
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে খুলনার উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও নাগরিক প্রত্যাশা নিয়ে সরব হলো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য প্রার্থীরা। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: খুলনাবাসীর প্রত্যাশা’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে খুলনাকে ঘিরে শিল্প পুনরুজ্জীবন, গ্যাস সংযোগ, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, টেকসই অবকাঠামো ও সুশাসনের অঙ্গীকার উঠে আসে প্রার্থীদের বক্তব্যে।
খুলনায় নাগরিক সংলাপে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সংসদ প্রার্থীরা।
(১৭ জানুয়ারি) সকাল ১১টায় খুলনা প্রেসক্লাবে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির উদ্যোগে এ নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে খুলনার সার্বিক উন্নয়নের দাবিসংবলিত স্মারক সংসদ সদস্য প্রার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামানের সভাপতিত্বে এবং অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদিরের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সংলাপে বিভিন্ন আসনের প্রার্থীরা খুলনাবাসীর সামনে তাদের পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন।
খুলনা-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আমীর এজাজ খান বলেন, শিল্পনগরী খুলনাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের জীবন ও অর্থনীতি রক্ষায় টেকসই ব্রিজ ও বাঁধ নির্মাণ জরুরি উল্লেখ করে তিনি দাকোপের পানখালী খেয়াঘাটে ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানান। খুলনা-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, খুলনা এখন অন্ধকার নগরীতে পরিণত হয়েছে। মাদক ও হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ন্যায়ভিত্তিক সুশাসন প্রতিষ্ঠাই এখন সময়ের দাবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব সংকট মোকাবিলায় বিএনপি নানামুখী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
আরও পড়ুন: অনলাইনে গুজব-অপপ্রচার রোধে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার: ফয়েজ আহমদ
খুলনা-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক এডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন হেলাল বলেন, খুলনাকে তিলোত্তমা নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আসন্ন নির্বাচনে যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব নির্বাচনের আহ্বান জানান তিনি।
খুলনা-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মোহাম্মদ হফুজুর রহমান বলেন, খালিশপুরসহ শিল্পাঞ্চল আজ মৃতপ্রায়। কলকারখানা লুটপাট ও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজারো মানুষ বেকার হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা তুলে ধরে তিনি দৌলতপুর ও খালিশপুরে উন্নতমানের হাসপাতাল স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
একই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী জনার্দন দত্ত নান্নু বলেন, খুলনার উন্নয়নের প্রথম শর্ত গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা। তিনি রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের দাবি জানিয়ে খুলনাকে আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন।
খুলনা-৬ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী হাফেজ মো. আসাদুল্লাহ ফকির বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতি ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের সেবার জন্য। খুলনাবাসীর পাশে থেকেই রাজনীতি করতে চান তারা।
ষাটগম্বুজ মসজিদ ও বাগেরহাট জাদুঘরের ই-টিকেটিং সেবা চালু
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন খুলনা প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক এনামুল হক, মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন (এমইউজে) খুলনার সভাপতি রাশিদুল ইসলাম, বিএনপি নেতা অধ্যক্ষ রেহেনা আক্তার, জাতীয়তাবাদী খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি নূরুল হাসান রুবা, অ্যাডভোকেট ও ইঞ্জিনিয়ার আজাদুল হকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এ সময় উন্নয়ন কমিটির নেতা, শিক্ষাবিদ, সুধীজন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচনী ইশতেহারে উপকূলের প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মীরা। তারা বলেছেন, পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে উপকূলে ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে। এই সংকট মোকাবেলায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
(১১ জানুয়ারি) রাজধানীর ডাব্লিউভিএ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সভা থেকে এই দাবি জানানো হয়।
বাপা সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে সভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব উপস্থাপন করেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র।
সভায় বক্তৃতা করেন বাপা সহ-সভাপতি ও বেন-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. নজরুল ইসলাম, বেন-এর বৈশ্বিক সমন্বয়কারি ড. মো. খালেকুজ্জামান, বাপার সহ-সভাপতি মহিদুল হক খান ও অধ্যাপক এম. শহীদুল ইসলাম, বাপা’র সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির, বাপার যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার প্রমুখ।
সভার প্রস্তাবে উপকূলের সংকট মোকাবেলায় আসন্ন এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সকল রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ১১ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
দাবিগুলো হচ্ছে- উপকূলীয় অঞ্চলকে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বিশেষ এলাকা ঘোষণা করতে হবে। উপকূলের প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষায় জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। লোনা পানি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ খাবার পানির স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে উপকূলের প্রতিটি বাড়িকে শেল্টার হোম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। উপকূল সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলের রক্ষাকবচ বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নদ-নদী ও জলাশয় দখল ও দূষণমুক্ত এবং স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। বৃক্ষরোপনের মাধ্যমে উপকূলে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে। টেকসই ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও পুরানো বাঁধ মেরামত করতে হবে। কৃষির উন্নয়ন ও বিকল্প কর্মসংস্থানে পদক্ষেপ নিতে হবে। উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠন করতে হবে।
প্রস্তাবে বলা হয়- বৈশ্বিক উষ্ণতায় দায় মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ হলেও দুর্যোগে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। আর সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ দেশের উপকূলীয় অঞ্চল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০ বছরে উপকূলে দুর্যোগ ১০ গুণ বেড়েছে। এ সকল দুর্যোগে মানুষের জীবন-জীবিকা, সম্পদ, খাদ্য, পানি, বাসস্থানসহ অন্যান্য সংকট সৃষ্টি করছে। সমগ্র উপকূলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট চলছে। অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ ও লবণাক্ততার আগ্রাসনে সুন্দরবন এলাকায় সুপেয় পানির সংকট বেড়েছে। সুন্দরবন উপকূলে ৭৩ শতাংশ পরিবার সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত বা অনিরাপদ পানি খেতে বাধ্য হচ্ছে। টেকসই বেড়ি বাঁধের অভাবে প্রতিবছর স্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। নদ-নদী ও জলাশয় দখল-দুষণ ও ভরাটের কারণে পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। ৭টি উপজেলা, ৭৭টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই জেলায় চারটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ১৮ লাখ ১৬ হাজার ৪২৪ জন। জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উন্নয়ন বঞ্চনার অভিযোগ এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে তাই সাতক্ষীরায় ভোটের মাঠে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততা, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো সংকট।
জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এই জেলার মানুষ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে আছে। প্রতিবার জাতীয় নির্বাচন এলেই দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বিভিন্ন পথসভা জনসভায় প্রার্থীদের মুখে শোনা যায় মানুষের সমস্যা সমাধানের নানা আশ্বাস। নদীভাঙন রোধ, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি- প্রতিটি নির্বাচনি প্রচারণায় এসব প্রতিশ্রুতি নতুন করে উঠে আসে।
তবে ভোটারদের অভিযোগ, এসব আশ্বাস নতুন নয়। আগের নির্বাচনগুলোতেও একই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘ দিনেও সমস্যাগুলোর স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। ফলে প্রতিশ্রুতির ওপর মানুষের আস্থা কমেছে। তাই এবারের নির্বাচনের শুধু বক্তব্য বা ইশতেহার নয়, অতীতের কাজ ও বাস্তব সক্ষমতা বিবেচনা করেই সঠিক প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে চান জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় এ জনপদের ভোটাররা।
কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া, ইছামতি, মরিচ্চাপসহ একাধিক নদীর ভাঙনে প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জ, দেবহাটা উপজেলার বহু পরিবার একাধিকবার বসতভিটা হারিয়ে এখন নিঃস্ব। ভাঙন রোধে খণ্ড খণ্ড প্রকল্প নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান না থাকায় সমস্যাটি দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে।
বেড়িবাঁধ ভাঙন ও লবণপানির আগ্রাসন
উপকূল রক্ষার প্রধান ভরসা বেড়িবাঁধ। কিন্তু জরাজীর্ণ ও অপরিকল্পিত বাঁধ সামান্য জোয়ার বা নিম্নচাপেই ভেঙে পড়ে। ফলে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে লবণপানি। নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি, মিঠাপানির উৎস ও মৎস্য ঘের। এতে করে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির অভাব এখানকার স্থায়ী সমস্যা।
আইলা, আম্পান, বুলবুল, ফণি, ইয়াসসহ একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাতক্ষীরার মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করেছে। দুর্যোগের সময় ত্রাণ এলেও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, টেকসই বাসস্থান ও বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ না থাকায় মানুষ আবারও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসে বাধ্য হচ্ছে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের সোরা গ্রামের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবার নির্বাচন এলে আমাদের এলাকায় নেতারা আসেন, নতুন বেড়িবাঁধ নির্মাণ করার কথা বলেন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। কিন্তু ভোট শেষ হলেই আর কেউ এদিকে ফিরে তাকান না। দুর্যোগ বা পূর্ণিমার জোয়ার এলেই বেড়িবাঁধ ভেঙে বা বাঁধ ছাপিয়ে লবণপানি ঘরে ঢুকে যায়, খাওয়ার পানির জন্য ব্যবস্থা না থাকায় অনেক দূরে যেতে হয়। গত সরকারের সময় এখানে টেকশই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। তবে এখন কাজ হচ্ছে ধীর গতিতে। এই বাঁধ কবে শেষ হবে জানি না। যারাই নির্বাচিত হোক, তারা যেন আমাদের এই বাঁধের কাজ শেষ করে।’
একই এলাকার বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘নদীতে বড় জোয়ার এলেও পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকি। বেড়িবাঁধ যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে। জায়গা জমি না থাকায় এখানে বাধ্য হয়ে থাকতে হয়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটে। আগেও অনেক নেতাদের প্রতিশ্রুতি শুনেছি, কিন্তু কোনো সমস্যার সমাধান হয়নি। তাই এবার ভেবেচিন্তেই নিজের ভোট দিতে চাই।’
আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নের নদীভাঙন কবলিত এলাকা বিছট গ্রামের বাসিন্দা আয়েশা বেগম বলেন, ‘আমার ঘর-বাড়ি জমি সব নদীতে চলে গেছে। কয়েকবার জায়গা বদল করে এখন খাস জমিতে বাস করি। এখনো নিশ্চিত কোনো ঠিকানা নেই। নির্বাচনের সময় সবাই ভোট চাইতে আসে, বলে ভাঙন বন্ধ করবে। বাঁধ করে দেবে। কিন্তু ভাঙন বন্ধ হয় না। আমরা এমন একজন মানুষ চাই, যিনি সত্যিই আমাদের বিপদে পাশে দাঁড়াবেন। আমাদের জন্য কাজ করবেন।’
এই উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের হাওলাদার বাড়ি গ্রামের বৃদ্ধ রইচ উদ্দিন বলেন, ‘দীর্ঘ এই জীবনে আমি অনেক নির্বাচন দেখেছি। প্রতিবারই নেতারা ভোটের জন্য এই এলাকায় আসেন। তারা বলেন, উপকূলের উন্নয়ন হবে, পানি সমস্যা দূর হবে। কিন্তু বয়সের এই সময়ে এসেও সেই একই কষ্ট ভোগ করছি। এবার আমরা এমন কাউকে চাই, যিনি কথা কম বলবেন, কাজ বেশি করবেন।’
সুন্দরবন ঘেঁষা জেলা হলেও পরিবেশ রক্ষায় সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কারণে এখানে বননির্ভর জীবিকার সুযোগ সীমিত হয়েছে। এই এলাকায় কোনো বড় শিল্পকারখানা না থাকায় তরুণদের জন্য নেই পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ। কৃষি ও মৎস্য খাতে আধুনিক প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগের অভাব স্পষ্ট। ফলে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজের সন্ধানে খুলনা, যশোর কিংবা ঢাকায় চলে যাচ্ছেন। অনেক তরুণ ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের মৌখালী গ্রামের বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রামে থাকলে পরিবার নিয়ে শান্তিতে থাকতে পারতাম। কিন্তু বিকল্প কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় উপায় নেই। আমাদের এলাকায় অনেকে ইট ভাটায় কাজ করে। আমিও কয়েকবার ভাটায় গিয়েছি। তবে সেখানে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। টাকাও কম। এজন্য বর্তমানে ঢাকার একটি বস্তিতে বসবাস করে রিকসা চালাচ্ছি। তবে আমার পরিবার গ্রামে থাকে।’
আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘আমাদের এলাকার অনেক তরুণ এখন গ্রামে থাকে না। কেউ খুলনায়, কেউ ঢাকায়। এখানে যদি কাজের পরিবেশ থাকত, তাহলে কেউ পরিবার ছেড়ে বাইরে যেত না। নির্বাচনের সময় সবাই কর্মসংস্থানের কথা বলেন, কিন্তু ভোটের পর সেই কথার কোনো বাস্তবতা দেখি না।’
কর্মসংস্থানের অভাবে উপকূল থেকে মানুষের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা প্রসঙ্গে শ্যামনগরের উন্নয়নকর্মী গাজী ইমরান বলেন, ‘এই অঞ্চলে কর্মসংস্থানের স্থায়ী সুযোগ না থাকায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছে। কৃষি ও মৎস্য খাতে সম্ভাবনা থাকলেও প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ ও বাজার সংযোগের অভাবে স্থানীয়ভাবে কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে দালালের মাধ্যমে এখানকার অনেক মানুষ দেশের বিভিন্ন ইটভাটায় কাজ করতে চলে যায়। এর ফলে বছরের প্রায় ৬ মাস এই এলাকাগুলো পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে।’
পর্যটন সম্ভাবনাতেও অবকাঠামো সংকট
সুন্দরবনের পশ্চিমাংশে পর্যটনের বড় সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগানো হয়নি। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং অনুমতি প্রক্রিয়ার জটিলতায় পর্যটক কমছে। এতে স্থানীয় মানুষের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
নির্বাচনের মাঠে প্রতিশ্রুতির ছড়াছড়ি
এই বাস্তবতায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ সব দলের প্রার্থীরাই সাতক্ষীরার এসব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন। সবার নির্বাচনি সভা, প্রচারপত্র ও ইশতেহারে উঠে আসছে নদীভাঙন রোধ, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পর্যটন খাত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি।
কিছু প্রার্থী সাতক্ষীরার সঙ্গে সারাদেশের যোগাযোগ উন্নয়নে রেললাইন স্থাপনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলছেন। আবার কেউ কেউ উপকূলভিত্তিক শিল্প, ফিশ প্রসেসিং জোন, পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলে কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ইশতেহারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা ও লবণাক্ততা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করছেন অনেকে।
সার্বিকভাবে সাতক্ষীরার নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি উপকূলের মানুষের টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতিফলন। প্রার্থীদের ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হলে বদলে যেতে পারে এই জেলার চেহারা। আর ব্যর্থ হলে আগের মতোই দুর্যোগ, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই কাটবে সাতক্ষীরার মানুষের জীবন।
ভোটাররা তাই এবার শুধু জনপ্রতিনিধি নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার দায়িত্ব তুলে দিতে চান এমন নেতৃত্বের হাতে— যিনি সত্যিই উপকূলের বাস্তবতা বোঝেন এবং কথা নয়, কাজে প্রমাণ রাখবেন।
প্রার্থীরা কী বলছেন?
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনে বিএনপির প্রার্থী ড. মনিরুজ্জামান এই প্রতিবেদককে বলেন, উপকূলীয় এই জনপদের সবচেয়ে বড় সংকট সুপেয় পানির অভাব। নির্বাচিত হলে নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে আমার অগ্রাধিকার।
একইসঙ্গে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, যুব সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে শিক্ষা, খেলাধুলা ও কর্মসংস্থানের বিকল্প সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। উপকূলীয় এলাকার নদীভাঙন, বেড়িবাঁধ ও লবণাক্ততার সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন উন্নয়ন, যোগাযোগ ও অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানমুখী পরিবেশ তৈরির কথাও জানান বিএনপির এই প্রার্থী।
একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম এই প্রতিবেদক কে বলেন, শ্যামনগরের মানুষের প্রধান চাহিদা নিরাপদ সুপেয় পানি ও মাদকমুক্ত সামাজিক পরিবেশ।
তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকার স্থায়ী সমস্যাগুলো বিশেষ করে বেড়িবাঁধের টেকসই সংস্কার, নদীভাঙন রোধ এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একইসঙ্গে সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে প্রশাসন ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন গাজী নজরুল ইসলাম।
এই আসনের অন্যান্য প্রার্থীরাও প্রচারণায় উপকূলীয় সংকট, যোগাযোগ, সুপেয় পানির অভাব ও মাদক সমস্যার কথা তুলে ধরে ভোটারদের কাছে সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন।
সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালিগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী কাজী আলাউদ্দিন এই প্রতিবেদককে বলেন, এর আগেও তিনি একবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে তিনি কাজ করেছেন। ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের মূল কারণ সুপেয় পানির সংকট। এছাড়া এলাকায় মাছ চাষ হওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে। নির্বাচিত হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, রেললাইন, নতুন রাস্তা ব্রিজ নির্মাণের পাশাপাশি নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন এবং নদীভাঙন ও লবণাক্ততা মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাদ্দেস রবিউল বাসার বলেন, এখন সময় এসেছে পুরোনো নিয়ম ও ব্যর্থ ব্যবস্থার পরিবর্তনের। সবার আগে উন্নয়ন কাজ করতে হবে অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোতে। যোগাযোগ, উপকূলীয় সংকট নিরসন, সুপেয় পানির সমাধান এবং নৈতিক ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেবেন বলে জানান। জনগণের অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এই আসনের বাকি প্রার্থীরাও নির্বাচনি প্রচারণায় ভোটারদের মন জয় করতে সুপেয় পানির সংকট নিরসন, উপকূলীয় সমস্যা সমাধান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অবকাঠামো উন্নয়নের নানা আশ্বাস দিচ্ছেন।খুলনার উপকূলঘেরা জনপদে বাস্তবতা যেন একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন পৃথিবীর ছবি। একদিকে নির্বাচনের মৌসুমে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, ঝলমলে পোস্টার আর ব্যানারে ভরা সড়ক; অন্যদিকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই উপকূলবাসীর উঠোনে নোনাজল, ভাঙা বেড়িবাঁধের ফাঁক গলে ঢুকে পড়ছে নদীর গর্জন। রাতভর মানুষ ছুটছে বালুভর্তি বস্তা কাঁধে নিজেদের ঘর, জমি আর ভবিষ্যৎ বাঁচানোর জন্য। উন্নয়ন যেন কাগজে আটকে আছে আর দুর্ভোগের বাস্তবতা রয়ে গেছে মাটিতেই।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই উপকূলীয় অঞ্চল শুধু প্রকৃতির প্রতিকূলতার নয়, বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত অবহেলারও শিকার। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট, ভঙ্গুর বেড়িবাঁধ ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এই সংকটগুলো হঠাৎ তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পনার ঘাটতি, দুর্বল বাস্তবায়ন ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি এগুলোকে আরও গভীর করেছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল রক্ষায় নির্মিত ১,০১৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের মানুষের জন্য জীবনরক্ষাকারী অবকাঠামো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে এই বাঁধগুলোর অন্তত তিন-চতুর্থাংশই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের কাছে বাঁধ শব্দটি এখন নিরাপত্তার প্রতীক নয়, বরং আশঙ্কার নাম।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীর স্রোত বেড়েছে, জোয়ারের উচ্চতা অস্বাভাবিক হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতাও বাড়ছে। এসব বাস্তবতায় বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজন ছিল আধুনিক নকশা, জিওটেক্সটাইল ব্যবহার, প্রশস্ত স্লোপ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিকাংশ মেরামত কাজই হয় স্বল্পমেয়াদি চিন্তা থেকে সঙ্কুচিত বাজেট, দুর্বল তদারকি ও রাজনৈতিক প্রভাবের সমন্বয়ে।
ফলে বর্ষা বা জোয়ার এলেই বাঁধ ভেঙে পড়ে। কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা কিংবা বটিয়াঘাটার বহু গ্রামে একই দৃশ্য নদীর পানি ঢুকে ফসলি জমি নষ্ট হয়, ঘরবাড়ি ভেঙে যায়, মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
কয়রা মহেশ্বরীপুরের বাসিন্দা হালিমা খাতুন বললেন, আমাদের ঘর ছিল ওইখানে, এখন সব গাঙ হয়ে গেছে। বছর বছর পানি আসে, জমি যায়। সরকার বদলায় কিন্তু আমাদের ভাগ্য বদলায় না।
খুলনা-৬ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মনিরুল হাসান বাপ্পি বলেন, নির্বাচিত হলে তার প্রথম কাজ হবে ভৈরব নদে একটি সেতু নির্মাণ এবং নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, কয়রা ও পাইকগাছার মানুষকে চিকিৎসার জন্য ১০৪ কিলোমিটার ভাঙাচোরা রাস্তা পাড়ি দিয়ে খুলনা শহরে আসতে হয়। এই দুর্ভোগ লাঘবে ওই এলাকায় ২৫০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে স্থানীয় মানুষ নিজ এলাকাতেই চিকিৎসাসেবা পেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার চিন্তাও রয়েছে। এতে সারা দেশের মানুষ কয়রা-পাইকগাছায় আসবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যারা এলাকা ছেড়ে শহরে চলে গেছে, তারা আবার নিজ এলাকায় ফিরে আসবে, বলেন তিনি।
মনিরুল হাসান বাপ্পি বলেন, আমরা একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও মডেল কয়রা-পাইকগাছা গড়ে তুলতে চাই।
উপকূলীয় খুলনার সবচেয়ে নীরব কিন্তু ভয়ংকর সংকট হলো লবণাক্ততা। মাটি ও পানিতে লবণের মাত্রা বাড়তে থাকায় সুপেয় পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বর্ষা ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় টিউবওয়েলের পানি নোনা, পুকুর ও জলাশয়ের পানি পানযোগ্য নয়।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কিছু এলাকায় রিভার্স ওসমোসিস (আরও) প্লান্ট বসানো হলেও সংখ্যায় তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেক প্লান্ট আবার রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল হয়ে পড়ে আছে। ফলে নারীদের কিলোমিটার পর কিলোমিটার হাঁটে পানি সংগ্রহ করতে হয়, যা তাদের সময়, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি পান করার ফলে উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন জটিলতা, কিডনি ও ত্বকজনিত রোগ বাড়ছে। অথচ নিরাপদ পানির স্থায়ী সমাধানে বড় মাপের সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
গ্রামীণ উপকূলের বাইরে শহর খুলনাও ভিন্ন কোনো স্বস্তির জায়গা নয়। মহানগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় পরিকল্পিত ড্রেন নেই, যেখানে আছে সেগুলোও ভরাট ও অকার্যকর।
বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। এক স্থানীয় ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ড্রেনেজের সমস্যাটা কোনো সরকারের সময়ই সমাধান হয়নি। আমরা পানি সহ্য করি, যানজট সহ্য করি নেতারা শুধু নির্বাচনের সময় এসবের কথা বলেন।
একসময়ের শিল্পনগরী খুলনা আজ বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি জুটমিলের ভার বইছে। খালিশপুর ও দৌলতপুর এলাকার হাজারো শ্রমিক পরিবার কর্মসংস্থান হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছে। নতুন শিল্প স্থাপনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে খুলনার উপকূলীয় ছয়টি আসন ও মহানগরে প্রায় ২০ লাখ ভোটার আবারও আশার আলো দেখছেন। তবে সেই আশার সঙ্গে রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা ও অনাস্থা।
এক সাবেক জুটমিল শ্রমিকের ভাষায়, ভোটে উৎসাহ নাই। উৎসাহ আছে কবে আমাদের মিল চালু হবে। যে নেতৃত্ব মিল চালু করবে, তাকেই ভোট দেব। এই বক্তব্য শুধু একজনের নয়, এটি হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের হতাশার প্রতিফলন।
প্রার্থীরা অবশ্য প্রতিশ্রুতির ঝুলি খুলে বসেছেন টেকসই বেড়িবাঁধ, লবণাক্ততা মোকাবিলায় পানি ব্যবস্থাপনা, আধুনিক হাসপাতাল, কর্মসংস্থান। খুলনা-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, এই অঞ্চলে আধুনিক হাসপাতাল নেই। নির্বাচিত হলে এটি হবে আমার প্রথম কাজ। কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন এই প্রতিশ্রুতিগুলো কি আগের মতোই কাগজে থেকে যাবে, নাকি বাস্তবায়নের মুখ দেখবে? খুলনার মানুষের জীবন মানেই প্রতিদিনের লড়াই নদীভাঙন, লবণাক্ততা, নিরাপদ পানির সংকট, ভঙ্গুর বেড়িবাঁধ আর কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে। তবু নির্বাচন এলেই তারা আবারও আশা করেন হয়তো এবার কেউ তাদের কথা শুনবে। ২০ লাখ ভোটারের এই জেলা এখন অপেক্ষায় কে আসবে শুধু আশ্বাস দিতে নয়, বরং সমাধান, প্রকল্প, বাজেট ও বাস্তবায়নের স্পষ্ট রূপরেখা নিয়ে? উত্তর মিলবে ভোটকেন্দ্রে। আর মানুষের প্রত্যাশা একটাই নিরাপদ বেড়িবাঁধ, সুপেয় পানি এবং সম্মানজনক জীবনের টেকসই ভবিষ্যৎ।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাকি আর মাত্র ২৩ দিন। ফলে খুলনা জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে ভোটের অঙ্ক কষতে ব্যস্ত সময় পার করছে রাজনৈতি দলগুলো। আনুষ্ঠানিক প্রচার না চালালেও বসে নেই প্রার্থীরা। কৌশলে কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভোটারদের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হচ্ছেন তারা। তবে ভোটাররা বলছেন, শুধুই কথার ফুলঝুরি নয়, এবার কাজে পারদর্শী ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সক্ষম এমন প্রার্থীর ব্যালটে ভোট দিতে চান তারা।