
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সর্বজনবিদিত যে, কোন কোন সময় সুস্বাস্থ্য এতটা উপকারী প্রতিপন্ন হয় না, যতটা উপকারী প্রতিপন্ন হয় রোগ-ব্যাধি। এইজন্য যে, রোগের সূচনা হওয়ামাত্র তাহার চিকিৎসা ও প্রতিবিধানের প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট হয় এবং দক্ষ চিকিৎসকের মাধ্যমেই শরীর পূর্বের তুলনায় অধিকতর নিরোগ হইয়া যায়। তারপর নানা সুস্বাদু ও পুষ্টিকর বলবর্ধক ঔষধ, পথ্য সেবনে ও আহার্য-পানীয় গ্রহণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পূর্বের তুলনায় অধিকতর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হইয়া উঠে।
অনুরূপ হযরত আদম (আ)-এর উক্ত পদস্খলনের পর উপর্যুপরি তিন শত বৎসর পর্যন্ত তওবা-ইস্তিগফার ও আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটির মধ্যে কাটাইয়া দেওয়াটা তাঁহার মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হইয়া যায়। তাই আল্লাহ তাআলা বলেন :
“আদম তাহার প্রতিপালকের হুকুম অমান্য করিল, ফলে সে দুর্ভোগে পতিত হইল। ইহার পর তাহার প্রতিপালক তাহাকে মনোনীত করিলেন, তাহার তওবা কবুল করিলেন ও তাহাকে পথনির্দেশ করিলেন” (২০ ১২১-১২২)।
আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে নবী-রাসূলগণের পদস্খলনের কথা এইজন্য বর্ণনা করিয়াছেন যাহাতে লোকে ধারণা করিতে পারে যে, তাঁহারা কত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন এবং আল্লাহ তাআলার কতই না নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা ছিলেন যে সামান্য ব্যাপারে তাঁহাদের প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারিত হইয়াছে। তাহারও সর্বদা আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকিতেন। নবী-রাসূলগণের এই ভুলভ্রান্তিগুলিই প্রকৃতপক্ষে তাঁহাদের মাসূম হওয়ার প্রমাণবহ। নবীগণের মাসুম হওয়ার দলীলসমূহ
(১) আল্লাহ তাআলা বলেন :
“যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করিল, প্রকৃতপক্ষে সে আল্লাহরই আনুগত করিল” (৪ : ৮০)।
“তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাহাতে তোমরা কৃপা লাভ করিতে পার” (৩ : ১৩২)।
প্রথমোক্ত আয়াতে রাসূলের আনুগত্যকে আল্লাহ তাআলা তাঁহার নিজের আনুগত্য বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। বলাবাহুল্য, কোন গায়ের মাসূম ব্যক্তির আনুগত্যকে স্বয়ং আল্লাহর আনুগত্য বলিয়া অভিহিত করা চলে না। আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলের আনুগত্যকে কেবল তখনই অভিন্ন বলা যাইতে পারে যখন রাসূল আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা হইতে সর্বতোভাবে মুক্ত থাকিবেন। আয়াতে তাগিদসূচক শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে,যাহাতে কেহ আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের মধ্যে পার্থক্য করে। অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে বলেন :
“যাহারা আল্লাহকে অস্বীকার করে ও তাঁর রাসূলগণকেও এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে ঈমানের ব্যাপারে তারতম্য করিতে চাহে এবং বলে, আমরা কতককে বিশ্বাস করি এবং কতককে অবিশ্বাস করি, আর তাহারা মধ্যবর্তী কোন পথ অবলম্বন করিতে চাহে, ইহারাই প্রকৃত কাফির” (৪ ও ১৫০-১৫১)।
দ্বিতীয় আয়াতে নিঃশর্তভাবে রাসূলের আনুগত্যের হুকুম দেওয়া হইয়াছে এবং তজ্জন্য রহমতের ওয়াদা করা হইয়াছে। বলা বাহুল্য, কোন গায়ের মাসূম ব্যক্তির নিঃশর্ত আনুগত্যের নির্দেশ দেওয়া হয় নাই, বরং তাহাদের আনুগত্যের নির্দেশ প্রদানকালে আনুগত্যের মাপকাঠি দেওয়া হইয়াছে এইভাবে :
“আমীরের আনুগত্য ততক্ষণ পর্যন্ত জরুরী যতক্ষণ পর্যন্ত কোন পাপাচারের হুকুম আমীর না দেয়। কিন্তু আমীর যখন কোন পাপাচারের নির্দেশ দিবে তখন আর তাহার আনুগত্য করা চলিবে“ (বুখারী)।
পক্ষান্তরে যে সমস্ত আয়াতে নবীর আনুগত্যের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে, কোথায়ও এরূপ বলা হয় নাই যে, যাবৎ না কোন পাপাচারের নির্দেশ দেওয়া হয়। ইহা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা গেল যে, নবীর কোন কাজ পাপাচার বা মাসিয়ত হইতেই পারে না, যাহাতে আমীর ও খলীফাগণের মত তাঁহাদের আনুগত্যের ব্যাপারেও শর্ত আরোপ করিতে হয়। অনুরূপভাবে বুঝা গেল যে, কোন গায়ের মাসূম ব্যক্তির নিঃশর্ত আনুগত্য রহমতের কারণও হইতে পারে না।
(২) নবীগণ যদি পাপাচার হইতে মাসূম না হইতেন তাহা হইলে তাঁহারা সাক্ষী হিসাবে গ্রহণযোগ্য হইতেন না। কেননা পাপাচারীরা ফাঁসিক হইয়া থাকে এবং ফাঁসিকের সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন :
“যদি কোন ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোন সংবাদ লইয়া আসে তবে তোমরা উহা যাচাই করিয়া লইবে” (৪৯ : ৬)।
তাহা হইলে কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মতের মুকাবিলায় নবীগণের সাক্ষ্য কিভাবে গ্রহণযোগ্য হইবে? অথচ কুরআন শরীফে আছে যে, প্রত্যেক নবী কিয়ামতের দিন নিজ নিজ উম্মতের সম্পর্কে সাক্ষ্য দিবেন। যেমন আল্লাহ বলেন :
“যখন আমি প্রত্যেক উম্মত হইতে একজন সাক্ষী উপস্থিত করিব এবং তোমাকে উহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করিব তখন কী অবস্থা হইবে” (৪ : ৪১)
(৩) নবীর কাজ হইল মানুষকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে আহবান করা। এখন তাহারা নিজেরাই যদি আল্লাহর বাধ্য-অনুগত বান্দা না হন তাহা হইলে তো তাহারা আল্লাহর ভর্ৎসনার উপযুক্ত হইবেন। যেমন কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে :
“তোমরা কি মানুষকে সৎকার্যের নির্দেশ দাও আর নিজেদেরকে বিস্তৃত হও, অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর! তবে কি তোমরা বুঝ না” (২৪৪)?
“তোমরা যাহা কর না তাহা তোমরা কেন বল এবং তোমরা যাহা কর না তোমাদের তাহা বলা আল্লাহর নিকট অতিশয় অসন্তোষজনক” (৬১ : ২-৩)।
অথচ এরূপ আচরণ একজন সাধারণ বক্তা ও নিম্নমানের আলিমের পক্ষেও সমীচীন নহে। নবী-রাসূলগণের পক্ষে তাহা কী করিয়া শোভন হইতে পারে।
(৪) পাপাচার সংঘটিত হইয়া থাকে শয়তানের আনুগত্যের কারণে। নবীগণ যদি মাসূম না হন তাহা হইলে তাহাদেরকে শয়তানের আনুগত্যকারী সাব্যস্ত করিতে হয়। যেমন আল্লাহ বলিয়াছেন :
“উহাদের সম্পর্কে ইবলীস তাহার ধারণা সত্য প্রমাণ করিল, ফলে উহাদের মধ্যে একটি মুমিন দল ব্যতীত সকলেই তাহার অনুসরণ করিল” (৩৪ ও ২০)।
অথচ নবীগণকে প্রেরণের উদ্দেশ্যই হইল শয়তানের অনুসরণ হইতে লোকজনকে রক্ষা করা।
(৫) নবীগণ মাসূম না হইলে তাহাদের তুলনায় যাহারা নবী নন তাহাদের শ্রেষ্ঠতর হওয়া প্রমাণিত হয়। কেননা উক্ত আয়াতে মুমিনদের একটি দলকে উহার ব্যতিক্রম বলা হইয়াছে। সুতরাং তাঁহারা নবীগণের চাইতেও উত্তম প্রতিপন্ন হইবেন। কেননা ঐ মতে নবীগণ যেখানে শয়তানের অনুসরণ হইতে আত্মরক্ষা করিতে পারিবেন না, সেখানে তাহারা কঠোর তাকওয়া ও ঈমানের দৃঢ়তার পরিচয় দিয়াছেন। আর আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন :
“তোমাদের মধ্যকার অধিকতর তাকওয়ার অধিকারীরাই আল্লাহর নিকট অধিকতর মর্যাদার অধিকারী” (৪৯ : ১৩)
(৬) আল্লাহ তাআলা বান্দাদিগকে দুই ভাগে ভাগ করিয়াছেনঃ হিযবুল্লাহ বা আল্লাহর দল এবং হিযবুশ শয়তান বা শয়তানের দল। প্রথমোক্ত দল বলিয়া অভিহিত করিয়া আল্লাহ তাআলা বলেন : ।
“ওহে! আল্লাহর দলই সফলকাম দল” (৫৮ : ২২)।
“ওহে! আল্লাহর দলই বিজয়ী” (৫ : ৫৬)।
“ওহে! শয়তানের দলই ক্ষতিগ্রস্ত” (৫৮ : ১৯)।
সুতরাং নবীগণের পাপাচারে লিপ্ত হওয়া সম্ভব হইলে আল্লাহর দলের পরিবর্তে তাহাদেরকে শয়তানের দলবর্তী এবং ক্ষতিগ্রস্ত হইতে হয় (নাউযু বিল্লাহ)। ইহা তো কখনও হইতে পারে না।
(৭)। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে স্বয়ং ইবলীসের উক্তি উদ্ধৃত করিয়াছেন এইভাবে :
“আপনার ক্ষমতার শপথ! আমি উহাদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করিব, তবে উহাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদিগকে নহে” (৩৮ : ৮২-৮৩)।
আর সর্বদিক দিয়া একনিষ্ঠ বান্দা কেবল নবী-রাসূলগণই, যেমন হযরত ইবরাহীম, হযরত ইসহাক ও হযরত ইয়াকূব (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে :
এবং হযরত ইউসুফ (আ) সম্পর্কে বলা হইয়াছে :
(দ্র. ৩৮ : ৪৬ ও ১২ : ২৪)।
উক্ত আয়াতসমূহে এবং কুরআনুল করীমের আরও অনেক স্থানে নবী-রাসূলগণকে আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে।
(৮)। আল্লাহ তাআলা কুরআন শরীফের বিভিন্ন স্থানে নবী-রাসূলগণকে [ ] ও [ ] নির্বাচিত, মনোনীত, বাছাইকৃত ও বিশেষ মর্যাদাবান পুণ্যবান বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন :
“নিঃসন্দেহে তাহারা ছিল আমার মনোনীত উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত” (৩৮ :৪৭)।
“স্মরণ কর ইসমাঈল, আল-ইয়াসা ও যুল-কিফলের কথা, ইহারা প্রত্যেকেই ছিল সজ্জন” (৩৮ : ৪৮)। লক্ষণীয়, তাহাদের কোন বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ করিয়া তাহাদেরকে মনোনীত ও মর্যাদাশীল বান্দা বলিয়া অভিহিত করা হয় নাই, বরং সামগ্রিকভাবে তাঁহাদেরকে মনোনীতরূপে ঘোষণা করা হইয়াছে। এহেন নির্বাচিত ও মনোনীত বান্দাগণ যে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হইতে পারেন না, তাহা বলাই বাহুল্য।
(৯)। আল্লাহ তাআলা নবী-রাসূলগণ সম্পর্কে বলিয়াছেন :
“তাহারা কল্যাণকর কাজে ধাবিত হয়” (৩ :১১৪)।
লক্ষণীয় [ ] শব্দটিকে [ ] যোগে বর্ণনা করা হইয়াছে। এই [ ] ব্যাকরণে! [ ] বা সম্পূর্ণবোধক অব্যয় বলা হয়, যাহরা অর্থ হইতেছে তাহারা সর্বপ্রকার কল্যাণেরই আধার, অকল্যাণকর কিছু তাঁহাদের দ্বারা হইতে পারে না।
(১০) প্রত্যেক পাপীতাপীর ব্যাপারেই যালিম শব্দটি প্রযোজ্য। কুরআন শরীফের অনেক স্থানেই পাপীদিগকে যালিম বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। সুতরাং কোন নবী যদি কোন অবাধ্যতায় লিপ্ত হইতেন, তাহা হইলে তাহার ব্যাপারেও উহা প্রযোজ্য হইত। কোন যালিম-এর পক্ষে নবী হওয়া কখনও সম্ভবপর নহে। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেন :
“আমার প্রতিশ্রুতি যালিমদের প্রতি প্রযোজ্য নহে” (২: ১২৪)।
উক্ত আয়াতে : শব্দ দ্বারা যদি নবুওয়াত উদ্দিষ্ট হইয়া থাকে, তাহা হইলে পাপাচারী ও যালিম যে নবী হইতে পারে না তাহা তো স্পষ্ট কথা। আর যদি ইহার অর্থ “ইমামত বা নেতৃত্ব হইয়া থাকে, যেমনটি তাফসীর জালালায়নে উক্ত হইয়াছে, তবে ইহার দ্বারা যালিমের পক্ষে নবী হওয়া যে অসম্ভব তাহা আরও জোরদারভাবে প্রমাণিত হয়। কেননা ইমামতের তুলনায় নবুওয়াতের মর্যাদা এতই অধিক যে, বিন্দুর সাথে সিন্ধুর তুলনাও এখানে অচল। এমতাবস্থায় যালিম যদি ইমাম বা নেতাই হইতে না পারে, নবী হইবে কেমন করিয়া?
(১১) আল্লাহ তাআলা বলেন :
“আল্লাহ তাআলা সেই পবিত্র সত্তা যিনি নিরক্ষর সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন তাহাদেরই মধ্য হইতে যিনি তাহাদেরকে তাহার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করিয়া শুনাইবেন এবং তাহাদেরকে পবিত্র করিবেন” (৬২ :২)।
নবী নিজেই যদি আত্মিকভাবে বিশুদ্ধ না হইয়া পাপাচারী হন তাহা হইলে তাহার দ্বারা অন্যদের শুদ্ধি কেমন করিয়া সাধিত হইতে পারে?
(১২) নবী আল্লাহর পক্ষ হইতে উম্মতের জন্য উসওয়ায়ে হাসানা (সুন্দরতম আদর্শ) এবং আল্লাহ তাআলার পসন্দসই চারিত্রিক গুণাবলীর আধার হইয়া থাকেন, যাহাতে লোকজন বিনা আপত্তিতে চোখ বুজিয়া তাঁহাকে অনুসরণ করিতে এবং তাহার প্রতিটি কথা ও কাজকে নিজেদের জন্য আদর্শরূপে গ্রহণ করিতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন ।
“তোমাদের মধ্যে যাহারা আল্লাহ ও শেষ বিচারের দিনকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণ স্মরণ করে তাহাদের জন্য অবশ্যই উত্তম আদর্শ রহিয়াছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে” (৩৩ : ২১)।
বলা বাহুল্য, আল্লাহ তাআলা পছন্দনীয় স্বভাব-চরিত্র, তাঁহার আনুগত্যের নমুনা এবং আল্লাহর ভয় অন্তরে পোষণকারীদের আদর্শ কেবল এমন ব্যক্তিই হইতে পারেন যিনি আল্লাহ তাআলার নাফরমানী হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র হইবেন।
(১৩) কোন ব্যক্তি যদি নবীর বর্তমানে কোন কাজ করে এবং নবী তাহা লক্ষ্য করিয়াও চুপ থাকেন বা মৌন সমর্থন দেন তবে তাহার ঐ মৌনতাই ঐ কাজটি বৈধ হওয়ার প্রমাণরূপে সকল দলমতের মুসলমানদের কাছে গ্রহণযোগ্য। ইহাতে প্রতীয়মান হয় যে, নবীর মৌন সমর্থনই কোন কাজকে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণের সীমা হইতে বৈধতার গণ্ডীর মধ্যে নিয়া আসে। এমতাবস্থায় তাঁহার নিজের করা কাজ কেমন করিয়া আল্লাহ্ তাআলার অবাধ্যতা বলিয়া গণ্য হইতে পারে?
(১৪) কতক লোক যখন নিজেদের সম্পর্কে দাবি করিল যে, তাহারা আল্লাহর প্রিয়ভাজন, তখন আয়াত নাযিল হইল :
“তুমি বলিয়া দাও (হে রাসূল), যদি তোমরা প্রকৃতই আল্লাহকে ভালবাস তবে আমার অনুসরণ কর, তাহা হইলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসিবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করিয়া দিবেন” (৩ :৩১)।
উক্ত আয়াতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুসরণকে আল্লাহ নিজের ভালবাসার মাপকাঠি সাব্যস্ত করিয়াছেন। তারপর তাহার অনুসরণের বিনিময়ে দুইটি অঙ্গীকার করিয়াছেন। ইহার একটি হইল, যদি তোমরা আমার নবীর অনুসরণ কর, তাহা হইলে আমি তোমাদেরকে আমার প্রিয়পাত্ররূপে গ্রহণ করিব। দ্বিতীয়ত, তোমাদের গুনাহরাশিও মাফ করিয়া দিব।
বলা বাহুল্য, আল্লাহ তাআলার ভালবাসার মাপকাঠি এমন পুণ্যাত্মা ব্যক্তির অনুসরণই হইতে পারে যিনি মাসূম হইবেন। একজন গায়র মসূমের আনুগত্য মহান আল্লাহর ভালবাসা লাভের এবং গুনাহসমূহের ক্ষমার কারণ হইতে পারে না (দ্র. ইসমাতুল আম্বিয়া আরবী, পৃ. ৪-১০; ফখরুদ্দীন রাযী (৫৪৩-৬০৬হি); মাআরিফুল কুরআন (উর্দু),১খ,পৃ. ৯৯-১১৩; ইদরীস কান্দেহলভী প্রণীত মাকতাবায়ে উছমানীয়া বায়তুল হামদ, লাহোর, ২য় মুদ্রণ, ১৯৮২ খৃ.)।
গ্রন্থপঞ্জী ও বরাত নিবন্ধ গর্ভে প্রদত্ত হইয়াছে।
আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী
সে (শয়তান) তাহাদের দুইজনের নিকট শপথ করিয়া বলিল, নিশ্চয় আমি তোমাদের দুইজনের হিতাকাঙ্খীদের একজন” (৭ : ২১)।
তখন হযরত আদম (আ)-এর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হইল না যে, মহান আল্লাহর পবিত্র নাম লইয়াও কেহ মিথ্যা শপথ করিতে পারে, মিথ্যা কথা বলিতে পারে। তিনি মনে করিলেন, আল্লাহর কোন বান্দাই তাহার পবিত্র ও মহান নাম লইয়া মিথ্যা শপথ করিতে পারে না। সুতরাং বুঝা গেল যে, হযরত আদম (আ)-এর উক্ত কাজ বিরুদ্ধাচরণের উদ্দেশ্যে বা রিপুর তাড়নায় ছিল না। তাই উহাকে গুনাহ বা অপরাধ বলা যাইবে না বরং উহাকে তাঁহার পদস্খলনই বলিতে হইবে। আল্লাহ তাআলার বাণী l এবং ১৬;i–এর উভয় ক্ষেত্রেই উহা যে তাঁহার পদত্থলন ও ভুলবশত ছিল, তাহার আল্লাহর নাফরমানীর ইচ্ছা ছিল না সেদিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে।
সুতরাং কুরআনুল কারীমের যে সমস্ত আয়াতে উহাকে তাহার বিরুদ্ধাচরণ বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে উহা কেবল যাহেরী সুরত হিসাবেই বলা হইয়াছে, প্রকৃত অর্থে নহে অথবা তাহার উচ্চ মর্যাদার অনুপাতে উহাকে ইসয়ান বা অপরাধ বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে।
নবী-রাসূলগণের ক্ষেত্রে উত্তম কাজ ছাড়িয়া অনুত্তম বা তাহার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের কাজ করাই এমন যেমনটি অন্যদের জন্য অপরাধমূলক কর্ম (দ্র. খিয়ালী–এর মোল্লা আবদুল হাকীমের লিখিত পাদটীকা)।
নবী-রাসূলগণের ক্রটির অর্থ হইতেছে উত্তম ও শ্রেষ্ঠতরটির স্থলে ভুলবশত তাহাদের অপেক্ষাকৃত অনুত্তমটি করিয়া বসা। আর অন্যদের ত্রুটির অর্থ হক ও হিদায়াতের স্থলে বাতিল বা গোমরাহীর মধ্যে লিপ্ত হইয়া পড়া। উম্মতের আলিমগণের সর্ববাদীসম্মত মতে আম্বিয়ায়ে কিরাম এই জাতীয় ত্রুটি বা অপরাধ হইতে মুক্ত, মাসূম। তাহাদের ইজতিহাদগত ত্রুটির অর্থ হইতেছে ভুলবশত উত্তম ও শ্রেষ্ঠতরটির স্থলে অপেক্ষাকৃত অনুত্তম তাঁহাদের দ্বারা সংঘটিত হইয়া যাওয়া।
হযরত আদম (আ)-এর পদস্খলন (;) ততটুকুই। তাহা না হইয়া (আল্লাহর আশ্রয় চাই) তাঁহারা যদি লোভের বশবর্তী ও রিপুর অনুবর্তী হইতেন, তাহা হইলে আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর তাহাদের নিঃশর্ত ও অকুণ্ঠ আনুগত্য কখনও ফরয বা অপরিহার্য করিয়া দিতেন না আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে তাঁহাদের অনুকরণের নির্দেশ দিয়া বলিতেন না?
“ইহারাই হইতেছে সেই সব ব্যক্তি যাহাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ হিদায়াত দান করিয়াছেন, সুতরাং (তুমি ওহে রাসূল) তাহাদেরই অনুকরণ কর” (৬ : ৯০) (দ্র. আল-মুতামাদ ফিল-মুতাকাদ তাওরীশী প্রণীত)।
ইমাম আবু মানসূর মাতুরীদী (র) বলেন : চিন্তা-গবেষণায় ইহাই যৌক্তিক গ্রহণযোগ্য হইতে বাধ্য যে, আম্বিয়ায়ে কিরামের মাসূম হওয়ার বিশ্বাস ফেরেশতাদের মাসূম হওয়ার বিশ্বাসের চাইতে অধিকতর তাকিদপূর্ণ ও গুরুত্ববহ। এইজন্য যে, লোকজন আম্বিয়ায়ে কিরামের অনুসরণ করার জন্য আদিষ্ট, ফিরিশতাগণের অনুসরণের জন্য আদিষ্ট নহে (দ্র, আল-মুতামাদ ফিল-মুতাকাদ, পৃ. ৭৩)।
ইমাম রাযী (র) বলেন, ইসমতের সম্পর্ক চারটি ব্যাপারের সহিতঃ
(১) আকাইদ (বিশ্বাস)
(২) আহকাম (আদেশ-নিষেধের তাবলীগ)
(৩) ফাতওয়া ও ইজতিহাদ;
(৪) কার্যকলাপ, আচার-আচরণ, অভ্যাস ও স্বভাব-চরিত্র।
(১) আকাইদ সম্পর্কে গোটা মুসলিম উম্মাহর সর্ববাদীসম্মত মত এই যে, নবী-রাসূলগণ একেবারে গোড়া হইতেই সহজাতভাবে তাওহীদ ও ঈমানের অধিকারী হইয়া থাকেন। ভূমিষ্ঠ কাল হইতেই তাঁহাদের অন্তর কুফর ও শিরকের ক্লেদমুক্ত এবং ইয়াকীন ও বিশ্বাসে পরিপূর্ণ থাকে। তাঁহাদের মুবারক চেহারাসমূহ সর্বদা মারিফাত ও আল্লাহর নৈকট্যের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত থাকে। আজ পর্যন্ত ইতিহাসে ইহার কোন প্রামণ পাওয়া যায় নাই যে, আল্লাহ তাআলা যে পবিত্র আত্মা মনীষিগণকে নবুওয়াত ও রিসালাত দানে ধন্য করিয়াছিলেন, তাহাদের মধ্যকার কোন একজনও জীবনের কোন পর্যায়ে শিরক ও কুফরের কলুষতায় নিপতিত হইয়াছেন। আল্লাহ তাআলার বাণী :
“ইবরাহীমকে আমি পূর্ব হইতেই হিদায়াত দান করিয়াছিলাম এবং আমি তাহার সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত ছিলাম” (২১ : ৫১)। ইহা দ্বারা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, নবুওয়াত লাভের পূর্বে যদিও নবীগণ নবী পদবাচ্য হন না, তবুও তাহারা তখনও আল্লাহ কামিল ওলী এবং নৈকট্যধন্য অবশ্যই থাকেন। তাঁহাদের সেই বিলায়াত এত উচ্চ মানের হয় যে, অন্য ওলীগণ তাহাদের তুলনায় সমুদ্রের সম্মুখে বারি বিন্দুসমও গণ্য হন না। এইজন্য উম্মতে মুহাম্মাদীর আলিমগণ এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত যে, আম্বিয়ায়ে কিরামের অন্তরে কুফর ও গুমরাহির উপস্থিতি অসম্ভব।
(২) তাবলীগে আহকাম বা আদেশ-নিষেধের প্রচারে নবী-রাসূলগণ যে মাসূম এ ব্যাপারে গোটা উম্মত একমত। এই ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁহাদের কোন ভুলভ্রান্তির শিকার হওয়া বা মনের অজান্তে ভুলক্রমে তাবলীগের ক্ষেত্রে তাহাদের মিথ্যা বা বিকৃতির আশ্রয় লওয়া অসম্ভব। এই ব্যাপারে তাঁহারা সর্বতোভাবে মাসূম ও পবিত্র। তাঁহাদের সুস্থ বা অসুস্থ অবস্থায় অনুরাগ বা বিরাগের ক্ষেত্রে কোন অবস্থায়ই ওহী প্রচারের ব্যাপারে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাহাদের কোনরূপ মিথ্যা বা ছলচাতুরীর আশ্রয় লওয়া একটি অসম্ভব ব্যাপার। নচেৎ অকুণ্ঠচিত্তে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় ফেরেশতাগণের কঠোর প্রহরার ব্যবস্থা থাকিত, যাহাতে শয়তানের কোনরূপ হস্তক্ষেপ, ভেজাল বা মিথ্যার সংমিশ্রণ ওহীর সহিত না ঘটিতে পারে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন :
“তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা; তিনি তাঁহার অদৃশ্যের জ্ঞান কাহারও নিকট প্রকাশ করেন না তাঁহার মনোনীত রাসূল ব্যতীত। সেই ক্ষেত্রে আল্লাহ রাসূলের অগ্র ও পশ্চাতে প্রহরী নিয়োজিত করেন, রাসূলগণ তাহাদের প্রতিপালকের বাণী পৌঁছাইয়া দিয়াছেন কিনা জানিবার জন্য। রাসূলগণের নিকট যাহা আছে তাহা তাঁহার জ্ঞানগোচর এবং তিনি সমস্ত কিছুর বিস্তারিত হিসাব রাখেন” (৭২ : ২৬-২৮)।
(৩) ফাতওয়া ও ইজতিহাদের ব্যাপারে উলামায়ে ইসলামের মত হইতেছে, আম্বিয়ায়ে কিরাম যে সমস্ত ব্যাপারে ওহী অবতীর্ণ হয় নাই এমন ব্যাপারসমূহে কখনও কখনও ইজতিহাদও করিতেন। কখনও সেই সব ইজতিহাদে ভুলত্রুটি হইয়া গেলে সাথে সাথে ওহীর মাধ্যমে তাঁহাদিগকে সতর্ক করিয়া দেওয়া হইত। নবী-রাসূলের পক্ষ হইতে ইজতিহাদগত কোন ত্রুটি হইয়া যাইবে অথচ আল্লাহর পক্ষ হইতে তাঁহাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হইবে না এমনটি হইতেই পারে না।
(৪) কার্যকলাপ ও আচার-আচরণের ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত-এর অভিমত এই যে, নবী-রাসূলগণ কবীরা গুনাহ হইতে সর্বতোভাবে মুক্ত ও পবিত্র, অবশ্য সগীরা বা অনুত্তম পর্যায়ের কাজ কখনো ভুলবশত বা অজ্ঞাতসারে হইয়া যাইতে পারে। বাহ্যিকভাবে তাহা অপরাধ বলিয়া মনে হইলেও ঐগুলির দ্বারাও শরীআতের কোন কোন হুকুম ব্যক্ত করাই উদ্দেশ্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যাইতে পারে, যুহর বা আসরের নামাযে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভুল (সাহু) হইয়া যাওয়া। বাহ্যত উহা ভুল বলিয়া দেখা গেলেও ইহার দ্বারা প্রকৃতপক্ষে সিজদায়ে সহো শিক্ষা দেওয়াই উদ্দেশ্য ছিল । নবী করীম (স)-এর নামাযে সাহু না হইলে উম্মত সিজদায়ে সাহুর মাস্আলা কীভাবে শিক্ষা লাভ করিত। অনুরূপভাবে ‘লায়লাতুত তারীছ নামে মশহুর রাত্রিতে তাহার নামায কাযা
হইলে উম্মত কাযা নামায আদায়ের মাস্আলা কোথা হইতে লাভ করিত? এই হিসাবে ঐ সাহু বা ভুলিয়া যাওয়াটাও ছিল আল্লাহর দয়া ও সাক্ষাত রহমত। এইজন্য হযরত আবু বকর (রা) বলিতেনঃ “হায়, যদি আমি মুহাম্মাদের ভুলত্রুটিই হইতাম”! অর্থাৎ মহানবী (স)-এর ভুল ও আমার হাজার নির্ভুল হইতে উত্তম। আল্লাহ তাআলার বাণী :
“নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্মৃত হইবে না, আল্লাহ যাহা ইচ্ছা করেন তাহা ব্যতীত” (৮৭ ও ৬–৭)।
এই আয়াত দ্বারাও সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, নবীর তুলিয়া যাওয়ার মধ্যেও কোন না কোন তাৎপর্য নিহিত থাকে। মানুষ হিসাবে নবী-রাসূলগণেরও ভুলত্রুটি হইয়া থাকে। তাহা এইজন্য যে, তিনি যতক্ষণ পর্যন্ত মানবরূপে থাকিবেন, মানবীয় বৈশিষ্ট্যাবলী হইতে ততক্ষণ পর্যন্ত মুক্ত থাকা সম্ভব নহে ও ক্ষুধা-তৃষ্ণা আছে, আনন্দ-উফুল্লতাও আছে, হাসি-কান্না আছে, অনুরাগ-বিরাগও আছে। আল্লাহ তাআলা বাণী :
“বল আমি তোমাদেরই মত মানুষ” (১৮ : ১১০)। ইহার মধ্যে তাহার ইঙ্গিত রহিয়াছে অর্থাৎ নবী হওয়া সত্ত্বেও আমি মানুষই, ফেরেশতা নই। তোমাদেরই মত পানাহার করিয়া থাকি এবং মানবীয় প্রয়োজনাদি মিটাইবার উদ্দেশে হাট-বাজারেও গিয়া থাকি। এইসব কিছুই মানবীয় বৈশিষ্ট্য। এইগুলিও নবুওয়াত ও রিসালতের পরিপন্থী নহে। অবশ্য নবী-রাসূলগণের ভুল-ত্রুটি স্থায়ী হয় না, মানবীয় কারণে কখনও কোন ভুলচুক হইয়া গেলেও তাহা ঐ একবারই, জীবনে আর কোন দিন সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি হয় না। যেমন হাদীসে আছে :
“মুমিন কখনও একই গর্তে দুইবার পা দেয় না।”
অনুরূপ হযরত আদম (আ)-এর উক্ত নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণও ছিল মানবীয় ভুলের ফসল। তাই আল্লাহ তাআলা বলেন :
আদম (আ) বিস্মৃত হইলেন এবং আল্লাহর নিষেধ ও শয়তানের শত্রুতার কথা তাহার স্মরণে রহিল না। অবাধ্যতার ইচ্ছা তাঁহার মোটেও ছিল না। কেবল শয়তানের কসমের দ্বারাই তিনি প্রতারিত হন। হাদীছে আছে : (মুমিন প্রতারিত হইয়া পড়ে)। আল্লাহ তাআলা বলেন :
“তোমরা কোন ভুল করিলে তোমাদের কোন অপরাধ নাই, কিন্তু তোমাদের অন্তরে সঙ্কল্প থাকিলে অপরাধ হইবে “ (৩৩ : ৫)।
উক্ত আয়াত অনুসারে অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটিতে যেখান গুনাহ নাই, সেখানে উহা ইসমতের পরিপন্থী নহে। এই কারণেই রোযা অবস্থায় ভুলক্রমে পানাহার করিয়া ফেলিলে উহাতে রোযা ভঙ্গ হয় না। হযরত আদম (আ)-এর অন্তর যেহেতু পবিত্র এবং আল্লাহ ভক্তিতে পরিপূর্ণ ছিল তাই শয়তান যখন বলিল : (নিশ্চিতভাবেই আমি তো তোমাদের হিতাকাঙ্খীদের একজন; ৭ : ২১), তখন তিনি কল্পনাও করিতে পারেন নাই যে, স্বয়ং আল্লাহ তাআলার নামে কেহ মিথ্যা কসম করিতে পারে। এই প্রতারণার মাধ্যমে শয়তান আদম (আ)-এর পদস্খলন ঘটায়। কুরআন শরীফের ভাষায়:
“শয়তান তাহাদের দুইজনকে ধোঁকা দিয়া অধঃপতিত করিল” (৭ : ২২)। [ ] শব্দটি ব্যবহারের দ্বারা সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এই মাসিয়াত বা অপরাধটির মূলে রহিয়াছে ধোঁকা বা প্রতারণা। নতুবা আদমের তাহাতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না। তিনি বরং আল্লাহ তাআলার আরও ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্খী ও তজ্জন্য প্রয়াসী ছিলেন। আনুগত্যের বাহানায় শয়তান তাঁহাকে বিরুদ্ধাচরণের অপরাধে লিপ্ত করে। কিন্তু এই অপরাধটি কেবল বাহ্যিকভাবেই অপরাধ ছিল। প্রকৃতপক্ষে তাহা ছিল মহা নিমত ও অনন্ত রহমত। উহার উদ্দেশ্য ছিল গুনাহগারদেরকে তওবা ও ইস্তিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনার পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া। যেমন মহানবী (স)-এর নামাযে ভুলের দ্বারা সাহু সিজদা শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, তেমনি আদম (আ)-এর ত্রুটির দ্বারা আদম সন্তানদেরকে তওবা-ইসতিগফার শিক্ষা দানই উদ্দেশ্য। যখন কোন আদম সন্তানের দ্বারা কোন পাপকার্য সংঘটিত হইয়া পড়ে, অমনি সে তাহার আধিপিতা আদম (আ)-এর ন্যায় কান্নাকাটি ও আহাজারির সহিত আল্লাহ তাআলার দরবারে লুটাইয়া পড়িবে। সে শয়তানের মত উল্টা তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হইবে না। যদি আদম (আ)-এর দ্বারা কোন ভুলই সংঘটিত না হইত, তাহা হইলে আদম-সন্তানগণ তওবা-ইস্তিগফারের শিক্ষা কেমন করিয়া লাভ করিত?
শায়খ আবদুল ওয়াহআব শারানী (র) বলেন, “আল্লাহ তাআলার ইম-এর মধ্যে সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য দুইটিই ছিল। তাঁহার হিকমত ছিল এই যে, দুইটিরই সূচনা হইয়া যাইবে। তাহা তিনি সৌভাগ্যের উদ্বোধন আদম (আ)-এর দ্বারাই করাইলেন এবং যুগপভাবে দুর্ভাগ্যের উদ্বোধন শয়তানের দ্বারা করাইলেন।”
হাদীছ শরীফে আসিয়াছে, যে ব্যক্তি কোন সুন্নাতে হাসানা বা শুভ রীতির সূচনা করে, উহার উপর আমলকারী সকলের সওয়াবের সমপরিমাণ ছওয়াব সেই সূচনাকারীও লাভ করিয়া থাকে। যতদিন পর্যন্ত সেই শুভ কর্মটি চালু থাকিবে, ততদিন পর্যন্ত সে ঐ ছওয়াব পাইতে থাকিবে। অনুরূপ হযরত আদম (আ) এই পৃথিবীতে তওবা ও ইস্তিগফার তথা আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করার ও ক্ষমা প্রার্থনার বরকতময় সুন্নাত বা রীতি প্রবর্তন করিয়াছেন। কিয়ামত পর্যন্ত যত লোক তওবা ও ইস্তিগফার করিয়া আল্লাহ তাআলার দরবারে কান্নাকাটি করিবে, তাহাদের সকলের সওয়াবের ভাগ তিনিও লাভ করিবেন এবং আল্লাহর দরবারে তাঁহার মর্যাদা বৃদ্ধি পাইতে থাকিবে।
পক্ষান্তরে ইবলীস অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও অহমিকা প্রকাশের (সুন্নাতে সায়্যিআ) বা অশুভ রীতির প্রবর্তন করে। কিয়ামত পর্যন্ত যত ব্যক্তি আল্লাহর আদেশের ।