
আলকামা রমিন : সময় পেরিয়েছে সাড়ে চার দশক। বদলেছে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপট। কিন্তু শত চেষ্টার পরও থামানো যায়নি রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানকে নিয়ে হওয়া আলোচনা কিংবা মূল্যায়ন; বরং সময়ের চাকা যত গড়াচ্ছে, ততই সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষ। সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে একটি নিস্প্রাণ জাতিকে জাগিয়ে তোলার অগ্রণী সেনানী, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী আজ (৩০ মে)।
সঙ্কটের কালবেলায় যিনি খাদের কিনারে দাঁড়ানো একটি রাষ্ট্রের স্বপ্নকে সাহসের সাথে উচ্চারণ করেছিলেন, এক ভূখণ্ডের মানুষের আত্মপরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য রূপ দিয়েছিলেন একটি পতাকার—তিনিই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। মৃত্যুর সাড়ে চার দশক পর আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যার নাম উচ্চারিত হয় রাষ্ট্রগঠন, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা আর কালজয়ী বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের এক অনন্য স্থপতি হিসেবে।
ঘোষণাপত্র থেকে রণাঙ্গন
একাত্তরের সেই রক্তঝরা ও উত্তাল ২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার পর যখন গোটা জাতি দিশেহারা, তখন ২৬শে মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে জাতীয় ইতিহাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রে উঠে আসেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। শুধু ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে বীরত্বপূর্ণ ‘জেড-ফোর্সের’ অধিনায়ক ও ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্র তাকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে। যুদ্ধপরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের চরম অস্থির ও সংকটময় সময় পেরিয়ে, ইতিহাসের অনিবার্য প্রয়োজনেই তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন জাতীয় রাজনীতির মূল কাণ্ডারি।
বহুদলীয় গণতন্ত্র ও নতুন রাষ্ট্রচিন্তা
১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেই তিনি একদলীয় ‘বাকশাল’ শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটান এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক ঐতিহাসিক পটভূমিতে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। যার মধ্য দিয়ে তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলেরই জন্ম দেননি, বরং উপহার দিয়েছেন ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ তথা ১৯ দফার এক অন্তর্ভুক্তিমূলক নতুন রাষ্ট্রচিন্তা। বিভাজনের রাজনীতি দূর করে টেকসই ঐক্যের ডাক দিয়ে মেহনতি কৃষক থেকে শুরু করে তরুণ উদ্যোক্তা—সবাইকে উন্নয়নের মূল স্রোতে যুক্ত করেছিলেন তিনি।
অর্থনৈতিক বিপ্লব ও দূরদর্শী কূটনীতি
স্বল্প সময়ের শাসনকালেই জিয়াউর রহমান এমন কিছু যুগান্তকারী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যা আজ অবধি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে তার ঐতিহাসিক ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ ও গণশিক্ষা আন্দোলন গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। এছাড়া বেসরকারি খাতের বিকাশ, তৈরি পোশাক শিল্পের (গার্মেন্টস) সূচনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির পথ উন্মোচন করে তিনি দেশকে স্বাবলম্বী করার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব এবং প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক জোরদারে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। সার্ক (SAARC) গঠনের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা ও উদ্যোক্তাও ছিলেন তিনি। মাত্র তিন বছরের কিছু বেশি সময়ে একটি দিকভ্রান্ত জাতিকে তিনি রূপ দিয়েছিলেন এক আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রে।
নির্মম শাহাদাৎ ও অবিনশ্বর চেতনা
কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম ও কালো অধ্যায়ে আচমকা থমকে যায় বাংলাদেশের সেই সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল যাত্রা। ১৯৮১ সালের ৩০ মে, চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে একদল চক্রান্তকারীর হাতে নির্মমভাবে শাহাদাৎ বরণ করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। মাত্র ৪৫ বছর বয়সেই নিভে যায় এই মহৎ রাষ্ট্রনায়কের জীবনপ্রদীপ।
জিয়াউর রহমান এদেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীর আসন গেড়েছিলেন, তার সবচেয়ে বড় ও অকাট্য প্রমাণ মেলে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অনুষ্ঠিত তার স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জানাজার নামাজে, যেখানে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিল। প্রিয় নেতার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা দেশ। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত টেকনাফ-তেঁতুলিয়ার জনপদ—লাখো-কোটি সাধারণ মানুষ চোখের জল, গভীর ভালোবাসা আর পরম শ্রদ্ধায় বিদায় জানিয়েছিলেন তাদের প্রিয় ‘জিয়া’কে।
আজ সাড়ে চার দশক পরও, রাজনৈতিক নানা মহাবর্ত ও বাঁক বদলের মাঝেও, বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান, দেশপ্রেম এবং তার দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা একটুও ম্লান হয়নি; বরং তা সময়ের কষ্টিপাথরে প্রতিনিয়ত আরও উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে।
আলকামা রমিন
শিক্ষার্থী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
সাবেক সভাপতি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি