1. mesharulislammonir1122@gmail.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন
  2. info@www.sangjogprotidin.com : দৈনিক সংযোগ প্রতিদিন :
শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:১৭ পূর্বাহ্ন

শিশুদের পৃথিবী ‘শৈশব’অন্ধকার

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১১০ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: কুণ্ডলী পাকানো মেঘ, ঝরঝর বৃষ্টি ও গাছের ডালে বসে থাকা বিভিন্ন পাখপাখালি দেখতে দেখতেই হঠাৎ শিশুদের কলরব ও হুটোপুটির শব্দ! শব্দের উৎস খুঁজতে খুঁজতে চোখ আটকে গেল দেয়াল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শিশুদের হাতের রঙিন ছাপে। ভাবছেন এ কোন দুনিয়া? এটি শিশুদের আপন ভুবন ‘শৈশব।’ শিশুরা এখানে খেলে নিজেদের ইচ্ছামতো। আঁকে যেমন খুশি তেমন।
ডে কেয়ার সেন্টার ‘শৈশব’ সবে শুরু করেছে তাদের কার্যক্রম। শিশুদের ওপর ভালোবাসা থেকেই স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলামের এ উদ্যোগ। অবশ্য শৈশবকে গতানুগতিক ডে কেয়ারের সঙ্গে তুলনা করতে নারাজ তিনি। কেবল কর্মজীবী বাবা-মায়ের সন্তান নয়, যে বাবা মা সবসময় ঘরে থাকেন তাদের শিশুরাও যেন ‘শৈশব’-এ থাকে, এমনটা ইচ্ছা নজরুল ইসলামের। সেটা কেন? ‘কারণ এখন ছোট ফ্যামিলিই বেশি। বাবা-মা হয় চাকরি করেন নাহলে ব্যস্ত থাকেন বিভিন্ন কাজে। শিশুকে খাওয়ানো বা যত্ন নেওয়া ছাড়া তাদের জন্য আমাদের সময় কতটুকু? ফলে এখনকার শিশুরা বেড়ে উঠছে একাকীত্ব নিয়ে। একা একা বেড়ে ওঠার ফলে সহযোগিতা করার মানসিকতা কিংবা সহমর্মিতার মতো মানবিক গুণাবলী তারা শিখছে না। এটি তাদের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত খারাপ। শিশুরা আসলে কী চায়? কেবল আপনার একটু সময় আর মনোযোগ- আর কিচ্ছু না। শৈশবে এটাই পাচ্ছে তারা’- বলেন তিনি।
যেমন খুশি তেমন আঁকার দেয়াল
কথা বলতে বলতেই ১৪ মাসের ছোট্ট সৃজিতা হাসিমুখে এগিয়ে এলো। সঙ্গে সঙ্গে এলো ঈপ্সিতা, নিধি, অরিত্র। তাদের দুষ্টুমিতে মুখরিত হয়ে গেল পরিবেশ। শিশুদের দেখাশোনা করছেন লীনা। তিনি জানালেন, সৃজিতা বাসায় ভাত খেতো না বলে অভিযোগ করতেন ওর বাবা মা। অনেক চেষ্টা করেও যাকে ভাত খাওয়ানো যায়নি সে এখন নিয়মিত সবজি দিয়ে ভাত খাচ্ছে! তাছাড়া অনেক শিশু এখানে থাকতে এতোই পছন্দ করে যে শুক্রবার দিনও ব্যাগ গুছিয়ে চলে আসতে চায়! এগুলোই শৈশব-এর প্রাপ্তি।
শিশুদের সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করার জন্য এখানে রয়েছেন বেশ কয়েকজন তত্ত্বাবধায়ক। শিশুদের খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানোসহ সব ধরনের যত্নআত্তি করেন তারা। এছাড়া শিশু খেলতে খেলতে হঠাৎ আঘাত পেলে কী করতে হবে সেসব বিষয়েও ট্রেনিংপ্রাপ্ত সবাই। স্বাস্থ্যকর পরিবেশে এখানেই রান্না করা হয় শিশুদের খাবার। সকাল, দুপুর ও বিকালে শিশুদের জন্য পরিবেশন করা হয় বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার। খাদ্য তালিকায় রয়েছে হাতে তৈরি রুটি, পরাটা, হালুয়া, ডিম, দুধ, খিচুড়ি, ভাত, ডাল, সবজি, ফল, পোলাও, মুরগি, ফ্রায়েড রাইস, নুডলস, বিস্কুট ইত্যাদি।
চলছে খেলাধুলা

নজরুল ইসলাম জানান, শৈশব শুরু করার আগে বিভিন্ন ডে কেয়ার সেন্টারে নিজেই গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন তিনি। তাদের কর্মপদ্ধতি, অভিজ্ঞতাসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জেনেছেন। তারপর শুরু করেছেন শৈশব। জানান, বেশিরভাগ ডে কেয়ার সেন্টারই শিশুদের খাবারের ব্যবস্থা রাখে না। কারণ মাছ বাছতে গিয়ে যদি রয়ে যায় কাটা, সেই দায়িত্ব কে নেবে? তবে শৈশব-এর উদ্দেশ্যই হচ্ছে বাবা মাকে ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়ে শিশুর সবটুকু দায়িত্ব নিয়ে নেওয়া। একজন মাকে যদি সকালে অফিসে যাওয়ার আগে বিভিন্ন কাজকর্ম সামলানোর পাশাপাশি শিশুর তিনবেলার খাবারও তৈরি করতে হয়, তবে আর শৈশব কীভাবে মাকে নিশ্চিন্ত থাকার আশ্বাস দেয়? খাবার থেকে শুরু করে দিনভর শিশুর যাবতীয় নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব তাই নিচ্ছে শৈশব। এখানে প্রি-স্কুলিংও করানো হয়। অনেক শিশু স্কুল থেকে ফিরে হোমওয়ার্ক করে এখানে। সারাদিনের কর্মকাণ্ড শেষ করে তবেই বাসায় পাঠানো হয় শিশুকে। এতে দিনভর কাজ করে ক্লান্ত বাবা-মাকে যেন শিশুর পড়াশোনা নিয়ে চিন্তা করতে হয় না, আর শিশুও সারাদিন পর বাবা-মায়ের সঙ্গে কাটাতে পারে আনন্দময় সময়।
৬ মাস থেকে শুরু করে ৭ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা শৈশবের সদস্য হতে পারবে। এখানে রয়েছে তিন ধরনের প্যাকেজ। প্রথমটি সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত। দ্বিতীয়টি দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সাধারণত স্কুল পড়ুয়া শিশুরা আসে এ সময়। তৃতীয় প্যাকেজটি হচ্ছে কয়েক ঘণ্টার। অনেক সময় কোন দরকারে বাবা-মা বাইরে গেলে যদি শিশুকে কোথাও রাখার ব্যবস্থা করতে না পারেন, তবে শৈশবের তৃতীয় প্যাকেজটি নিতে পারেন।
যেমন খুশি তেমন আঁকো
নজরুল ইসলাম মনে করেন, বেশিরভাগ শিশুর ওপর সৃজনশীল কাজগুলো চাপিয়ে দেন বাবা-মা। গান অথবা নাচ- শিশু কোনটা শিখবে সে সিদ্ধান্ত নেন তারাই। ফলে নাচ জানা একজন শিশু হয়তো জানতেও পারে না যে তার প্রতিভা ছিলো গান গাওয়ার! ‘শৈশব’-এর শিশুরা নিজেরাই নিজেদের বিভিন্ন বিষয়ে যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেভাবেই গড়ে তোলা হবে তাদের। হারমোনিয়াম, ঘুঙুর- সবকিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এখানে। দুটি দেয়াল কেবল শিশুদের আঁকাআঁকি করার জন্যই বরাদ্ধ। ইচ্ছা হলেই দলবেঁধে গান গাও, কিংবা নাচো! কিংবা রঙ পেন্সিল নিয়ে দেয়ালে আঁকতে শুরু করো! একসময় শিশু নিজেই বুঝে যাবে তার আগ্রহ আসলে কোনদিকে। শৈশবে শিশুদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন ওয়ার্কশপও। আগামীকাল বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ির মাঠে শৈশবের প্রথম কর্মশালায় শিশুরা ঘুড়ি বানাবে এবং ওড়াবে। ২১ ফেব্রুয়ারিতে তৈরি করবে শহীদ মিনার। নাচ, গান, ছবি আঁকার কর্মশালার পাশাপাশি খালি হাতে আত্নরক্ষা বিষয়েও খুব শীঘ্রই শেখানো হবে শৈশবে।

এখনও ডে কেয়ার নিয়ে মানুষের মধ্যে রয়েছে অনেক ভুল ধারণা। পরিবারের নানী-দাদীরা তো বটেই, অনেক বাবা-মাও মনে করে ডে কেয়ারে দেওয়া মানেই শিশুকে অনিরাপদ কোন পরিবেশে দিয়ে দেওয়া। এই ধারনাটি বদলে যাওয়া খুব জরুরি বলে মনে করেন নজরুল। ‘আমরা যদি শিশুকে স্কুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারি, তাহলে ডে কেয়ারে কেন নয়?’- প্রশ্ন করেন তিনি।
শৈশব-এর স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম
‘আমাদের শিশুরা একটি বেড়াঘেরা পরিবেশে বেড়ে উঠতে উঠতে হঠাৎ করে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। বেড়ার বাইরের দুনিয়াকে সে চেনে না। এভাবে মানসিকভাবে পঙ্গু অবস্থায় সে বেড়ে ওঠে। কিন্তু একটি প্রজন্ম এভাবে একা একা বড় হতে পারে না। শৈশব একটি সুস্থ প্রজন্ম তৈরি করতে চায়। শিশুকে একটি আনন্দময় শৈশব উপহার দেওয়ার লক্ষ্যেই পথচলা শুরু করেছে শৈশব’- বলেন নজরুল ইসলাম। বিশাল উঠানওয়ালা বাড়িতে শিশুরা দুষ্টুমিতে মেতে উঠবে নিজেদের মতো, একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করবে অনুভূতি এবং সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে শৈশবের এমন হাজারও শাখা- শৈশব দেখে এমন স্বপ্ন।
আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই বাক্যটি শুধু কাগজে কলমেই দেখা যায়। বাস্তবের সাথে মিল নেই। আমরা শিশুদের দিয়ে শ্রম আদায় করি। তাদের যথ াযথ মূল্যায়ন করি না। তাদের সুন্দর শৈশবটাকে কষ্টে জর্জরিত করেছি। শৈববের সুখটুকু কেড়ে নিয়েছি। তাদের পড়ালেখার অধিকার দিতে পারিনি। দিতে পারিনি যথাযথ আদর-স্নেহ, মায়া-মমতা। কেড়ে নিয়েছি তাদের ন্যায্য অধিকার। স্কুল-মাদ্রাসায় না পাঠিয়ে তাদের দিয়ে দিচ্ছি মানুষের বাসায় কাজের জন্য কিংবা বেকারিতে। সম্প্রতি ৮-৯ বছরের এক ছেলেকে দেখতে পেলাম। জীর্ণশীর্ণ পোশাক। সারা শরীরে পুড়ে যাওয়া মবিলের গন্ধ। তার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করলাম। মিষ্টি গলায় কথা বললাম। এক পর্যায়ে বলল, ওয়ার্কশপে কাজ করে। মালিক ঠিকমতো বেতন দেয় না। কাজে ভুল হলে শারীরিক নির্যাতন করে। আসলে অসুস্থ নিয়ম-কানুনের কাছে আমাদের হাত-পা বাঁধা। ফেসবুকে দেখতে পেলাম, তিনজন শিশুকে হাত-পা বেঁধে বেত্রাঘাত করা হচ্ছে। তাঁদের অপরাধ দোকান থেকে তিনজনে তিনটি চকলেট নিয়ে খেয়ে ফেলেছে। আমরা কত অমানবিক হলে বাচ্চাদের চকলেট খেয়ে ফেলার জন্য মারধর করতে পারি। আমাদের মানবিক হতে হবে, শিশু নির্যাতন বন্ধে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। শিশুর শৈশব নিরাপদ হোক।
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম।
করেও ঝুঁকিপূর্ণ নানা কাজে কোমলমতি শিশুদের ব্যবহার প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। দিন দিন বেড়েই চলেছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এই শিশু। প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০টি শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আজকের শিশু আগামীর কাÐারি। প্রশ্ন হলো, যদি এই শিশুরা নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে আমরা কি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নষ্ট করছি না? মানুষের আইনি ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশের ৯৯৯ কল সেন্টার চালুর দু›দিনের মাথায় গাজীপুর থেকে কল আসে প্রতিবন্ধী শিশুকে যৌন নির্যাতনের! এমন কত শিশু প্রতিদিন নির্যাতনের শিকার হয় তার অনেক খবরই হয়তো জনসমক্ষে আসে না। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে আরও তৎপর হতে হবে। সুশীল সমাজকে যুক্ত করে নিশ্চিত করতে হবে যেন শিশুশ্রম কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে বন্ধ হয়। ঝালাই, লেগুনার হেলপারি কিংবা নির্মাণ কাজে আজকাল শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। যে বয়সে এসব শিশুর স্কুলে থাকার কথা, সেই বয়সে জীবিকার খোঁজে নিরুপায় হয়ে কাজে যোগ দিচ্ছে। প্রতিটি শিশু তার অধিকার পাবে, কোনো শিশু শ্রমিক হবে না- এই হোক অঙ্গীকার।
সাব্বির হোসেন
শ্রীপুর, গাজীপুর
সরকারি ওষুধ পেতে ভোগান্তি
চিকিৎসার কথা বলতে গেলে প্রথমেই চলে আসে ওষুধের কথা। আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ রয়েছে, যারা তাদের মৌলিক চাহিদা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। শুধু তাই নয়, পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল তারা সরকারি ওষুধের প্রতি। কিন্তু সরকারি ওষুধ চাইতে গেলে প্রথমেই যে কথাটি শুনতে হয় তা হচ্ছে, হাসপাতালে ওষুধ আসে না। বাধ্য হয়ে খালি হাতে বাড়িতে ফিরে আসতে হয়। ফার্মেসিগুলোর ওষুধের চড়া দামের কারণে হতদরিদ্র মানুষ ওষুধ কিনতে অক্ষম হয়ে বিনা চিকিৎসায় ভোগে। এমন দৃশ্য কাপাসিয়া উপজেলার ভাকোয়াদী গ্রামের সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিকটিতে। ওষুধের জন্য গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক বরাবরই জানান, হাসপাতালে কোনো ওষুধ আসে না, এমনও ওষুধ আছে যা দুই বছর ধরে আসে না। তাছাড়া এখানে উপজেলা হাসপাতালের মতো রোগীর তেমন সমাগম না থাকায় ওষুধ দিতে চায় না কর্তৃপক্ষ। ডাক্তারের এমন কথা শুনে ওষুধ না পেয়ে অসহায়ের মতো নীরবে চলে আসে স্থানীয় এলাকাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ। এমন অবস্থায় প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করে স্থানীয় হতদরিদ্রদের সমস্যা সমাধান করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
সাগর হাসান
কাপাসিয়া, গাজী।
স্বপ্না, বয়স ১০। ৭১ নম্বর বুড়িগোয়ালিনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। শরীরে অপুষ্টির ছাপ স্পষ্ট। এ বয়সে স্বপ্নাকে আয়ের পথ ধরতে হয়েছে! দুপুর তখন ২টা। সুন্দরবনসংলগ্ন মালঞ্চ নদে পূর্ণ জোয়ার চলছে। জোয়ারের সময় বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া মালঞ্চের তীর ঘেঁষে ত্রিভুজ আকৃতির নীল রঙের নেট টানতে টানতে এগিয়ে যায় স্বপ্না। বিদ্যালয় সময়ের বাইরে সে চিংড়ির পোনা ধরে। নেট টানতে তার ইচ্ছে করে না! তবু নেট টানা এখন ওর প্রতিদিনকার রুটিনে দাঁড়িয়ে গেছে! বাবা অসুস্থ। সংসারে অভাব। নেট টেনে প্রতিদিন কত টাকা পাও?Ñ এ প্রশ্নের উত্তরে লজ্জামাখা মুখখানি তুলে এক পলক তাকিয়েই কোনো কথা না বলে নেটের ভেতর বাগদার পোনা খুঁজতে শুরু করে। নদের এপার থেকে তাকালে ওপারে সুন্দরবন অনায়াসেই দেখা যায়। তীরে দাঁড়িয়ে থাকা স্বপ্নার নানির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি পোনার দাম ১ টাকা। কোনো দিন ৫০টি আবার ভাগ্য ভালো থাকলে কোনো দিন ২০০টিও পোনা পায় স্বপ্না। স্বপ্নাদের লোনা পানির ভয় নেই! সংসারের অভাবের ভয় লবণাক্ত পানিতে নারীদের শারীরিক ক্ষতিকেও যেন হার মানিয়েছে!
সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বুড়িগোয়ালিনী গ্রামে স্বপ্নার বাড়ি। এলাকার মানুষের প্রধান পেশা মাছ ধরা। মালঞ্চ নদে জোয়ার এলেই যেন জেগে ওঠে শিশু-কিশোর বয়সের ছেলেপুলে! জোয়ারে সুন্দরবন তলিয়ে যায়। এ সময় ছোট ছোট ডিঙি, জাল, নেট আর আটল (কাঁকড়া ধরার যন্ত্র) নিয়ে ছোটবড় সবাই বেরিয়ে পড়ে সাদা মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির রেণু সংগ্রহে। সংসারে অভাব-অনটন এ এলাকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। মাছ ধরা বাদে উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসংস্থান নেই। তাই লেখাপড়ার চেয়ে ছোটবেলায় বাপদাদার পুরাতন পেশা মাছ ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় বেশি!
মালঞ্চের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেখা হয় মিয়ারাজের সঙ্গে। মাকে নিয়ে দোকানে খাবার কিনতে এসেছে আট বছরের মিয়ারাজ। তুমি স্কুলে যাও?Ñ এ প্রশ্নের উত্তরে মায়ের আঁচলের নিচে হাসিমাখা মুখ লুকায় ও। মিয়ারাজের মা রহিমা (৩২) জানান, স্কুলে ভর্তি হলেও মিয়ারাজ স্কুলে যায় না। ছেলের লেখাপড়া নিয়ে অতটা চিন্তিত নন মা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘লেখাপড়া শিখে কী হবে? চাকরি নাই। বাদাবনে (সুন্দরবনে) কাজে দিয়ে দেব।’ একই দোকানে বসে ছিলেন দুই সন্তানের জননী খাইরুন (৩৫)। ছোট ছেলের নাম রণি। বয়স ১১। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়ে আর পড়াননি। অল্প বয়সের ছেলেকে অভাবের কারণে কাজে দিয়ে দিয়েছেন।
মালঞ্চের তীর ঘেঁষে বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের বাঁধের রাস্তা দিয়ে নীলডুমুর যাওয়ার পথে দেখা হয় ইয়াসিনুর রহমানের (৩০) সঙ্গে। এলাকায় একটি প্রজেক্টে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। এলাকায় শিশুদের কোনো সমস্যা আছে কি না?Ñ এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এলাকায় জলবায়ুগত সমস্যার প্রভাব রয়েছে। এ গ্রামের বাসিন্দাদের প্রধান সমস্যা নদীভাঙন। এলাকার মানুষ বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল। পুকুরের পানি বিশুদ্ধকরণের পর পাইপের মাধ্যমে গ্রামে সরবরাহ করলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি লবণাক্ত হয়ে যায়। তখন পানির জন্য হাহাকার লেগে যায়। অনেক পরিবারের শিশুরা লবণাক্ত পানি পান করতে বাধ্য হয়। ফলে শিশুরা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। শিশুদের পাঁচড়া, শ্বাসকষ্ট, চুলকানি, সর্দিকাশি লেগেই থাকে। অভাব ও অসচেতনতার কারণে বেশিরভাগ পরিবারের শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে। এলাকায় চিকিৎসাসেবাও ভঙ্গুর।’
শ্যামনগরের আরেক ইউনিয়ন গাবুরা। এটি একটি দ্বীপ ইউনিয়ন। কপোতাক্ষ নদ ও খোলপেটুয়া নদী গাবুরার চারদিক ঘিরে রেখেছে। এলাকায় ৯৫ ভাগ রাস্তা কাঁচা। গাবুরা ইউনিয়নে বাঁধের ওপর যখন পৌঁছাই তখন দুপুর সাড়ে ১২টা। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বাঁধের পাশে আলী হায়দারের (২৯) ছোট দোকানে তখন শিশুদের জটলা। বাঁধের এক পাশে কংক্রিটের ব্লক দিয়ে ঢালাই চলছে। তার পাশেই আবার নদীভাঙনের চিহ্ন স্পষ্ট। এলাকায় প্রধান সমস্যা কী?Ñ প্রশ্ন করতেই শুরুতে আলী হায়দার লবণাক্ততার কথা জানান। এ সমস্যার কারণে শিশুদের সর্দিকাশি, নিউমোনিয়া লেগেই থাকে। এলাকার হাওয়া খারাপ। যোগাযোগব্যবস্থা খুবই নাজুক। অপুষ্টি, রক্তশূন্যতা ও বাল্যবিবাহের মতো সমস্যা রয়েছে শিশুদের। আগে তিনি সন্তানদের জন্য রক্তের বড়ি কিনে খাওয়াতেন। একই দোকানে বসে কথা হয় কিশোর আরিফুল ইসলামের (১৪) সঙ্গে। ৫০ নম্বর গাবুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বয়সের সঙ্গে শ্রেণি না মেলায় খানিকটা অবাক হই! তোমার তো এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার কথা?Ñ এ প্রশ্নের উত্তরে ঠোঁট দুটো চওড়া করে মিষ্টি হাসি দিয়ে আরিফুল বলে, ‘আমায় দেরিতে স্কুলে দেছে। বাপ-মায় জানে।’ আরিফুল আরও জানায়, প্রতি বছর মে মাসের দিকে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাকেও ছোটবেলায় বাঁধে থাকতে হয়েছে। আরিফুলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দোকানে হাজির হয় ১২ বছরের শিশু আজমীর। স্থানীয় নিজামিয়া দাখিল মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। আজমীর জানায়, একটু বৃষ্টি হলেই কাঁচা রাস্তা দিয়ে মাদ্রাসায় যেতে মন চায় না। বাড়িতে লোনা পানি দিয়ে থালাবাসন ধোয়া ও অন্যান্য কাজ করা হয়। আর খাওয়ার জন্য টিউবওয়েলের পানি সংগ্রহ করতে হয়। আজমীর আরও জানায়, এলাকায় নদীভাঙনের ভয় আছে। নদীভাঙন শুরু হলে তখন বাঁধের ওপর থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। তাই ছোট্ট ভাইকে নিয়ে খুব
চিন্তা হয় ওর।
গাবুরা ইউনিয়নের খোলপেটুয়া গ্রামের বাসিন্দা মাজেদা বেগমের (৪৫) ছোট মেয়ে সাবিনা। বয়স ৭। স্কুলের বারান্দায় যাওয়ার সুযোগ হয়নি এখনও। কারণ ঘরে থাকা বয়স্ক অন্ধ দাদিকে দেখাশোনা করতে হয়। গাঙের চরে ওদের বাস। ঘরের তিন পাশে পানি। বহুবার নদীভাঙনের শিক্ষার হয়েছে মাজেদার পরিবার। শিশু সাবিনা আদৌ লেখাপড়া করতে পারবে কি না নিশ্চয়তা নেই পরিবারের কাছে!
গাবুরায় সবচেয়ে সমস্যা হলো বিয়ে দেওয়ার সময় বেশিরভাগ পরিবার মেয়ের উপযুক্ত বয়স বিবেচনায় নেয় না। এলাকায় কম বয়সে বিয়ে হওয়ার প্রবণতা বা প্রথা অনেক আগে থেকেই। নয়টি ওয়ার্ডের মধ্যে ছয়টিতেই বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। গাবুরা দ্বীপটিকে বাঁচানোর জন্য চারপাশে কংক্রিটের ঢালাই গাবুরাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। কাজও শুরু হয়েছিল। গত জুনের মধ্যে কংক্রিটের বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অর্ধেকের কম কাজ হয়েছে। তাই লেবুবুনিয়া বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশের ভয়ে এলাকার শিশুসহ সবাই শঙ্কিত।
গাবুরা সুন্দরবন কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক হাফিজুল ইসলাম জানান, তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে কয়েক মাস আগেও ৭৭ জন শিক্ষার্থী ছিল। এখন রয়েছে ৫৫ জন। ঝরে পড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, শুষ্ক মৌসুমে অনেক শিক্ষার্থী বাবা-মায়ের সঙ্গে এলাকার বাইরে ছয় মাসের জন্য ইটভাটায় কাজ করতে যায়। দারিদ্র্য ও অভিভাবকদের অসচেতনতা শিশুদের ঝরে পড়ার প্রধান কারণ। এলাকার শিশুদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি ‘গাবুরা শিশু অধিকার ফাউন্ডেশন’ করেছেন বলে জানান।
শ্যামনগরের আরেক প্রসিদ্ধ ইউনিয়ন মুন্সিগঞ্জ। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যখন সুন্দরবনসংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ সেন্টার কালীনগর গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি তখন দেখা হয়ে গেল স্কুল থেকে ফেরা নিশাত তাসনিম, ইসরাত তাসনিম ও মারিয়ার সঙ্গে। তাদের প্রত্যেকের বয়স ১২ বছরের কাছাকাছি। তারা সাড়ে ৩ কিলোমিটার হেঁটে মুন্সিগঞ্জ বাজারের পাশে কলবাড়ি নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়তে আসে। বৃষ্টি হলে বিদ্যালয়ে আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়! ইসরাত জানায়, তাদের এক বান্ধবীর ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালে বিয়ে হয়ে গেছে। গ্রামে বিশুদ্ধ পানির সংকট আছে বলে তারা জানায়।
বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে শিশুসহ সব নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসাকে মৌলিক মানবিক চাহিদা বা মৌলিক উপকরণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জলবায়ুগত সমস্যার কারণে উপকূলের অনেক শিশু এসব মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় এলাকার ৪৫ লাখ শিশু ঘূর্ণিঝড়সহ তীব্র ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বুলবুল, আম্পান, সিত্রাং, মোখা, রিমালের মতো ঘূর্ণিঝড় উপকূলের মানুষকে একটু একটু করে পিছিয়ে দিচ্ছে। জলোচ্ছ্বাস, খরা, বন্যা, দাবদাহ, অতিবৃষ্টির মতো জলবায়ুগত সমস্যা এলাকার শিশুদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। দারিদ্র্যের কারণে উপকূলের অনেক শিশু বিদ্যালয়ের বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না। জলবায়ুগত সমস্যা উপকূলে সুপেয় পানির অভাব, পুষ্টির অভাব, স্যানিটেশন সমস্যা বাড়িয়ে তুলেছে। এসব সমস্যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। অনেক শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে। শিশুরা মাছ ধরাসহ বিভিন্ন শ্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন বাল্যবিবাহ ত্বরান্বিত করছে।
মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কলবাড়ি নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিবাশীষ কুমার মণ্ডল জানান, শ্যামনগরজুড়ে শিশুদের ওপর জলবায়ুগত সমস্যার প্রভাব পড়েছে। লবণাক্ততার কারণে দ্রুত বয়ঃসন্ধিকাল চলে আসছে শিশুদের মধ্যে। বিভিন্ন সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সুযোগে বাল্যবিবাহ হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, তার বিদ্যালয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে শিক্ষার্থীদের পানির চাহিদা মেটানো হয়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পানির টান লাগলে পানি কিনতে হয়। এ এলাকার অনেক গরিব শিক্ষার্থী পড়ালেখার পাশাপাশি আয়বর্ধক কাজের সঙ্গে যুক্ত।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শ্যামনগর উপজেলার ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) প্রোগ্রাম অফিসার প্রণব বিশ্বাস জানান, শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির অভাব রয়েছে। লবণাক্ততার কারণে শিশুদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অল্প বয়সে বয়ঃসন্ধিকাল চলে আসছে।’ শিশুশুম ও বাল্যবিবাহ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাতক্ষীরায় বাল্যবিবাহের হার একটু বেশি। অনেক জায়গায় গোপনে বাল্যবিবাহ হওয়ার অনেক যে আমরা জানতে পারি। এলাকায় শিশুশ্রম নেই তা বলব না। অভাবের কারণে দালালদের খপ্পরে পড়ে বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও ইটভাটায় যাওয়াসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত হচ্ছে। আমরা শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছি।’
যেখানে হাসি-উল্লাসে বেড়ে ওঠার কথা, সেখানে শুধুই দারিদ্রের কশাঘাত। যে শিশুটির হাতে থাকার কথা ছিল বই, সেই শিশুটিই মাছ ধরার বড়শি নিয়ে দিনভর ঘুরে বেড়ায় নদী-খালের ধারে। স্কুলের হাজিরা খাতায় কোনো না কোনো শ্রেণিতে নাম থাকলেও যাওয়া হয় না ক্লাসে। যে চোখে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন থাকার কথা, সেই চোখ দুটো নির্ঘুম কাটে। আবার রাতে কোনোমতে ঘুমালেও, সকাল হতেই ছুটতে হয় বাবার কর্মের সঙ্গী হিসেবে।
দারিদ্রের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত, এমন জীবন কাটে উপকূলের হাজারো শিশুর। উপকূলীয় প্রান্তিক শিশুদের অন্তহীন দুর্দশার এই চিত্র দেখা গেছে উপকূলীয় জেলা বরগুনার একাধিক আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোতে। শিশু অধিকারের কথা জানে না পরিবারের কেউ, আর শিশু সুরক্ষা যেন অর্থহীন বার্তা এইসব পল্লিতে।
প্রতিটি শিশুর মতো তাদেরও বেড়ে ওঠার কথা ছিল সমান অধিকার নিয়ে, পাওয়ার কথা ছিল সমান সুযোগ সুবিধা, কিন্তু সেখানে শৈশব থেকেই সূচনা হয় বিবর্ণ জীবনের। সুষম খাদ্য, একটি শিশুর জন্য একাধিক বস্ত্র, ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা যেন এখানে অমাবস্যার চাঁদ। এমন এক অনিশ্চয়তায় বিবর্ণ হয়ে উঠেছে এসব পল্লির হাজারো শিশুর শৈশব। এখনো প্রতিদিন বাবার কাজের ঘানি শিশু ছেলেটাকেও টানতে হয়। শিশুশ্রমের বেড়াজালে বন্দিজীবন আর বাবার কষ্টের কর্মের সঙ্গী হতে ষষ্ঠ শ্রেণির গণ্ডিতে যাওয়া হয় না অধিকাংশ শিশুর। ফলে কোমলমতি সব শিশুদের কাঁধে ওঠে সংসারের বোঝা। ভবিষ্যতে নতুন একজন দরিদ্র জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনাকে বুকে নিয়েই কর্মজীবন শুরু করে এই পল্লিগুলোর দরিদ্র শিশুগুলো।
বরগুনা পোটকাখালি আশ্রয়ণ প্রকল্পের শিশু আবির, বাবুল, মিলন, দিপু আর সাইফুল মারবেল খেলছিল বিকালের রোদে। সকাল থেকে পড়ন্ত বিকাল খেলতে আসার আগ পর্যন্ত তারা ব্যস্ত ছিল যে যার কাজে। তাদের পাঁচজনের মধ্যে আবির একাই স্কুল থেকে ফিরেছে, বাকি চারজন ছিলেন কাজে। বাবুল চায়ের দোকানে কাজ করে, মিলন মাছের আড়তে, আর দিপু কোনো কাজ না করেও স্কুলে যায় না। সাইফুল প্রতিদিন সকালে বাবা-চাচাদের সঙ্গে গড়ার জাল তুলতে যায়।
শিশু সাইফুল জানালো, ‘স্কুলে যাইতে ইচ্ছা করে, তয় কাজের লইগ্যা যাইতে পারি না। জোয়ার আওয়ার আগেই জাল পাতি, আর ভাটায় পানি টানলে মাছ লইয়া আইয়া আইতে আইতে স্কুলের ছুটি হইয়া যায়। মাছের আড়তে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কাজ করে ফেরা মিলন (১০) নামের শিশুটি বলে, আমার পরিবারের ভাইবোনদের মধ্যে আমি বড়, আমার ছোট আরও দুইটা ভাইবোন আছে। আমরাতো গরীব, পরিবারের সবাই কি লেখাপড়া করতে পারে? আমি করি না তবে আমার ছোট ভাইটাকে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করে দিয়েছি এ বছর।’
শুধু ওরাই নয়, দারিদ্রের বেড়াজালে এভাবে হাজারো শিশুর শৈশব ও ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে উপকূলে। শিশু অধিকারের কথা কাগজে কলমে থাকলেও নেই বাস্তবে। তাই উপকূলের হাজারো শিশু বঞ্চিত হচ্ছে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে।
শিশুদের সুরক্ষায় ১৯৭৪ সালের শিশু আইন সংশোধন করে ২০১৩ সালের ১৬ জুন সংসদে শিশু আইন ২০১৩ পাস হয়। শিশু আইন ছাড়াও শিশু অধিকার রক্ষায় সরকারের অসংখ্য আইন ও প্রকল্প রয়েছে। এগুলোর মধ্যে জাতীয় শিশু নীতিমালা ২০১১, জাতীয় শিক্ষা নীতিমালা ২০১০ এবং জাতীয় শিশুশ্রম নিরোধ নীতিমালা ২০১০ অন্যতম। আগের তুলনায় শিশুশ্রম কিছুটা কমলেও উপকূলের চরাঞ্চল ও প্রান্তিক দরিদ্র পল্লিগুলোতে এর মাত্রা এখনো অকল্পনীয়।
এই পল্লির বাসিন্দা সেলিম মিয়া (৫৫) বলেন, ‘সব পরিবারই এখন বোঝে যে তাদের পোলাপানগুলারে পড়ানো উচিত, কিন্তু প্যাডের (পেটের) তাগিদে সবাই তো পড়াইতে পারে না।’
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক সুমন চন্দ্র গাইন বলেন, ‘আবাসনের অনেক শিশুরা কাজের কারণে বা পরিবারের আগ্রহ না থাকায় স্কুলে আসে না। আবার যারাও আসে তারাও প্রতিবেশী শিশুটি স্কুলে না আশার ফলে লেখাপড়া থেকে আগ্রহ হারাচ্ছে। প্রতিনিয়ত ঝরে পরছে স্কুল পড়ুয়া এখানকার শিশুরা।’
বিষয়টি নিয়ে কথা হলে শিশুবিষয়ক গবেষক ও বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘উপকূল অঞ্চলে শিশুদের শিক্ষিত করার প্রবণতা কম পরিলক্ষিত হয়। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এই অঞ্চলে দরিদ্র ও অভাবী মানুষের বিচরণ বেশি। শিশুদের শিক্ষিত করার প্রবণতা তখন বৃদ্ধি পাবে যখন সমাজ থেকে অভাবকে দূর করা যাবে। প্রতিটি শিশুর জীবনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিবারকে সচেতন করতে পারলে কমে আসবে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি শিশুর জীবন হওয়া উচিত চিন্তামুক্ত। কিন্তু শিশুকেই যদি পরিবার-পেট-প্রয়োজন নিয়ে চিন্তা করতে হয়, তখন তার লেখাপড়ার ব্যাঘাত ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। শিশুটি চিন্তামুক্ত না থাকলে শুধু পড়ালেখার ক্ষতিই নয়, বরং তার মানসিক স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আরো সংবাদ পড়ুন

পুরাতন সংবাদ পড়ুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট