
বিশেষ প্রতিনিধি: ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার ব্যস্ত সড়কের পাশে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। টিনের চাল, পুরোনো দেয়াল আর সাধারণ সাজসজ্জা—সব মিলিয়ে খুবই সাধারণ একটি পরিবেশে রিনিয়া বেগমের ছোট্ট এই চায়ের দোকানটি। কিন্তু এই সাধারণতার মাঝেই লুকিয়ে আছে এক নারীর অসাধারণ সংগ্রামের গল্প।
দোকানটির ভেতরে দেখা যায়, একটি ছোট কাউন্টার, পাশে কিছু কাঠের তাক তাতে রাখা স্থানীয় বেকারির তৈরী বিভিন্ন প্রকার বিস্কুট, ও চানাচুর সহ নানা প্রকার খাদ্য পন্য, চা-পাতা, চিনি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল। এক কোণে গ্যাস সিলিন্ডার ও চুলা, সামনে কয়েকটি স্টুলে বসে চা পান করছেন স্থানীয় গ্রাহকেরা। দোকানের দায়িত্বে থাকা নারীটি হলেন সংগ্রামী কিংবা সাবলম্বী এক নারী অথবা অসহায় একটি পরিবারের অভিভাবক, একজন মা। ফরিদপুর জেলার পৌর সহর আলফাডাঙ্গা থানার সামনের সড়কের চায়ের দোকান্দার রিনিয়া বেঘম। এখানে তিনি বিরতিহীন ভাবে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিজেই সামলান দোকানের সবকিছু। যেমন চা তৈরি, সাথে হাকা ধরনের নাস্তা পরিবেশন সহ এ-সবের হিসাব-নিকাশ সবই তার হাতে।
স্থানীয়রা জানান, গত প্রায় ২১ বছর আগে তার স্বামী মোঃ শাহদাৎ শেখ মারা যাবার পর থেকে পারিবারিক আর্থিক সংকটের মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে তার একার আয়ের উপর বিশাল দায়িত্ব ছিলো সংগ্রামী এই নারীর উপর যেমন সংসারে তার তিনটি মেয়ে ও এক ছেলে সহ ৫জনের অভিভাবক রিনিয়া বেঘমকে। বড়ো মেয়ে সুরাইয়া এস এ সি পর্যন্ত ২য় মেয়ে ফার্জানা তাকেও এস এ সি পর্যন্ত লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে দিয়েছেন, আর ছোটো মেয়ে ফারিয়া বর্তমানে আলফাডাঙ্গা ডিগ্রি কলেজের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী, সবার ছোট্ট মোঃ আরিফ এবার আলফাডাঙ্গা ডিগ্রি কলেজ থেকে ইন্টার পাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন রিনিয়া। তার অক্লান্ত পরিশ্রমে ও একার উপর্যনে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ হিশেবে তৈরী করতে বা আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে দির্ঘ প্রায় ২১ বছর পার করিতে হয়েছে। রিনিয়া বলেন আমার স্বামী মারা যায় ২০০৫ শালের ১৭ অক্টবর এর পর থেকে ছেলে মেয়ে নিয়ে বাচার তাগিদে স্বামীর রেখে যাওয়া ছোটো পরিসরে এই চায়ের দোকানটিতে তিনি আবার ও নুতান করে শুরু করেন তিনি। শুরুতে নানা প্রতিকূলতা থাকলেও ধীরে ধীরে গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করেতে স্ব ক্ষম হন বলে জানিয়েছেন রিনিয়া বেগম। দোকানটির কেনা বেচার প্রতিদিনের আয়ে আমার সংসার সহ সবকিছুই চলে। সন্তানের পড়াশোনার খরচও জোগান দিচ্ছি এখান থেকেই।
একজন নিয়মিত গ্রাহক আলফাডাঙ্গা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মোঃ আলমগীর কবির বলেন, আপা একজন অত্যান্ত ভালো মনের মানুষ, তার আচার আচারনে আলফাডাঙ্গা এলাকার ছোট্ট এই শহর টির কমবেশি সবাই তাকে চিনেন একই সাথে আপা খুব আন্তরিকভাবে চা বানান। আমরা লক্ষ করছি তিনি দোকানটি সহ সবকিছুই সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করেন। তাই আমরা প্রতিদিন এখানেই আসি।
দোকানটির অবকাঠামো খুব আধুনিক না হলেও আন্তরিকতা আর পরিশ্রমই যেন তার মূল শক্তি। সমাজের নানা চ্যালেঞ্জের মাঝেও একজন নারী যে সাহস আর পরিশ্রম দিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারেন—এই ছোট্ট দোকানটির মালিক রিনিয়া বেগম তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, এমন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে তারা আরও স্বাবলম্বী হতে পারবেন। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পেলে এই ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ছোট্ট এই চায়ের দোকান তাই শুধু চা বিক্রির স্থান নয়, এটি এক সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি, আত্মবিশ্বাস ও স্বাবলম্বিতার গল্প।
Like this:
Like Loading...
Related