1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৪৭ পূর্বাহ্ন

বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানীর জীবন বৃত্তান্ত

  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬
  • ২২ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : ইসলামের মহান বানী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য দুনিয়াতে যুগে যুগে যেসকল ওলি আল্লাহর আবির্ভাব ঘটেছে তন্মধ্যে বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) অন্যতম। সেকারণে তাঁকে গাউসুল আজম হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়।

জন্ম ও পরিচয়:
বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) ২য় রমযান ৪৭০ হিজরী বা ১৯ মার্চ, ১০৭৮ বাগদাদের জিলান শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম আল-সাইয়িদ মহিউদ্দীন আবু মুহাম্মদ আব্দুল কাদির আল-জিলানী আল-হাসানী ওয়াল-হুসানী। তাঁর পিতার নাম আবু সালেহ মুছা জঙ্গী। মাতার নাম সাইয়েদা উম্মুল খায়ের ফাতেমা। তিনি ছিলেন হজরত ইমাম হাসান (রা.) এর বংশধর। বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) এর জন্ম ইরাকের অন্তর্গত জিলান নামক স্থানে হয় বলে তাকে জিলানী বলা হয়। তার উপাধি ছিল আবু মোহাম্মদ মুহিউদ্দীন।

ছোটবেলা:
হযরত আব্দুল কাদির জিলানী(র এর বয়স যখন মাত্র ৫ বৎসর তখনই তিনি পিতৃহীন হন। তার লালন-পালন ও পড়াশোনার দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের উপর।মা চরকায় সুতা কেটে জিবীকা নির্বাহ করতে শুরু করেন।মাতা পুত্রকে কখনও কখনও অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়।যেদিন ঘরে কিছু খাবার না থাকতো তখন মা বলতেন,”আজ আমরা আল্লাহপাকের মেহমান।”খুব অল্প বয়সেই হযরত আব্দুল কাদির জিলানী(র মকতবে যাওয়া শুরু করেন।বাল্যবয়সেই বিভিন্ন আলৌকিক ঘটনাও ঘটতে শুরু করে।একবার সমবয়সী বালকদের সাথে খেলায় যোগ দেয়ার ইচ্ছা করলে গায়েবী আওয়াজ এলো,”হে বরকতময় সত্তা ,আমারকাছে এসো!”কথা শোনা গেলেও কন্ঠটি কার বা কোথ্থেকে এলো কিছুই তিনি বুঝতে পারলেন না।তাছারা কোন লোকও তিনি সেখানে দেখতে পেলেন না।তাই ভয়ে দৌড়ে তিনি ময়ের কাছে চলে এলেন। এরকম আরো বহুবার হয়েছে।একবার নিদ্রাকাতর অবস্হায় সুখময় নিদ্রা যাচ্ছিলেন।
এমন সময় ঘুমের ঘরে তিনি স্বপ্নে দেখিলেন-একজন উজ্জল জ্যোতিবিশিষ্ট স্বর্গীয় ফিরেশতা তাহার শিয়রের নিকট এসে অত্যন্ত কোমল স্বরে বলিতেছেন- ”হে আল্লাহর মনোনিত আব্দুল কাদির!উঠ,আর নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে থেক না।সুখ শয্যার কোলে ঢলে পড়বার জন্য এই পৃথিবিতে তোমার আগমন ঘটেনি।তোমার কর্তব্য ও দায়িত্ব সুদুরপ্রসারী! মোহগ্রস্হ,নিদ্রাচ্ছন্ন জনগনকে নিদ্রার মোহ থেকে মুক্ত করিবার জন্যই তোমার আগমন ঘটেছে।

শিক্ষা জীবন ও ধর্ম প্রচার:
হযরত আব্দুল কাদির জিলানী(র এর বাল্য শিক্ষার হাতে খড়ি হয়েছিল জ্ঞানবান পিতা ও গুনবতী মাতার মাধ্যমে।তিনি স্বীয় পিতা -মাতার মাধ্যমেই প্রথমিক স্তরের শিক্ষনীয় বিষয়গুলি গৃহে বসেই সমাপ্ত করেছিলেন।সর্বপ্রথমেই তিনি পবিত্রকোরান পাঠ করা শিক্ষা করেন ও সম্পুর্ন কোরান হেফজ করেন।গৃহশিক্ষার বাইরেও তিনি জিলান নগরের স্হানীয় মক্তবেও বিদ্যা শিক্ষা করেছিলেন।একবার তিনি মক্তবে উপস্হিত হলে সেখানে বসার জন্য কোন স্হান পাচ্ছিলেন না।এমন সময় অদৃশ্য হতে আওয়াজ হলো,”হে শিক্ষার্থীগন!এই বালকের জন্য তোমরা একটু স্হান করে দাও,যাহাতে তিনি বসতে পারেন।” কেহই আওয়াজের দিকে তেমন লক্ষ্য দিল না।পরিশেষে আবার গম্ভীর কন্ঠে দৈববানী ঘোষিত হলো, ”হে শিক্ষার্থীগন!তোমরা কি দেখিতএ পাইতেছ না যে,আল্লাহর প্রিয় অলী দ্বারে দাড়িয়ে আছে ? উঠ,তাহাকে সসিবার স্হান করে দাও। অযথা বিলম্ব করে সময় অপচয় কর না।”এই অদৃশ্য বানী ছাত্র শিক্ষক সকলের কর্নেই ভীষনভাবে আঘাত করল।সকলেই হতচকিত ও বিস্ময়াপন্ন হয়ে গেল এবং বড় পীর আব্দুল কাদির র: কে বসবার স্হান করে দিল। তার প্রখর ধীশক্তি,প্রত্যুতপন্নমতিত্ব ও আল্লাহ প্রদত্ত প্রজ্ঞার ফলে বাল্যকালেই তিনি অসাধারন পান্ডিত্য অর্জন করতে সক্ষম হন। কোন এক জিলহজ্ব মাসের ৯ম দিবসে শহর ছেরে গ্রামের দিকে গেলেন।সেখানে এক গাভীর গায়ে হাত দিতেই গাভীটি তার দিকে তাকালো এবং বলতে লাগলো,”হে হযরত আব্দুল কাদির !

আল্লাহ পাক তোমাকে কৃষিকাজের জন্য সৃষ্টি করেন নি বা জীবিকা অর্জনের হুকুমও তোমাকে দেননি”গাভীর মুখে কথা শুনতে পেয়ে ভীত সন্ত্রস্হ অবস্হায় বাড়ী ফিরে এলেন এবং মনের উদ্বেগে ঘরের ছাদে উঠে নানা কথা ভাবছিলেন।এমনসময় তিনি দেখতে পেলেন মক্কা শরীফ পর্যন্ত সমস্ত এলাকা তার সামনে উন্মুক্ত । চোখের সামনে তিনি আল্লাহর ঘর দেখতে পেলেন।তিনি আরো দেখতে পেলেন আরাফাতে হাজ্বী সাহেবরা অবস্হান করছেন।অতএব গায়বী ইঙ্গিতের মর্ম বোঝতে চেষ্টা করে তিনি মাকে দ্বীনী উচ্চশিক্ষার জন্য বাগদাদ গমনের ইচ্ছার কথা জানালেন।মা হৃষ্টচিত্তে অনুমতি দিয়ে তার পাথেয় প্রস্তুতিতে লেগে গেলেন।রওনার দিন জামার ভেতরে ৪০টি স্বর্নমুদ্রা সেলাই করে দিয়ে তার মা বললেন,”আল্লাহর নাম নিয়ে রওয়ানা হও।সততা ও বিশ্বস্ততাকে নিজের আদর্শরুপে শক্ত হাতে ধারন করবে।”

ঘটনাক্রমে রাস্তায় ডাকাত পড়লো।এক ডাকাত শিশু আব্দুল কাদিরকে তার কাছে কিছু আছে কিনা জিজ্ঞেস করলো।তিনি অকপটে স্বীকার করলো জামার ভিতর সেলাইকরা ৪০টি স্বর্নমুদ্রার কথা।বালকের সততায় ও সরলতায় ডাকাত মুগ্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করলো,এবিপদের মুহুর্তে লোকেরা প্রকাশ্য সম্পদও গোপন ফেলে আর তুমি এ গোপন সম্পদের কথা কেন আমাকে দিলে ? বালক আ্ব্দুল কাদির জবাব দিল,”আমার আম্মা আমাকে সর্বদা সত্য কথা বলার উপদেশ দিয়েছেন।”

আল্লাহওয়ালাদের কথায় এমন প্রভাব থাকে যা পাষান হৃদয়ও একমুহুর্তে গলিত হতে পারে।ডাকাত সর্দার কাদতে শুরু করলো এবং বলল,”এবালকটি তার মায়ের নির্দেশ এত বিপদের মধ্যেও যেভাবে মানল ,আমি কি আমার সৃষ্টিকর্তা প্রভর হুকুম কি এভাবে মানছি ?আমিতো অর্থ-সম্পদের লোভে মহান মহান মালিকের অবাধ্য হয়ে শত শত মানুষের সর্বনাশ করছি”।কাফেলার লুন্ঠিত সম্পদ ফিরিয়ে দিয়ে ডাকাত তার গোটা দলশ তওবা করে ডাকাতি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলো ।বলা হয় এই ব্যক্তিটিই নাকি পরবর্তীতে আল্লাহর এক ওলীতে পরিনত হয়েছিলেন।আল্লাহুআলম।

উচ্চশিক্সার জন্য তিনি ৪৮৮ হিজরীতে যখন প্রথম তিনি বাগদাদ গমন করেন তখন তার বয়স হয়েছিল আঠার বৎসর।বাগদাত এসে তিনি শায়েখ আবু সাইদ ইবনে মোবারক মাখযুমী হাম্বলী,আবুল ওয়াফা আলী ইবনে আকীল এবং আবু মোহাম্ম ইবনে হোসাইন ইবনে মুহাম্মদ র: এর নিকট ইলমে ফিখ,শায়েখ আবু গালিবমুহাম্মদ ইবনে হাসান বাকিল্লানী,শায়েখ আবু সাইদ ইবনে আব্দুল করীম ও শায়েখ আবুল গানায়েম মুহম্মদ ইবনে আলী ইবনে মুহম্মদ র: প্রমুখের নিকট এলমে হাদীস এবং শায়েখ আবু যাকারিয়া তাবরেয়ী র: নিকট সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ লাভ করেন।শায়খ জীলানীর বাহ্যিক ও আধ্যাত্নিক জ্ঞান চর্চার গূরু শায়খ আবু সাঈদ মাখযুমীর মনে তরুন এ শিষ্যের যোগ্যতা ও প্রতিভা সম্পর্কে এতই সুধারনা ও আস্হাশীলতার সৃষ্টি করল যে, নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা তত্তাবধান ও পরিচালনার দায়িত্ব বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)এর নিকট অর্পন করে তিনি নিজে অবসর গ্রহন করেন।

তখন তিনি এ মাদ্রাসার উন্নতি ও উৎকর্ষের কাজে আত্ননিয়োগ করেন।হাদীস ,তাফসির,ফিকহ ও অন্যান্য জ্ঞান বিজ্ঞানের শিক্ষাদান নিজেই শুরু করেন। পাশাপাশি ওয়াজ নসিহত ও তাবলিগের কর্মসুচীও চালু করেন ।অল্পদিনের মধ্যেই এ প্রতিষ্ঠানের সুনাম চারিদিকে ছরিয়ে পড়লো এবং দেশ বিদেশের বিদ্যার্থীরা এতএ ছুটে আসতে লাগলো।এ পর্যায়ে মাদরাসার নামকরনও শায়খের সাথেই সম্পৃক্ত হয়ে ‘মাদরাসায়ে কাদেরিয়া” হয়ে গেল।

বই
তিনি কাব্য, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, ভূগোল ইত্যাদি বিষয়ের পণ্ডিত ছিলেন। তার রচিত বহু গ্রন্থ রয়েছে। এসব গ্রন্থের মধ্যে ফতহুল গায়ের গুনিয়াতুত তালেবীন, ফতহুর রবযানী, কালীদায়ে গাওসিয়া উল্লেখযোগ্য।

মৃত্যু
হিজরী ৬৬২ সালের ১১ রবিউসসানী বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) পরলোক গমন করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। বড়পীর সাহেবের এই ওফাতের দিন সারা বিশ্বের মুসলমানরা প্রতি বছর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করে থাকেন এবং তার মৃত্যুবার্ষিকী ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহাম পরিচয় : ১ রমজান ৪৭১ হিজরীতে ইরানের অন্তর্গত জিলান জেলার কাসপিয়ান সমুদ্র উপকূলের নাইদ নামক স্থানে বড় পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হযরত আবু সালেহ মুছা জঙ্গি (রাহ.) ও মাতার নাম সৈয়দা উম্মুল খায়ের ফাতিমা (রাহ.)। স্রষ্টার চূড়ান্ত দীদার লাভের উদ্দেশ্যে ১১ রবিউস সানী ৫৬১ হিজরী রোজ সোমবার ইহজগত ত্যাগ করেন। বর্তমানে ইরাকের বাগদাদ শহরে তাঁর মাজার শরীফ রয়েছে। গাউসূল আজম বড় পীর হিসেবে তিনি সকলের নিকট পরিচিত।
বাল্যশিক্ষা : হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর বাল্যশিক্ষা মক্তবে শুরু হয়। প্রথম দিন মক্তবে গিয়ে দেখেন অন্যান্য ছাত্রদের ভিড়ে বসার কোনো জায়গা নেই। হঠাৎ করে উপর হতে গায়বী আওয়াজ আসল, হে মক্তবের ছাত্ররা! আল্লাহর অলির বসার স্থান প্রসস্ত করে দাও। গায়বী আওয়াজ আসার সাথে সাথে সকল ছাত্ররা চেপে বসলেন। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) এর বসার ব্যবস্থা হয়ে গেল। প্রথম দিনেই অবাক কা-! মক্তবের শিক্ষক হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)কে আউযু বিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ সবক দানের সাথে সাথে হযরত বড় পীর কোরআন মজিদের প্রথম ১৮ পাড়া পর্যন্ত মুখস্ত বলে ফেললেন। মক্তবের শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন, হে বৎস! তুমি কিভাবে কোরআন মুখস্ত করেছো! আজ মক্তবে তোমার প্রথম দিন। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) বলেন, আমার মাতা ১৮ পাড়ার পর্যন্ত কোরআন মুখস্ত করেছিলেন। আমি গর্ভে থাকাকালীন সময় তিনি কোরআন পাঠ করতেন। আমি মায়ের তেলাওয়াত শুনে শুনে ১৮ পাড়া পর্যন্ত মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সময়ে মুখস্ত করে ফেলেছি।
ভূমিষ্ঠ হয়ে শরীয়ত পালন : ২৯ শাবান। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় জিলানবাসীদের কেউ রমজানের চাঁদ দেখতে পায়নি। সকলে রোজা রাখা না রাখার বিষয় নিয়ে সংশয়ের মধ্যে পড়ে গেলেন। এমতবস্থায় রাতের শেষাংশে সুবহে সাদেকের পূর্বে তথা ১ রমজান ধরাধামে আসেন হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)। শিশু আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) জন্মের পর সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত দুধ ও মধু পান করেন। কিন্তু সুবহে সাদিকের পর তাকে আর কিছু খাওয়ানো যায়নি। এ আশ্চার্যজনক খবর ছড়িয়ে পড়লে সকলে বুঝতে পারল মাহে রমজান শুরু হয়েছে।
গায়বী জ্ঞান ও ওয়াজ নসিহত : ৫২১ হিজরীর ১৬ শাওয়াল রোজ মঙ্গলবার রাসূল (সা.) স্বপ্নযোগে বলেন, হে আবদুল কাদির! তুমি মানুষকে কেন আল্লাহর পথে আহ্বান করছো না। মানুষকে কেন বঞ্চিত করছো। আবদুল কাদের (রহ.) বলেন, আমি রাসূল (সা.) ও আলী (রা.)-এর আওলাদ। আমি তো আরবী জানিনা। যদি ইরাকের লোকজন তিরস্কার করেন। তাৎক্ষণিক রাসূল (সা.) বলেন, আবদুল কাদের তুমি মুখ খোল। রাসূল (সা.) কিছু একটা পড়ে ৬ বার মুখের মধ্যে ফুক দিলেন এবং রাসূল (সা.)-এর মুখের লালা আবদুল কাদের জিলানীর মুখে লাগিয়ে দিলেন। অতপর বললেন, মানুষকে হিকমত এবং উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তোমার প্রভুর পথে পরিচালিত করো। (সূরা নাহল, আয়াত-১২৫)। এর পর থেকে হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর মাহফিলে এমন তাসির হতো যে, প্রত্যেক মাহফিলে ২/৩ জন লোক প্রভুর প্রেমে এশকে ফানা হয়ে মারা যেতো।
হিজরত ও সত্যবাদিতা : তৎসময় কালে ইরাকে ভালো পড়াশুনা ও ব্যবসার সুযোগ ছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পড়াশুনা ও ব্যবসার জন্য মানুষ বাগদাদ আসত। পড়াশুনার উদ্দেশ্যে হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) ব্যবসায়িক কাফেলার সাথে বাগদাদ যাওয়ার পথে ডাকাতের কবলে পড়েন। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ)কে ডাকাত সর্দার জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার সাথে কি আছে? তিনি বললেন, আমার নিকট ৪০টি স্বর্ণ মুদ্রা আছে। ডাকাত সর্দার আশ্চার্যন্বিত হয়ে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন হে যুবক! তুমি তো মিথ্যা কথা বলে আমার নিকট থেকে স্বর্ণ মুদ্রা লুকাতে পারতে। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) বললেন, মিথ্যা কথা বলতে আমার মা নিষেধ করেছেন। এ কথা শুনে ডাকাত সর্দার বললেন, মায়ের আদেশ যুবক তুমি এভাবে পালন কর। নিশ্চয়ই তুমি আল্লাহর আদেশ আরো যতেœর সাথে পালন করো। আর আমি ও অন্যান্য ডাকাতরা তো আল্লাহর আদেশই পালন করি না। মায়ের কথা তো অনেক দূরের কথা। এই বলে ডাকাত সর্দার আপসোস করতে থাকেন ও বলেন, হে বালক ! তুমি সাধারণ কোন মানুষ না। হে বালক তুমি আমাকে কলেমা পড়াও। ডাকাত সর্দারের সাথে আরো ৬০ জন অশ্বারোহী ডাকাত ছিলেন। তারাও কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলেন।
ইবাদতের কঠোর সাধনা : তিনি একাধারে ৪০ বছর পর্যন্ত ইশার নামাজের অযু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। প্রত্যহ শেষ রাত্রে পাঠ করতেন, আল মুহিতুল আলমে, আর রাব্বুশ শহীদ, আল হাসীবুল ফায়্যায়িল খাল্লাকি, আল খালিকু, আল বারিউ, আল মুসাব্বিরু। উক্ত দোয়া পাঠ করার সাথে সাথে লোক চক্ষুর সামন থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতেন। তিনি রাতের একটা সময় জিকির ও মোরাকাবা করে কাটাতেন। যৌবনের অধিকাংশ সময় রোজা রেখে কাটিয়েছেন। যখন নফল নামাজ আদায় করতেন সুরা ফাতেহার পর সূরা আর রহমান, সূরা মুজাম্মিল কিম্বা সুরা ইখলাস পড়তেন। তন্দ্রার ভাব আসলে দেখে দেখে কোরআন তেলাওয়াত করতেন।
কাদেরীয়া তরিকার প্রবর্তক : হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ) বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচার ও প্রসারে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। মুসলামানকে ভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে কোরআন সুন্নাহ ভিত্তিক মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। মানুষকে আল্লাহ ও রাসূল (সা.) মুখী করার জন্য বিভিন্ন আমল বাতলিয়ে দিতেন। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) যখন দুনিয়ার জীবন ত্যাগ করে পরপারে যান। তখন হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর ভক্ত অনুসারীরা তাঁর আমল ও চরিত্রকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে কাদেরীয়া তরিকা প্রবর্তন করেন। সে সময়কাল থেকে কাদেরীয়া তরিকার প্রচলন আমাদের দেশেও প্রচলিত হয়েছে।
বেলায়াতের উচ্চস্তরের গাউসূল আজম সারা জাহানে প্রত্যেক জামানায় ৩১৩ জন অলি জমিনে বিদ্যমান থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) এর শান মান প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকেন। সূফীতাত্ত্বিক পরিভাষায় তাঁদের আখইয়ার বলা হয়। ৩১৩ জন অলির মধ্যে ৪০ জন আবদাল, ৭ জনকে আবরার, ৫ জনকে আওতাদ, ৩ জন নকীব, ৪ জন নুজবা ও ১ জন গাউসূল আজম থাকেন। যাকে কুতুবুল আউলিয়া বা সুলতানুল আউলিয়া বলা হয়। বাকিরা অন্যান্য সাধারণ পর্যায়ের অলি। তৎজমানায় গাউসগণের মধ্যে যিনি সর্বোচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত, বেলায়েতে ওজমা ও গাউসিয়তে কোবরার সুমহান আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি হচ্ছেন হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)।
গাউসে পাকের বেলায়েতের ব্যাপকতা : হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) রুহানী ও প্রত্যক্ষ নির্দেশে ইসলামের প্রচার প্রসারে ৩৪২ জন আউলিয়া সারা বিশ্বে আল্লাহর সৃষ্টির খেদমতে নিয়োজিত রয়েছেন। ইহার মধ্যে মক্কা-মদিনাতে ১৭ জন, ইরাকে ৬০ জন, সিরিয়াতে ৩০ জন, মিশরে ২০ জন, পশ্চিমাদেশে ২৭ জন, পূর্বদেশীয় অঞ্চলে ২৩ জন, আবিসিনিয়াতে ১১ জন, ইয়াজুজ মাজুজের প্রাচীরাংশে ১৭ জন, লংকাতে ১৭ জন, কুহেকাফে ৪০ বাহরে মুহীতে ৪০ জন।
উপাধিসমূহ : হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর বেলায়েতের পরিচিতি বিশ্বব্যাপী ছিল। তিনি বিভিন্ন দেশে মানুষের নিকট ভিন্ন উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর উপাধিগুলো হলো যথাক্রমে- গাউসূল আজম, বড় পীর, মাহবুবে সোবহানী, মহিউস সুন্নাহ, কুতুবে রাব্বানী, ইমামুল আউলিয়া, সৈয়দ, পীর, মীর, মহিউদ্দিন, কামিউল বিদায়াত, নূরে হক্কানী, পীরানে পীর, জিলানী ইত্যাদি।
শেষ কথা : ১১ রবিউস সানি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়েছে ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম। বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্বির্য্যরে মাধ্যমে হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ) এর ওফাত দিবস উপলক্ষে ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম পালিত হয়েছে। এছাড়া প্রত্যেক চন্দ্র মাসের ১১ তারিখ কাদেরীয়া তরিকার অনুসারীরা হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ) এর ওফাতের তারিখে গেয়ারভী শরীফ পালন করেন। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর আদর্শিক জীবনধারা থেকে শিক্ষা নেয়ার মতো অনেক কিছু রয়েছে। বড় পীরের আদর্শিক জীবনের সামান্য অংশ যদি আমরা পালন করতে সক্ষম হই। তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) এর সন্তোষ্টি অর্জন সম্ভব। আল্লাহ আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে মহান অলি হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর আদর্শ বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান করুন।

প্রচলিত সূফী তরীকাগুলোর মধ্যে কাদিরিয়া তরীকা অন্যতম। এই তরীকার প্রতিষ্ঠাতা গাউসুল আযম বড়পীর হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (র.)। বাগদাদের এই সর্বজনশ্রদ্ধেয় সূফী মুসলিম বিশ্বের প্রত্যেক প্রান্তে সমানভাবে পরিচিত। তিনি সমসাময়িক মুসলিম সমাজে যেমন বিরাট ইতিবাচক প্রভাব রেখেছিলেন, তেমনি তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর শিষ্যদের হাতে পৃথিবীর সর্বত্র ইসলাম প্রচারিত হয়েছিল। নুরুদ্দীন জংগী এবং সালাহুদ্দীন আইয়ুবীগণ যেভাবে ইসলামের সোনালি যুগ ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছিলেন, তার পেছনে শাইখ জিলানী (র.) এর অবদান অনেকটাই আজ বিস্মৃত। তাসাউফে তিনি যে মূল্যবোধ তুলে ধরেছিলেন, অর্থাৎ শরীআতের একনিষ্ঠ অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, সেই মূল্যবোধও আজ কাদিরিয়া তরীকার দাবিদার অনেকের ভেতর নেই। এজন্য তাঁর জীবন ও অবদানের পুনর্পাঠ জরুরী।
শাইখ আব্দুল কাদির জিলানী (র.) এর উপনাম আবূ মুহাম্মদ। ইবন রজব হাম্বলী হাসান ইবন আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার দিকে তাঁর বংশধারা সাব্যস্ত করেছেন। অন্যদিকে সিদ্দীক হাসান খান ভূপালী, মুহাম্মদ ইবন শাকির প্রমুখ তাঁর বংশধারা ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর দিকে সাব্যস্ত করেছেন। তবে দু’ধরণের মতের সাথে সমন্বয় করে বলা যায়, বাবার দিক থেকে তিনি হাসানী এবং মায়ের দিক থেকে হুসাইনী ছিলেন। শাইখ জিলানী (র.) তাঁর মা ফাতিমা উম্মুল খাইর বিনতু আব্দুল্লাহ আস সাওমাঈকে নিয়ে নিজেই বলেছেন, ‘আমার মায়ের বংশধারা হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সাথে মিলিত হয়েছে।’
শাইখ আব্দুল কাদির জিলানী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইরানের গিলান বা জিলান প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলের কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণে অবস্থিত নিফ নামক শহরে ২৯ শাবান, ৪৭০ হি./১৭ মার্চ ১০৭৮ খ্রি. জন্মগ্রহণ করেন। অবশ্য কেউ কেউ ৪৭১ ও ৪৯১ হিজরীর কথাও বলেছেন। গিলান প্রদেশের দিকে সম্পৃক্ত করে তাঁকে জিলানী, গিলানী, কিলানী ইত্যাদি বলা হয়। ইবনুল আসির, ইবন কাসির, যাহাবিসহ কেউ কেউ জিলানী বা কিলানীর বদলে জিলি বলেছেন। মুহই-উদ-দীন, ইমাম, শাইখুল মাশায়িখ, শাইখুল ইসলাম, গাউসুল আযম, তাজুল আরিফীন, কুতবে বাগদাদ, বাযুল্লাহিল আশহাবসহ বহু উপাধিতে তিনি ভূষিত হয়েছেন।
শাইখ জিলানী (র.) এর পিতা আবূ সালিহ মূসা নিজেও আত্মশুদ্ধি ও নফসের বিরুদ্ধে মুজাহাদার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। এজন্য তাঁর একটি উপাধি ছিল মুহিব্বুল জিহাদ।
শাইখ জিলানী (র.) ছিলেন মা-বাবার সর্বশেষ সন্তান। কারণ তাঁর জন্মের কিছুদিন পরেই তাঁর বাবা ইন্তিকাল করেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, তখন তাঁর মায়ের বয়সও ছিল ষাটের কোঠায়। বেশি বয়সে সন্তান লাভ করা ছিল কুরাইশ গোত্রের নারীদের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যাই হোক, পিতা আবূ সালিহ মূসার ইন্তিকালের পর নানা আব্দুল্লাহ সাওমাঈ তাঁর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এজন্য তাঁকে ইবনুস সাওমাঈও বলা হতো। আব্দুল্লাহ এতই ইবাদতগুযার ছিলেন যে, সাওমাঈ (ইবাদতখানা) নামে প্রসিদ্ধ হয়ে যান। আব্দুল কাদির জিলানী (র.) এভাবেই বিদূষী মা আর যাহিদ নানার সংস্পর্শে একজন দুনিয়াবিরাগী পুতঃপবিত্র মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠেন।
তাঁর আরও একজন ভাই ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ বাগদাদে রওয়ানা হবার সময় তাঁর মা ফাতিমা বিনতু আব্দুল্লাহ তাঁদের দুজনের মধ্যে সমুদয় সম্পদ ভাগ করে দিয়েছিলেন। শাযারাতুয যাহাবের বর্ণনামতে, এই ভাইয়ের নাম ছিল আব্দুল্লাহ। তিনি বাগদাদেই অল্প বয়সে ইন্তিকাল করেন।
শাইখ জিলানী (র.) এর অসংখ্য কারামত ছোটবেলা থেকেই জাহির হওয়া শুরু হয়েছিল। রামাদান মাসে দিনের বেলায় তিনি দুধ খেতেন না। তাঁর এ কারামত এতই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে, জিলানে কখনও মেঘের জন্য রামাদানের চাঁদ দেখা না গেলে লোকেরা খোঁজ নিত, আবূ সালিহের পুত্র আব্দুল কাদির দুধ খেয়েছেন কি না? এর উপর ভিত্তি করে তাঁরা যে সিদ্ধান্ত নিতেন, পরবর্তীতে সেটাই সত্য বলে প্রমাণিত হতো।
একটু বড় হবার পর শষ্যক্ষেত্রে একটি ষাঁড় বড়পীর (র.) কে বলেছিল, ‘কৃষক হবার জন্য তোমাকে সৃষ্টি করা হয়নি।’ এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, তাঁদের একটি কৃষিজমি ছিল। তিনি সেখানে কাজ করতেন এবং তাঁদের কিছু গরু-মহিষও ছিল। ইবরাহীম ইবন আদহামের সাথে ঘোড়ার জীনের কথার মতো এই ষাঁড়ের কথাও তাঁর জন্য বিশেষ ইঙ্গিতবাহী ছিল।
এ ঘটনায় জিলানী (র.) এর জ্ঞানার্জনের স্পৃহা বেড়ে যায়। তখন বাগদাদ ছিল জ্ঞানের শহর হিসেবে বিবেচিত। তিনি বাগদাদ যেতে মনস্থ করলেন।
ইবন হাজার আসকালানী (র.) আবূ মুহাম্মদ আল জুব্বাইয়ের বরাতে উল্লেখ করেছেন, শাইখ জিলানী (র.) বলেছেন, ‘আমার মা আমাকে ইলম অর্জনের জন্য বাগদাদ যেতে বলেছিলেন। তাই ষোলো অথবা আঠারো বছর বয়সে আমি ইলমের সন্ধানে এক শহর থেকে আরেক শহরে চলে গেলাম।’
শাইখ জিলানী (র.) পরিবার পরিজন ছেড়ে এভাবেই একটি কাফেলার সাথে ভাইয়ের সাথে বাগদাদ রওয়ানা হলেন। তাঁর মা আবূ সালিহ মুসা জংগী দোস্তের রেখে যাওয়া আশিটি দিনার দুভাইয়ের মাঝে ভাগ করে দিলেন। পথিমধ্যে ডাকাত দলের হিদায়াত হবার কথা সবাই জানেন। সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে শাইখ জিলানী (র.) এর যখন বাগদাদে প্রবেশ করলেন, তখন তাঁর বয়স ১৮, সময়টা ৪৮৮ হিজরী। চলছে খলীফা মুসতাযহিরের শাসন (৪৮৭-৫১২ হি:)। একই বছর ইমাম আবূ হামিদ আল গাযালী বাগদাদের নিযামিয়া মাদরাসার শিক্ষকতা ছেড়ে নির্জনবাসের জন্য সিরিয়া ও হিজায সফরে চলে গেলেন। একজন গাযালীর তিরোধানের পর যেন আরেকজন গাযালীর আবির্ভাব হলো বাগদাদে।
জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা আর সংস্কৃতির কিংবদন্তীতুল্য নগরী বাগদাদে শাইখ জিলানী (র.) ৪৮৮ হিজরী থেকে ৫৬১ হিজরীতে ইন্তিকাল পর্যন্ত ৭৩ বছর অবস্থান করেছিলেন। মোটা দাগে তাঁর বাগদাদের জীবনকে দু’ভাবে ভাগ করা যায়:
ক. বাগদাদে প্রবেশ থেকে মাদরাসায় শিক্ষাগ্রহণ কাল (৪৮৮-৫২১ হি:)
খ. শিক্ষাদানের দায়িত্ব গ্রহণ থেকে ইন্তিকাল ( ৫২১- ৫৬১ হি:)
ক. বাগদাদে প্রবেশ থেকে মাদরাসায় শিক্ষাগ্রহণ কাল (৪৮৮-৫২১ হি:)
শাইখ জিলানী (র.) এর আগমনের আগের কয়েকশ বছর ধরেই বাগদাদে চলছে জ্ঞানীগুণীদের আনাগোনা, চারিদিকে তাঁদের অসংখ্য কালোত্তীর্ণ বইয়ের ছড়াছড়ি। যেমন ইমাম গাযালী (৫০৫ হি.) ও তাঁর ইহইয়া, ইমাম রাগিব ইস্পাহানী (মৃ. ৫০২ হি.) ও তাঁর মুফরাদাত, ইমাম কুশাইরী (মৃ. ৪৬৫ হি.) ও তাঁর রিসালা, আল্লামা যামাখশারী (মৃ. ৫৩৭ হি.) ও তাঁর কাশশাফ, আল্লামা মাওয়ার্দী (মৃ. ৪৫০ হি.) ও তাঁর আহকামুস সুলতানিয়্যা, ইমাম আবুল হাসান আল আশআরী (মৃ. ৩২৪ হি.) ও তাঁর মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন, আশ শাইখুর রঈস ইবন সীনা (৪২৮ হি.) ও তাঁর কিতাবুশ শিফা, আল্লামা হারিরী (মৃ. ৫১৭ হি.) ও তাঁর মাকামাত ইত্যাদি। কিন্তু এতসব শাস্ত্রের ভীড়ে তিনি সবার আগে ফিকহ ও হাদীস শাস্ত্রকে বেছে নিলেন। এদিকে পিতৃহীন এই শাইখকে বিরাট অর্থকষ্ট আর অভাবের সম্মুখীন হতে হলো।
বাগদাদের মতো নগরীতে চল্লিশ দীনার খুব বেশি কিছু নয়। তার উপর শাইখ জিলানী (র.) ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। মায়ের সেলাই করে দেওয়া সেই দিনারগুলো অচিরেই শেষ হয়ে গেল। কখনও কখনও তাঁর মা লোকজনের মাধ্যমে কিছু টাকাকড়ি পাঠাতেন। কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না।
তীব্র অর্থকষ্ট ও অভাবের মধ্যেও তিনি অসংখ্য শাইখের কাছে বিভিন্ন শাস্ত্র নিয়ে জ্ঞানার্জন করেছেন। সবার নাম ইতিহাস সংরক্ষণ করতে না পারলেও বিখ্যাত কয়েকজনের নাম জানা যায়। যেমন তিনি হাদীস শুনেছেন আবূ গালিব মুহাম্মদ ইবন হাসান আল বাকিল্লানী, আবূ বকর আহমদ ইবনুল মুযাফফর, আবুল কাসিম আলী ইবন বাফান আর রাযযায, আবূ মুহাম্মদ জাফর ইবন আহমদ আস সররাজ, আবূ সাদ মুহাম্মদ ইবন খুশাইশ, আবূ তালিব ইবন ইউসুফ প্রমুখের কাছ থেকে। ফিকহ শিক্ষা করেছেন বাগদাদে হাম্বলীদের শাইখ আবুল ওয়াফা আলি ইবন আকীল, আবুল খাত্তাব মাহফুজ ইবন আহমদ হাম্বলী, কাজী আবূ সাদ মুবারক ইবন আলী আল মুখাররিমি, আবুল হাসান মুহাম্মদ ইবনুল কাজী আবূ ইয়ালা আল ফাররা হাম্বলী প্রমুখের কাছ থেকে। শুধু ফিকহে হাম্বলী নয়, ফিকহে শাফেঈর উপরও তিনি দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। এছাড়া আবূ যাকারিয়া ইয়াহইয়া আত তিবরিযীর কাছে সাহিত্য, অলঙ্কারশাস্ত্র এবং আবুল ওয়াফা আলী ইবন আকীল ও আবুল খাত্তাব মাহফুযের কাছে কুরআন পঠনরীতি ও তাফসীর সম্পর্কে তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন।
ইসলামী শরীআতে গভীর জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আধ্যাত্মিকতার চর্চাও তিনি সমান গতিতে চালিয়ে গেছেন। আসলে বাগদাদে আগমনের পর থেকে তাঁর পুরো জীবনই ইলমে তাসাওউফ আর ইলমে শরীআত চর্চায় কেটেছে। পরবর্তী জীবনে একদিকে যেমন ফাতওয়া দিয়েছেন, তেমনি আরেক দিকে অসংখ্য সালিকের শাইখের দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময় বাগদাদের সংগ্রাম আর দুঃখভরা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেছেন, ‘আমি জ্ঞানচর্চায় মগ্ন হয়ে থাকতাম। এছাড়া আমার অভ্যাস ছিল নেককারদের সাথে দেখা-সাক্ষাত করা। আমি নফসকে মুজাহাদার মাধ্যমে পাকড়াও করেছিলাম। এক পর্যায়ে এক আধ্যাত্মিক অবস্থা আসলো। এমনকি এই অবস্থা মরুভূমিতে দিনরাত হতে লাগলো। এজন্য আমি ঘুরে বেড়াতাম। এক রাতে আমার ভেতর এমন এক আধ্যাত্মিক অবস্থা তৈরী হলো যে, আমি সজোরে চিৎকার করে উঠলাম। কাছাকাছি ঘুরতে থাকা কয়েকজন লোক এতে ভয়

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।