
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সুন্দরবন এখন দুষ্কৃতকারীদের বাপ-দাদার সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে । প্রতিনিয়ত বিষ দিয়ে মাছ শিকার, হরিণ শিকার দুষ্কৃতকারীদের দৈনন্দিন ব্যবসা। এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে উপকূলীয় অঞ্চলের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি , মহাজন ও আড়ৎত দাররা। বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সুন্দরবনের অপরাধ নিয়ে যত তৎপরতা হচ্ছে তার চেয়ে তৎপরতা হচ্ছে অসাধু দুষ্কৃতিকারীরা। সুন্দরবন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যবর্তী একটি বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বনভূমি। বঙ্গোপসাগরের উত্তরে বাংলাদেশের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার উপকূলীয় অঞ্চলে সুন্দরবনের প্রধান অংশ অবস্থিত। এর মোট আয়তনের প্রায় ৬২ শতাংশ বাংলাদেশ অংশে। সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, যা ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এটি পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। এখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির, বানর, উভচর প্রাণীসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিরল ও বিপন্ন প্রাণীর বসবাস। এ বনে ৩২২টিরও বেশি প্রজাতির মাছ, ৩২০ প্রজাতির পাখি, ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ ও আট প্রজাতির উভচর প্রাণীর আবাস রয়েছে। এ ছাড়া সুন্দরবনে ৩৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে, যা এর পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
সুন্দরবন বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য একটি প্রাকৃতিক ঢাল। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সামুদ্রিক ঝড়ের সময় সুন্দরবনের ঘন বৃক্ষরাজি বাফার জোন হিসেবে কাজ করে। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার জনবসতি, চাষাবাদ ও অবকাঠামো ভয়াবহ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায়। সুন্দরবন যে পরিমাণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করে, তার আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন। সিডর, আইলা ও আম্পানের সময় সুন্দরবন না থাকলে উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কয়েকগুণ বেশি হতো। সুন্দরবন থেকে মধু, কাঠ, গোলপাতা, মাছ ও কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করা হয়, যা লাখো মানুষের জীবিকার উৎস। পর্যটন খাতেও সুন্দরবনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি বছর দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
কিন্তু সুন্দরবন আজ নানারকম হুমকির মুখে পড়েছে, যার বেশিরভাগই মানবসৃষ্ট। সুন্দরবনের কাঠ ও গোলপাতার ব্যাপক চাহিদার কারণে প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ সুন্দরবনের বিরল প্রাণীগুলোর শিকার ও পাচার এ বনের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। সুন্দরবনের আশপাশে শিল্পকারখানার বর্জ্য ও তেল নিঃসরণ সরাসরি নদীতে পড়ায় জলজ পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, এতে মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। সুন্দরবনের কাছাকাছি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সুন্দরবনের পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সুন্দরবন সংরক্ষণে বন বিভাগের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। ড্রোন ও স্যাটেলাইট মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। অবৈধ কাঠ আহরণ, বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচার বন্ধে কঠোর আইনের সঠিকভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সুন্দরবনের আশপাশে শিল্প ও অবকাঠামো নির্মাণে কঠোর পরিবেশগত মূল্যায়ন ও পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। ইউনেসকোসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় সুন্দরবনের টেকসই সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের দায়িত্ব হলো এ অমূল্য সম্পদকে আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা, যাতে সুন্দরবন সবসময় আমাদের রক্ষাকবচ হয়ে থাকতে পারে।
সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে হরিণ শিকারিরা। বিভিন্নভাবে বনে ঢুকে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করছেন তারা। শিকার করা হরিণের মাংস বিক্রয় করা হচ্ছে চড়া দামে। মাঝে মধ্যে অভিযানে কিছু মাংস ধরা পড়লেও অধিকাংশ থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেওড়া গাছের পাতা ও ফল হরিণের অন্যতম খাদ্য। এ এলাকায় হরিণ থাকে বলে শিকারিরা কেওড়া গাছের স্থলে শিকারের জন্য বেশি ফাঁদ পাতে। এরমধ্যে কাঠকাটা, জসিং এবং মহেশ্বরপুর অন্যতম জায়গা। শিকারিরা সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল দিয়ে এসব জায়গায় বেশি যাতায়াত করে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা রেঞ্জের কোবাদক স্টেশন, বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন এবং কৈখালী স্টেশন, সুন্দরবনের মোংলা, খুলনার পাইকগাছা ও শরণখোলা এলাকা থেকে শিকারিরা বনে প্রবেশ করে।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, হরিণ শিকার করে অসাধুরা মাংস পাচারের অন্যতম পথ হিসেবে ব্যবহার করে বনের বিভিন্ন খাল। হরিণের মাংস কেজিপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকায় বিক্রয় করে শিকারিরা। এছাড়াও ২০২৪ সালের পুরো বছরের জরিপে ২০ জন চোরাশিকারি গ্রেফতারের তথ্য বন বিভাগের নিকট থাকলেও শিকারির সংখ্যা আরও বেশি। অনেকে আবার ধরাই পরে না। ২০২৪ সালে বন বিভাগের তথ্যে ১৫০০টি হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধারের বিষয় অবগত করা হলেও এ ধরনের ফাঁদ ব্যবহার করে হরিণ শিকারের ঘটনা ঘটছে অহর
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, সুন্দরবনে হরিণ শিকার, মাংস বিক্রয় এবং ভক্ষণ অনাকাঙ্ক্ষিত একটি প্রচলিত রীতিতে পরিণত হয়েছে। শুধুমাত্র স্থানীয়দের মধ্যে নয় বরং সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে হরিণের মাংসের প্রতি রয়েছে একটা বিশেষ ঝোঁক।
অথচ সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের তিনটি শ্রেণির মধ্যে হরিণ প্রথম শ্রেণিভুক্ত খাদক। কোনো শ্রেণির খাদক বিলুপ্ত হলে বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ, এক স্তরের প্রাণী তার নিচু স্তরের প্রাণীর ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। কিন্তু একশ্রেণির অসাধুচক্র সুযোগ পেলেই হরিণ শিকার করেন। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে পর্যটনের অজুহাতে অসাধু চক্র সুন্দরবনে প্রবেশ করে বিভিন্নভাবে হরিণ শিকার করে।
তিনি আরও বলেন, হরিণসহ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে দেশে কঠোর আইন রয়েছে। যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাস্তবায়ন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে। পরিবেশ ও সম্পদকে অপূরণীয় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, হরিণ শিকার বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কেওড়া গাছ এলাকায় নিয়মিত পেট্রোলিং এবং সিপিজি টিম এর মাধ্যমে নিয়মিত টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়াও হরিণ শিকার প্রতিরোধে এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে সচেতনতামূলক প্রচার অব্যাহত রয়েছে।: সুন্দরবনের ভেতরে প্রবাহিত খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছেই। বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অসাধু জেলেদের একটি চক্র।
এই বিষ প্রয়োগে মাছ আহরণ অব্যাহত থাকলে এক সময় সমগ্র সুন্দরবন এলাকায় মৎস্যশূন্য হয়ে যাবে এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসহ উদ্ভিদ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।
অনুসন্ধান করে জানা যায়, জেলেরা সুন্দরবনের খালে জোয়ারের আগে চিঁড়া, ভাত বা অন্য কিছুর সঙ্গে কীটনাশক মিশিয়ে খালের পানিতে ছিটিয়ে দেয়।
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পানিতে ভেসে ওঠে। জেলেরা ওই মাছ ধরে স্থানীয় আড়তসহ বিভিন্ন হাটবাজারে সরবরাহ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, এক শ্রেণির অসাদু বনরক্ষীদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে জেলেরা বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করছেন। এজন্য ট্রলার প্রতি ১০ হাজার এবং নৌকা প্রতি ৫ হাজার টাকা গুনতে হয় তাদের।
বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে তারা অভয়ারণ্যের খালে বিষ দিয়ে অল্প সময়ে অধিক মাছ শিকার করে থাকেন। এছাড়া জেলেদের শিকার করা মাছ নিরাপদে লোকালয়ে পৌঁছাতেও টাকা দিতে হয় স্থানীয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। মাঝেমধ্যে ২/১ জন ধরা পড়লেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধচক্রটি দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
জানা যায়, সুন্দরবনে পর্যটকসহ মাছ ও কাঁকড়া আহরণে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার মধ্যে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় অব্যাহতভাবে চলছে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের কার্যক্রম। বনবিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন অভিযান চালিয়েও দমন করতে পারছেন না তাদের।
সুন্দরবন উপকূলবর্তী কয়রা উপজেলার ইয়াসিন, কামাল, আল আমিনসহ বেশ কয়েকজনের পাশাপাশি বন বিভাগের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তি, কয়েকজন মৎস্য আড়তদার, দাদনদাতা এমনকি সংবাদকর্মীদের ছত্রছায়ায় অসাদু জেলেরা সুন্দরবনে প্রবেশ করে। তাদের সঙ্গে আছে এক শ্রেণির কীটনাশকবিক্রেতা। চক্রের লোকজন ওই বিক্রেতাদের কাছ থেকে অবাধে কীটনাশক সংগ্রহ করে তা মাছ ধরার কাজে অপব্যবহার করছে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে বনবিভাগের কিছু অসাদু বনরক্ষী ও কর্মকর্তা উৎকোচের বিনিময়ে এসব দেখেও না দেখার ভান করেন। ফসলের পোকা দমনে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক দিয়ে এসব মাছ শিকার করা হয়। এর মধ্যে ডায়মগ্রো, ফাইটার, রিপকর্ড এবং পেসিকল নামক কীটনাশকই বেশি ব্যবহার করেন জেলেরা।
স্থানীয়রা জানান, সুন্দরবনের কয়রা অংশের তেঁতুলতলার চর, ৬ নং কয়রা, ৪ নং কয়রা, জোড়সিং, নীলকোমল, মোংলার ঢাংমারী, মরাপশুর, জোংড়া, ঝাপসি, ভদ্রা, নীল কমল, হরিণটানা, কোকিলমুনী, হারবাড়িয়াসহ শরণখোলা, বটিয়াঘাটা, শ্যামনগর, আশাশুনির বেশ কয়েকজন মৎস্যদস্যু বিষ দিয়ে মাছ ধরছে। পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জার,দোবে কি ,খবরাখালী ,দার গান ,কাশিঘাটা ,১৮বেকী ,ফিরিঙ্গিয়া ,উলবাড়িয়া ,হাতি ভাঙ্গা ,চালতেবাড়িয়া ,উলুবাড়িয়া ,বেইলা, কয়লা ,তাল পট্টি ,ইলশেমারি ,লটারি বেকি ,পুষ্পকাটি ,মান্দারবাড়ীয়া, দিপির মাদিয়া ,হাড়িভাঙ্গা ,চুনকুড়ি ,দত্তেখালি, খাসি টানা সহ সুন্দরবনের অসংখ্য নদীখালী বিষ দিয়ে মাছ শিকার করে এই সমস্ত মাছ জেলেরা শ্যামনগরের সোনার মোড়ের মৎস্য আড়তে অবাধে বিক্রয় করছে এই সোনার মোড়ের কিছু অসাধ আড়ৎদার
রয়েছে তারা মাছ কেনার জন্য এই সমস্ত বিষপেরকারী অসাধু জেলেদের কীটনাশক সরবরাহ করে থাকে । বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন মানুষের মধ্যে জল্পনা কল্পনা চলছে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সকলকে প্রতিদিন সোনার মোড়ের আড়তে নজরদারি অথবা অভিযান চালালে বিষ দেওয়া মাছ আটক করা যাবে সেই সাথে যারা জড়িত রয়েছে এবং যে সমস্ত আড়ত দাররা
