1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৮ অপরাহ্ন

সুন্দরবন বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক গর্ব

  • প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৩৫ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : ভৌগোলিক অবস্থান ও গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্য সৃষ্টি ও টিকের থাকার এই নিবিড় প্রতিবেশ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সুন্দরবনের প্রধান সৌন্দর্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার তথা বাঘের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণে বাঘের সংখ্যা কমছে না, কমছে মনুষ্যসৃষ্ট কারণে। চোরা শিকারিদের বিভিন্ন দল বাঘ হত্যা করছে। এ ছাড়া সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যাও কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। খাদ্যের অভাব, চোরা শিকারিদের দাপট ও আবাসস্থল কমে যাওয়ার কারণে সুন্দরবনের সৌন্দর্যের প্রতীক হরিণেরা ভালো নেই।
১৪ ফেব্রুয়ারি ‘সুন্দরবন দিবস পালিত হয়’। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০১ খিষ্টাব্দ থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। সুন্দরবনের গুরুত্ব অপরিসীম। সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্যের আধারই নয়, এটি রক্ষাকবচও বটে। কেনোনা বিভিন্ন দুর্যোগে সুন্দরবন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বাঁচিয়ে রেখেছে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সুন্দরবন ব্যাপকভাবে জড়িয়ে আছে। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে তুলে ধরে বা বাংলাদেশকে চেনে এমন পাঁচটি বিষয়ের তালিকা করলে সুন্দরবন সে তালিকায় প্রথমদিকে থাকবে। বাংলাদেশের গর্ব সুন্দরবন। সম্প্রতি ইউনেসকো সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে বিশ্বের জন্য অসামান্য সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় বিপন্ন প্রজাতির বহু প্রাণীর আশ্রয়স্থল এখন সুন্দরবন। মেছো বাঘ, ইরাবতী ও গাঙ্গেয় ডলফিন, মদনটাক, রাজগোখরা, উদবিড়াল ইত্যাদি ‘প্রায় বিপন্ন’ প্রজাতির প্রাণীর বিচরণ এখন সুন্দরবনে। তথ্য মতে, প্রতিবছর দেশের অর্থনীতিতে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার অবদান রেখে চলেছে সুন্দরবন।
ভৌগোলিক অবস্থান ও গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্য সৃষ্টি ও টিকের থাকার এই নিবিড় প্রতিবেশ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সুন্দরবনের প্রধান সৌন্দর্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার তথা বাঘের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণে বাঘের সংখ্যা কমছে না, কমছে মনুষ্যসৃষ্ট কারণে। চোরা শিকারিদের বিভিন্ন দল বাঘ হত্যা করছে। এ ছাড়া সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যাও কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। খাদ্যের অভাব, চোরা শিকারিদের দাপট ও আবাসস্থল কমে যাওয়ার কারণে সুন্দরবনের সৌন্দর্যের প্রতীক হরিণেরা ভালো নেই। হরিণের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে বাঘের খাদ্য সংকট তৈরি হচ্ছে। তথ্য মতে, প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজারের বেশি হরিণ নিধন করা হয়। বন রক্ষার স্বার্থে বাঘ ও হরিণ রক্ষা জরুরি হয়ে পড়েছে। সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে বেড়ে যাচ্ছে লবণাক্ততা। উজানে ফারাক্কা বাঁধের কারণে এবং গঙ্গা-গড়াই-কপোতাক্ষ-মাথাভাঙ্গা-ভৈরবসহ সুন্দরবনের সঙ্গে মিঠাপানির সরবরাহের সংযোগ থাকা নদ-নদীগুলোতে পানি সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে না বা অল্প লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে এমন উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য সমস্যা তৈরি হয়েছে। কম লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে সুন্দরী ও কেওড়া গাছের জন্য রীতিমতো ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মূলত হিমালয় থেকে নেমে আসা মিষ্টি পানির প্রবাহ ও বঙ্গোপসাগরের লোনা পানির মিশ্রণে এক বিশেষ প্রতিবেশব্যবস্থা গড়ে ওঠেছে সুন্দরবনে। এক কথায়, লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে সুন্দরবনের সার্বিক প্রতিবেশব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সুন্দরবনের প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের মধ্যে সোয়া ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার পড়েছে বাংলাদেশে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের দূষণ, মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন প্রকৃতি-পরিবেশবিনাশী কর্মকাণ্ড সুন্দরবনের জন্য হুমকি তৈরি করছে। সুন্দরবন হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র শ্বাসমূলীয় বন যেখানে পলি পড়ে পড়ে নতুন ভূমির গঠন হচ্ছে। আবার নতুন জেগে ওঠা ভূমিতে একইভাবে হরিণ, বাঘ, সাপসহ অন্যান্য প্রাণীরাও আবাসস্থল গড়ছে। শত শত বছর ধরে সুন্দরবন নিজে নিজেই টিকে আছে। প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা আবার নিজে নিজেই পূরণ করে চলেছে। এই বন দক্ষিণাঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার অবলম্বন। প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সুন্দরবন তা পূরণ করতে পারলেও মনুষ্যসৃষ্ট বনবিনাশী কর্মকাণ্ড বনের জন্য মহাবিপদ ডেকে আনছে। সুন্দরবনের পাশে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানা থেকে প্রাপ্ত বর্জ্য সুন্দরবনের দূষণকে ত্বরান্বিত করছে। সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরার সংবাদও এখন শোনা যায়, যা জীববৈচিত্র্য টিকে থাকার জন্য বিরাট অন্তরায়। খালে বা নদীতে বিষ প্রয়োগ করার ফলে শুধু মাছ নয় অন্যান্য জীববৈচিত্র্যও মারা যাচ্ছে। শুঁটকির ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সুন্দরবনে উদ্ভিদ ও প্রাণী সম্পদের ক্ষতি করা হচ্ছে। বনের আশপাশে যেকোনো ধরনের শিল্পকারখানা বা উন্নয়ন প্রকল্প নেয়ার পূর্বে অবশ্যই পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষার (ইআইএ) ফলাফলকে বিবেচনায় নেয়া দরকার। সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রও। অতিরিক্ত পর্যটকের কারণে সুন্দরবনের দূষণ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি তৈরি হচ্ছে! বনে কোনো ধরনের প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ যাতে না হয় এ ব্যাপারে আগত পর্যটকদের সতর্কতা বিবেচনায় নিতে হবে।
সম্প্রতি এক গবেষণার তথ্য মতে, সুন্দরবনের শিবসা, পশুর নদসহ অন্যান্য নদ-নদী ও খালে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে। তথ্য মতে, সুন্দরবন এলাকায় প্রতিবছর লবণাক্ততা বাড়ছে প্রায় ২ পিপিটি বা পার্টস পার ট্রিলিয়ন হারে। লবণাক্ততার ফলে বিরূপ প্রভাব পড়েছে মিঠা পানির মাছের ওপর। গবেষণায় বলা হয়েছে, মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে সুন্দরবনের প্রায় ২৭ প্রজাতির মাছ। কেনোনা এই ২৭ প্রজাতির মাছ শূন্য থেকে পাঁচ পিপিটি পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। ইতোমধ্যে খুলনা ও বাগেরহাটের নদী-নালা-খাল-বিল থেকে মিঠা বা স্বাদু পানির অনেক মাছ হারিয়ে গেছে। সুন্দরবন ও চারপাশের এলাকায় লবণাক্ততার পরিমাণ যতো বাড়বে বনের প্রতিবেশ ব্যববস্থার ওপর তার বিরূপ প্রভাব পড়বে। নদ-নদীগুলোর প্রবাহ কমে আসার ফলে ধীরে ধীরে নিম্ন মুখিতার দিকে লবণাক্ততা উঠে আসছে। সুন্দরবনের আশপাশের অঞ্চলে লবণ পানি আটকে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ করার ফলেও লবণাক্ততা ক্রমাগতভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
সুন্দরবনকে সুন্দরবনের মতো থাকতে দেয়া হচ্ছে না! কারখানার দূষণে শুধু উদ্ভিদ-প্রাণীই ঝুঁকিতে নেই, বিভিন্ন প্রাণীর স্বাভাবিক খাদ্যচক্র নষ্ট হচ্ছে। সুন্দরবনে নদী-খালগুলো নানা প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণীর এক অনন্য ভাণ্ডার। বনের অস্তিত্ব রক্ষার সঙ্গে নদী-খাল আর জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। তথ্য মতে সুন্দরবনে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, ১২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১২৩ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৭০ প্রজাতির পাখি, ২০০ প্রজাতির উভচর প্রাণী ও ৩০ প্রজাতির বেশি চিংড়ি রয়েছে। বন প্রাকৃতিক সম্পদের আধার ও জলবায়ু দুর্যোগে উপকূলীয় অঞ্চলের রক্ষাদেয়াল। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ সমগ্র দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশসহ উপকূলের লক্ষ-কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা সুন্দরবনের সঙ্গে জড়িত। সুন্দরবন অক্সিজেনেরও বিশাল আধার। বন বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। এখনই উদ্যোগ না নিলে লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবনে ডলফিনসহ অনেক জলজ প্রাণী টিকে থাকতে পারবে না। আবাসস্থল ও খাদ্য সংকটসহ চোরা শিকারিদের কারণে বাঘের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় মর্যাদায় অধিষ্ঠিত শৌর্য, বীর্য আর বীরত্বের প্রতীক বাঘ রক্ষা করতে না পারলে সুন্দরবন বাঁচানো যাবে না।
বনে কোনো প্রকার ক্ষতিকর প্রভাব পড়লে তার প্রভাব পুরো দেশের ওপর পড়বে। কেনোনা বিপন্ন প্রাণীদের আবাস্থলসহ, উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুরক্ষা ও সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের অবদান অনস্বীকার্য। সুন্দরবনে লবণাক্ততা যাতে না বাড়ে সেজন্য উজানের মিঠাপানির সরবরাহ ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে মঙ্গলগ্রহে যাওয়া সম্ভব, আরো শহর বানানো সম্ভব, কিন্তু আর একটি সুন্দরবন বানানো সম্ভব না।বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবন আমাদের জন্য প্রকৃতির এক অপরূপ দান। ঝড়-ঝাপ্টা থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক অনেক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে সুন্দরবন। এখানকার জীববৈচিত্র্য এই বনকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। সুন্দরবনে রয়েছে ৫ হাজার প্রজাতির সম্পূরক উদ্ভিদ, ১৯৮ প্রজাতির উভচর প্রাণি, ১২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৭৯ প্রজাতির পাখি, ১২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ৩০ প্রজাতির চিংড়ি মাছ।রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুন্দরবনের অন্যতম আকর্ষণ। এই বনকে ঘিরেই বহু মানুষের জীবন-জীবিকা চলছে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পেও সুন্দরবন এক অসাধারণ ভূমিকা রেখে চলেছে। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে সুন্দরবন আজ নানা কারণেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। অথচ এই বনকে রক্ষা করতে না পারলে জলবায়ুর পরিবর্তনসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশকে আরও দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হবে। এজন্য সুন্দরবন রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।আজ বেসরকারিভাবে সুন্দরবন দিবস পালন করা হচ্ছে। ২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের আওতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রূপান্তর ও পরশের উদ্যোগে এবং দেশের আরও ৭০টি পরিবেশবাদী সংগঠনের অংশগ্রহণে প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ সুন্দরবন দিবস পালন করা হচ্ছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে-‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে সুন্দরবনকে ভালোবাসুন’। সত্যি বলতে কি আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই সুন্দরবনকে ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই।সুন্দরবনের পাশে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে কেন্দ্র করে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো আপত্তি জানিয়ে আসছে। তারা বলছেন, এরফলে সুন্দরবন সমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। অপরদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সুন্দরবনের ক্ষতি হয় এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে না। আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র লাগবে। প্রাকৃতিক সম্পদ কয়লার ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। তবে এজন্য সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপ নেওয়াই হবে সমীচীন।পাশাপাশি তেল-গ্যাস আবিষ্কারের জন্য অনুসন্ধানী উদ্যোগ বন্ধ, আইনানুগ সম্পদ আহরণকারীদের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত, বন ও বন্যপ্রাণী আইনকে আরও যুগোপযোগী এবং প্রয়োজনে পৃথক বন আইন, বনের ভেতর ও পাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর সংস্কার, বিশেষ করে গোরাই নদীশাসনের ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো, সুন্দরবন এলাকায় চিংড়ি পোনা ধরার কারণে মাছসহ জলজ সম্পদের যে ক্ষতি হচ্ছে তা রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার যে দাবি জানানো হচ্ছে পরিবশেবাদী সংগঠন গুলোর পক্ষ থেকে সেগুলোও আমলে নিতে হবে। সুন্দরবন আমাদের ভালোবাসার ধন। আমরা কোনোভাবেই তা হারাতে চাই না।
সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রশস্ত বনভূমি। এই বন বিশ্বের এক অপার বিস্ময়। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। সুন্দরবনের মোট আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার।সুন্দরবনকে বলা হয় বাংলাদেশের ‘প্রাণ’। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। ২০০১ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। যদিও ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসের আড়ালে হারিয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ দিবসটি।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমে অবধারিতভাবে যে প্রাণীটির কথা বলতে হবে সেটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার। আক্ষরিক অর্থে রাজসিক এই প্রাণী তার হলুদের ওপর কালো ডোরাকাটা রঙের জন্য বিশ্বখ্যাত। এই প্রজাতির পূর্ণবয়স্ক পুরুষ প্রাণীটির নাক থেকে লেজের ঠগা পর্যন্ত গড় দৈর্ঘ্য ১০ ফুট। তবে এর মধ্যে প্রাণীটির লেজের দৈর্ঘ ৩ ফুটের মতো। এদের গড় ওজন ২০০ থেকে ২৫০ কেজির মতো হয়ে থাকে। তবে এখন পর্যন্ত প্রকৃতিতে পাওয়া সবচেয়ে বড় বাঘের ওজন সোয়া তিনশ কেজি। প্রকৃতিতে এসব প্রাণী নিভৃতচারী হয়ে থাকে। এরা বন্য শূকর, হরিণ, মহিষের মতো প্রাণী শিকারের মাধ্যমে জীবন ধারণ করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাণীটির সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজারের মতো। এর শতকরা ১০ ভাগের বসবাস সুন্দরবনে।
রয়েল বেঙ্গল টাইগারের পাশাপাশি সুন্দরবনের বাসিন্দা রেসাস বানর, চিতল হরিণ, ধূসর মাথা মেছো ঈগল, নীল মাছরাঙা, নোনাপানির কুমির, করাত মাছ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ইরাবতি ডলফিন নামক এক প্রকারের স্তন্যপায়ী প্রাণী সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীগুলোতে বসবাস করে। তবে নদী দূষণের কারণে এসব জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
এই বনে বসবাসকারী অনিন্দ্য সুন্দর চিতল হরিণের বসবাস হুমকিতে। একসময় সুন্দরবনের চিতল হরিণের সংখ্যা ছিল ১ লাখের বেশি কিন্তু বর্তমানে এর সংখ্যা ৩০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বে বিপন্ন ৩১ প্রজাতির প্রাণী এখনো সুন্দরবনে টিকে আছে। এর মধ্যে ১২ প্রজাতির প্রাণী সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এ বনে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় বাংলাদেশের উপকূলের মানুষের প্রাকৃতিক ঢাল সুন্দরবন। বিপন্ন প্রাণীর আবাস। বিপন্ন প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মেছো বাঘ, ছোট মদন টাক, গ্রেট নট পাখি, রাজগোখরা, জলপাই রঙের কাছিম, দুই প্রজাতির ডলফিন (ইরাবতি ও গাঙেয়), দুই প্রজাতির উদবিড়াল ও নোনা পানির কুমির ইত্যাদি।
১৯৭৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে ইউনেস্কো। পৃথিবীজুড়ে যে নোনা পানির ৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ আছে, তার ৩৫ প্রজাতিই পাওয়া যায় সুন্দরবনে। তবে বর্তমানে নানা রকম সমস্যার মোকাবিলা করছে সুন্দরবন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, অবৈধ বসতি স্থাপন ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে গাছ কাটায় প্রতিনিয়ত সুন্দরবনের আয়তন কমেছে।
২০২০ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১৯০৪-১৯২৪ সালে সুন্দরবনের আয়তন ছিল ১১ হাজার ৯০৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯৬৭ সালে তা কমে হয় ১১ হাজার ৬৬৩ বর্গকিলোমিটার। ২০২১ সালে আয়তন কমে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৫০৬ বর্গকিলোমিটারে। অর্থাৎ গত ১০০ বছরে সুন্দরবনের আয়তন ৪৫১ বর্গকিলোমিটার কমে গেছে। এই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯০৪-১৯২৪ সালে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের আয়তন ছিল ৭ হাজার ১৪২ বর্গকিলোমিটার। ২০১৫-২০১৬ সালে আয়তন কমে ৬ হাজার ৮৭১ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ১০০ বছরে সুন্দরবনের ২৫২ বর্গকিলোমিটার হারিয়ে গেছে। এর অর্থ, প্রতিবছর আড়াই বর্গকিলোমিটারের মতো বন হারিয়ে যাচ্ছে। এই পরিমাণ জমির আয়তন আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার ৩৫০টি ফুটবল মাঠের সমান।
তাছাড়া সৌন্দর্যের প্রতীক সুন্দরী গাছ কমে গেছে প্রায় ২৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। এসব ঝুঁকির অন্যতম হলো, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর মিঠা পানির প্রবাহ হ্রাস পাওয়া। ফলে বাংলাদেশে সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের মাটি ও নদ-নদীতে সমুদ্রের পানি ঢুকে লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়েছে। এ সমাস্যার সমাধান অথবা এর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উপায় খুঁজে বের করে তা কাজে লাগানো জাতীয় স্বার্থেই খুব জরুরি।
বঙ্গোপসাগরে চর পড়ায় জোয়ারের পানিতে উচ্চতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আগেকার দিনে পাঁচ-ছয় ফুট উঁচু রাস্তা দিয়ে জোয়ারের পানি থেকে লোকালয় রক্ষা করা যেত। তবে উপকূলীয় অধিবাসীদের আগলে রেখেছে সুন্দরবন। মংলা বন্দরের চলাচলকারী নৌযানের পোড়া তেল-মবিলের কালো কালো দাগ সুন্দরবনের গাছপালার দিকে তাকালে নজরে পড়ে। সুন্দরবনের ভেতরের জাহাজসহ নানা রকম নৌযানের মেশিনের শব্দ রাতের বেলা সেগুলোর আলো এবং এর সার্চলাইট বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক পরিবেশে বিঘ্ন ঘটায়। সিমেন্ট কারখানাসহ বড় ধরনের কারখানা গড়ে উঠেছে মংলায়। সেগুলো পরিবেশদূষণ ঘটাচ্ছে।
সর্বোপরি, সুন্দরবনের পুরো পরিবেশ এখন হুমকিতে। আর বনের ভেতর চলাচলকারী রাসায়নিকবাহী জাহাজ বা বন্দরের আশপাশ এলাকার কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটলে তা বনের জন্য বিপর্যয় বয়ে আনে। তবে আশার ব্যাপার হলো, রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং তার কারণে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে সুন্দরবন সংরক্ষণে আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশ এবং ভারত দুটি দেশই প্রাণীটি তাদের জাতীয় প্রাণীর মর্যাদা দিয়েছে। তাই আশা করা যায়, জাতীয় প্রাণী ও তার বাসস্থান বাঁচাতে দুটি দেশ তাদের সামর্থ অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তাদের সম্মলিত প্রচেষ্টায় রক্ষা পাবে বিশ্বের একমাত্র শ্বাসমূলের বন; এমনটাই আশা বিশ্ববাসীর।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।