
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : মানুষের বসবাসের স্থানে বাঘ বা সাপ ঢুকে পড়লে মানুষ মোটেই তাদেরকে আপ্যায়ন করে না। বরং বাঘ ও সাপ দেখতে পাওয়ামাত্রই তাদেরকে পিটিয়ে মারে। কেউবা ভয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। বাঘও তাদের এলাকায় মানুষ পেলে আক্রমণ করবে, এমনকি খাবার হিসেবে দেখবে—সেটাই স্বাভাবিক।
মানুষ ক্রমে ক্রমে বাঘের আশ্রয়স্থল জঙ্গল কেটেকুটে সাফ করে দখল নিয়ে বাড়িঘর আর চাষাবাদের জমি বাড়াচ্ছে। আবার কি না সুন্দরবনে ঢুকে মানুষ কত কী করছে। কাঁকড়া, মধু ও কাঠ সংগ্রহ করার জন্য বাঘের এলাকায় ঢুকে পড়ছে মানুষ। তাই মানুষ তার স্বভাবদোষে আক্রান্ত হচ্ছে। কয়েকটা মোষ নিয়ে ঢুকে বাঘের সামনে দিলে তো মানুষ বাঘের আক্রমণের শিকার হয় না।
বাঘের কী দোষ? মানুষ যায় কেন বাঘের আশ্রয়স্থলে? বাঘ তো মানুষ খাবেই— তার খাবারের একটি হলো মানুষ। মানুষ কেন জেনেশুনে ঢুকে যায় সুন্দরবনে? বাঘের খাবার সংগ্রহের প্রধান অস্ত্র তার গতি ও শক্তি। বয়স বাড়লে সেই সময় বাঘের সামর্থ্য কমে, গতি মন্থর হয়। খাবার হিসেবে বাঘের পছন্দ হরিণ, মোষ। সেগুলো শিকার করতে গেলে যে শক্তি ও গতির প্রয়োজন, তা বয়সের কারণে হারিয়ে ফেলে। তখন অন্য প্রাণীর তুলনায় মানুষ শিকার সহজ হয়। জখম বাঘের ক্ষেত্রেও এটা সত্য।
সজারুর কাঁটায় জখম হওয়ার ঘটনা বাঘের ক্ষেত্রে ঘটে প্রায়ই। তাছাড়া মানুষের রক্তের নোনা স্বাদও নাকি বাঘের খুব প্রিয়। শিকারিদের মধ্যে এ নিয়ে নানা গল্প চালু আছে, খাবার না পেলেই বাঘ জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে আসে। কেননা খাদ্য-খাদক সম্পর্ক এখানে। তাই সুন্দরবনে মানুষের সঙ্গে বাঘের লড়াই থাকবেই।
মানুষ জঙ্গল সাফ করছে, আবার বাঘের আশ্রয়স্থলে ঢুকছে! দোষটা কি মানুষের নয়? সার্ভাইভ্যাল অফ দ্য ফিটেস্ট-এর তত্ত্ব তা-ই বলে। ইয়ান মার্টেলের উপন্যাস অবলম্বনে বিখ্যাত হলিউড মুভি ‘লাইফ অফ পাই’ যারা দেখেছেন, তারা জানেন— ভয়ানক রয়াল বেঙ্গল টাইগারকে মাঝ-সমুদ্রে মাছ খাইয়ে খাইয়ে কীভাবে পোষ মানিয়েছিল পাই। পেটে খাবার থাকলে মানুষ খাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয় না বাঘ। তাই সুন্দরবনের বাঘেদের পেট ভরানোর ব্যবস্থা জরুরি। বন দপ্তরকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, মাছ কাঁকড়া মধু ইত্যাদি সংগ্রহকারীদের জঙ্গলে যেতে হলে কয়েকটি মোষ সঙ্গে নিয়ে যেতে বাধ্যবাধকতা দরকার। বাঘ দেখতে যেমন সুন্দর; ঠিক তেমনই ভয়ঙ্কর। বাঘ আসলে বড় বিড়াল জাতের অন্তর্ভুক্ত একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী। সিংহ, চিতাবাঘ ও জাগুয়ারের সঙ্গে প্যানথেরা গণের চারটি বিশালাকার সদস্যের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী প্রাণী। বাঘ ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় পশু।
যদিও অতীতের তুলনায় বিশ্বে বাঘের সংখ্যা অনেক কমেছে। ইতিহাসের তথ্যমতে, ১০০ বছর আগেও পৃথিবীতে বাঘের সংখ্যা ছিল এক লাখেরও বেশি। বর্তমানে সে সংখ্যা ৯৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯০০টিতে। তবে বিশ্বব্যাপী সচেতনতায় এখন আবার বাড়ছে বাঘের সংখ্যা।
পৃথিবীতে বাঘকে টিকিয়ে রাখা খুবই জরুরি। এ বিষয়ে হয়তো অনেকেরই জানা নেই। বাঘ টিকিয়ে রাখার প্রতিশ্রুতি নিয়েই প্রতিবছর ২৯ জুলাই পালিত হয় আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস। বাঘ রক্ষার শপথ নিয়ে সারা বিশ্বে পালিত হয় এই দিবসটি। এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘বাঘ বাড়াতে শপথ করি, সুন্দরবন রক্ষা করি’।
এই দিবস পালনের মুখ্য উদ্দেশ্য হল বাঘের প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা করা এবং বাঘের সংরক্ষণের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে এর সম্পর্কে থাকা ভুল ধারণা ও ভয় দূর করা। বিশ্বজুড়ে বাঘ বিপন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে রাশিয়ায় প্রথমবারের মতো বাঘ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
ওই সম্মেলনে বলা হয়, আগামী ১২ বছরে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণে পরিণত করতে হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেশে দেশে বাঘ সংরক্ষণে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হতে শুরু করে। বাংলাদেশেও একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। বন বিভাগের সঙ্গে ওয়াইল্ড টিম এই কার্যক্রমটি বাস্তবায়ন করে থাকে।
জেনে নিন বাঘ সম্পর্কিত অজানা সব তথ্য
বিড়াল প্রজাতির সবচেয়ে বড় প্রাণী হলো বাঘ। একটি পুরুষ বাঘের ওজন কমপক্ষে ৩০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। যা ৬ জন মানুষের গড় ওজন।
বাঘ তার একটি হাত বা পায়ের থাবা দিয়েই মানুষকে মেরে ফেলতে পারে। বিশেষ করে বাঘের সামনের হাতের একটি থাবা কোনো মানুষ বা প্রাণীকে মেরে ফেলা বা হাড় ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বাঘ প্রকৃতপক্ষে নিশাচর প্রাণী না হলেও রাতেই শিকার ধরা পছন্দ তাদের। এর পেছনের কারণ হলো সংঘাত এড়ানো। বাঘের পছন্দ হলো রাতে তাদের অঞ্চল ঘিরে টহল দেওয়া ও শিকারের খোঁজ করা।
বাঘের শাবক বা ছানারা অন্ধ হয়ে জন্মায়। অন্যদিকে তাদের মধ্যে অর্ধেকই মারা যায়। অন্ধ হয়ে জন্মানোর কারণে চলাফেরা করতে অসুবিধা হয় শাবকদের। তারা মা বাঘের ঘ্রাণ অনুসরণ করে পথ চলে।
যেহেতু বাঘ শাবকেরা জন্মগতভাবে অন্ধ হয়ে জন্ম নেয়। তাই তাদের অধিকাংশই ক্ষুধা বা ঠান্ডায় মারা যায়। আবার কখনও কখনও মা বাঘ যৌন সঙ্গমের উদ্দেশ্যে উপহার হিসেবে নিজের শাবককেই পুরুষ বাঘকে দিয়ে খাওয়ান। যা খুবই দুঃখজনক!
গৃহপালিত বিড়ালরা যেখানে পানি দেখলেই ছুটে পালায়; সেখানে বাঘ পানিতে সাঁতার কাটতে ও জলকেলি করতে পছন্দ করে। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কাটতে পছন্দ করে। জানা যায়, প্রাপ্তবয়স্ক বাঘ একদিনে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত সাঁতার কাটতে পারে। পানিতে খেলার ফাঁকে বাঘ শাবক ও নারী বাঘকেও হত্যা করে অনেক পুরুষ বাঘ।
বাঘের আয়ু ২০-২৫ বছরের মধ্যে। তবে বেশিরভাগ বাঘই ২০ বছর বয়সের আগে মারা যায়। বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক বাঘটির বয়স ছিল ২৫ বছর। যার নাম ছিল ফ্ল্যাভেল। ফ্লোরিডার টাম্পার চিড়িয়াখানার থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
বাঘ বড় প্রজাতির অন্যান্য বিড়ালের সঙ্গেও সঙ্গম করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি পুরুষ বাঘ নারী সিংহের সঙ্গে সঙ্গম করে; তাহলে সংকর জন্মগ্রহণকারী প্রাণী টিগন নামে পরিত।
টিগন প্রজাতি বৃহত্তম বিড়াল প্রজাতি এবং লিগারের চেয়েও বড় হতে পারে। যা পুরুষ সিংহ এবং স্ত্রী বাঘের মিশ্রণ। একটি লিগারের উচ্চতা চারটি পায়ে এবং দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় প্রায় ৬ ফুট লম্বা হয়।
বাঘের লালা অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে বিবেচিত। বাঘের লালায় থাকে অ্যান্টিসেপটিক সালাইভা। সম্ভবত এটিই বাঘের একটি ভালো বৈশিষ্ট্য। যদি বাঘের শরীরের কোথাও ক্ষত হয়; তখন তারা চেঁটে চেঁটে স্থানটি জীবণুমুক্ত করে।
প্রাণীজগতের দ্রুততম রানার না হলেও বাঘের শক্তিশালী পা আছে। যা দিয়ে প্রতি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌঁড়াতে পারে এই বিস্ময়কর প্রাণী।
বাঘের শরীরের ডোরাকাটা দাগ কারও সঙ্গে কারও মিল নেই। অনেকটা আমাদের আঙুলের ছাপের মতো। ঠিক বাঘের শরীরের ডোরাকাটা দাগগুলোই তাদের পরিচয় বহন করে। এই দাগগুলো তাদের পশমের নিচে চামড়াতেও দেখতে পাবেন।
বাঘ খুব কমই গর্জন করে। অন্যদিকে নিজ প্রজাতিকেই খেয়ে থাকে এই হিংস্র প্রাণী। যার শিকার হয় নারী ও শাবক বাঘ।
অদ্ভূত এক তথ্য হলো, বাঘের মূত্র থেকে যে গন্ধ বের হয়, তা না-কি বাটার পপকর্নের মতো। তাই বনাঞ্চলে এই ঘ্রাণ পেলে বুঝবেন সেখানে বাঘ আছে।
বাঘ অন্যান্য প্রাণী শিকারের সময় তাদের সঙ্গে লড়াই করতে পছন্দ করে। শরীরে ডোরাকাটা দাগ থাকার কারণে তারা ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিব্যি লুকিয়ে থেকে আক্রমণ করে শিকারকে।
বাঘকে নির্জন প্রাণী হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তারা অবসর সময়ে হাঁটতে বা তার পরের খাবার খুঁজতে থাকে।
বাঘ সাধারণত বুনো শুকনো, হরিণ, ভালুক, পাখি, গণ্ডার, কুমির, মহিষ ও চিতা বাঘও খেতে পছন্দ করে। এমনকি তারা মাছও খায়!
বাঘ অন্যান্য প্রাণীর ডাক অনুকরণ করতে পারে। অন্য প্রাণীদের ডাক নকল করার মাধ্যমে বাঘ অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণ করে। বাঘরা অন্যান্য প্রাণীদের ডাক অনুকরণ করে নিরীহ প্রাণীদের ফাঁদে ফেলে এবং আক্রমণ করে।
যদিও বাঘ মানুষকে শিকার হিসেবে দেখে না। যদি না কোনো মানুষ তাদের প্রতি আক্রমনাত্মক না হয়। যদি কখনো বাঘের সম্মুখে পড়েন, তবে অবশ্যই সামনে পা না বাড়িয়ে পিছনে পা দিয়ে হেঁটে যাবেন।
বাঘ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাঘ জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যশৃঙ্খল প্রক্রিয়ার একটি অংশ। সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের (ইকোলজি) খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে আছে বাঘ। বাঘ সুন্দরবনের পাহারাদার। আবার এটিও ঠিক যে, বাংলাদেশের মধ্যে শুধু এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলেই বাঘ বসবাস করে। সম্পদ আহরণের জন্য মানুষ এ বনাঞ্চলে প্রবেশ করে।
অনেকেই বাঘ হত্যা ও বিক্রয় করেছেন। যা বর্তমানে নিষিদ্ধ। পাশাপাশি বন উজারের কারণে আবাসস্থল হারাচ্ছে বাঘ। নগরায়ণ এবং কৃষিজমির উপর মানুষের নির্ভরশীলতা বাড়ায় বাঘেরা তাদের আবাস হারিয়েছে ৯৩ ভাগ৷ আর এর ফলে খুব কম জায়গায় বাস করতে হচ্ছে প্রাণীদের, সেই সঙ্গে পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য গেছে বেড়ে৷
এ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে৷ এর ফলে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অভয়ারণ্য হুমকির মুখে রয়েছে৷ ডাব্লিউডাব্লিউএফ এর গবেষণায় দেখা গেছে, বাঘকে বাঁচাতে হলে তাদের আবাসনের দিকে নজর দিতে হবে এবং শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে৷
তবে বর্তমানে বিশ্বের সব দেশগুলো একসঙ্গে বাঘ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। ২০১৬ সালের, ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ড (ডাব্লুডাব্লুএফ) এর তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশ এবং ভারতে বাঘের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে।
কনজারভেশন গ্রুপ ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে৷ ২০১৬ সালে তাদের প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে বাঘের সংখ্যা ছিলো ৩২০০, আর বর্তমানে ৩৯০০৷ ভারত, রাশিয়া এবং নেপালে ডাব্লিউডাব্লিউএফ এর কার্যক্রমের জন্য বাঘের সংখ্যা বেড়েছে৷
যদিও বাঘের সংখ্যা বাড়ছে; তবে বিশেষজ্ঞদের মতে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই প্রাণী। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে হারিয়ে যাবে বিশ্ব-ঐতিহ্য সুন্দরবনের বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার৷ অষ্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সর্বশেষ গবেষণায় এমন আশঙ্কার কথাই উঠে এসেছে৷