বিষ প্রয়োগে সহায়তা করে তাদেরকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসা সহজ হবে। প্রতিদিন শ্যামনগর উপজেলার সোনার মোড় ও গোয়ালবাড়ি মৎস্য আরতে শত শত মন বিষ দেওয়া সুন্দরবনের নানা প্রকার মাছ করায় বিক্রি হয়ে থাকে । এই সমস্ত বিষফরকারীদের সাথে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে কিছু প্রভাবশালী আদ্দাররা তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারলে সুন্দরবনে বিস্ফোরকের হার কমিয়ে আসবে সেজন্য এই সমস্ত প্রভাবশালী আরাধ্যারদের চিহ্নিত করতে হবে ।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা করা হয়। এ সময় বনের নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরার পাশাপাশি পর্যটক প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। ২০২৫ সালে বন্ধ মৌসুমে সুন্দরবনে খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তিনমাসে ১১৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ সময় ১২৪ জেলেকে আটক করা হয়েছে।
জানা যায়, নিষিদ্ধ সময়ে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জ অবৈধ প্রবেশের দায়ে ২৭ টি পিওআর মামলা, ৩৪টি ইউডিওআর মামলা ও ০১টি সিওআর মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ সময় ২৩ জন আসামিকে আটক করা হয়। এছাড়া একটি ইঞ্জিন চালিত ট্রলার, ৬৩টি নৌকা, ৪টি মোটরসাইকেল, ১৬ কেজি হরিণের মাংস, ৬৩৯ কেজি চিংড়ি / সাদা মাছ, ৩৫ কেজি শুঁটকি চিংড়ি ১৯০ কেজি, কাঁকড়া, ৬০০টি হরিণ ধরা ফাঁদ ও ১৪টি বিষের বোতল জব্দ করা হয়েছিল।
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে গত তিনমাসে ৮টি ইঞ্জিনচালিত ট্রলার, ১৩০টি নৌকা এবং অবৈধ কাঁকড়া পরিবহনকালে একটি পিকআপ ভ্যান জব্দ করা হয়েছে। এ সময় ১০১ জনকে আটক করা হয়েছে। ৭টি পিওআর মামলা, ৩১ টি ইউডিওআর মামলা এবং ১৬ টি সিওআর মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
এসবের পাশাপাশি উদ্ধার করা হয়েছে অবৈধ ভেসালি জাল, নিষিদ্ধ কীটনাশক, হরিণের মাংস ও ধরার ফাঁদ, শুটকি চিংড়িসহ অন্যান্য সরঞ্জাম। বিভাগীয় পর্যায়ে মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে ২৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়েছিল।
পশ্চিম সুন্দরবনের তৎকালীনকাশিয়াবাদ স্টেশন কর্মকর্তা শ্যামা প্রসাদ রায় বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মহাজন নামধারি কতিপয় ব্যক্তি প্রতি বছর নিষিদ্ধ সময়ে সহ সারা বছরবনের খালে মাছ শিকারের চেষ্টা করেন। এলাকার জেলেদের দাদনের ফাঁদে ফেলে বিষ দিয়ে মাছ শিকারে উৎসাহিত করেন তারা। আবার কেউ কেউ জেলেদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে সংরক্ষিত বনের খালে বিষ দিয়ে মাছ শিকার ও পাচারে সুযোগ করে দেন। তারা বনরক্ষীদের টহলের গতিবিধি লক্ষ্য করে জেলেদের সতর্ক করে থাকেন। বিষ দিয়ে মাছ শিকার নির্মূলে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তৎকালীনকয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ মিজানুর রহমান বলেন, বিষ দিয়ে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণে বনবিভাগের পাশাপাশি আমরাও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। গত বছর চার দিনে বিষ দিয়ে ধরা ৩৮০ কেজি চিংড়ি জব্দ করা হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত চারজনকে আটক করেছি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, বিষ প্রয়োগ করলে ছোট-বড় সব প্রজাতির মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাছের পোনা মারা যায়। এছাড়া বিষমিশ্রিত পানি ভাটার টানে যখন গভীর সমুদ্রের দিকে যায়, তখন সেই এলাকার জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া আশপাশের মাটিতে মিশে বিষের প্রভাব দীর্ঘ সময় থাকে। ফলে জলজ প্রাণীদের প্রজনন ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দিন দিন জলজ প্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। পাখি ও বড় যে প্রাণী আছে যারা এসব মাছ খেয়ে বেঁচে থাকে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে মাছ, পাখি এবং মাছের উপর নির্ভরশীল অন্যান্য প্রাণীদের জীবন চক্রের পরিবর্তন আসছে। এ ব্যাপারে কথা হয় সাতক্ষীরা রেঞ্জার কদমতলা স্টেশন কর্মকর্তা এ কে এম আব্দুস সুলতানের সাথে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় বিশেষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার চলছে এটা সত্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি এটা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, তিনি আরো জানান সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগের কীটনাশক ভেটখালী বাজার হরিনগর বাজার শ্যামনগর বাজার বংশীপুর বাজার মুন্সিগঞ্জ বাজার নওয়াবেকি বাজার বুড়ি গোয়ালিনী বাজার পাতাখালী বাজার গাবুরা বাজার ডুমুরিয়া বাজার চাঁদনীমুকা বাজার ঘড়িলাল বাজার থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে একশ্রেণীর ব্যবসায়ীরা আছে ১০০ টাকার কীটনাশক ২০০ টাকায়। বিশ প্রকারীদের কাছে বিক্রয় করছে, বিস্পরকারীরা অনেক সময় নিজেরা এই কীটনাশক বহন করেন না তাদের নিয়োজিত ভাড়ার মোটরসাইকেল অথবা কীটনাশক ব্যবসায়ীরা ফোন করলে তাদের দায়িত্বে কীটনাশক এই অসাধু ছেলেদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়। এই সমস্ত অসাধু কীটনাশক বিক্রয় তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নিতে বনবিভাগ সহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সকলকে উদ্যোগ নিতে হবে সেই সাথে উদ্যোগ নিতে হবে সমাজের বিবেকবান মানুষের, তিনি আরো বলেন সুন্দরবন শুধু বন বিভাগের নয় বাংলাদেশের 18 কোটি মানুষের অধিকার রয়েছে সুন্দরবনের উপর সে কারণে সকলকে এই অপরাধ প্রতিরোধের জন্য এগিয়ে আসতে হবে তাহলে আমাদের সুন্দরবনের জাতীয় মৎস্য সম্পদ রক্ষা পাবে। তা না হলে অচিরেই সুন্দরবনে মৎস্য সম্পদ বিরক্ত হয়ে যাবে । তিনি আরো বলেন আমরা বিষ প্রকারীদের ধরে মামলা দিয়ে জেল হাজতে পাঠালে আইনের থাক ফোকর দিয়ে অপরাধ থেকে মুক্তি পেয়ে যায় ।
সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার প্রসঙ্গে জলবায়ু পরিবেশ ও বন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়া হাসানবলেন, সুন্দরবনের সব খালের মাথায় একজন করে লোক দাঁড় করে রাখার মতো জনবল তো আমাদের নেই। জনগণ নিজেরাই সুন্দরবনের সম্পদ নষ্ট করলে আমরা কি করে রক্ষা করব। কয়রা শ্যামনগর সহ সুন্দরবন এলাকায় অনেক খাল রয়েছে। একটা, দুইটা ,পাঁচটা খালকে পাহাড়া দেওয়া যায়। শত শত খাল কে পাহাড়া দেবে কে? মানুষ যদি নিজেরা ঠিক না হয়। রাজহাঁস সোনার ডিম পাড়বে ওরা সেই রাজহাঁসটাকেই মেরে খেয়ে নিতে চায়। তাহলে খাক তারা। ওদের জীবিকার সম্পাদ ওরাই নষ্ট করছে। আমি কি করব? এত বুঝালেও বোঝে না। শুধু কয়রায় শ্যামনগরনয় সারা সুন্দরবনে সব জায়গায় বিষ দিয়ে মাছ শিকারের সমস্যা রয়েছে। তিনি আরো জানান যে সমস্ত দুষ্কৃতী মহল বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের নদী খালে বিষ প্রয়োগ করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া আছে তারা যেন আর কখনো সুন্দর বনে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য তাদের বিএলসি বাতিলের নির্দেশ দেওয়া আছে সেই নির্দেশ মোতাবেক বন বিভাগ কাজ করবে। তারপরও সুন্দরবন দেখার দায়িত্ব শুধু বন বিভাগের নয় বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের সুন্দরবন রক্ষার ও সুন্দরবনের নদীখালে বিষ প্রয়োগকারীদের রুখে দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে আসুন সকলেই সুন্দরবনে হরিণ শিকার বিষ দিয়ে মাছ শিকার কারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই।