাত্র ১২৬ জন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে।
১৯৯৭ (২৫-২৭ সেপ্টেম্বর) হারিকেনের তীব্রতাসম্পন্ন প্রবল ঘূর্ণিঝড় ও ১.৮৩ থেকে ৩.০৫ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহ এবং চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী এবং ভোলার চরাঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যায়।
১৯৯৮ (১৬-২০ মে) উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহ এবং চট্টগ্রাম কক্সবাজার ও নোয়াখালীর চরাঞ্চল ঘণ্টায় ১৫০ কিমি বায়ুপ্রবাহ ও ১.৮৩ থেকে ২.৪৪ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাসসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের শিকার হয়।
১৯৯৮ (১৯-২২ নভেম্বর) উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহ এবং খুলনা বরিশাল ও পটুয়াখালীর চরাঞ্চল ঘণ্টায় ৯০ কিমি বায়ুপ্রবাহ ও ১.২২ থেকে ২.৪৪ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাসসহ ঘূর্ণিঝড়ের শিকার হয়।
২০০৭ (১৫-১৭ নভেম্বর) ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ভূমিধ্বসের মাধ্যমে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে যাতে প্রায় তিন সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানী ঘটে।
২০০৮ (৩ মে) ঘুর্ণিঝড় ‘নার্গিস’ উত্তর ভারত মহাসাগরে সৃষ্টি হয়। যা মায়ানমারের উপকূলে আঘাত হানে। এতে প্রায় ১,৩৮,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
২০০৮ (২৭ অক্টোবর) ঘুর্ণিঝড় ‘রেশমী’ বাংলাদেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানে। বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় ৮০ কিমি এবং প্রচুর ঝড়বৃষ্টিতে জাহাজ ও মৎস্যশিল্পের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়।
২০০৯ (১৯-২১ এপ্রিল) ঘূর্ণিঝড় ‘বিজলি’ বাংলাদেশে মৃদুভাবে আঘাত হানে এবং এই ঝড়ের প্রভাবে চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার অঞ্চলে কিছু কাঁচা ঘরবাড়ি ও ফসলী জমি ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া তেমন বৃহত্তর কোন ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
২০০৯ (২৭-২৯ মে) ঘুর্ণিঝড় ‘আইলা’ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিাঞ্চলে ১৫টি উপকূলীয় জেলায় আঘাত হানে যাতে প্রায় দেড় শতাধিক মানুষের প্রানহানি ঘটে, দুই লক্ষাধিক ঘরবাড়ি এবং তিন লক্ষাধিক একর আবাদি জমি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়।
বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো রকেট অথবা উপগ্রহ সুবিধা নেই, তবে উন্নত দেশের উৎক্ষিপ্ত উপগ্রহ থেকে আবহাওয়ার চিত্র গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে। ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) আবহাওয়া উপগ্রহসমূহ থেকে চিত্র গ্রহণের জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় চিত্র প্রেরণ ভূকেন্দ্র (ATP or Automatic Picture Transmission Ground Station) প্রতিষ্ঠিত হয়। নাসা (NASA)-র তত্ত্বাবধানে ইউএসএইডের (USAID) আর্থিক সহযোগিতায় সম্প্রতি এ কেন্দ্রে উপগ্রহ থেকে চিত্র গ্রহণ ও বিশ্লেষণে উন্নত প্রযুক্তির সাজসরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে। এ সকল উন্নত সরঞ্জামের সাহায্যে যুক্তরাষ্ট্রের নোয়া-১৪, নোয়া-১৫ এবং জাপানি জিএমএস-৫ উপগ্রহসমূহ থেকে ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত তথ্য গ্রহণ করা হচ্ছে। জিএমএস উপগ্রহগুলি প্রতি ঘণ্টায় তথ্য প্রেরণ করে। নোয়া উপগ্রহগুলির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে প্রতি ছয় ঘণ্টা পর পর। বর্তমান আধুনিক সরঞ্জামের সাহায্যে আবহাওয়া চিত্রে অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ ও বাংলাদেশের সীমারেখা চিহ্নিত করা যায়। চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। এ উন্নত ব্যবস্থার কারণে বঙ্গোপসাগারের কোনো ঘূর্ণিঝড়ই এখন আর দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে না।
একটি তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসাত্মক শক্তি হাজার হাজার মেগাটন আনবিক বোমার শক্তির সঙ্গে তুলনীয়। স্বভাবতই এ প্রচন্ড শক্তিকে হ্রাস বা পরিমিতকরণ বর্তমান প্রযুক্তিগত অগ্রসরতার যুগেও অনেকাংশেই দুঃসাধ্য। যুক্তরাষ্ট্র আটলান্টিক মহাসাগরে সিলভার আয়োডাইড ছড়িয়ে বাতাসের উচ্চ মাত্রার গতিকে প্রশমিত করার পরীক্ষা চালিয়েছে। যদিও এ ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা খুবই আশাব্যঞ্জক কিন্তু এখনও তা নিষ্পত্তিহীন একটি পর্যায়ে রয়েছে। অধিকন্তু এক্ষেত্রে ঘূর্ণিঝড়ের দিক পরিবর্তন এবং অন্য দেশের দিকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়গুলির সৃষ্টি প্রতিহত করা বা তীব্রতাকে হ্রাস করার ক্ষেত্রে অন্যান্য যে পদ্ধতিগুলির কথা বলা হচ্ছে তা হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের সম্ভাব্য এলাকায় তেল ছড়িয়ে দিয়ে পানির উপর বিস্তৃত একটি পাতলা স্তর সৃষ্টি করা অথবা রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহার করে বাষ্পীভবনের হার কমিয়ে ফেলা। তবে এ ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা পরিচালনা বা বাস্তবায়নের পূর্বে ভয়াবহ সমুদ্র দূষণের বিষয়টি গুরুত্বসহ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভূমিকম্প বা অগ্ন্যুৎপাতের মতো ঘূর্ণিঝড়ও একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। বাংলাদেশকে এ দুর্যোগের পুনঃপুন সংঘটনের জন্য প্রস্ত্তত থাকতে হবে। ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং কার্যকর নিরাপত্তা ও ত্রাণ কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসযজ্ঞকে অনেকাংশেই প্রতিহত করা সম্ভব। ঘূর্ণিঝড়ের প্রচন্ডতাকে আংশিক প্রশমণের এটাই একমাত্র পথ।
বর্তমানে বাংলাদেশের রয়েছে একটি ব্যাপক ঘূর্ণিঝড় প্রস্ত্ততিমূলক কর্মসূচি (সিপিপি)। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে কর্মসূচিটি পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলের ১৯৫টি ইউনিয়নের ২,০৪৩টি ওয়ার্ডে নিয়োজিত ৩২,০০০ স্বেচ্ছাসেবী সদস্য এ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় তার করণীয় সম্পর্কে সজাগ এবং প্রস্ত্তত। প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি বেতারযন্ত্র, একটি মেগাফোনসহ সাইরেন, একটি সংকেত টর্চলাইট এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। প্রায় প্রতিটি উপজেলায় ওয়ারলেস সেট দেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা হয়।
সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানসহ সমগ্র সরকারি প্রশাসন যৌথভাবে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা কার্যকর করে। ঘূর্ণিঝড় বা এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন ও অংশগ্রহণের জন্য সরকারের স্থায়ী আদেশ রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ এবং প্রস্ত্ততিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে লক্ষণীয় উন্নতি করেছে। ১৯৯৭ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের সময় গৃহীত সতর্কীকরণ এবং প্রস্ত্ততিমূলক ব্যবস্থার বিস্তৃত কার্যক্রম বর্তমানের এ উন্নতিতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় এ পর্যন্ত ২,৫০০ ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বনায়ণের জন্য উপকূলীয় সবুজবেষ্টনী প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। উন্নত ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং আসন্ন ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বে জনগণকে এর মোকাবেলায় যথাযথ প্রস্ত্ততি দুর্যোগে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী বলে প্রতীয়মান হয়।